লেখালেখি

Category: বইয়ের আলাপ Page 1 of 9

হাসনাত আবদুল হাই’এর ভ্রমণ-জগত

(১)
প্রিয় ভ্রমণ-গদ্যকারের নাম ভাবতে গিয়ে বাঙালি পাঠককে প্রথমেই সবুট স্যালুট মারতে হয় সৈয়দ মুজতবা আলীকে। একদম আটপৌরে গদ্যে সুনীল গাঙ্গুলীও আমাকে নানা জায়গা ঘুরিয়ে এনেছেন অক্ষর দিয়ে, তাকেও আমি রাখবো নিজের প্রিয় ভ্রমণ-লেখকের তালিকায়। বলতে হবে, মাত্র খান দুয়েক বইয়ের মাধ্যমেই প্রিয় পর্যটক-লেখক হয়ে ওঠা রাইকার্ড কাপুচিনস্কির নামটাও।

কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা হয় বাংলাদেশে আমার প্রিয় ভ্রমণ-গদ্যকার কে, তখন?

ভেবে দেখলে, খুব বেশি নাম বিবেচনায় উঠে আসে না। হুমায়ূন আহমেদ থেকে মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো বহুপ্রজ লেখকেরা তো বটেই, সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেম বা মুনতাসীর মামুনের মতো একটু পাশে সরে থাকা লেখকেরাও ভ্রমণ-কাহিনি পিপাসু পাঠকদের উপহার দিয়েছেন সুলিখিত কিছু বই। বিশেষ করে বলতে হবে শুধু ভ্রমণ সংক্রান্ত রচনা দিয়েই প্রায় তারকা-খ্যাতি পেয়ে যাওয়া মাঈনুস সুলতানের নাম, তার ‘কাবুলের ক্যারাভান সরাই’কে তো রীতিমতো আধুনিক ‘দেশে-বিদেশে’ বলতে হয়। একদম হালের ভ্রমণ-লেখক সঞ্জয় দে কিংবা ফাতিমা জাহানের রচনাও বেশ লাগে পড়তে। তাঁদের প্রত্যেকের রচনাই নিঃসন্দেহে দারুণ নিজস্বতা ও সৌন্দর্য্য-মণ্ডিত। তবু, নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বাংলাদেশে আমার প্রিয় ভ্রমণ-গদ্যকার হাসনাত আবদুল হাই।

২০২৩ এর বইঃ চায়ের কাপে সাঁতার

(১)
সমসাময়িক কোনো লেখকের মাথায় ঢোকার জন্য এমনকি দুই দশক আগেও পাঠকের রাস্তা ছিলো একমুখী। একজন লেখক কী ভাবছেন কোনো বিষয়ে, কী পর্যবেক্ষণ বা মতামত তার কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে- তা জানতে পাঠকেরা তখন নির্ভর করতেন উদ্দিষ্ট লেখকের লেখা বা বক্তব্যের ওপরেই কেবল। অনলাইনের উত্থান এখন কমিয়ে দিয়েছে পাঠকের সেই বাধা। পাঠকের জন্য পত্রিকা কি বইয়ের মোড়কে পেশ করা লেখা ছাড়াও লেখকরা আছেন ব্লগে, ফেসবুকে; সেখানে তারা জায়েদ খানের রোলেক্স থেকে আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় অক্লেশে মতামত প্রদান করেন নিয়মিত। আর এই দ্বিতীয় ধারার টেক্সটও পাঠকের মাথায় তৈরি করতে থাকে লেখকের দ্বিতীয় একটা সত্ত্বা। সমকালের লেখক এনামুল রেজাকে পড়তে গেলে ওই দ্বিতীয় সত্ত্বা কি কিছুটা ছায়া ফেলে পাঠকের মনে?

কুটি কবিরাজের জগৎ

(১)
কুটি কবিরাজ কে?

পোশাকি পরিচয় দিতে গেলে, লোকটার নাম মীর্জা শিপিহর আলি। আয়ূর্বেদিক শাস্ত্রে পন্ডিত বাপের ছিলো কবিরাজি ব্যবসা, মাইনর পর্যন্ত পড়ে শিপিহর সেখানেই ঢুকে গেলো। তারপর কবিরাজি ব্যবসায় সাফল্য। কখনো সিলেটের করিমগঞ্জ, কখনো শিলং, কখনো বীরভূমের সীতাবাড়িতে তার চেম্বার।

কিন্তু বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে মানুষটার জীবন যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো, তার কারণ নিশ্চিতভাবেই শিপিহরের পেশাগত জীবন নয়। লোকে বরং তার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলো ঠিক সেই মুহুর্ত থেকে, যখন দীর্ঘ বিরতির পর ‘কুটি’ ডাকনামের ওই কবিরাজ হঠাৎ চিঠি পাঠায় বন্ধু তুলুকে, আর জানায়ঃ দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর ছায়ার মতো অনুসরণ করে অবশেষে জামশেদ মুস্তফিকে কব্জায় পেয়েছে সে!

২০২২ এর বইঃ ডি-মাইনর

(১) যখনই কোনো উপন্যাস প্রসঙ্গে বলি আমরা, অনুমিতভাবেই আমাদের মাথায় তখন ঘুরতে থাকে উপন্যাসটা পড়বার স্মৃতি। কোন জায়গাটায় সে উপন্যাস স্পর্শ করেছে আমাদের গোপন কোনো বেদনা, কোন অধ্যায়টা আমাদের নতুন কোনো ভাবনা দিলো, কিংবা কোন জায়গাটা মনে হয়েছে একেবারে গাঁজাখুরি- বলতে বা লিখতে গেলে সেইসব ভাবনাকেই আমরা উল্টেপাল্টে দেখি রুমালের মতো। সাথে, যদি লেখকের অন্যান্য লেখার সাথে পূর্বে যাত্রার অভিজ্ঞতা থাকে আমাদের- সেটাও প্রভাব ফেলে কোনো উপন্যাসকে নিয়ে বলবার সময়।

কিন্তু যখন ঔপন্যাসিকের রচনা-প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকেন পাঠক?

না, পাঠক যদি হয় লেখকের পূর্বপরিচিত, আর সে যদি টের পায় যে এই লেখা নামানোর সময় ঔপন্যাসিক ভাবনার অমুক সড়কটায় পা দিয়েছেন- তখন কিন্তু উপন্যাসটাকে সে অন্য দশটা বইয়ের সাথে একত্রে মেশাতে পারে না। শিরায় মাদক ঢুকলে যেমন চেনা জগতের মাত্রা সংখ্যা বেড়ে যায় – ঠিক তেমনই নতুন একটা বোধ, একটা দৃষ্টিভঙ্গি তখন তার চোখের সামনে চশমার মতো এসে দাঁড়ায় উদ্দিষ্ট উপন্যাস পড়তে গেলে।

আদর্শ পাঠক আর আদর্শ পাঠাগার

 আদর্শ পাঠক নিয়ে কয়েক লাইন 

কাগজের বুকে শব্দ বসাবার ঠিক আগ মুহুর্তে লেখকই হলো আদর্শ পাঠক। সৃষ্টি মুহুর্তের ঠিক পূর্বক্ষণেই আদর্শ পাঠক বিরাজ করে।

আদর্শ পাঠক কোনো গল্পকে পুনরায় জোড়া লাগায় না, তারা গল্পটাকেই বানায় নতুন করে।

আদর্শ পাঠক গল্পকে অনুসরণ করে না, তারা গল্পের অংশ হয়ে ওঠে।

২০২৩ এর বইঃ যে জীবন আমার ছিল

[২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বইগুলো পড়া শেষে আমার এলোমেলো অনুভূতি গুছিয়ে রাখার জন্য এই ধারাবাহিক। আশা করি, এই স্বেচ্ছা-উদ্যোগ চালু থাকবে বছর জুড়েই। ধারাবাহিকের আজকের পর্বে থাকলো ইমদাদুল হক মিলনের আত্মজীবনী ‘যে জীবন আমার ছিল’ নিয়ে আলাপ।]

লেখকের মৃত্যু ঘটে দুই রকমে।

এক রকমের মৃত্যু তার দৈহিক মৃত্যু, লেখক যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য হলে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের এই মৃত্যুদিনটি মুখস্ত করতে হয় অবজেক্টিভে গোল্লা ভরাটের জন্য। আর দ্বিতীয় মৃত্যুটি লেখকের রচনার মৃত্যু, তার রচনা তখন প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে পাঠকের কাছে। বলা বাহুল্য, সত্যিকার লেখকের জন্য এই মৃত্যুটাই করুণতম।

২০২৩ এর বইঃ জবরখাকি

[২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বইগুলো পড়া শেষে আমার এলোমেলো অনুভূতি গুছিয়ে রাখার জন্য এই ধারাবাহিক। আশা করি, এই স্বেচ্ছা-উদ্যোগ চালু থাকবে বছর জুড়েই। ধারাবাহিকের আজকের পর্বে থাকলো বর্ণালী সাহার গল্প-সংকলন ‘জবরখাকি’ নিয়ে আলাপ।]

(১)
যুগটা এখন পলিটিকাল কারেক্টনেসের, বাংলা সিনেমার মতো ড্রেসিং-গাউন গায়ের পাইপ টানা চৌধুরী সাহেবদের হাতে অনলাইনে লেখকদের নিল-ডাউন হবার দৃশ্য আজকাল অতি পরিচিত। ইদানিং নাকি ‘লোলিতা’ লেখার জন্য নবোকভকেও ডাকা হচ্ছে শিশুকামী বলে।

কিন্তু সাহিত্যের কাজ কি এসব পলিটিকাল কারেক্টনেসের  গুষ্টি মেরে ব্যক্তিগত অনুভূতির অস্বাভাবিকতাকেই আবিষ্কার করা নয়? অন্য দশজন যা এড়িয়ে যাচ্ছে স্বভাব বশে, লেখকের কাজ কি চিরকাল সেখানেই নজর রাখা না? উদাহরণ হিসেবে যদি প্রেম বিষয়টাকেই বেছে নেই; হাত ধরে রমনা পার্কে বসে বাদাম খাওয়া আর প্যারিসের রাস্তায় কাব্যিক ও কোটেবল বাক্য উচ্চারণের বাইরেও কি সেই প্রেমের একটা কালো রুপ নেই? এমনও তো প্রেম আছে, যা ভেঙে গেলে ছোঁড়া হয় এসিড আর অনলাইনে ছেড়ে দেওয়া হয় ভিডিও? সেই সব অস্বাভাবিকতার গল্প বলাটাও কি লেখকের কাজ নয়?

Page 1 of 9

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: Content is protected !!