সেলিনা হোসেনের ‘লারা’, ক্রিস নোলানের ‘প্রেস্টিজ’

(১)
যখনই পড়তে বসি সেলিনা হোসেনকে, তার উপন্যাসগুলোর শেষে যেন সঙ্গী করতে হয় এক ধরনের আক্ষেপকে।

ছেলেমানুষি এক ধরনের সাহসিকতা আছে সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে। তার প্রায় সমসাময়িক ঔপন্যাসিকেরা মানুষের মনকে নানা ভাবে ভেঙে দেখানোর যে রাস্তায় হেঁটেছেন, অথবা পূর্বপুরুষ ওয়ালীউল্লাহ কিংবা সৈয়দ হকের উপন্যাসেও যেমন পরিচয় মেলে নক্ষত্রবীথির চেয়েও অচেনা মানব মনের, সেলিনা সেখানে রীতিমতো ছেলেমানুষের মতো যেন পণ করেছেন পাড়ার ওইসব বড় ভাইদের অগ্রাহ্য করার। তার চরিত্ররা যেন মনে করায় আরো প্রায় অর্ধেক শতাব্দী পেছনের শরৎচন্দ্রের উপন্যাসকে, যারা এই পৃষ্ঠায় উপদেশ মারে তো পরের পৃষ্ঠায় কান্না চাপতে ঠোঁট কামড়ায়। Continue reading “সেলিনা হোসেনের ‘লারা’, ক্রিস নোলানের ‘প্রেস্টিজ’”

উপন্যাসের প্রথম লাইন

উপন্যাসের প্রথম বাক্যটা লেখাই নাকি সবচেয়ে কঠিন। সম্ভাব্য পাঠককে বাস্তবের জগত থেকে শব্দ আর কল্পনার জগতটায় সরিয়ে নিয়ে যেতে যে টোপগুলো লেখক ছাড়েন, উপন্যাসের শুরুটা নাকি তার মাঝে সবচাইতে গুরত্বপুর্ণ। ক্যামন ধরনের যাত্রায় নামতে যাচ্ছে পাঠক, প্রথম বাক্যে থাকা লাগে সেটার একটা ইঙ্গিত, থাকতে হয় লেখকের ভাষা কি ভঙ্গির সাক্ষর, আর সাথে অবশ্যই প্রয়োজন পাঠককে আকর্ষণ করবার ক্ষমতা।

আর সেরা উপন্যাসগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, যে উলটো দিক থেকেও ব্যাপারটা সত্য। মানে পাঠকও যদি প্রথম বাক্য থেকেই আটকা পড়ে যায় লেখকের সাথে, তবে সেই উপন্যাস তার মনে একটু গভীরতর দাগই কাটে। বহুদিন পরেও তখন তার মনে ঘুরেফিরে আসে উপন্যাসের শুরুটা। Continue reading “উপন্যাসের প্রথম লাইন”

‘দা জেনারেল অফ দা ডেড আর্মি’ নিয়ে কয়েক ছত্র

ইসমাইল কাদারের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মায় বছর দুয়েক আগে, প্যারিস রিভিউকে তার সাক্ষাৎকারটা পড়ে। খুব বেশি মানুষ কথা বলে না আলবেনিয়ান ভাষায়; কিন্তু অমন একটা ভাষাতেই লিখে ইউরোপের সেরা ঔপন্যাসিকদের একজন বলে স্বীকৃতি পেয়েছেন কাদারে; সে তথ্যের চেয়েও বেশি আগ্রহ জাগে লোকটার ভাবনার বৈচিত্র্য দেখে। আমাদের অতি পরিচিত গ্রিক পুরাণের চরিত্র আর ঘটনাগুলো দিয়ে লোকটা এমন ভাবে আধুনিক যুগকে ব্যক্ত করেন ওই সাক্ষাৎকারে, পড়তে বেশ মজা লাগে আমার। গুগলের শরণাপন্ন হয়ে বেশ কিছু পড়াশোনাও করি তাকে নিয়ে। এবং নিশ্চিত হই, যে লোকটাকে পড়া দরকার। Continue reading “‘দা জেনারেল অফ দা ডেড আর্মি’ নিয়ে কয়েক ছত্র”

জীবনানন্দের লাবণ্য, তলস্তয়ের সোফিয়া

(১)
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ডুবে গিয়ে অল্পবিস্তর যারা চোখ রেখেছেন কবির ব্যক্তিগত জীবনেও, লাবণ্য দাশ তাদের কাছেও পরিচিত এক নাম। নিজেকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে এমন এক বিপন্ন বিস্ময়ের অনুসন্ধান জীবনানন্দ করে গেছেন, সমকালের চেয়ে পরবর্তী কালেই মানুষ সেটার সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে অধিক। সময় কেটেছে, এবং জীবনানন্দের ছায়া হয়ে উঠেছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। অগণিত বাংলাভাষী পাঠক, আজও তারা হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে হেঁটে চলার ক্লান্তি আবিষ্কার করে যাচ্ছে জীবনানন্দের কবিতায়। নিশ্চিত জানি, ‘কবি’ শব্দটা শুনলেই যে করোটির ভেতরে কোথাও অনুরণন তোলে জীবনানন্দ দাশের নামটা, সে ব্যাপারটা কেবলই আমার ব্যক্তিগত নয়।

অথচ গণমানুষের হৃদয়ে কবিপত্নী লাবণ্য দাশ রীতিমতো এক অসংবেদনশীলতার পিরামিড। জাগতিক বিষয় ভুলে সংসার উদাসীন থাকার যে রোমান্টিক বুদবুদ কবির চারপাশে বুনতে ভালোবাসে ভক্ত দল, জীবনানন্দকে সেটার উদাহরণ হিসেবে টানলে পরীক্ষার পাতায় দশে সাড়ে নয় পাওয়াটাও সম্ভব। কিন্তু পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ আবিষ্কার করা জীবনানন্দের বিপরীতে তার স্ত্রী লাবণ্যের কুঁচো চিংড়ি কেনার দৈনন্দিন জীবন হয়ে উঠেছে পাঠকের চক্ষুশূল। Continue reading “জীবনানন্দের লাবণ্য, তলস্তয়ের সোফিয়া”

কী বলি, যখন হারুকি মুরাকামিকে নিয়ে বলতে যাই

(১)

নিখুঁত লেখা বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, যেমন নেই নিরেট কোনো হতাশা।

হারুকি মুরাকামির প্রথম উপন্যাস ‘হিয়ার দ্যা উইন্ড সিং’ শুরু হয়েছে অন্য কোনো লেখকের মুখে শোনা এই বাণী উদ্ধৃত করে।

(২)
ঢাকা শহরের অজস্র রাজপথ, কিংবা তা হতে উদ্ভূত ভেতরের গলি, তস্যগলির মাঝে কিছু রাস্তা আমরা নিজস্ব বলে চিহ্নিত করে রাখি। কারো জন্য সেটা হতে পারে মাসুদের দোকান, কারো জন্য সেটি চাচীর টং, কারো জন্য বরাদ্দ থাকে বারেক স্টোরের বেঞ্চি। জানেন আড্ডাপ্রেমী মানুষ মাত্রই, এ জাতীয় আড্ডাগুলো মুখর হয়ে থাকে বিবিধ প্রশ্ন, বিচারকাজ এবং আক্ষেপে। Continue reading “কী বলি, যখন হারুকি মুরাকামিকে নিয়ে বলতে যাই”

কফিশপের মানুষেরা

বর্ণালী সাহার ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ উপন্যাসটি পড়বো বলে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়নি আমার দুটো কারণে। ফেসবুক মারফত নজরে আসা মাত্র মনে হয় যে, কি নামকরণে কি প্রচ্ছদে, এই উপন্যাসটি বেশ অভিনব। তদুপরি বিক্ষিপ্তভাবে নানা জায়গায় বর্ণালীর টুকরো টুকরো রচনাগুলো যা পড়া হয়েছে, তাতে করেও তার গদ্যে বেশ আস্থা স্থাপিত হয়। বর্ণালীর প্রথম উপন্যাস হিসেবে ‘দ্যা নর্থ এন্ড’কে সংগ্রহ করাকে কর্তব্য নির্ধারণে আমি তাই দ্বিধান্বিত হইনি।

অথচ মার্চের এক সন্ধ্যায়, ঘন্টা তিনেক টানা পড়ে শেষ করে ফেলবার পর, ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে আমার ভেতরে বেশ দ্বিধা চাপে, বিক্ষিপ্ত বলে মনে হয় নিজেকে।

Continue reading “কফিশপের মানুষেরা”