আলো ছায়ার আগস্টে

(১)
কী ঘটে, যখন আমরা সদ্য রচিত কোনো উপন্যাস পড়ি? কী চলে আমাদের মনের ভেতরে, যখন সেই উপন্যাস লেখা হয় ভিনভাষার বদলে আমার নিজের ভাষায় আর উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হয় আমারই চারপাশ?

মাসরুর আরেফিনের উপন্যাস আগস্ট আবছায়া পড়তে বসে, প্রশ্নবোধক চিহ্নের এই দল আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে একটা সময় জুড়ে।Read More »

পাথরের দিনলিপি

প্রায়ই এমন হয়, উপন্যাসের পাতা থেকে এক-একটা কথা আমাদের মনের ভেতর যেন মূর্তি হয়ে বসে। কোনো এক প্রখর গ্রীষ্মের দুপুরে ওভাবেই মাহমুদুল হক আমার ভেতরে গড়ে তুলেছিলেন একটা আস্ত অজন্তা ইলোরা। বলেছিলেন –

আসলে জীবন মানেই শৈশব; জীবনভর মানুষ এই একটা ঐশ্বর্যই ভাঙ্গিয়ে খায়, আর কোনো পুঁজিপাট্টা নেই তার।

আলবেনিয়ার ঔপন্যাসিক ইসমাইল কাদারের ক্রনিকল ইন স্টোন পড়তে বসে ঘুরে-ফিরে কেবল ওই কথাটিই মনে পড়ে। বিষয়ে গম্ভীর অথচ বয়ানে সরল এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় বহুবার অনামা এক বালকের ভেতর দিয়ে নিজের শৈশবকে উদ্ধার করেছেন কাদারে, বোঝা যায়। শৈশবকে পুনরুদ্ধার করবার ক্ষমতা খুব বেশি লেখকের থাকে না। আর এটাও আমাদের জানা, যে গড়পড়তা মানকে ছাড়িয়ে গিয়ে তিনিই হয়ে উঠতে পারেন অনন্য লেখক, যিনি ব্যক্তির ভেতর থেকে তুলে আনতে পারেন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রকে। দুটো শর্তকেই পূরণ করতে পেরেছেন বলে, ক্রনিকল ইন স্টোন উপন্যাসের শেষে ইসমাইল কাদারে’র দিকে পাঠককে তাই তাকাতে হয় নতুন মুগ্ধতায়।Read More »

মূর্খ

সমস্ত পড়ুয়ার জীবনে কখনো কখনো এমন সব মুহুর্ত আসে, যখন শব্দের সৌন্দর্য্য তাকে অ্যাতো অভিভূত করে, যে তাকে বই বন্ধ করে খানিক বসে থাকতে হয়। একটা কিছু আবিষ্কারের, একটা কিছু নতুন করে অনুধাবনের কাঁটা তখন তাকে খোঁচায় ভেতরে, কিন্তু সেটা কীসের, তা ঠিক নিশ্চিত হওয়া যায় না। মানুষের জটিল মনোসরণির সবটা কখনোই জানা হয়ে ওঠে না আমাদের। কিন্তু দস্তয়েভস্কির উপন্যাস সেই বিরল উপলক্ষগুলোর একটা, যা পাঠককে নিয়ে যায় হৃদয়ের এমন কলোসিয়ামে, যেখানে মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বহু উপলদ্ধি আর বহু জিজ্ঞাসার গ্ল্যাডিয়েটর তাকে ক্রমাগত রক্তাক্ত করে।Read More »

সিঁড়ি ভাঙা শেষ হলে

প্রেস্তুপ্লেনিয়ে ই নাকাজানিয়ে, রাশান এই শব্দদ্বয়ের অনুবাদ দুনিয়াজোড়া ইংরেজির হাত ধরে হয়ে গেছে ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট, বাংলা করলে দাঁড়ায় অপরাধ ও শাস্তি। কিন্তু প্রেস্তুপ্লেনিয়ে নাকি এমন এক শব্দ, ক্রাইম/অপরাধ যার কাছাকাছি কেবল, কিন্তু পুরোটা বোঝায় না কিছুতেই। অর্থটা নাকি ‘লঙ্ঘন’, সেটা হতে পারে কোনো আইনের, অথবা কোনো নৈতিকতার সীমানায় থাকা আচরণের।Read More »

পামুকের প্রতীক জগৎ

ব্ল্যাক বুক ঠিক দ্রুত পড়ার মতো উপন্যাস নয়। এমনিতেই ওরহান পামুকের গদ্যের গতি তরতর করে পড়ার মত লাগে না কখনোই, সেটার স্বাদ নিতে এগোতে হয় ধীরে ধীরে। ব্ল্যাক বুকের অধ্যায়গুলো বেশ বড়, কখনো কখনো পাতার পর পাতা চলে যায় একটি অনুচ্ছেদেই, বাক্যেরা জটিল রুপে কেবল প্যাঁচিয়েই চলে বহু জায়গায়। ফলে ব্ল্যাক বুকের ভেতরে ঢুকতে পাঠকের সময় লাগে বেশি। মনোযোগ হারিয়ে অনেকেই চলে যাবে- সেই আশঙ্কাও থাকে।

কিন্তু গোয়েন্দা ঘরানার এই উপন্যাসের হাত যে পাঠক মাঝপথে ছেড়ে দেয়নি, পামুকের অনুসন্ধানে আস্থা রেখে যারা কড়া নেড়ে গেছে উত্তরাধুনিক এই বয়ানের দরজায়, নড়েচড়ে বসার অজস্র উপাদান তারা সংগ্রহ করতে পারে সাড়ে তিনশো পাতা পেরিয়ে যাবার পরে। উপলদ্ধি আর প্রশ্নের সিন্দাবাদি বুড়ো পাঠককে বিচলিত করে তোলে তখন।

Read More »

বিচ্ছিন্নতার দহন

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝখানে ফিওদর মিখাইলেভিচ দস্তয়েভস্কি তার ছোট্ট উপন্যাসিকা নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ডে রোপণ করেছিলেন বিশেষ এক চিন্তাধারার বীজ, অস্তিত্ববাদ। আজ আমরা জানি, পরের দেড়শো বছরে চিন্তার ওই স্রোত ছড়িয়ে গেছে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো। বিংশ শতাব্দীর উপন্যাসের জগতে অস্তিত্ববাদ কতটা প্রভাব রেখেছে, কিংবা সাত্রে বা কাম্যু থেকে শুরু করে আমাদের ওয়ালীউল্লাহ পর্যন্ত কীভাবে নেড়েচেড়ে দেখেছেন অস্তিত্ব নিয়ে গল্পের নায়কের ভীষণ সংকটমুখর জীবনযাপনকে; সে সব বিষয়েও বহু আলোচনা হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। কিন্তু সত্য কথাই হচ্ছে নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ডের কাছে পুনরায় ফিরে এসে গিয়ে সাহিত্য জগতে এই উপন্যাসের প্রভাব বিস্তার বিষয়ে ঠিক মন দিতে পারিনি। বরং, একবিংশ শতাব্দীর ঢাকা শহরের পথে যেমন সকল লোকের মাঝে বসে নিজস্ব মুদ্রাদোষে আমার যেমন নিজেকে কেবলই আলাদা, ক্ষুদ্র আর অকিঞ্চিৎ মনে হয়; সেই একই দশা আমি এই উপন্যাসে দেখতে পেয়েছি সেন্ট পিটার্সবাগের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে অজ্ঞাতবাসে যাওয়া লোকটির। মনে হয়েছে, নিজের ভেতর আমার অজস্র অনাবিষ্কৃত স্বরকে দস্তয়েভস্কি ভাষা দিয়েছেন এই ছোট উপন্যাসিকায়। লক্ষ করেছি বিস্ময়ে; মানুষ, মানুষের সমাজ আর এদের পারষ্পরিক মিথস্ক্রিয়া সংক্রান্ত নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ আজ অ্যাতো বছর পরেও অক্ষয়, সার্বজনীন।

কিন্ত ঠিক কী নিয়ে লেখা দস্তয়েভস্কির নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড? উত্তরটা নিজস্ব উপায়ে আমরা প্রত্যেকেই জানি, কেবল অভিজ্ঞতা লাভের রাস্তাটা সকলের আলাদা ছিলো।Read More »

রঙের মাঝে রক্তপাত

এলোপাথাড়ি ভাবে সহস্র বই পড়বার চাইতে ভালো লেগে যাওয়া কোনো লেখকের হাতে গোণা কয়েকটা বই পড়াও ভালো, এই সত্য আবিষ্কার করতে জীবনের অনেকটা সময় অপচয়িত হয়ে গেছে আমার। ইদানিং তাই ফুলের বনে যার পাশে যাই, চেষ্টা করি তার সমস্ত সুবাস এমনকি পচা গন্ধও ঠিকভাবে আত্মস্থ করতে। সে অভ্যাসেই আমার আতস কাঁচের নিচে সম্প্রতি এসে দাঁড়িয়েছেন তুরস্কের ওরহান পামুক। ছেষট্টি বছরে দাঁড়িয়ে থাকা পামুক, বলাই বাহুল্য, এ মুহুর্তে নিজ দেশের সবচাইতে সবচেয়ে নামজাদা ঔপন্যাসিক। প্রাচ্যের লেখকদের ক্ষেত্রে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেয়াটা নানা কারণে কঠিন। পামুকের ক্ষেত্রে সুবিধা ছিলো স্বনামে খ্যাতিমান হয়ে ওঠার পূর্ব পর্যন্ত তাকে জীবিকার জন্য লিখতে হয়নি। রেলশিল্পে পয়সা কামানো এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম নেয়া ওরহান পামুক পড়াশোনা করেছেন প্রকৌশলবিদ্যা, স্থাপত্য আর সাংবাদিকতায়; কিন্তু ওসবের কোনোটাতেই না গিয়ে তিনি বরং পালটে দিয়েছেন তুরস্কের উপন্যাসের গতিপথ। মাই নেইম ইজ রেড, এই নোবেল জয়ী লেখকের সামর্থ্যের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত।Read More »