লেখালেখি

Tag: ওরহান পামুক

প্রচ্ছদ নিয়ে কয়েক লাইন

  • সম্ভাব্য প্রচ্ছদ নিয়ে কোনো রকম স্বপ্ন দেখা ছাড়াই যদি কোনো ঔপন্যাসিক তার উপন্যাস শেষ করে ফেলতে পারেন; তবে তিনি নিঃসন্দেহে প্রজ্ঞাবান, পুরোদস্তুর পরিণত একজন মানুষ। কিন্তু যা তাকে একদিন লেখক করে তুলেছিলো, ভেতরের সেই ছেলেমানুষি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন।
  • যখন সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোকে স্মরণ করি, তাদের প্রচ্ছদটাকেও তখন আমাদের মনে ভেসে ওঠে।
  • প্রচ্ছদ দেখে যদি আরো বেশি পাঠক বই কেনে, আমাদের সেটা ভালো লাগে। এবং সেই পাঠকদের কথা মাথায় রেখে যে বইগুলো লেখা হয়, সমালোচকেরা যদি সেগুলোকে ধুয়ে দেন; সেটাও আমাদের ভালো লাগে।
  • প্রচ্ছদে যদি নায়ককে ফুটিয়ে তোলা হয় খুঁটিনাটি সহ; লেখক নয় শুধু, পাঠকের কল্পনাকেও সেটা অপমান করে।
  • প্রচ্ছদশিল্পীরা যখন ঠিক করে ‘লাল এবং কালো’ উপন্যাসের ওপরে লাল আর কালো রঙের মলাট থাকবে, কিংবা ‘নীল বাড়ি’ শিরোনামের কোনো বইয়ের ওপরে তারা যখন বসায় নীল রঙের কোনো বাড়ি; আমরা তখন বুঝি যে শিরোনামকে অনুসরণ করলেও বইটাকে তারা আদৌ পড়ে দেখেনি।
  • কোনো বই পড়ার বহু বছর পরেও যদি আমরা কখনো তার প্রচ্ছদের মুখোমুখি হই, আমাদের তখন মনে পড়ে যায় সেই প্রাচীন দিনটা, যখন কোনো এক জায়গায় গুটিসুটি মেরে বসে আমরা ক্রমশ আবিষ্কার করেছিলাম বইটার ভেতরের পৃথিবীটাকে।
  • সার্থক বইয়ের প্রচ্ছদ এক রকমের সুরঙ্গ, প্রতিদিনের নীরস জীবন থেকে সেটা আমাদের নিয়ে যায় বইয়ের ভেতরের জীবনটায়।
  • বইয়ের দোকানের যে আকর্ষণী যাদু, সেটা বইয়ের জন্য নয়, বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য।
  • বইয়ের নাম আসলে মানুষের নামের মতোই, লাখো বইয়ের মাঝ থেকে নাম দিয়েই আমরা একটা বইকে আলাদা করতে পারি। কিন্তু বইয়ের প্রচ্ছদ হলো মানুষের মুখের মতোঃ হয় তারা আমাদের সুখের কোনো স্মৃতি মনে করায়, কিংবা তারা আমাদের প্রতিশ্রুতি দেয় যে অচিরেই আমরা মুখোমুখি হবো স্বাদ না নেওয়া কোনো অভিজ্ঞতার। আমরা তাই বইয়ের প্রচ্ছদকে দেখি গভীর আগ্রহ নিয়ে, ঠিক মানুষের মুখের মতোই।


    [অরহান পামুকের ‘আদার কালার্স’ সংকলনের ‘নাইন নোটস অন বুক কাভার’ এর অনুবাদ]

পামুকের প্রতীক জগৎ

ব্ল্যাক বুক ঠিক দ্রুত পড়ার মতো উপন্যাস নয়। এমনিতেই ওরহান পামুকের গদ্যের গতি তরতর করে পড়ার মত লাগে না কখনোই, সেটার স্বাদ নিতে এগোতে হয় ধীরে ধীরে। ব্ল্যাক বুকের অধ্যায়গুলো বেশ বড়, কখনো কখনো পাতার পর পাতা চলে যায় একটি অনুচ্ছেদেই, বাক্যেরা জটিল রুপে কেবল প্যাঁচিয়েই চলে বহু জায়গায়। ফলে ব্ল্যাক বুকের ভেতরে ঢুকতে পাঠকের সময় লাগে বেশি। মনোযোগ হারিয়ে অনেকেই চলে যাবে- সেই আশঙ্কাও থাকে।

কিন্তু গোয়েন্দা ঘরানার এই উপন্যাসের হাত যে পাঠক মাঝপথে ছেড়ে দেয়নি, পামুকের অনুসন্ধানে আস্থা রেখে যারা কড়া নেড়ে গেছে উত্তরাধুনিক এই বয়ানের দরজায়, নড়েচড়ে বসার অজস্র উপাদান তারা সংগ্রহ করতে পারে সাড়ে তিনশো পাতা পেরিয়ে যাবার পরে। উপলদ্ধি আর প্রশ্নের সিন্দাবাদি বুড়ো পাঠককে বিচলিত করে তোলে তখন।

রঙের মাঝে রক্তপাত

এলোপাথাড়ি ভাবে সহস্র বই পড়বার চাইতে ভালো লেগে যাওয়া কোনো লেখকের হাতে গোণা কয়েকটা বই পড়াও ভালো, এই সত্য আবিষ্কার করতে জীবনের অনেকটা সময় অপচয়িত হয়ে গেছে আমার। ইদানিং তাই ফুলের বনে যার পাশে যাই, চেষ্টা করি তার সমস্ত সুবাস এমনকি পচা গন্ধও ঠিকভাবে আত্মস্থ করতে। সে অভ্যাসেই আমার আতস কাঁচের নিচে সম্প্রতি এসে দাঁড়িয়েছেন তুরস্কের ওরহান পামুক। ছেষট্টি বছরে দাঁড়িয়ে থাকা পামুক, বলাই বাহুল্য, এ মুহুর্তে নিজ দেশের সবচাইতে সবচেয়ে নামজাদা ঔপন্যাসিক। প্রাচ্যের লেখকদের ক্ষেত্রে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেয়াটা নানা কারণে কঠিন। পামুকের ক্ষেত্রে সুবিধা ছিলো স্বনামে খ্যাতিমান হয়ে ওঠার পূর্ব পর্যন্ত তাকে জীবিকার জন্য লিখতে হয়নি। রেলশিল্পে পয়সা কামানো এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম নেয়া ওরহান পামুক পড়াশোনা করেছেন প্রকৌশলবিদ্যা, স্থাপত্য আর সাংবাদিকতায়; কিন্তু ওসবের কোনোটাতেই না গিয়ে তিনি বরং পালটে দিয়েছেন তুরস্কের উপন্যাসের গতিপথ। মাই নেইম ইজ রেড, এই নোবেল জয়ী লেখকের সামর্থ্যের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত।

লেখকের বিচার

সিসলিতে- সারাটা জীবন যে জেলায় আমি কাটিয়েছি, যে তিনতলা বাড়িতে আমার দাদী কাটিয়েছেন জীবনের চল্লিশটা বছর, ঠিক তার উল্টোদিকের এক আদালতে আগামী শুক্রবার আমাকে দাঁড়াতে হবে আদালতের কাঠগড়ায়। আমার অপরাধ, তুর্কী জাতীয়তাবাদের অনুভূতিতে প্রকাশ্যে আঘাত করা। সরকারি কৌসুলি আমার তিন বছরের জেল চাইবেন। হয়তো আমার দুশ্চিন্তা করা উচিৎ; কারণ এই আদালতেই, একই অপরাধের দায়ে আর্মেনিয়ান-তুর্কি সাংবাদিক হারান্ত দিঙ্ককে দাঁড়াতে হয়েছিলো, এবং সংবিধানের ৩০১ নম্বর ধারায় তিনি দোষী প্রমাণিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমি আশাবাদী। আমার উকিলের মতো আমিও মনে করি যে আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটা দুর্বল, মনে হয় না আমার জেলে যেতে হবে।

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: Content is protected !!