স্তালিনের রোদে পোড়া বুটজোড়া

রিয়াল মাদ্রিদের কাছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে লিভারপুল হেরে বসার পরের বিকালটায় আমি বেরিয়ে পড়ি মেমেন্টো পার্কের দিকে। একলাই, কারণ জাপানি এক রেস্তোঁরায় খানিক আগে দেড় সপ্তাহ পরে ভাতের সান্নিধ্যে এসেছে বলেই হয়তো, আমার সফরসঙ্গী রিফাত আলম শরীর ম্যাজম্যাজের অজুহাত দেয় এবং টার্কিশ বাথ নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু সফর পরিকল্পনায় বুদাপেস্টের দর্শনীয় স্থান হিসেবে মেমেন্টো পার্ক আমার তালিকায় বেশ উপর দিকেই আছে, সেই জায়গা দেখার সুযোগ আমি কিছুতেই ছাড়বো না।

কিন্তু গুগল ম্যাপ আর হাতের ট্যুরিস্ট গাইডের নির্দেশনা দেখে মেমেন্টো পার্কে যাবার পথ নিয়ে ধাঁধা লাগে আমার, তেমন পরিষ্কার কোনো ধারণা পাওয়াই যায় না। খানিক ভেবে আমি তাই চলে যাই হোস্টেলের গলির মোড়ে। গতকাল থেকেই খেয়াল করেছি, বিভিন্ন বাস কোম্পানির হয়ে আগ্রহী টুরিস্টদের কাছে নানারকম পাস (Pass) আর টিকেট বিক্রি করছে হাস্যজ্বল তরুণ তরুণীরা, কিছু না কিনলেও এদের কাছে তথ্য চেয়ে কেউ ফিরে আসে না। আমি দ্বারস্থ হয়ে যাই ওরকমই একটা তথ্যকেন্দ্রের। মেমেন্টো পার্কে যেতে চাই আমি, কীভাবে যাবো?Read More »

‘গেইম অফ থ্রোন্স হেঁটেছে বিপ্লব আর নারী নেতৃত্বের জুজু দেখানো পথেই’ : স্লাভোয় জিজেক

স্লোভেনিয়ান দার্শনিক স্লাভোয় জিজেক আলোচনা করেছেন সদ্য সমাপ্ত টিভি সিরিজ গেইম অফ থ্রোন্সের রাজনীতিক দর্শন নিয়ে। ২৩ মে, ২০১৯-এ ইন্ডিপেন্ডেন্ট এর মতামত বিভাগে প্রকাশিত উক্ত আলোচনাটি এখানে অনুবাদ করা হলোঃ 

গেইম অফ থ্রোন্সের শেষ সিজন দেখে মানুষের হট্টগোল এমন চরমে উঠেছে, যে প্রায় দশ লাখের মতো লোক অনলাইনে আবেদন জানিয়েছে এই সিজনটা বাতিল করে আবার শুটিং করবার জন্য। বিতর্কের আকার দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে, দর্শক এই সিরিজের অন্য পরিণতির জন্য প্রয়োজনে বাজিও ধরতে পারে!

মানুষের অতৃপ্তিগুলো শোনা যাচ্ছে মূলত কয়েকটা বিষয়কে ঘিরেইঃ দুর্বল চিত্রনাট্য (দ্রুত সিরিজ শেষ করবার চাপ, গল্পের জটিল বয়ানটিকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলা), চরিত্রদের দুর্বল মনস্তত্ত্ব (ডেনেরিসের মুহুর্তেই উন্মাদিনীর রুপ নেয়া তার চরিত্রের সাথে খাপ খায় না)- এরকম সব ব্যাপার।Read More »

বিচ্ছিন্নতার দহন

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝখানে ফিওদর মিখাইলেভিচ দস্তয়েভস্কি তার ছোট্ট উপন্যাসিকা নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ডে রোপণ করেছিলেন বিশেষ এক চিন্তাধারার বীজ, অস্তিত্ববাদ। আজ আমরা জানি, পরের দেড়শো বছরে চিন্তার ওই স্রোত ছড়িয়ে গেছে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো। বিংশ শতাব্দীর উপন্যাসের জগতে অস্তিত্ববাদ কতটা প্রভাব রেখেছে, কিংবা সাত্রে বা কাম্যু থেকে শুরু করে আমাদের ওয়ালীউল্লাহ পর্যন্ত কীভাবে নেড়েচেড়ে দেখেছেন অস্তিত্ব নিয়ে গল্পের নায়কের ভীষণ সংকটমুখর জীবনযাপনকে; সে সব বিষয়েও বহু আলোচনা হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। কিন্তু সত্য কথাই হচ্ছে নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ডের কাছে পুনরায় ফিরে এসে গিয়ে সাহিত্য জগতে এই উপন্যাসের প্রভাব বিস্তার বিষয়ে ঠিক মন দিতে পারিনি। বরং, একবিংশ শতাব্দীর ঢাকা শহরের পথে যেমন সকল লোকের মাঝে বসে নিজস্ব মুদ্রাদোষে আমার যেমন নিজেকে কেবলই আলাদা, ক্ষুদ্র আর অকিঞ্চিৎ মনে হয়; সেই একই দশা আমি এই উপন্যাসে দেখতে পেয়েছি সেন্ট পিটার্সবাগের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে অজ্ঞাতবাসে যাওয়া লোকটির। মনে হয়েছে, নিজের ভেতর আমার অজস্র অনাবিষ্কৃত স্বরকে দস্তয়েভস্কি ভাষা দিয়েছেন এই ছোট উপন্যাসিকায়। লক্ষ করেছি বিস্ময়ে; মানুষ, মানুষের সমাজ আর এদের পারষ্পরিক মিথস্ক্রিয়া সংক্রান্ত নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ আজ অ্যাতো বছর পরেও অক্ষয়, সার্বজনীন।

কিন্ত ঠিক কী নিয়ে লেখা দস্তয়েভস্কির নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড? উত্তরটা নিজস্ব উপায়ে আমরা প্রত্যেকেই জানি, কেবল অভিজ্ঞতা লাভের রাস্তাটা সকলের আলাদা ছিলো।Read More »

ম্যারিলেসের অলিম্পাস ক্যামেরা আর চিরকুট

প্রথম দেখায় স্টেশনটাকে বেশি সুবিধার লাগে না। টিভি নাটকে বাংলাদেশের মফস্বলের কোনো অনামা রেলস্টেশন দেখাতে হলে যেভাবে সেট সাজাতে হয়, প্রায় সেই আদলেই সাজানো। বাতি জ্বলছে না অনেক জায়গায়। ওভারকোট মোড়া সন্দেহজনক দুয়েকটি অবয়ব, যে দলে পুরুষ আর নারী উভয়েই আছে, প্রায়ই আমাদের আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। এদের দিকে দৃষ্টিপাত করে আমার উদ্দেশ্যে নিচুস্বরে নানা মাত্রার সতর্কবাণী ছাড়ে সফরসঙ্গী রিফাত আলম।

ঘটনাস্থল বেলগ্রেড, সময় রাত্রি সোয়া দশটা হবে। সার্বিয়ার রাজধানী থেকে আমরা রওয়ানা হবো হাঙেরির রাজধানী বুদাপেস্টের দিকে।

Read More »

নীল জল দিগন্ত

প্রথম যেদিন গল্পকার হিসেবে আমি পরীক্ষার সামনে দাঁড়াই, সে ঘটনাটা আজ বলতে চাই। প্রথমবারের মতো সেদিন মনে হয়েছিলো যে কাজটা আমার জন্য নয়।

ঘটনাটা ঘটেছিলো আয়াগুয়া নামের একটা শহরে, বলিভিয়াতে। আমি উঠেছিলাম কয়লা খনির কাছে একটা জায়গায়। স্যান জুয়ানের কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডটা এ শহরেই হয়েছিলো, সেইন্ট জন’স ইভ উদাযপন করতে থাকা পানরত আর নৃত্যরত খনি শ্রমিকদের ওপর সেই সন্ধ্যায় চারদিকের পাহাড়চূড়া থেকে স্বৈরাশাসক ব্যারিন্টোসের আদেশে গুলি চালিয়েছিলো তার সৈনিকেরা।Read More »

হামিম কামালের দর্শন অরণ্য

প্রিয় লেখকের প্রতি পাঠকের প্রেম হয় দুই ঘরানার। এক ধরনের লেখককে পাঠক ভালোবাসে কেবল তাদের লেখার মাধ্যমে। আরেক রকম প্রিয় লেখকের প্রতি ভালোবাসাটা জমে অক্ষরের বাইরে, লেখার প্রতি লেখকের নিবেদনের প্রগাঢ়তা অনুভব করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমার কাছে প্রথম ঘরানার লেখক, দ্বিতীয় ধারার লেখক হিসেবে মনে আসে ওরহান পামুকের নাম। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো কেউ কেউ একই সাথে আবার দুই নৌকায়ও পা রাখেন।

তো বাংলাদেশের মতো জায়গায়, পাঠকগোষ্ঠীর আয়তন যেখানে যথেষ্ট বড় নয়, সংবাদ মাধ্যম যেখানে ডুবে রয় নিজস্ব বুদবুদে আর প্রকাশনা ব্যবসা দাঁড়িয়ে থাকে নানা ধরনের ফাঁকির ওপর ভিত্তি করে; তেমন এক দেশে বাস করেও মনোরঞ্জনের সাহিত্যের প্রতি উন্নাসিকতা নিয়ে কেবল জীবন ঘষে আগুন বের করে লেখার প্রতি নিবেদন দেখাচ্ছেন বলে, হামিম কামালের প্রতি আমার অনুরাগ দ্বিতীয় ঘরানায় পড়ছে। পরিচয় আছে বলেই লেখক হয়তো রেগে উঠবেন তাকে প্রথম দলে না রাখায়, এবং কেউ কেউ হয়তো ক্ষেপেও উঠবেন ওই ব্যক্তিগত পরিচিতির সূত্রে আমার পছন্দকে দুই নম্বরি মাল ভেবে। কিন্তু যিনি সত্যি সত্যি লিখতে চান, তিনি জানেন,  তার প্রতিটি অক্ষরকেই উল্টেপাল্টে দেখা হবে মহাকালের কাস্টমসে, এবং পকেটে মিথ্যা থাকলে তাকে ফিরে আসতেই হবে সেই দরজা থাকে। বিগ ব্রাদার আর অগণিত স্মার্টফোনের তীব্র তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে, মিথ্যা বলার ঝুঁকি এই জমানায় তাই, নিতান্ত অদূরদর্শী না হলে নেয়া যায় না।Read More »

রঙের মাঝে রক্তপাত

এলোপাথাড়ি ভাবে সহস্র বই পড়বার চাইতে ভালো লেগে যাওয়া কোনো লেখকের হাতে গোণা কয়েকটা বই পড়াও ভালো, এই সত্য আবিষ্কার করতে জীবনের অনেকটা সময় অপচয়িত হয়ে গেছে আমার। ইদানিং তাই ফুলের বনে যার পাশে যাই, চেষ্টা করি তার সমস্ত সুবাস এমনকি পচা গন্ধও ঠিকভাবে আত্মস্থ করতে। সে অভ্যাসেই আমার আতস কাঁচের নিচে সম্প্রতি এসে দাঁড়িয়েছেন তুরস্কের ওরহান পামুক। ছেষট্টি বছরে দাঁড়িয়ে থাকা পামুক, বলাই বাহুল্য, এ মুহুর্তে নিজ দেশের সবচাইতে সবচেয়ে নামজাদা ঔপন্যাসিক। প্রাচ্যের লেখকদের ক্ষেত্রে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেয়াটা নানা কারণে কঠিন। পামুকের ক্ষেত্রে সুবিধা ছিলো স্বনামে খ্যাতিমান হয়ে ওঠার পূর্ব পর্যন্ত তাকে জীবিকার জন্য লিখতে হয়নি। রেলশিল্পে পয়সা কামানো এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম নেয়া ওরহান পামুক পড়াশোনা করেছেন প্রকৌশলবিদ্যা, স্থাপত্য আর সাংবাদিকতায়; কিন্তু ওসবের কোনোটাতেই না গিয়ে তিনি বরং পালটে দিয়েছেন তুরস্কের উপন্যাসের গতিপথ। মাই নেইম ইজ রেড, এই নোবেল জয়ী লেখকের সামর্থ্যের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত।Read More »