লেখালেখি

Category: উপন্যাস Page 1 of 4

ইমতিয়ার শামীমের সঞ্চারপথ

(১)
কোথাও পড়েছিলাম, সকল মহৎ উপন্যাসই মোটা দাগে তিনটা চেনা ছকে এগোয়। একটা ছকে কোনো জনপদে নতুন কোনো ব্যক্তি কিংবা বর্গের আগমন ঘটে (দস্তয়েভস্কির ‘ব্রাদার্স কারামাজভ’ যেমন), একটা ছকে দুটো বিপরীত শক্তি পরস্পরের মুখোমুখি হয় (তলস্তয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিস’ এই ঘরানার রচনা)। আর উপন্যাসের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ছক যেটা, সেটা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টি বেরিয়ে পড়ে একটা যাত্রা কি অভিযানে; সারভান্তেসের ডন কিহোতের দিগ্বিজয় কিংবা বিভূতিভুষণের অপুর অপরাজিত হয়ে ওঠাটা তেমন যাত্রারই উদাহরণ।

পাঠক যদি স্বীকার করে নেয় যে উপন্যাস পড়া মানে অন্য কারো জুতোয় পা রাখা, তখনই সে বুঝে ফেলে, যে কেন বর্ণিত তৃতীয় ছকটির নকশাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সাহিত্যে। উপন্যাস যখন পড়ি, আমরা কি তখন প্রকৃতপক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি বা বর্গের সঞ্চারপথকেই আশ্রয় করি না?

শাহরিয়ার কবিরের সেরা ১০ কিশোর উপন্যাস

অনলাইনে কিংবা চায়ের কাপের আড্ডায় কিশোর বয়েসীদের জন্য ভালো বইয়ের খোঁজ করতে দেখি অনেককে। আন্তর্জালের কল্যাণে বিদেশি ভাষার সুদৃশ্য কিশোরোপযোগী বইগুলোর নামধাম জানা সকলের জন্যেই সহজ এখন। কিন্তু বিপণনের আয়তনের স্বল্পতা হোক, বা সংশ্লিষ্টদের অনীহা; বাংলা প্রকাশনাগুলোর ক্ষেত্রে সেই ঘরানার বইগুলো নিয়ে বেশি আলোচনা দেখি না খুব একটা। বাংলাদেশের কিশোর সাহিত্যে মুহম্মদ জাফর ইকবালের অবস্থানটি দুর্দান্ত সবল, কিশোর বয়েসীদের জন্য ভালো বইয়ের তালিকায় সবাই তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর রচিত গল্প উপন্যাসের কথাই সচরাচর বলেন।

আড়ালে চলে যান শাহরিয়ার কবির।

দুইমুখো বলপয়েন্ট

অ্যাকুরিয়ামের অধিকাংশ মাছের গায়ের রং লালচে, কিছু আছে সোনালি বর্ণের। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এম মালিক এই বড় ঘরটিতে এলেই মাছগুলোর সাথে কিছু সময় কাটান। বিশেষ করে কাচের দেয়ালে টোকা মারতে তার খুব ভালো লাগে। হঠাৎ আলোড়নে বিব্রত হয়ে পড়া মাছগুলোর দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করার দৃশ্যটা বড় চমৎকার ঠেকে গভর্নর মালিকের কাছে। তবে আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন, গভর্নরের নিজেরই এখন মাথার ঠিক নেই।

চারপাশে বসে থাকা মন্ত্রীপরিষদের দিকে তিনি একবার চোখ বোলালেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘এখন কী করা যায় আপনারাই বলুন। প্রেসিডেন্টকে টেলিগ্রাম করলাম পরশুদিন, এখনো তো সেটার কোনো জবাব এলো না। জানি যে প্রেসিডেন্ট খুব ব্যস্ত মানুষ, তবুও…’

সত্যি ছিলো সতীনাথের ঢোঁড়াই!

মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্কর যেমন মুখে মুখে ঘোরে বাংলা উপন্যাসের পাঠকের; সতীনাথ ভাদুড়ী সেদিকে যেন বিহার জেলার মতোই দূরে, চট করে তাকে স্মরণ করাটা কঠিন। ফলে এমন দেখেছি অনেক, যে অনেক পাড়া মাড়িয়ে আসা পাঠকেরও সতীনাথকে আবিষ্কার করতে সময় লাগে। তবে বিলম্বে হোক, বা দ্রুত; যখন পাঠক পড়েন সতীনাথকে; বিস্ময়ের এক প্রচন্ড থাবড়া খেয়ে তাকে সোজা হয়ে বসতে হয় তখন। এমন লেখকও আছেন? এভাবে, অ্যাতো নিস্পৃহ থেকে, অ্যাতো অচঞ্চল থেকে, নিজেকে এমন আড়ালে রেখেও তবে উপন্যাস লেখা যায়? সেই পাঠককে তাই প্রচণ্ড ঈর্ষা হয় আমার, যিনি সতীনাথ ভাদুড়ীর উপন্যাস পাঠ করবেন প্রথমবারের মতো।

বইমেলা ২০২০/ আলথুসার

(১)
কাফকার শহর প্রাগের সেন্ট ভিটাস ক্যাথেড্রাল, কিংবা জার্মানির কোলোন ক্যাথেড্রালের চাইতে কী কারণে প্যারিসের নটরডেম ক্যাথেড্রাল বেশি আলোড়িত করে আমাদের? প্রশ্নটার উত্তরে বলা যায়, নটরডেমের নামের সাথে আমাদের পরিচিতি। যুগে যুগে দেশে দেশে অগণিত যে সব পাঠক ভিক্টর হুগোর ‘হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম’ পড়েছেন, কোয়াসিমোদো আর এসমেরালদার সাথে ওই স্থাপনাটাও জায়গা করে নিয়েছে তাদের হৃদয়ের স্যাংচুয়ারিতে। উপন্যাস আর উপন্যাসের চরিত্রেরা যখন সত্যি আমাদের মনে ভালোবাসা জাগায়, কোনো পরিসংখ্যান আর তথ্য দিয়ে সেটাকে মোকাবেলা করা যায় না তখন।

সেলিনা হোসেনের ‘লারা’, ক্রিস নোলানের ‘প্রেস্টিজ’

(১)
যখনই পড়তে বসি সেলিনা হোসেনকে, তার উপন্যাসগুলোর শেষে যেন সঙ্গী করতে হয় এক ধরনের আক্ষেপকে।

ছেলেমানুষি এক ধরনের সাহসিকতা আছে সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে। তার প্রায় সমসাময়িক ঔপন্যাসিকেরা মানুষের মনকে নানা ভাবে ভেঙে দেখানোর যে রাস্তায় হেঁটেছেন, অথবা পূর্বপুরুষ ওয়ালীউল্লাহ কিংবা সৈয়দ হকের উপন্যাসেও যেমন পরিচয় মেলে নক্ষত্রবীথির চেয়েও অচেনা মানব মনের, সেলিনা সেখানে রীতিমতো ছেলেমানুষের মতো যেন পণ করেছেন পাড়ার ওইসব বড় ভাইদের অগ্রাহ্য করার। তার চরিত্ররা যেন মনে করায় আরো প্রায় অর্ধেক শতাব্দী পেছনের শরৎচন্দ্রের উপন্যাসকে, যারা এই পৃষ্ঠায় উপদেশ মারে তো পরের পৃষ্ঠায় কান্না চাপতে ঠোঁট কামড়ায়।

উপন্যাসের প্রথম লাইন

উপন্যাসের প্রথম বাক্যটা লেখাই নাকি সবচেয়ে কঠিন। সম্ভাব্য পাঠককে বাস্তবের জগত থেকে শব্দ আর কল্পনার জগতটায় সরিয়ে নিয়ে যেতে যে টোপগুলো লেখক ছাড়েন, উপন্যাসের শুরুটা নাকি তার মাঝে সবচাইতে গুরত্বপুর্ণ। ক্যামন ধরনের যাত্রায় নামতে যাচ্ছে পাঠক, প্রথম বাক্যে থাকা লাগে সেটার একটা ইঙ্গিত, থাকতে হয় লেখকের ভাষা কি ভঙ্গির সাক্ষর, আর সাথে অবশ্যই প্রয়োজন পাঠককে আকর্ষণ করবার ক্ষমতা।

আর সেরা উপন্যাসগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, যে উলটো দিক থেকেও ব্যাপারটা সত্য। মানে পাঠকও যদি প্রথম বাক্য থেকেই আটকা পড়ে যায় লেখকের সাথে, তবে সেই উপন্যাস তার মনে একটু গভীরতর দাগই কাটে। বহুদিন পরেও তখন তার মনে ঘুরেফিরে আসে উপন্যাসের শুরুটা।

Page 1 of 4

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: Content is protected !!