২০ অক্টোবর, ২০২০
যে গেছে, বন মাঝে, চৈত্র বিকেলে
যে গেছে, ছায়াপ্রাণ, বনবীথিতলে ♩ ♪ ♫।

মাথার ভেতরে মহীনের ঘোড়ার জন্য আস্ত একটা রেসকোর্স নিয়ে ভাবতে থাকি; যার যাওয়ার, বনবীথিতল ছাড়া সে আর কোথায় যেতে পারে?

বেইলি রোডের মাস্কবাদী, আর সামাজিক দূরত্বের বালাই না রেখে প্রেম করতে চলে আসা মাস্কহীন রুপসীদের মাঝেই কি সে লুকিয়ে আছে কোথাও? নাকি নবাবী ভোজের সামনে প্রায় নতুন একটা পানির ফ্লাক্স নিয়ে খেলা করে যে ন্যাংটা মাতারির পোলা, উদ্দিষ্ট জন তার পাশেই দাঁড়িয়ে?

বন জানে, অভিমানে, গেছে সে অবহেলে…♩ ♪ ♫

তা অবহেলা করে সে আর কতদূর যেতে পারে? ফেসবুকের কিলোবাইটে পোষ মানানো শিল্প মারানোর বাইরে তার দৌড় আর কতটুকু? নাহ, খুলনায় গিয়ে পাটশ্রমিকের দলে ভিড়ে পুলিশের প্যাঁদানি খাওয়ার বেশি তার সাধ্য নাই। অথবা হয়তো প্রীতি জিনতার সাথে বসে সে আইপিএলের খেলা দ্যাখে বড়জোর। ট্রাম্পের নির্বাচন নিয়ে কথা বলা? সেটাও অবশ্য সীমিত পরিসরে তার পক্ষে করা সম্ভব।

… প্রশ্নের উত্তর কিছুতেই মেলে না। দিন ফুরোনো আলোর এইসব সেপিয়া বিকেল, এমনিতে পোষা কুকুরের মতো ঝিমিয়ে থাকা, অথচ সিগন্যাল পড়লেই বনবেড়ালের মতো চিৎকার করতে থাকা এইসব রাস্তাঘাট; দেয়ালের গায়ে রাজারবাগ শরীফের এইসব মাহফিলের বিজ্ঞাপণ, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভেতরে কাউকে ঢুকতে না দেয়ার এইসব সংবিধানের গলিঘুঁপচির ভেতরেও তো সে হারাতে পারে?

সে বুঝি, শুয়ে আছে, চৈত্রের হলুদ বিকেলে,
সেখানে, চূর্ণ ফুল, ঝরে তার আঁচলে… ♩ ♪ ♫

০৬ অক্টোবর, ২০২০
রিকশা ভাড়া চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার ফলে আনন্দ একটু হয় ঠিকই, তবে সেটা ভালোমতো জমতেও পারে না, কারণ পেছন থেকে ক্রমাগত হর্ন বাজে। ফিরে তাকিয়ে বিশালদেহী প্রাডো গাড়ির পেটের ভেতরে চ্যাংড়া এক ড্রাইভার দেখে মেজাজ খারাপ তো হয় বটেই, সাথে ‘এই শালা, গাড়িতে উঠলে কি আমাদের মানুষ মনে হয় না আর?’ বলে হুঙ্কার দিতেও মুখটা নিশপিশ করে। কিন্তু নিজস্ব একটি গাড়ির অভাবে গলাটা আর তোলা হয় না, রিকশাও সেই ফাঁকে চট করে ঢুকে পড়ে গলিতে।

রাজধানী ঢাকার চিরকালের পুরোনো সেই গলি। এইসব গলিতে চিরকাল জমে থাকে প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা, এইসব গলিতে রিকশার টুংটাং শুনে পথচারী শঙ্কিত হয়ে ওঠে পেছন থেকে ধাক্কা খাবার ভয়ে, এইসব দুটো গাড়ি পাশাপাশি যাওয়া মানে বহুত দিগদারি, তার ওপর শালারা রাস্তার ওপর ভ্যান পেতে সবজি কি ফল বেচে যাচ্ছে। এইসব দৃশ্য কতদিনের পুরোনো?

হিসাব নাই। সেই কয়েকশো বছর ধরে এইসব গলিতে একই ভঙ্গিতে চুল কেটে যায় নোংরা সেলুনের নাপিত, এক একটা বাড়ির নিচতলায় জায়গা করে দেওয়া গুদাম কি কাঠমিস্ত্রির ঘর কি হোমিওপ্যাথির বোতল সাজানো ক্লিনিক সুর্যালোক ঢোকেনি কত যুগ, কতকাল ধরে এইসব গলি অস্পৃশ্য রয়ে গেছে রুপসী রাজকন্যায় ভরে থাকা আলো ঝলমল কফিশপের ঢাকা থেকে। সেই ঢাকা, একদিন যেখানে মাইকেল মধুসূদন দত্ত কবিতা পড়েছিলেন করিনিস্থিয়ান থাম শোভিত কোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে; সেই ঢাকা, যে আজও বেঁচে আছে কোথাও কুকুরকে নিয়ে তুলকালামে অথচ মানুষের জন্য রাস্তায় নামলে যেখানে শিক্ষা শান্তির পেটোয়া বাহিনি হাজির হয়ে যাবে।

কিন্তু ভরসন্ধ্যায় অতদূর ভ্রমণ পোষায় না, আবার রিকশাচালকও ভাড়াটা বেশি রাখেনি। ফলে এইসব কতকাল, কতদিনের গলিপথ ছেড়ে ডাস্টবিনটাকে পাশ কাটিয়ে মেইন রোডে উঠলো ঢাকা শহর আবারো ঝলমল। এখানে এখন পাশের রিকশায় মাস্কপরিহিত যুগল, এখানে এখন চাঁদের নিচে বিদ্যুৎ আর ইন্টারনেটের তার একত্রে জট পাকায়, এখানে এখন রিকশা গিয়ে আটকে দেয় গাড়ির বামদিকের বেরিয়ে যাবার পথ।

সেই কবে মানুষের মুখে কৌতূহল জাগিয়ে এখানে ছুটে গেছে জুয়াড়ি আর বেশ্যা বোঝাই খড়খড়ি তোলা ঘোড়ার গাড়ি; আজ অ্যাতোদিন পরেও তাদের হ্রেষারব আমি ঝেড়ে ফেলতে পারলাম কই?

০১ সেপ্টেম্বর, ২০২০
‘পুরুষ নয়, মানুষ হও।’ – এমন একটি আহবান শোভা পায় টিএসসি’র দরজার পাশে, তো সেই দেয়ালেই হেলান দিয়েই দুটো ভুঁড়িহীন পুরুষ খুব ছবি তোলে। কিন্তু এদের এই কায়দার ম্যালা আগেই পাশ্চাত্য পোশাকের কিছু তরুণী দেয়াল ছাড়াই ছবি তোলে খুব। ঢং এবং ভঙ্গিমার বাহার দেখে মনে হয় ইটের পাঁজা নয়, এরা দাঁড়িয়ে আছে রীতিমতো ভার্সাই উদ্যানে। কাণ্ড দেখে প্রত্যক্ষদর্শী জন লেনন পর্যন্ত নিশ্চুপ, আর পোড়াচোখের বদলে পোড়ামুখ সর্বস্ব সঞ্জীব চৌধুরী কথা বলবে কী, কথা তো সব বলে চলে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে থাকা মেট্রোরেলের সেবায় নিয়োজিত সিমেন্ট মিক্সার গাড়িটি।

একটু একটু কথা বলেন রিদওয়ান ভাই, ডি-স্কুলিং নিয়ে লোকটার জ্ঞান ফেলে দেওয়া চলে না। মূর্খ আমি কিন্তু এসব না বুঝে দেয়াল লিখন-ই দেখে বেড়াই। একজন লিখেছে K+B; তাকে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফাংশন বোঝাতেই যেন, নিচে লেখা R+B, K+B। তারও নিচে, প্রগতির পেটোয়া বাহিনির কেউ বোধহয়,সমস্ত দ্বিধা দূর করতে গোলাপি ফন্টে বিশালাকার করে লিখে রেখেছে K+B।

রাস্তা জুড়ে অবশ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অপরাজেয় বাংলার সামনে শিন্ডলার্স লিস্ট ছবির পোস্টারের বাচ্চা মেয়েটির জামার মতো লালচে রঙের বেলুন একটা একটা করে কমে যায়, আর এদিকে পোস্টারে, যাদুঘরের সামনের সাময়িক স্থাপনায়, দেয়ালের গায়ে বঙ্গবন্ধু মুচকি হাসেন।

আরো সামনে যাওয়া গেলো তো কোলাহল কমে আসে, কাঁটাবন চৌরাস্তা পেরিয়ে এসে,শাইনপুকুরের এপারেও সব চুপচাপ। কয়েকটি আশাবাদী দোকানদার শুধু বসে কাস্টোমারের আশায় ঝিমায়। কিন্তু এদের পেরিয়ে এলাম তো হঠাৎ হঠাৎ ছুটে যাওয়া কোনো বাস কিংবা গাড়ি কিংবা সময় বাঁচাতে তৎপর মোটরবাইক ছাড়া কেউ নাই, দুপাশের নীরব দোকানের মাঝে স্ট্রিটল্যাম্পের দুধেল আলো রাস্তায় একলা একলাই সাতচারা খেলে। পরে অবশ্য সায়েন্স ল্যাব মোড় পর্যন্ত আসতে পারলে আড়ং-এর সামনে ঝোলানো নষ্ট টিভিতে গলাকাটা রিয়াজ এবং মৌসুমিকে দেখে একটু স্বস্তি লাগে চেনা দুনিয়ায় ফিরে আসার।

খানিক দূরের গলিতে ঢুকে এক টুকরো পলিথিন নিয়ে তিনটি বেকুব কুকুরের বাচ্চার টানাটানি দেখলে পরে সেই ঢাকাকে চেনার স্বস্তিটা বাড়ে। সন্ধ্যার নক্ষত্র না জানলেও রিকশা জানে আমি কোন পথে যাবো।

১১ আগস্ট, ২০২০
ফেলুদার ‘হোয়্যার ইজ দা ডেড বডি’তে নয়, কেলেঙ্কারি এখন মেরিন ড্রাইভে। ‘ইয়াবা থাকে ওই ভদ্দরলোকের পকেটে’ জেনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম দাগিয়ে সরকারি সার্ভিসে ঢুকে পড়া লোকটি ফুলটোক্কা মেরে দিলো বিচারপতি না হয়ে ‘দেখবো এবার জগৎটাকে’ বলে বেরিয়ে পড়া সিনহাকে; কেউ বলে ফোটে ফুল, কেউ ভাবে পটকা।

তার আগে আমদলের দেখাদেখি স্তালিনীয় কায়দা করে বামদল। এদের মতো নিরীহ টার্গেটকে হাতছাড়া না করে লোকে পোস্ট তো শেয়ার মারেই, পারলে ব্রাদার অপুর সাথে টিকটক ভিডিও পর্যন্ত বানায়।

বেলা আড়াইটার উইকেট গোণাও থেমে নেই, বেন স্টোকস হতে না পারুক, বেনজেমার নিচে সেই ঘাতককে নামানো মুশকিল। কিন্তু মাস্ক পড়া খুব কষ্ট; এই বলে সচেতন ফেসবুকারটি গরুর হাটে গিয়ে মুলামুলি করে ও থুতু ফেলতে ফেলতে ‘ভাই জিতসেন!’ শুনে ঘরে আসে।

তবে রাস্তাঘাটে গাড়ি এখনও কম। বছর দুয়েক আগে কারা য্যান রাস্তায় নেমে কী সব ‘বদলে দাও’ বলে স্লোগান ছেড়েছিলো, মামলা আর প্যাঁদানিতে এদের বেহাল দশা দেখে পাবলিক আজও পথে নামতে হুঁশিয়ার।

গাড়ির সংখ্যা বাড়াতে এগিয়ে আসেন সাকিব, আর পাবলিক নিয়ে আসে অনুদান। ওয়েব সিরিজের হাত ধরে দেশীয় সংস্কৃতির মূল্যবোধের মতো বন্যার জলে ভাসতে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত ডোবে, সাথে দেশের অর্ধেকটাও নিয়ে যায়।

ডেসটিনি পর্ব শেষে রিজেন্ট পর্বের মিনি সিরিজও শেষ, পৃথিবী ঘুরে যাচ্ছে আগের মতো। আজও অ্যাঞ্জেলিনা জোলির বাঁকানো গুলির মতো মুগ্ধ করে যাচ্ছে মেসি, ওয়েবিনারে সরগরম হয়ে উঠছে পথঘাট, কোথায় যেন রাস্তায় সাইক্লিস্টকে ফেলে ভাস্কর্য এঁকে চলে যাচ্ছে কেউ, বাঙালি হয়ে যাচ্ছে আদিবাসী।

দেখতে দেখতে আলাউদ্দিন আলী কেঁদে ফেলেন, তার দুঃখের কথা কইতে গেলে এই দুনিয়ার সবাই এখনো বলে, শোনার সময় নাই।

৬ জুলাই, ২০২০
বিদায় এন্ড্রু কিশোর। আপনি ছিলেন তাই দূরতম সিনেমার প্লেব্যাক কৈশোরের টিভি অনুষ্ঠানের হাত ধরে ঢুকে যেতো নিউরনে, আপনি ছিলেন তাই অনেক পুরোনো দুপুরের সেলুনের রেডিওগুলো বেজে চলতো কাশতে কাশতে।

বিদায় এনিও মোরিকোনে। আপনি ছিলেন তাই ক্লিন্ট ইস্টউডের প্রায় বোজা চোখের নিচ থেকে ছুটে আসা শিসের সাথে ঘোড়ার খুর ও বুনো পশ্চিমের কামারের ঘায়ের সরোদ হয়েছিলো সারা দুনিয়ার সবচেয়ে চেনা সুর; আপনি ছিলেন তাই সিসিলি’র কোনো গ্রামে রাতজাগা তরুণের সাথে বারান্দায় দাঁড়ানো পৃথিবীর সুন্দরতম তরুণীটির মুখের পানে চেয়ে আমাদের হৃদয়ে বৃষ্টি জাগতো।

৭ জুন, ২০২০
জর্জ ফ্লয়েডের শ্বাস নিতে না পারার কষ্টে বাংলা বিহার উড়িষ্যা থেকে ইয়াহুদি নাসারাদের বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যে সকলেই হঠাৎ আবিষ্কার করে, তাদেরও দম আটকে আছে বহুদিন।

শ্বাস নিতে শ্রমবিমুখ জনতা মাঝে মাঝে আইসিইউ চেয়ে একটু আলোড়ন তোলে অবশ্য, তবে সেটা সীমিত পরিসরে। ফেসবুকের বুকে তারও চেয়ে সজোরে, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে ঘুরে বেড়ায় চন্দ্রাভিযানের জন্য বিপুল দামে কেনা গগলস।

এলোমেলো লুডু খেলার গুটি হয়ে মানুষ ঘুরে বেড়ায় লাল হলুদ আর সবুজ এলাকায়। তারে কই বড় যাদুকর, যার কাঁচা কি পাকা গুটি কেউ খেয়ে দ্যায় না।

খানিক পেছনে তাকালে নামের উচ্চারণ নিয়ে বহু ক্যারিকেচারে অংশ নিয়ে আম্পানে ভেসে যায় বিশ্বচরাচর। হাটুঁপানিতে নামাজ আদায় দেখে চিন্তাশীল রাজনীতিক আত্মঘাতী ফাঁস থেকে বাসি শব খুলে এনে তাদের কানে প্রশ্ন দাগেঃ কোন দল, তুমি কোন দল?

ইউরোপিয়ান ফুটবল ছাড়াও দেশীয় বালকগণও ফিরে গিয়ে মন দিয়েছে নিজ নিজ কাজে। অফিস খুলে দেয়ায় এদের হয়েছে মুশকিল; গণপরিবহন, বাজার ব্যবস্থা আর চিকিৎসকদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য বেশি সময় তারা আর পায় না।

তবে সরকারি সিদ্ধান্তও যে বাজে, তা মেনে নিয়ে বাণী ছাড়তে হয়েছে ঝামেলায় পড়ে গেছে নিখিল বাংলা জাস্টিস লীগ। পাগলা দাশুর মতো ‘দাঁড়া, দেখছিস না বকলস আটকে গেছে?’ বলে হুংকার দিতে গিয়েও এদের শেষ মুহুর্তের স্বস্তি শরাফতহীন জাফরুল্লাহকে খানিক বকে নিতে পারায়।

কোলম্যান বার্কসের পাতা থেকে উঠে এসে যে পরিমাণে আধ্যাত্মিকতা তাকে প্রতিনিয়ত তুলে আনতে হয় ফেসবুক ফিডে, বেঁচে থাকতে তা টের পেলে রুমী তো রুমী, তার চৌদ্দোগুষ্টিও দূরে থাকতো কবিতার।

তবে সত্য বলতে কবির চাইতেও বেশি বেড়েছে ফেসবুক লাইভ অনুষ্ঠান আর সমাজ সেবার দৌরাত্ম্য, বড় বড় বাক্য বুনে সুহান নিজেই সেদিকের ভিড় বাড়ায়।

খসড়া একটা উপন্যাসের বাতিঘর দূরে সরে যেতে থাকে প্রতিটি পদক্ষেপে; তলস্তয় কি স্তাদাল কি সুবিমল মিশ্রের সাধ্য কোথায় রুপসী ড়্যাপুনজেল হয়ে চুল ছড়িয়ে আগ্রহী পথিককে টেনে তুলে ধরে সেই বাতিঘরের চূড়ায়।

স্মৃতিফলকে লিখতে চায় উইলিয়াম ফকনার, He made the books and he died.
কেউ বলে দেয়নি, কিন্তু এটাও সত্য চিরন্তন যেঃ We post updates online, and we die.

৩০ এপ্রিল, ২০২০
কখনো কখনো মনে হয়, এ যেন যিশুর জীবন। উদ্ধত এক ক্রুশে সওয়ার হয়ে তার হাতে চুমু খেয়ে যায় ইস্পাতের পেরেক।

কখনো কখনো মনে হয়, সাতাশ বছরের আয়ূ নিয়ে রোবেন আইল্যান্ডে আপনি সহযাত্রী নেলসন ম্যান্ডেলার। Master of the fate যদিও বা হওয়া যায় কালেভদ্রে, Captain of the Soul কে হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আর কাটে না।

কখনো কখনো মনে হয়, জীবন জেগে আছে অবরুদ্ধ ট্রয় নগরীতে। দেয়ালের ওপাশে হাজারো বছর ধরে অপেক্ষমান দানবীয় এক কাঠের ঘোড়া।

কখনো কখনো আপনার জীবন এডমন্ড দান্তের। শ্যাঁতিল দিউফের প্রকোষ্ঠে প্রতিবেশি পাদ্রী আপনাকে শেখাবে ল্যাতিন, অর্থনীতি আর অসিবিদ্যা।

কখনো মনে হয়, রবার্তো ব্যাজিওর সোনালি চুলের কেশর ছুঁয়ে জীবনের ফুটবল উড়ে গেলো আকাশে। অ্যাতো কাছে তবু যেন আজও কত দূর।

কখন কখনো গভীর রাতের আঁধারে জীবন হয়ে ওঠে এমিল জ্যাটোপেকের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুষারপাতে কাঁপতে কাঁপতে আপনি দৌড়ে যাচ্ছেন জায়গায় দাঁড়িয়ে, প্রতিটি পদক্ষেপে যেন ছিটকে আসে আপনার শেষ নিঃশ্বাস।

কখনো কখনো আপনি এবি ডি ভিলিয়ার্স। অ্যাডিলেড টেস্টের শেষ দিন বাঁচাতে ঝাঁপ ফেলে দেওয়া ব্যাট হাতে।

কখনো ক্খনো ট্রুম্যান বুরবাঙ্ক হয়ে আপনি জীবন কাটাচ্ছেন টেলিভিশন সেটের ভেতরে। চেনা সেটের ভেতর পেট বাঁচাতে রাস্তায় নামা ছোটোলোকের আক্ষেপ আর অভিজ্ঞ মুখে সংকটের ওপর আলো ফেলা বড় মানুষের মত প্রকাশের অভিনয়, পৌনঃপুনিক।

কখনো কখনো নিরানন্দ এ জীবন মৃণালিনী ঘোষালের। চিরদিন এইখানে শুয়ে আছে তার শব, লাল নীল রুপালি নীরব।

কখনো কখনো নিঃসঙ্গতার আয়কর দিতে দিতে জীবন শিখতে হলে কান পেতে শোনা যায় বিটলস। Boy, you gotta carry that weight! Carry that weight, a long time!

১৩ এপ্রিল, ২০২০
বন্ধ একটা দরজার ওপাশে কোনো একটা উপন্যাসের জানালা খুলে পালানো, গত কয়েক বছরে আমার পছন্দের কাজ বলতে ওটুকুই। দরজা বন্ধ রাখা আমার কাছে নতুন নয় তাই, এটাই যেন স্বাভাবিক; আকাঙ্খিতও বটে।

কিন্তু ঝড়ো হাওয়া বা কালবৈশাখী ছাড়াই যখন পোড়ো দরজাটা মিলিয়ে দ্যায় মহামারী, কী ঘটে তখন আমাদের বন্ধ দরজার ওপাশে?

দরজা যখন বন্ধ হয় মহামারীতে, চট করে মনে হয় যেন অনেকদিনের পর আমাদের অখণ্ড অবসর। আমরা আবিষ্কার করি প্রগাঢ় পৃথিবীতে কত কিছু করবার আমাদের। আমরা গুছিয়ে নিই আমাদের বহুদিনের অগোছালো বুলশেলফ। আমরা আলো নিভিয়ে শুনতে পারি নতুন কিছু; শ্যুবার্ট, চপিন। আমরা শিখতে পারি নতুন কোনো রান্না, কিংবা ভাষা। ফোন দেয়া যায় বহুদিন আলাপ না হওয়া কোনো বন্ধুকে।

দরজা বন্ধ করলে মানুষ প্রথমেই শ্বাস টানে একটা জানালা খুলে। এমনিতে তার প্রতিদিনের জানালা হয়তো ভারি অ্যাস্থেটিক, বিদায়বেলার রুমালের মতো সাদামেঘ সেখানে দেখা যায় অনায়াসে। কিংবা হয়তো তার জানালা বড্ড প্যাথেটিক, গলির ভেতরে গাদাগাদি করা কয়েক ডজন সৃষ্টির সেরা জীব ছাড়া সেখানে দেখার কিছু নেই। কিন্তু মহামারী যখন বন্ধ করে দরজা, তখন মানুষ চেষ্টা চরিত্র করে খুলে ফেলে একেবারে ব্যক্তিগত একটা জানালা। হয়তো সে জানালা খুলে প্রত্যাশা করে সূর্যের তলায় কোনো একদিন টং দোকানের ভোজসভায় যাওয়ায়। হয়তো সে জানালা খুলে একটু একটু গান গায়, কিংবা নিজের জন্য আঁকে ছবি; আনন্দ ভাগ করে নিতে সে হয়তো অনলাইনে সেটা আপলোড পর্যন্ত করে। জানালা খুলে কেউ হয়তো আমার মতো লেখে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানালা খুলে সম্পাদন করে ফ্যালে সবচেয়ে সহজ কাজটাই, অশিক্ষিত প্রবন্ধকারের মতো দোষারোপ, কিংবা রবীন্দ্রনাথের মতো অভিজ্ঞ মুখে সর্ব বিষয়ে ক্ষোভপ্রকাশ।

কিন্তু কোনো কিছুই যথেষ্ট হয় না। আমাদের মনে হতে থাকে, উপন্যাসকে দ্বিতীয় জীবন কিছুতেই আর বলা যায় না এ মুহুর্তে বরং কোনো একটা উপন্যাসের চরিত্রকে দেখা যায় আয়নায় দাঁড়ালেই। আন্না কারেনিনার স্বামীর মতোই উদ্ভ্রান্ত পদচারণায় আমাদের মনে হতে থাকে, কোথাও কোনো কাউন্ট ভ্রনস্কি দাঁড়িয়ে আছে আমাদের শত উপেক্ষার পরেও। মনে হয়, টিভির পর্দার ওই শহর ডাবলিনের মতোই আমাদের বহুদিনের চেনা অথচ অপরিচিত। মনে হয়, আমরা অপেক্ষা করে আছি সাম্রাজ্যের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা অপেক্ষা করছি কোনো অচেনা বারবারিয়ানের জন্যে। কোয়েটজি কি লিওনার্দ কোহেনের মতো আমরাও জানি, সেই অদেখা শত্রু এসে পড়েছে।

মুক্তদিনে বন্ধ দরজার ওপাশে জানালা খুলে কেউ হয়তো গান গায়, কেউ ছবি আঁকে, কেউ হয়তো উপন্যাস লেখে। ক্যানো? কারণ হয়তো সেটা ছাড়া কিছু করতে সে অপারগ, কারণ হয়তো জীবনকে সে অর্থ দিতে চায় সেই জানালা খুলে। কিন্তু যখন জীবন নেই, বন্ধ দরজার ওপাশের জানালা সে খুলবে কী করে? বেদনারও সীমা আছে, শুন্যতার শেষ কোথায়?

২১ মার্চ, ২০২০
ডাক্তার বলছে ক্যালসিয়াম নয়, পিপিই’টা কম। কর্তৃপক্ষ বলছে ভাইরাসটা কমজোরি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। বল বাহুল্য, ঝাড়ু নিয়ে কিংবা মাস্ক পড়ে দলবদ্ধ হয়ে ছবি তোলার জন্য আতশবাজি এই দলটি আগেই সেরে ফেলেছে। তার বাইরে নাক খুঁটানো আর পাছা চুলকানো ছোটোলোক বাঙালকে যত্রতত্র ভিড় করার জন্য, এবং ভ্রমণপিপাসু বড়োলোক ড্যুডদের সাজেক ঘুরতে যাওয়ার জন্য সাধ্যমতো গালিগালাজের পর কোয়ারেন্টাইন ভবনের সামনে জমে ওঠা ভিড়ের ছবি শেয়ার করে আক্ষেপ; এই বেশ চলছে। এর বাইরে কী আছে? শরাফতহীন জাফরুল্লাহকে দলদাসপার্টির গালিগালাজ কিংবা মৃতের সংখ্যা যে জনসংখ্যার অর্ধেক ছোঁবে, তা নিয়ে বিবিধ মাত্রার প্রাক্কলন।

তারও বাইরে কী আছে? ওভারকোটের তুলে দেয়া প্রান্তের ওপার থেকে ‘living kills’ মার্কা হাসি মারা কাম্যুর ‘দ্যা প্লেগে’র ফিরে আসা। আরেকটু বেশি আঁতেল হলে সারামাগোর ‘ব্লাইন্ডনেস’ এবং স্থূল হলে ডিন কুন্টজের কোনো এক থ্রিলারের পাতা তুলে শেয়ার দেয়া, এই তো। না পড়েই কাজ সেরে দিতে চাইলে সোডারবার্গের ‘কন্টাজিওন’ দেখে ফেললেই চলে। কিন্তু তার বাইরে কিছু নেই, কোথাও কিচ্ছু নেই। কার্ল সাগানের ছিটকে আসা নক্ষত্রজাত কার্বন আর সিলিকনের দ্বি-মৌল যৌগের জন্য এ শহরে কোথাও কোনো আশা নেই।

নিজেকে ঠুনকো বলে মানুষের শেষ মুহুর্তেও বিশ্বাস হয় না। নিজেকে সে যোগ্যতম বলেই ভাবে, যদিও তার জানা যে সৃষ্টির শুরু থেকেই নিজেকে যে যোগ্যতম দাবি করেছে, তার নাম ইবলিশ। দুনিয়াজোড়া মসজিদে আজ ভেসে আসে ‘আসসালাতু ফিবুয়ু তিকুম’, তোমরা বাড়িতে বসে নামাজ পড়ো। কিন্তু তারপর কী? প্রার্থনার পরেও কি কিছু থাকে মানুষের?

ধ্বংস হয়ে যাওয়া আলেপ্পো শহরের ভাঙ্গা জানালায় বসে গ্রামোফোন শোনেন আবু ওমর, জনশুন্য ইতালির ছাদে বেজে চলে ‘বেলা চাও, বেলা চাও, বেলা চাও চাও চাও!’, ঢাকার বারান্দায় পাঠকের হাতে উঠে আসে মুরাকামির ছয় আঙ্গুলে মেয়ে।

They say ‘EARTH!’ will be just ‘EH!’ without the ART. They say it rightly.

১৫ জানুয়ারি, ২০২০
কী নামে ডাকা যায় সেই ধানমন্ডিকে যেখানে দুপুর থেকে বিকেল গড়িয়ে যায় মুহুর্তেই?

‘বুক অফ কোশ্চেনসে’ পাবলো নেরুদা এই প্রশ্ন তোলেননি। আমার করা ঠিক হবে নাকি ভাবতে ভাবতেই দেখি টিএসসি মোড়ে সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে অনশনের সামনে মাইক হাতে দাঁড়িয়ে ডাকসু খ্যাত নূর। লোকে বক্তব্য শোনে কম, মাইকের দিকে পাছা ঘুরিয়ে নূর ভাইকে ফোকাসে রেখে সেলফি তুলতে আগ্রহী মানুষই বরং বেশি। দুয়েকজন পারলে আবার রিকশা থেকেই কাজটা সেরে নেয়। আমার অ্যাতো সময় কোথায়? বরং বইমেলা আজ একটু সময় নিয়ে দেখতে চাই।

বেশ খোলতাই আয়োজন, মেট্রোরেলের ঠাপ খেয়ে টালমাটয়াল হয়ে পড়া শহরে যানজটের মতো মেলারও আয়োজন বেড়েছে। খাবার দোকান, হাঁটার জায়গা; সবই প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। বিশ্বমানের, বাংলা সাহিত্যে অনন্য, বেস্টসেলার আর নতুন জঁরার আবিষ্কারকের ট্যাগ খাওয়া লেখকেরা উদাস হাসি নিয়ে এদিক-সেদিক ঘোরে। চন্দ্রবিন্দুর সামনে বন্ধুদের ভিড়, নোংরা হাসি মুখে সব শালাই আমায় অবহিত করে যে মেলার সেরা বইটি এবার তারই লেখা। ভাবি, কতবার মুখ খারাপ করলে জ্বলে যায় বন্ধুত্বের রঙ?

ফোন, হাত মেলানো আর লোকে ভরপুরে মেলা চত্বর হালকা হলো তো পা চালিয়ে চলো দোয়েল চত্বর। অন্ধকার এবং বালিতে থৈথৈ ফুটপাথে দাঁড়িয়ে দানবাকার কলামের দিকে চাইলে মনে হয় গভীর রাতে গলাকাটা মাহাক্কাল এখানে নামতেও পারে। একটু একটু ভয় করে তো গাড়ির মাঝে কে যেন নিচু গলায় আহবান করে, ‘বিঘ্ন দাও অপসারি…’

শুদ্ধ্বস্বর? আড্ডা? অভিজিৎ রায়? কী যেন মনে পড়ে, আবার পড়ে না। ভাবি, পুরোনো কলম কতবার ব্যবহার করলে মুছে যায় এক দশক?

০২ জানুয়ারি, ২০২০
‘হালারা আলু দিয়া ডাইলপুরি বানায়!’ বলে শহীদুল জহিরের কাছে শুনেছি, কিন্তু আজ নাস্তার টেবিলে বিস্ময় আরও বড়। ডিমপোচের মাঝে ভাসে আস্ত একটি কমলা রঙের আটটা-ন’টার সূর্য। তা মাঝের কদিন বিরতির পর সূর্য অবশ্য গত কদিন ধরে নিয়মিতই দেখা দিচ্ছে, বিশেষ করে দুপুরের দিকে সে ছাদে উঠে রীতিমতো ফিল্ডিং মারে। কিন্তু এখন খাবার টেবিলে দেখা দিয়ে এই শালা কি নববর্ষের উপলক্ষে মন ভালো করে দিতে চায়?

রাস্তায় নেমে তাই মনে হয়। অন্যদিন খেঁকিয়ে ওঠা রিকশাওয়ালাদের মাঝে প্রথমটাই ন্যুনতম বাক্য ব্যয়ে রাজি, ফলে পঞ্চাশ গজ রাস্তা উল্টো দিকে যাওয়ার অপরাধবোধটা আজ আর কাজ করেই না। রিকশা এবার ফাইন গতিতে এগিয়ে চলে, যে কারণে কুকুরের মুখের সামনে ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে স্ট্রেট ড্রাইভের শ্যাডো প্র্যাকটিস করা পিচ্চি, বা আরামে দাঁড়াও ভঙ্গিতে রোদ পোহানো স্যুটমারানি জেন্টলম্যান; সবাইকেই ভালো লাগে। গুণগুণ করতে ইচ্ছা পর্যন্ত জাগে:
Happy ever after in the market place
Desmond lets the children lend a hand ♪ ♫ ♬

এরপর হাঁটা। বাস-ট্রাক সবই তো চলে, তবু রাস্তায় হর্নের সংখ্যা আজ শংকাজনক কম। এ ক্যামন ঢাকা? ছটফটিয়ে কমলা জুতো নিয়ে হেঁটে যাওয়া র্যাগন্ডম পথচারী আছে, অসম্ভব দু:খী চোখ নিয়ে প্রতিদিন পাশ কাটিয়ে যাওয়া চেনা মানুষটিও আছে; তবু অমানুষ ঢাকাকে আজ অচেনা, সুন্দর মুখশ্রীর মলি জোনসের মতো লাগে।
Molly stays at home and does her pretty face
And in the evening she still sings it with the band ♪ ♫ ♬

বৃষ্টি ছাড়াই এদিকে পানি। মেট্রোরেলের ধূলো এড়াতে শালারা রাস্তা ভিজিয়ে রেখেছে, আর তাদের এই পরোপকারী মনোভাবে ঝামেলায় পড়েছে পথচারীদের জুতোজোড়া। কিন্তু সকালটা এতো মিষ্টি, কাউকে গালি মারতে পর্যন্ত ইচ্ছা হয় না। এইসব সকালে একটুর জন্য সিগন্যালে আটকে যাওয়া বাইকচালক খুব বিনয়ের সাথে ট্রাফিকপুলিশকে জিজ্ঞেস করে, ‘চাচা, ছলে যাই?’
Ob la di, ob-la-da, life goes on, bruh,
La-la, how the life goes on ♪ ♫ ♬