কী বলি, যখন হারুকি মুরাকামিকে নিয়ে বলতে যাই

(১)

নিখুঁত লেখা বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, যেমন নেই নিরেট কোনো হতাশা।

হারুকি মুরাকামির প্রথম উপন্যাস ‘হিয়ার দ্যা উইন্ড সিং’ শুরু হয়েছে অন্য কোনো লেখকের মুখে শোনা এই বাণী উদ্ধৃত করে।

(২)
ঢাকা শহরের অজস্র রাজপথ, কিংবা তা হতে উদ্ভূত ভেতরের গলি, তস্যগলির মাঝে কিছু রাস্তা আমরা নিজস্ব বলে চিহ্নিত করে রাখি। কারো জন্য সেটা হতে পারে মাসুদের দোকান, কারো জন্য সেটি চাচীর টং, কারো জন্য বরাদ্দ থাকে বারেক স্টোরের বেঞ্চি। জানেন আড্ডাপ্রেমী মানুষ মাত্রই, এ জাতীয় আড্ডাগুলো মুখর হয়ে থাকে বিবিধ প্রশ্ন, বিচারকাজ এবং আক্ষেপে।Read More »

কফিশপের মানুষেরা

বর্ণালী সাহার ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ উপন্যাসটি পড়বো বলে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়নি আমার দুটো কারণে। ফেসবুক মারফত নজরে আসা মাত্র মনে হয় যে, কি নামকরণে কি প্রচ্ছদে, এই উপন্যাসটি বেশ অভিনব। তদুপরি বিক্ষিপ্তভাবে নানা জায়গায় বর্ণালীর টুকরো টুকরো রচনাগুলো যা পড়া হয়েছে, তাতে করেও তার গদ্যে বেশ আস্থা স্থাপিত হয়। বর্ণালীর প্রথম উপন্যাস হিসেবে ‘দ্যা নর্থ এন্ড’কে সংগ্রহ করাকে কর্তব্য নির্ধারণে আমি তাই দ্বিধান্বিত হইনি।

অথচ মার্চের এক সন্ধ্যায়, ঘন্টা তিনেক টানা পড়ে শেষ করে ফেলবার পর, ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে আমার ভেতরে বেশ দ্বিধা চাপে, বিক্ষিপ্ত বলে মনে হয় নিজেকে।

Read More »

বইমেলা ২০২০/ কিস্তি ০১

সুদূর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ফেব্রুয়ারিতে একেবারে নিজের আঙ্গিনা বানিয়ে ফেলা একুশে বইমেলা চত্বরে ব্যস্ততা আর অসুস্থতার প্রকোপে এবার যাওয়া হয়েছে বেশ কম। দিন তিনেক হবে। বই কেনার মাঝে তাই প্রথম দফায় ছিলো পরিচিতদের লেখা বইগুলোই। মেলায় কেনা বই মেলার মাঝেই পড়ে ফেলাটা গরম জিলিপি খাবার মতোই, সারতে পারলে বেশ আরাম লাগে। সেজন্যেই আকারে ছোট বলে হোক আর পরিচিতদের সাথে তাদের লেখা নিয়ে তর্ক করার লোভে হোক; কয়েকটা বই দ্রুতই পড়ে ফেললাম।

পরিচতদের বই নিয়ে আলোচনার করার ঝুঁকি থাকে। থাপ্পড়টাও মারতে হয় ললিত স্বরে, আবার প্রশংসা বিলাতে হলে বজায় রাখতে হয় আঁটোসাঁটো লাইন লেংথ। ফলে আলোচনার ওই ছকে বাঁধা এবং ভুরু কুঁচকানো পথে না হেঁটে আমি তাই এলোমেলো কথাই বলে গেলাম এখানে। আশা রাখি পডকাস্ট আর ইউটিউবারের যুগে বইমেলা ২০২০ থেকে কেনা বাকি বইগুলো নিয়েও এমন খাপছাড়া কথার ঝুলি চালু রাখতে পারবো পরের কোনো অবসরে।Read More »

দস্তয়েভস্কির দানবেরা

(১)
ফিওদর দস্তয়েভস্কির সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসটি, সম্ভবতঃ ‘অপরাধ ও শাস্তি’। আগ্রহী পাঠকের স্মরণ হয়, গোয়েন্দা কাহিনির গতিতে এগিয়ে চলা সেই উপন্যাসে তারা প্রত্যক্ষ করেছে রাস্কলনিকোভের প্রবল যুক্তিবাদী চরিত্রের টানাপোড়েন, দহনে পুড়তে পুড়তে যুক্তির সিঁড়ি ভাঙা শেষে যে মানুষটা আবিষ্কার করেছে জীবন কোনো অংক নয়, তত্ত্ব দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করা যায় না কিছুতেই। তো, সেই দস্তয়েভস্কিরই আরেক উপন্যাস দা ডেমনস পড়তে গিয়ে রাস্কলনিকোভকে কখনো কখনো স্মরণ হবার কারণ হচ্ছে, এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র পিওতর স্তেপানোভিচের সাথেও কিছু কিছু জায়গায় সাদৃশ্য রয়েছে রয়েছে।

স্বীকার করি, সেই সাদৃশ্য আবিষ্কার করার আগেই দা ডেমনস উপন্যাসের সাথে আমার পরিচয় ঘটে যায় দুটি ভিন্ন রাস্তায়। প্রথম রাস্তাটির অবস্থান জে এম কোয়েটজি’র ‘দা মাস্টার অফ পিটার্সবার্গ’ উপন্যাসে। আঠারোশো উনসত্তরের এক শীতে সৎ পুত্র পাভেলের রহস্যময় মৃত্যুতে দস্তয়েভস্কি সেন্ট পিটার্সবার্গে ফিরে এসেছেন ইউরোপ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষ করে, এমন এক কাল্পনিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে কোয়েটজির উপন্যাসটির কাহিনি। সেই আখ্যানে দস্তয়েভস্কি মুখোমুখি হন ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে থাকা সের্গেই নাচায়েভ নামের এক নিহিলিস্টের সাথে, আর উপন্যাসটির শেষ পাতায় দস্তয়েভস্কি শুরু করেন ‘দা ডেমনস’ উপন্যাস লেখার কাজ। দা ডেমনস উপন্যাসের সাথে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাৎ ঘটে প্রিয় ঔপন্যাসিক অরহান পামুকের এক আলোচনায়। দেখতে পাই, পামুক সেখানে দস্তয়েভস্কির এই উপন্যাসকে আখ্যা দিচ্ছেন সর্বকালের সেরা রাজনৈতিক উপন্যাস বলে।Read More »

আলো ছায়ার আগস্টে

(১)

কী ঘটে, যখন আমরা সদ্য রচিত কোনো উপন্যাস পড়ি? কী চলে আমাদের মনের ভেতরে, যখন সেই উপন্যাস লেখা হয় ভিনভাষার বদলে আমার নিজের ভাষায় আর উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হয় আমারই চারপাশ?

মাসরুর আরেফিনের উপন্যাস আগস্ট আবছায়া পড়তে বসে, প্রশ্নবোধক চিহ্নের এই দল আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে একটা সময় জুড়ে।Read More »

পাথরের দিনলিপি

প্রায়ই এমন হয়, উপন্যাসের পাতা থেকে এক-একটা কথা আমাদের মনের ভেতর যেন মূর্তি হয়ে বসে। কোনো এক প্রখর গ্রীষ্মের দুপুরে ওভাবেই মাহমুদুল হক আমার ভেতরে গড়ে তুলেছিলেন একটা আস্ত অজন্তা ইলোরা। বলেছিলেন –

আসলে জীবন মানেই শৈশব; জীবনভর মানুষ এই একটা ঐশ্বর্যই ভাঙ্গিয়ে খায়, আর কোনো পুঁজিপাট্টা নেই তার।

আলবেনিয়ার ঔপন্যাসিক ইসমাইল কাদারের ক্রনিকল ইন স্টোন পড়তে বসে ঘুরে-ফিরে কেবল ওই কথাটিই মনে পড়ে। বিষয়ে গম্ভীর অথচ বয়ানে সরল এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় বহুবার অনামা এক বালকের ভেতর দিয়ে নিজের শৈশবকে উদ্ধার করেছেন কাদারে, বোঝা যায়। শৈশবকে পুনরুদ্ধার করবার ক্ষমতা খুব বেশি লেখকের থাকে না। আর এটাও আমাদের জানা, যে গড়পড়তা মানকে ছাড়িয়ে গিয়ে তিনিই হয়ে উঠতে পারেন অনন্য লেখক, যিনি ব্যক্তির ভেতর থেকে তুলে আনতে পারেন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রকে। দুটো শর্তকেই পূরণ করতে পেরেছেন বলে, ক্রনিকল ইন স্টোন উপন্যাসের শেষে ইসমাইল কাদারে’র দিকে পাঠককে তাই তাকাতে হয় নতুন মুগ্ধতায়।Read More »

মূর্খ

সমস্ত পড়ুয়ার জীবনে কখনো কখনো এমন সব মুহুর্ত আসে, যখন শব্দের সৌন্দর্য্য তাকে অ্যাতো অভিভূত করে, যে তাকে বই বন্ধ করে খানিক বসে থাকতে হয়। একটা কিছু আবিষ্কারের, একটা কিছু নতুন করে অনুধাবনের কাঁটা তখন তাকে খোঁচায় ভেতরে, কিন্তু সেটা কীসের, তা ঠিক নিশ্চিত হওয়া যায় না। মানুষের জটিল মনোসরণির সবটা কখনোই জানা হয়ে ওঠে না আমাদের। কিন্তু দস্তয়েভস্কির উপন্যাস সেই বিরল উপলক্ষগুলোর একটা, যা পাঠককে নিয়ে যায় হৃদয়ের এমন কলোসিয়ামে, যেখানে মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বহু উপলদ্ধি আর বহু জিজ্ঞাসার গ্ল্যাডিয়েটর তাকে ক্রমাগত রক্তাক্ত করে।Read More »