ম্যারিলেসের অলিম্পাস ক্যামেরা আর চিরকুট

প্রথম দেখায় স্টেশনটাকে বেশি সুবিধার লাগে না। টিভি নাটকে বাংলাদেশের মফস্বলের কোনো অনামা রেলস্টেশন দেখাতে হলে যেভাবে সেট সাজাতে হয়, প্রায় সেই আদলেই সাজানো। বাতি জ্বলছে না অনেক জায়গায়। ওভারকোট মোড়া সন্দেহজনক দুয়েকটি অবয়ব, যে দলে পুরুষ আর নারী উভয়েই আছে, প্রায়ই আমাদের আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। এদের দিকে দৃষ্টিপাত করে আমার উদ্দেশ্যে নিচুস্বরে নানা মাত্রার সতর্কবাণী ছাড়ে সফরসঙ্গী রিফাত আলম।

ঘটনাস্থল বেলগ্রেড, সময় রাত্রি সোয়া দশটা হবে। সার্বিয়ার রাজধানী থেকে আমরা রওয়ানা হবো হাঙেরির রাজধানী বুদাপেস্টের দিকে।

Read More »

নীল জল দিগন্ত

প্রথম যেদিন গল্পকার হিসেবে আমি পরীক্ষার সামনে দাঁড়াই, সে ঘটনাটা আজ বলতে চাই। প্রথমবারের মতো সেদিন মনে হয়েছিলো যে কাজটা আমার জন্য নয়।

ঘটনাটা ঘটেছিলো আয়াগুয়া নামের একটা শহরে, বলিভিয়াতে। আমি উঠেছিলাম কয়লা খনির কাছে একটা জায়গায়। স্যান জুয়ানের কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডটা এ শহরেই হয়েছিলো, সেইন্ট জন’স ইভ উদাযপন করতে থাকা পানরত আর নৃত্যরত খনি শ্রমিকদের ওপর সেই সন্ধ্যায় চারদিকের পাহাড়চূড়া থেকে স্বৈরাশাসক ব্যারিন্টোসের আদেশে গুলি চালিয়েছিলো তার সৈনিকেরা।Read More »

হামিম কামালের দর্শন অরণ্য

প্রিয় লেখকের প্রতি পাঠকের প্রেম হয় দুই ঘরানার। এক ধরনের লেখককে পাঠক ভালোবাসে কেবল তাদের লেখার মাধ্যমে। আরেক রকম প্রিয় লেখকের প্রতি ভালোবাসাটা জমে অক্ষরের বাইরে, লেখার প্রতি লেখকের নিবেদনের প্রগাঢ়তা অনুভব করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমার কাছে প্রথম ঘরানার লেখক, দ্বিতীয় ধারার লেখক হিসেবে মনে আসে ওরহান পামুকের নাম। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো কেউ কেউ একই সাথে আবার দুই নৌকায়ও পা রাখেন।

তো বাংলাদেশের মতো জায়গায়, পাঠকগোষ্ঠীর আয়তন যেখানে যথেষ্ট বড় নয়, সংবাদ মাধ্যম যেখানে ডুবে রয় নিজস্ব বুদবুদে আর প্রকাশনা ব্যবসা দাঁড়িয়ে থাকে নানা ধরনের ফাঁকির ওপর ভিত্তি করে; তেমন এক দেশে বাস করেও মনোরঞ্জনের সাহিত্যের প্রতি উন্নাসিকতা নিয়ে কেবল জীবন ঘষে আগুন বের করে লেখার প্রতি নিবেদন দেখাচ্ছেন বলে, হামিম কামালের প্রতি আমার অনুরাগ দ্বিতীয় ঘরানায় পড়ছে। পরিচয় আছে বলেই লেখক হয়তো রেগে উঠবেন তাকে প্রথম দলে না রাখায়, এবং কেউ কেউ হয়তো ক্ষেপেও উঠবেন ওই ব্যক্তিগত পরিচিতির সূত্রে আমার পছন্দকে দুই নম্বরি মাল ভেবে। কিন্তু যিনি সত্যি সত্যি লিখতে চান, তিনি জানেন,  তার প্রতিটি অক্ষরকেই উল্টেপাল্টে দেখা হবে মহাকালের কাস্টমসে, এবং পকেটে মিথ্যা থাকলে তাকে ফিরে আসতেই হবে সেই দরজা থাকে। বিগ ব্রাদার আর অগণিত স্মার্টফোনের তীব্র তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে, মিথ্যা বলার ঝুঁকি এই জমানায় তাই, নিতান্ত অদূরদর্শী না হলে নেয়া যায় না।Read More »

রঙের মাঝে রক্তপাত

এলোপাথাড়ি ভাবে সহস্র বই পড়বার চাইতে ভালো লেগে যাওয়া কোনো লেখকের হাতে গোণা কয়েকটা বই পড়াও ভালো, এই সত্য আবিষ্কার করতে জীবনের অনেকটা সময় অপচয়িত হয়ে গেছে আমার। ইদানিং তাই ফুলের বনে যার পাশে যাই, চেষ্টা করি তার সমস্ত সুবাস এমনকি পচা গন্ধও ঠিকভাবে আত্মস্থ করতে। সে অভ্যাসেই আমার আতস কাঁচের নিচে সম্প্রতি এসে দাঁড়িয়েছেন তুরস্কের ওরহান পামুক। ছেষট্টি বছরে দাঁড়িয়ে থাকা পামুক, বলাই বাহুল্য, এ মুহুর্তে নিজ দেশের সবচাইতে সবচেয়ে নামজাদা ঔপন্যাসিক। প্রাচ্যের লেখকদের ক্ষেত্রে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেয়াটা নানা কারণে কঠিন। পামুকের ক্ষেত্রে সুবিধা ছিলো স্বনামে খ্যাতিমান হয়ে ওঠার পূর্ব পর্যন্ত তাকে জীবিকার জন্য লিখতে হয়নি। রেলশিল্পে পয়সা কামানো এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম নেয়া ওরহান পামুক পড়াশোনা করেছেন প্রকৌশলবিদ্যা, স্থাপত্য আর সাংবাদিকতায়; কিন্তু ওসবের কোনোটাতেই না গিয়ে তিনি বরং পালটে দিয়েছেন তুরস্কের উপন্যাসের গতিপথ। মাই নেইম ইজ রেড, এই নোবেল জয়ী লেখকের সামর্থ্যের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত।Read More »

তর্জনিতে স্বাধীনতা

বন্ধ দরজা খুলে শেখ মুজিবুর রহমান বেরিয়ে এলেন। দেরি হয়ে গেছে। বেলা আড়াইটায় রেসকোর্সের সভা আরম্ভ হবে কথা ছিলো। রুদ্ধদ্বার বৈঠকের নানা আলোচনায় এই ৩২ নম্বরেই আড়াইটা বেজে গেলো।

বাইরে বেরিয়ে শেখ মুজিব গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। হাত ইশারা করে তার সাথে পেছনে ডেকে নিলেন তাজউদ্দীনকে। তাজউদ্দীন উঠতে উঠতে চালকের পাশের আসনে গিয়ে বসলেন গাজী গোলাম মোস্তফা। সাদা রঙের মাজদা গাড়িটি যাত্রা করলো রেসকোর্সের দিকে।

Read More »

বাংলাদেশের দিন

সকালের ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন চারপাশ, দূরবীন চোখে দিয়েও সেতুর ওপারের ঢাকা শহরকে দেখা যাচ্ছে না। জেনারেল নাগরার মুখে তাই সামান্য বিরক্তির ভাব, সেটা দেখে কেউ ধারণা করতে পারবে না এই মুহূর্তে তার বুকের ভেতর কেমন সব অনুভূতির উথালপাতাল।

জেনারেল নাগরাকে প্রাথমিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো টঙ্গী পর্যন্ত পৌঁছে অবস্থান নিতে। সেই দায়িত্ব পূরণ করার পরে হাইকমান্ড থেকে নির্দেশ এসেছে ঢাকার পনেরো মাইলের মাঝে চলে যেতে। এরপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। সেনাপতি যদি সব দেখে সামনে এগিয়ে যেতে চান, তাহলে যেতে পারেন। ঠিক এ জায়গাতে দাঁড়িয়েই নাগরার বুকে আশার সাথে দৌড়াচ্ছে আশঙ্কার ঘোড়া। এখনো পুরো জেনারেল নন, মেজর জেনারেল তিনি। অথচ ঢাকা এখন তার হাতছোঁয়া দূরত্বে চলে এসেছে। ইতিহাসের অংশ হবার ললাটলিপি কি ভাগ্য তার জন্যেই রেখেছে? ঢাকার পতন কি তবে তার হাতেই হতে যাচ্ছে?

Read More »

লেখকের বিচার

সিসলিতে- সারাটা জীবন যে জেলায় আমি কাটিয়েছি, যে তিনতলা বাড়িতে আমার দাদী কাটিয়েছেন জীবনের চল্লিশটা বছর, ঠিক তার উল্টোদিকের এক আদালতে আগামী শুক্রবার আমাকে দাঁড়াতে হবে আদালতের কাঠগড়ায়। আমার অপরাধ, তুর্কী জাতীয়তাবাদের অনুভূতিতে প্রকাশ্যে আঘাত করা। সরকারি কৌসুলি আমার তিন বছরের জেল চাইবেন। হয়তো আমার দুশ্চিন্তা করা উচিৎ; কারণ এই আদালতেই, একই অপরাধের দায়ে আর্মেনিয়ান-তুর্কি সাংবাদিক হারান্ত দিঙ্ককে দাঁড়াতে হয়েছিলো, এবং সংবিধানের ৩০১ নম্বর ধারায় তিনি দোষী প্রমাণিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমি আশাবাদী। আমার উকিলের মতো আমিও মনে করি যে আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটা দুর্বল, মনে হয় না আমার জেলে যেতে হবে।Read More »