জানালা মানুষ

অঞ্জন দত্তের গান প্রথম শোনার দিন না হলেও ক্ষণটা আমার মনে আছে, মনে আছে যে তখনো আমি প্রাইমারি স্কুলেই পড়ি। প্রাইমারি স্কুলে পড়বার সময় আমার ধারণা ছিলো প্রতিবছর ঈদ হয় ঠিক শীতকালে, আর সেই ঈদের জন্যে শীতের সকালে গ্রামের বাড়িতে পেছনের লাগোয়া গোসলঘরে কাঁপতে কাঁপতে গোসল করতে হয় মাথায় পানি দিয়ে। তো, সেরকমই কোনো একটা ঈদ করবার পর মামার গাড়িতে চেপে গ্রাম থেকে রওয়ানা দিয়েছি চট্টলা শহরের দিকে। মেজোমামার ভোক্সওয়াগনের জানালা দিয়ে গালে হালকা থাপ্পড় মারছে ঠান্ডা বাতাস, আমি আম্মার সামনে আধ-বসা-আর-আধেক-দাঁড়ানো অবস্থায় সামনের সিটের কাঁধ আকঁড়ে ধরে আছি, ছোট্টো কিন্তু যাত্রী পূর্ণ গাড়ির নানা আসন থেকে নানা বিষয়ে কথা বলে চলেছে বড়রা, আর এসবের মাঝে কেমন একটা গলায় কে যেন সমানে চ্যাঁচিয়ে যাচ্ছে- ‘বড় বড় বড় বড় গোল গোল চোখ, হরিপদ একজন সাদামাটা ছোটোখাটো লোক…..’Read More »

প্যাটারসন আর পেসোয়াঃ না বাস-ড্রাইভার, না কেরানি

(১)

খেয়াল করলে দেখা যাবে, অজস্র অনাচার আর শ্বাপদে ভরে থাকা আমাদের ক্যারেক্টারলেস ঢাকা শহরকেও কোনো কোনো দিন অসম্ভব সুন্দর দেখায়। এক একটা পথশিশুর মুখের আদলে সেদিন আবিষ্কার করা যায় লেপচা কোনো পিচ্চিকে, কিংবা ভিজে সপসপ প্যান্টে ছিট ছিট কাদা নিয়েও বৃষ্টির পরে নিজেকে মনে হয় সম্রাট। সেইসব দিনে মনে হয়, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা আর সময়ের পৃথিবীতে পঞ্চম কোনো মাত্রা হয়ে আসে সংবেদনশীলতা। আর আমরা জানি, ওই বিশেষ মাত্রাটিকে নিয়ত আবিষ্কার করা যায় একজন কবির হৃদয়ে। আমাদের প্রতিদিনের বিড়ালের মুখে ধরা ইঁদুরের জীবনেও তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগাতে পারে একজন কবি। আর সৌন্দর্য্য আবিষ্কার করতে একজন প্রকৃত কবির পিরামিড কি তাজমহলের প্রয়োজন হয় না, তিনি সৌন্দর্য্যকে খুঁজে নিতে পারেন আমাদের চারপাশের ছড়ানো সাধারণের মাঝ থেকেও। জিম জারমুশের ধীর লয়ের সিনেমা প্যাটারসন দেখে, সেই বিশ্বাসটা মনে আরও পোক্ত হয়।

Read More »

‘আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে দেখার পর’: গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন স্ত্রী ম্যারি ওয়েলশকে সাথে করে, প্যারিসের সেন্ট মাইকেল ব্যুলেভার্দে ১৯৫৭ সালের এক বৃষ্টিভেজা বসন্ত দিনে, দেখামাত্রই তাকে আমি চিনতে পেরেছিলাম। তিনি হাঁটছিলেন রাস্তার অন্যপাশে, লুক্সেমবার্গ পার্ক বরাবর; গায়ে ছিলো তার একটা ভারি শার্ট, একটা বহু ব্যবহৃত কাউবয় প্যান্ট আর মাথায় বেসবল খেলার টুপি। চোখে থাকা ধাতব রিমটা অবশ্য তার সাথে মোটেই মানায়নি; গোলাকার ছোট চশমাটা তাকে দিচ্ছিলো অকালে বুড়িয়ে যাওয়া দাদুর মর্যাদা। তার বয়স তখন ৫৯, এবং লোকটা তখনো বিশাল আর প্রায় অতিরিক্ত চোখে পড়ার দাবিদার। কিন্তু তবু, নিজেকে সে যেমন দেখাতে চায়, তেমন অমানুষিক শক্তসমর্থ লোকটাকে মনে হয়নি। কারণ মানুষটার নিতম্ব ছিলো মাংসহীন, আর কাঠুরেদের জন্য উপযুক্ত শক্ত জুতোয় তার পা জোড়াকে মনে হচ্ছিলো কিছুটা কৃশকায়। পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর মাঝে আর চতুর্দিকে ঘিরে থাকা সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের মধ্যে তাকে অ্যাতো প্রাণবন্ত লাগছিলো, যেটা দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে মানুষটা আর মাত্র চার বছর বাঁচবে।

Read More »

শীতসন্ধ্যার ল্যাম্পপোস্টের আড়ালের বাংলাদেশ

প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ,আজকের এই আয়োজনে আমায় আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। স্বীকার করে নেয়া ভালো, যে তাজউদ্দীন আহমদের মতো মানুষকে নিয়ে স্মরণসভায় আলোচনা করবার মতো প্রজ্ঞাবান আমি মোটেই নই। সে কাজ অন্য আলোচকেরা করবেন। আমি কাজ করি শব্দ নিয়ে, উপন্যাস নিয়ে। আর ঘটনাচক্রে আমার প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস প্রচেষ্টা, সাক্ষী ছিলো শিরস্ত্রাণ, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জীবনকে কেন্দ্র করেই লেখা। ফলে, সাদাকালো অক্ষরের মাঝ দিয়ে শ্রদ্ধেয় তাজউদ্দীনের সাথে একটা উল্লেখযোগ্য সময় আমি যাপন করেছি, এখনো করছি। সেই সূত্রেই বোধ করি, আজকের আলোচনায় আয়োজকেরা আমায় কথা বলার যোগ্য মনে করেছেন। আমি কথা বলবো মূলতঃ  দুটো বিষয় নিয়ে। প্রথমতঃ তাজউদ্দীন আহমদকে আমি ঠিক কীভাবে আবিষ্কার করেছি, আর দ্বিতীয়তঃ আজকের বাংলাদেশে তাজউদ্দীনকে ঠিক কোনখানে আমি খুঁজে পাই।Read More »

স্তালিনের রোদে পোড়া বুটজোড়া

রিয়াল মাদ্রিদের কাছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে লিভারপুল হেরে বসার পরের বিকালটায় আমি বেরিয়ে পড়ি মেমেন্টো পার্কের দিকে। একলাই, কারণ জাপানি এক রেস্তোঁরায় খানিক আগে দেড় সপ্তাহ পরে ভাতের সান্নিধ্যে এসেছে বলেই হয়তো, আমার সফরসঙ্গী রিফাত আলম শরীর ম্যাজম্যাজের অজুহাত দেয় এবং টার্কিশ বাথ নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু সফর পরিকল্পনায় বুদাপেস্টের দর্শনীয় স্থান হিসেবে মেমেন্টো পার্ক আমার তালিকায় বেশ উপর দিকেই আছে, সেই জায়গা দেখার সুযোগ আমি কিছুতেই ছাড়বো না।

কিন্তু গুগল ম্যাপ আর হাতের ট্যুরিস্ট গাইডের নির্দেশনা দেখে মেমেন্টো পার্কে যাবার পথ নিয়ে ধাঁধা লাগে আমার, তেমন পরিষ্কার কোনো ধারণা পাওয়াই যায় না। খানিক ভেবে আমি তাই চলে যাই হোস্টেলের গলির মোড়ে। গতকাল থেকেই খেয়াল করেছি, বিভিন্ন বাস কোম্পানির হয়ে আগ্রহী টুরিস্টদের কাছে নানারকম পাস (Pass) আর টিকেট বিক্রি করছে হাস্যজ্বল তরুণ তরুণীরা, কিছু না কিনলেও এদের কাছে তথ্য চেয়ে কেউ ফিরে আসে না। আমি দ্বারস্থ হয়ে যাই ওরকমই একটা তথ্যকেন্দ্রের। মেমেন্টো পার্কে যেতে চাই আমি, কীভাবে যাবো?Read More »

ম্যারিলেসের অলিম্পাস ক্যামেরা আর চিরকুট

প্রথম দেখায় স্টেশনটাকে বেশি সুবিধার লাগে না। টিভি নাটকে বাংলাদেশের মফস্বলের কোনো অনামা রেলস্টেশন দেখাতে হলে যেভাবে সেট সাজাতে হয়, প্রায় সেই আদলেই সাজানো। বাতি জ্বলছে না অনেক জায়গায়। ওভারকোট মোড়া সন্দেহজনক দুয়েকটি অবয়ব, যে দলে পুরুষ আর নারী উভয়েই আছে, প্রায়ই আমাদের আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। এদের দিকে দৃষ্টিপাত করে আমার উদ্দেশ্যে নিচুস্বরে নানা মাত্রার সতর্কবাণী ছাড়ে সফরসঙ্গী রিফাত আলম।

ঘটনাস্থল বেলগ্রেড, সময় রাত্রি সোয়া দশটা হবে। সার্বিয়ার রাজধানী থেকে আমরা রওয়ানা হবো হাঙেরির রাজধানী বুদাপেস্টের দিকে।

Read More »

লেখকের বিচার

সিসলিতে- সারাটা জীবন যে জেলায় আমি কাটিয়েছি, যে তিনতলা বাড়িতে আমার দাদী কাটিয়েছেন জীবনের চল্লিশটা বছর, ঠিক তার উল্টোদিকের এক আদালতে আগামী শুক্রবার আমাকে দাঁড়াতে হবে আদালতের কাঠগড়ায়। আমার অপরাধ, তুর্কী জাতীয়তাবাদের অনুভূতিতে প্রকাশ্যে আঘাত করা। সরকারি কৌসুলি আমার তিন বছরের জেল চাইবেন। হয়তো আমার দুশ্চিন্তা করা উচিৎ; কারণ এই আদালতেই, একই অপরাধের দায়ে আর্মেনিয়ান-তুর্কি সাংবাদিক হারান্ত দিঙ্ককে দাঁড়াতে হয়েছিলো, এবং সংবিধানের ৩০১ নম্বর ধারায় তিনি দোষী প্রমাণিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমি আশাবাদী। আমার উকিলের মতো আমিও মনে করি যে আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটা দুর্বল, মনে হয় না আমার জেলে যেতে হবে।Read More »