২০১৮

১২ অক্টোবর, ২০১৮
সুদূর লাতিনে চে গুয়েভারার মৃত্যুর অপরাধে আজ কতদিন পরেও এই বাংলায় লোকেরা বেশ নতজানু হয়ে পড়লো, ভাবটা এমন যে ওই শালা থাকলেই পাগলা দাশু নাটকের শেষ দৃশ্যে ‘এই রাজ্যে নাহি রবে অন্যায়, অত্যাচার…’ সংলাপ মারার সুযোগ পেতো না। এসব শিশুতোষ ব্যাপার দেখে রাগের চোটে একদল বকুনি দিয়ে বসে রাষ্ট্রপতিকে, আর সমাবর্তনে জাঁকালো ছবি তুলতে না পেরে ওদিকে অভিমানী সাকিবের আঙুল ফুলে হলো গাছ। এর বাইরে আঠারো না পেরোনো নারী দলের ফুটবল সাফল্য বাস্তব, তবে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত সিনেমা দেখায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অমনোযোগের ব্যাপারটা গুজবও হতে পারে।

সিনেমার পর্দাকে বাস্তবে নামিয়ে বাঙ্কসি খেলা দেখিয়ে গেলো লন্ডনের নিলামে, কিন্তু এপাড়ায় ইলিয়াস কাঞ্চনের আওতার বাইরে রয়ে গেলো এমনকি সদরঘাটও। ডিজিটাল আইন অথবা ইয়াবা মামলার জন্য মানববন্ধন করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা আজকাল ব্যস্ত, আবার জাতির মেরুদণ্ড মইদুলও হাজত খেটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে; বান্দরবানে ম্রো জনগোষ্ঠীর জায়গা মেরে দেয়ার নিশ্চিত মিথ্যা অভিযোগে কেউ তাই কোথাও টুঁ শব্দটি করছে না। শব্দ করছে না বহুদিন ধরে লাল হয়ে থাকা আগস্ট মাসের একুশ তারিখও। গণতন্ত্র নিজের করে নিতে গিয়ে হাঙর-নদী-গ্রেনেড লেলিয়ে দিয়েছিলো যারা, অকথ্য অজুহাত দিয়েছিলো ভ্যানিটি ব্যাগের; বিচারের হাওয়ায় তাদের ভবন আজ ধ্বসে পড়েছে। কিন্তু গণশত্রুদের এই পতন দেখেও হাইকোর্টের মাজারের আলী কেনানেরা শিক্ষা নেবে কি না জানি না, উত্থানের পরে পতন- এ কথাটি তারা কেবলই বিস্মৃত হয়।

এদিকে বাংলার রাজপথে আজ রাজত্ব করে ত্রৈলোক্যনাথের তিতলী, কে পথচারীদের আশা দেবে- কে দেবে ভর্তিচ্ছুক পরীক্ষার্থীদের ভরসা, কোথায় আজ গোলাম হোসেন? জানি না। নাটমন্ডলের উচ্চাভিলাষী ও বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া ম্যাকবেথ হয়ে যাচ্ছে গলা কাঁপানো শাহরুখ খান, শহীদ কাদরীর হাত ধরে মাছরাঙা পায় অন্বেষণের মাছ, এসবের মাঝে মনোরম সাদা আকাশের শহর এখন বাতাস আর মৃদু শীতে থরথর। “You want to refuse all that? You want to give it all up? You want to give up the taste of cherries?”

০৩ অক্টোবর, ২০১৮
শীতকাল কবে আসবে, সুপর্ণা?

সুন্দরীদের এই প্রশ্ন কেউ করেনি, তাদের হয়ে সমাজ-ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সর্বজ্ঞদের কলমও জলের মতন ঘুরে ঘুরে একা একা উষ্ণতা বাড়ায়। প্রজাপ্রেমী শাসকের কল্যাণে শত কোটি মোবাইল বাড়িয়ে তুলছে রেডিয়েশন, মিইয়ে পড়া প্রিয়াঙ্কার পর হিন্দুস্থানের ঠগীরা এবার আমির খান সমেত নেমে পড়েছে নির্বাচনের মাঠ গরমে, মেসি-রোনালদোর অপরাধ বাঙালির পোলা তাসকিন করে ফেলায় অনলাইন জনপদ’ও তপ্ত। এসব যদি বা সহ্য করা যায়, আইসিসির অপরাধ যাকে বলে রীতিমতো অমার্জনীয়। আমরা পদ্মাপারের বিচারপতির বিচার করা জনতা, ড্রিম পর্যন্ত ব্রোকেন করে ফেসবুকে পোস্টে শেয়ার করতে পারি; সেই আমাদের তোরা আম্পায়ার দিয়ে হারাবি?

বলতে বলতে গরম বাড়ে। হাঁটতে হাঁটতে ঢাকার মানুষ আজকাল মাটি ও স্মৃতিনির্মিত সেই সব নানরুটি সেঁকার চুল্লীর পাশে গিয়ে গনগনে লাল, কিন্তু রুটির জন্য প্রতীক্ষার মিষ্টি ভাবটা নেই, মুখে পড়ে থাকে রুজির জন্য বিরক্তি। ওভারব্রিজে দাঁড়ালে যতদূর চোখ যায় প্রাণের পণ্য খাবে অথবা খাবে না বলে মোটরগাড়িরা দ্বিধাবিভক্ত। একটু দাঁড়ালেই দেখা যায় কখনো গাড়িকে মৃদু ধমকে রাস্তা পেরোয় পথচারী, আরেকটু সামনে যেতেই লোকটা পাচ্ছে সমাজসেবী স্কাউটের অশ্রদ্ধা।

কিন্তু শীতকাল কোথায় গেলো, হে দ্বিজেন শর্মা?

বাবার স্যুটকেস থেকে বেরিয়ে এসে ওরহান পামুক জানালেন, উপন্যাস- সে আর কিছু নয়, সে কেবল নিজের কাছে যাওয়া। ব্যাপার দেখে একটু একটু মাথা তোলেন রবীন্দ্রনাথ আর মানিক, একজন নাইভ আর একজন সেন্টিমেন্টাল নভেলিস্ট; অথচ আদিবাসীদের কোটা বিলোপ হয়ে গেছে বলে এরা দুঃখে ভরা হ্যাশট্যাগ দিয়ে ডুবে যান আবার। দুঃখ অবশ্য নোবেল কমিটিরও কম নয়, কাকাবাবু ও মতি নন্দী নেই বলে চিমসে হয়ে পড়া আনন্দমেলার শোকে এরা এবার নোবেল পুরষ্কারটাই দিলো না।

আমাদের শহরে তাই কোনো শীতকাল নেই নগরবাসী, এ শহরে আজীবন চ্যালেঞ্জিং টাইমস। কাশীর গলির গন্ধ না পেয়ে এ শহরে মরে গেছে ক্যাপ্টেন স্পার্ক ওরফে রুকুমণি, শহরে এখন পানির অপর নাম রেস্তোরেন্ট।

আমাদের শহরে বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে।

৩১ জুলাই, ২০১৮
পরীক্ষা হোক আর না হোক, বৃষ্টি আজ অনেকক্ষণ পড়লো।

প্রশ্ন ফাঁস হয় বলে একদা ইন্টারে আঠারো ঘন্টার শ্রম ঠেলে স্ট্যান্ডের পর ‘সঞ্চয়িতা আমার প্রিয় বই’ বলে বাণী ছাড়ার দিন আজকাল নেই, বৃষ্টি তাই অত ভালো ছাত্রী হতে পারেনি। সে খানিক পড়ে- খানিক বিরতি নেয়।

ফুলফোর্সে বৃষ্টি নামেনি বলে রেইনি পার্কের সংসার ছেড়ে মালার এবার জয়সলমীর যাওয়াটাও পিছিয়ে যাচ্ছে, অথচ দমদমে নেমে তার বাড়িতে কফি খেয়ে ইমরান খান নিয়াজী আজ প্রেসিডেন্ট। আসামে শুরু হয়েছে বাঙালি খেদাও আন্দোলন। ট্রাম্প শালা কি চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, না করবে না? চাকরির ইন্টারভিউতে কঠিন এই প্রশ্নের জবাব দিতে অপারগ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ভেগে গেলো ইতালি। কিন্তু তোমার পালানো হবে না। বর্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ, হারমোনিয়াম নিয়ে নজরুল, ঘাইহরিণী নিয়ে ঘোরা জীবনানন্দের মতো লুজারের দল হতে না চাইলে বিসিএসে বসো; টিয়ারশেলের ঘায়ে একটি চোখের বিনিময়ে একটি সরকারি চাকরির ডিল বরং বেশ লাভজনক।

ঢাকার যেদিকে যাও আজকে ছাত্রজনতা আর অন্যান্য দিন মেট্রোরেলের উন্নয়নের ধূলার দাপট; চট্টগ্রামের জোয়ার-ভাটায় আস্থা রাখুন বৈঠায়। অনলাইনে আসলে পরে জ্ঞানের ভারে আনত সাংবাদিক আবেগী গলায় ‘প্রজন্ম, তুমি অমুক চেনো…’ বলে পকায়, সাকিব-তামিম খরচ করে ফেলার পর হাতে থাকে শুধু মাশরাফি। এর বাইরে কিছুটা সেক্রেড গেমস, কিছুটা দীঘিনালার পূর্ণা ত্রিপুরা, অনেকটা বাস-ড্রাইভারে কেটে গেলো আমাদের জীবন। মনে হলো, প্রতিদিন গভীর রাতে একবার করে আমাদের মুখ থেতলে দিয়ে নদীতে ফেলে দিচ্ছে মানবতার পুরষ্কার জেতা মা এবং বাপ।

দেখতে পাই, লড়াকু পটুয়া কামরুল আজ পোস্টারে বলছেন ‘এই শাহজানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’, দেখতে পাই, দলদাসেরা আজও নিরপেক্ষ একটি সিলেকশন সম্পন্ন করার আনন্দে উদাস হাসির সাথে মিষ্টি স্মাইলি দিয়ে যায়। দেখতে পাই, গ্যালিয়ানোর বইয়ের পাতার রোদে-ছায়ার ফুটবল দূরে সরে গিয়ে বরিশালের বাঙালনামায় মনীষাই এখন হয়ে উঠেছে লাথি মারার লক্ষ্যবস্তু।

আজ গভীর রাতে, শিক্ষা-শান্তির পোষা বাহিনী আর পেটোয়া ঠোলার হাত এড়িয়ে গড় বাঙালির চেয়ে দীর্ঘতর কোনো কবি যদি দুঃখভারাক্রান্ত মনে আমাদের সামনে এসে হাজির হন, আমি ঠিক জানি- হৃদয়ের মতো মারাত্মক একটি আগ্নেয়াস্ত্র সাথে থাকার অপরাধে পার্টি তার বাপের নাম ভোলাবে।

২ জুলাই, ২০১৮
ব্রাজিল জেতার দিনে হারছে বাংলাদেশ।

এদিকে নেইমার মার খেয়ে তক্তা, ওদিকে হোমপেজে ভেসে আসে ‘ওই মারা যাবে, মারা যাবে, ছাইড়া দে!’ সেলেসাও’রা অভিনয়ে অপটু, কিন্তু মৌলবাদের বিরুদ্ধে চির সোচ্চার এবং শিক্ষা-শান্তি বিজনেসের সাথে মাঝেমধ্যে অর্থকষ্টে ভুগলে নিরুপায় হয়ে চান্দা নেয়া বৈঠাবাহিনী অমন মাল নয়। রেফারির ফাউল ধরার সময় কই? বেচারাকে খুব ভুল বোঝানো হচ্ছে। VAR ডেকে পেনাল্টি খাবার ইচ্ছে গণমাধ্যম কী নামজাদা সেলেব্রেটির নাই।

হেক্সা লোডিং। কিন্তু এদিকে সেভেনাপ, মানে কীসের যেন একশো বছরও লোড হচ্ছে সমানে।

১৪ জুন, ২০১৮
রিও’র বস্তি থেকে এবার রাশান রাজপ্রাসাদের আঙিনায় চলে যাওয়া বিশ্বকাপকে শুধু মহাকালের একক বললে ভুল হবে, বিশ্বকাপ আসলে ক্যালেন্ডারে চারের গুণিতক, আমাদের বয়স বাড়ার কো-অফিশিয়েন্ট।

ক্লদিও তাফারেলের আবছা আবছা ঠেকিয়ে দেয়া টাইব্রেকে, মনে পড়ে, ডিভাইন পনিটেইলের অভিশাপে রবার্তো ব্যাজ্জিওর কিক চলে গেলো স্বর্গে। পরের বার আর অস্পষ্টতার জায়গা নেই, দেখতে পাই গোল করার পর ধ্যানে বসে যাচ্ছেন ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরি, নিখুঁত কনভার্সন রেটের শিল্পবিহীন সায়েন্সের ছাত্র টাকলা রোনালদোর বান্ধবীর সোনালি চুল উড়ে যায় পত্রিকার পাতায়। ফরাসী ফাইনালের জিদান নয়, চোখে লেগে থাকে আরেকজনের তিন টাচের যাদু; ধারাভাষ্যে অবিশ্বাসের হুঙ্কার- ডেনিস বার্গক্যাম্প, ডেনিস বার্গক্যাম্প, ডেনিস বার্গক্যাম্প….

সেই শুরু। এরপর ইয়োকোহোমার বিকালে রোনালদো দেখায় যে ওভাবেও ফিরে আসা যায়, ফ্যাবিও গ্রসোর হেড আর ক্যানাভারোর সাথে মাতেরাজ্জির ইটালিয়ান জব চুরি করে নেয় জিদানের বিশ্বকাপ, একটি একটি গোলে বাঁধা পেরিয়ে ওয়েভিং ফ্ল্যাগসের যুগে স্পেন লিখে নেয় নতুন ইতিহাস, মারাকানায় মুকুট তোলে দ্রুততালের জার্মান যন্ত্র। যুগ পাল্টায়, টিভি পর্দায় নতুন করে ম্যারাডোনা কি সক্রেটিস আবিষ্কারের দিন পেছনে ফেলে এখন টুইটারে মুহূর্ত পুরোন হয়ে ওঠে মো সালাহ কি হ্যারি কেইন। রোমারিও গেলে নেইমার আসে, ম্যারাডোনা গেলে মেসি- তবু বিশ্বকাপ এখানে আজও এক, অদ্বিতীয়।

কারণ আমাদের প্রতিটা দিনই ফুটবল, ইতিহাস আমাদের প্রতিটা দিনই লাথি মারে। আমাদের রেফারির নজর এড়িয়ে চলে প্রকাশক হত্যার চোরাগোপ্তা ফাউল, আমাদের হ্যান্ড অফ গড সমস্তটার শেষ না দেখে ছাড়েন না, আমাদের কন্ঠ জিদানের মতো মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ে ৫৭টি লালকার্ড খেয়ে। বিশ্বকাপের পতাকা আমরা না উড়িয়ে যাবোটা কোথায়? আমাদের ক্রসফায়ারের আক্ষেপে তাই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ব্রাজিল বাড়ির রঙ, অশ্লীল যানজটের ওপরে আলতো ভাসে আর্জেন্টিনার গ্রাফিতি। আমাদের নাপিতের দোকানে গলাগলি বন্ধু হয়ে যায় গালাগালি শত্রু, আমাদের নিয়ত ভাগ হয়ে থাকা মানুষিকতা হয়ে যায় পত্রিকা পরিসংখ্যান নয়তো ফেসবুক ফ্যাক্টের ফাইট।

ফুটবলারদের কাছে সে সোনার পাতে মোড়া এক টুকরো অমরত্ব, কিন্তু আমাদের কাছে সে অসহনীয় দুনিয়ার সার্কাসে একটি মাস অনুভূতির ট্রাপিজে ওড়ার সুযোগ।

ক্যালেন্ডারের পাতায় চারটি বছর কেটে যাওয়ার আক্ষেপ মুছে, কালের খাতায় আরো একটি ঘর হারিয়ে যাবার ভীতি পাশ কাটিয়ে; রাশিয়া, তোমায় স্বাগতম।