লেখালেখি

Category: গল্প

তিনটি অণু গল্প

পূর্বপরিচিত

ভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে যাওয়ায় তারা আলিঙ্গন করলো একে অপরকে। ‘কতদিন দেখা হয়নি!’ বলে আক্ষেপ করলো দুজনেই। তারপর তারা খবর নিলো একে অন্যের, ফোন নাম্বার বিনিময় হলো, দেয়া হলো কফি খেতে দেখা হবার প্রতিশ্রুতিও।

শিকারী

১৮৬০ এর ২৯ জানুয়ারি জন্মেছিলেন আন্তন চেকফ।
লোকটা এমন ভাবে লিখেছে, যেন সে কিছুই বলছে না।
এবং সে সবই বলেছে।

এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো

[টীকাঃ  আন্তন চেকফের গল্পে ইম্প্রেশনাজিম ঘরানার শিল্পীদের ছায়া দেখেছিলেন তলস্তয়, চেকফের গল্পকে বোঝাতে গেলে, এই কথাটা দারুণ মানানসই।

অপূর্ব সব গল্প লিখে গেছেন চেকফ। ছোটর মাঝেও ছোট যে গল্পগুলো, সেখানে তিনি মানুষকে ধরেছেন একটা মুহুর্তের মহিমায় তার গোটা জীবনকে টেনে এনে। আর গল্প যখন একটু বড় হয়েছে, রাশিয়ার নানা স্তরের আপাদমস্তক বৈশিষ্ট্যহীন মানুষগুলোই তার বয়ানে হয়ে উঠেছে চিরকালের মানুষ।

‘শিকারী’ গল্পটা জুলাই, ১৮৮৫ তে লেখা। অল্প কথায় বহু না-বলা-গল্প বলার চেকফীয় ক্ষমতা এখানে পুরোমাত্রায় প্রকাশিত।]

তপ্ত আর দমবন্ধ গুমোট দিন। আকাশে কোনো মেঘ নেই। রোদেপোড়া ঘাসগুলোকে মনে হচ্ছে নিরানন্দ, নিরাশ, বৃষ্টি হলেও তারা যেন আর কখনো সবুজ হবে না। অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে নীরব, নিশ্চল, যেন গাছগুলো মাথা তুলে তাকিয়ে আছে কোথাও বা অপেক্ষা করছে কিছু একটার।

ইনভিকটাস, ১৯৭১

Some people believe football is a matter of life and death, I am very disappointed with that attitude. I can assure you it is much, much more important than that.
Bill Shankly

ক।

বাবার সামনে দাঁড়ালেই বুক কেঁপে উঠতো কেনো জানি, যে কারণে বাবার কাছে মুখ ফুটে মনের কথা বলা কখনোই হয়নি তার, যত আবদার ছিলো মায়ের কাছে। কোনোদিন এর অন্যথা হয়নি।

‘তোর বাবা বলতেছিলো তোকে লন্ডন পাঠায়ে দিবে আগামী মাসে,’ তূর্যকে বলেছিলেন মা। ‘এই নিয়ে ফয়েজ চাচার সাথে কথাও হইছে নাকি দুই-একবার।’

এ কথা শুনে আশঙ্কায় হঠাৎ ভারী হয়ে গিয়েছিলো তূর্যের বুকের ভেতরটা, চেষ্টা করেই গলার স্বরটা কাঠকাঠ করে তুলতে হয়েছিলো তাকে। ‘দ্যাখো আম্মা, ওই লন্ডন-ফন্ডন যাওয়া আমারে দিয়া হবে না। জুয়েলদের সাথে আমার কথা হইছে এর মাঝে, আগরতলায় যাবার রাস্তা খুঁজতেছে ওরা। আমিও ওদের সাথে যাবো ঠিক করছি, যুদ্ধে যাবো। তুমি আব্বারে বইলো।’

মা অবশ্য প্রথমে রাজি হননি বাবাকে এই কথা বলতে। তবে দুইদিন ধরে বাসায় পানি পর্যন্ত মুখে না দেয়ার ফলে মা’র কাছে আর উপায় থাকেনি কোনো। নিচু স্বরে চলা বদ্ধঘরের সেই আলোচনায় কান পেতে তূর্য কেবল শুনেছিলো মা হঠাৎ রেগে গিয়ে বাবাকে বলছেন- ‘আমার ছেলে যুদ্ধে চলে যাইতে চায়- আমার কলেজে পড়া ছেলে- তুমি তারে নিষেধ পর্যন্ত করবা না?’

বহুদূর থেকে তূর্য আব্বার গলা শুনতে পায় যেন, ‘আমি ওদের কোনমুখে মানা করি বলো ! আর তোমার ছেলেকে তো চেনো, সে যুদ্ধে না গেলে আর কার ছেলে যাবে বলতে পারো? ওর বয়েসী সবাই যুদ্ধে না গিয়ে লন্ডন চলে গেলে দেশটা কী করে স্বাধীন হবে?’

… সেই প্রথম তূর্যের মনে হয়েছিলো, বাবাকে সে চেনে না- বোঝে না ঠিকই; তবে বাবা তাকে ঠিকই বোঝেন ও চেনেন।

লেট দেয়ার বি লাইট

০১)

বড়পর্দার মাঝখানে ভেসে ওঠে ইংরেজী অক্ষরে লেখা ‘স্টপ’ শব্দটি। সেটি ক্রমান্বয়ে বড় হতে থাকে, একসময় সমস্ত পর্দা অধিকার নেয়। নেপথ্যে শোনা যায় কথকের কণ্ঠস্বর। ‘স্টপ’, ‘স্টপ’, ‘স্টপ’, ‘স্টপ’, ‘স্টপ’…

কলকাতা টাউন হলের সমবেত দর্শকেরা দীর্ঘ একটা সময় চুপ করে থাকেন নিজ জায়গায়। এরপরে ধীরে ধীরে করতালি শুরু হয়, তালির শব্দ বাড়তেই থাকে- একসময় তা স্তিমিত হয়ে যায়।

তর্জনিতে স্বাধীনতা

বন্ধ দরজা খুলে শেখ মুজিবুর রহমান বেরিয়ে এলেন। দেরি হয়ে গেছে। বেলা আড়াইটায় রেসকোর্সের সভা আরম্ভ হবে কথা ছিলো। রুদ্ধদ্বার বৈঠকের নানা আলোচনায় এই ৩২ নম্বরেই আড়াইটা বেজে গেলো।

বাইরে বেরিয়ে শেখ মুজিব গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। হাত ইশারা করে তার সাথে পেছনে ডেকে নিলেন তাজউদ্দীনকে। তাজউদ্দীন উঠতে উঠতে চালকের পাশের আসনে গিয়ে বসলেন গাজী গোলাম মোস্তফা। সাদা রঙের মাজদা গাড়িটি যাত্রা করলো রেসকোর্সের দিকে।

সাদা লাঠি

“…আমি সে চক্ষু দেখিতে দেখিতে অন্যমনস্ক হই, এর বেশি আর বুঝাইতে পারি না। “
-বিষবৃক্ষ [বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়]

প্রতিটা সন্ধ্যায়-এখানে- শুরু হয় নতুন দিন।

সাধারণতঃ মানুষের দিনের শুরু হয় ভোরে। পরীক্ষার্থী ছাত্র আর সদ্য দম্পতির জন্যে দিনের আরম্ভ দেরীতে হতে পারে কিছুটা, পত্রিকা হকার আর মসজিদগামী কিছু মানুষের আবার দিনের শুরু হয় খুব ভোরে। বাবা বলতেন- ঈশ্বর বেহেশতের দরজা খুলে রাখেন ঠিক সূর্যোদয়ের মুহুর্তে। বেহেশতের বাতাসে দিন শুরুর লোভে অবশ্য খুব বেশি মানুষ ভোরে ওঠে না আজকাল, আবার ছাত্রদের প্রতিদিন পরীক্ষা থাকে না। শহরের দিনের শুরুও তাই বদলে বদলে যায়। কিন্তু বাড়িভাড়া নেবার আগে তো সন্ধ্যায় কখনো এদিকটায় আসিনি, নয়নতারা হাউজিং সোসাইটির চার নম্বর বাড়ির তেতলার ফ্ল্যাট ৩/ডি বাসায় উঠবার আগে তাই আমি জানতামই না ঘটনাটা।

এক-একটা দিন

মৌসুমের ৪র্থ গাঢ়-ছাই রঙ আকাশের দিন,
২য় দশক, একবিংশ শতাব্দী,
ঢাকা।

আজ সকালে বৃষ্টি হলো। কোনো রকম ভেজাল ছাড়াই প্যাঁচপ্যাঁচে গরম আর ঘামের গন্ধ বাড়ানো দোসরহীন ঢাকাইয়া বৃষ্টি। ফলে যেটা ঘটে, ব্যালকনি থেকে ঘড়ির এলোমেলো বিশটি মিনিট কেটে নিয়ে রাস্তা জুড়ে চলা রিকশাগুলো পালিয়ে যায়। মনে হয়, কমসে কম তিন হাজার বছর ধরে এরকম দিন আমার জীবনে আসে না। বরং মনে পড়ে বৃষ্টির তীব্র পাতের মাঝে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি স্টেডিয়ামের ওদিকে, ফুটপাথের টিকিট কাউন্টারের ওপরের তেরপল থেকে খানিক পর পর গড়িয়ে পড়ছে জমে থাকা পানি। কে যেন অনুযোগ করছে- আলম ভাইয়ের সাথে বের হলেই তাকে কোনো না কোনো ভাবে বিপত্তির শিকার হতে হয়। আলম ভাই লোকটা কি আজও সহযাত্রীদের বিপদে ফেলে?

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: Content is protected !!