লেখালেখি

Category: অনুবাদ Page 1 of 2

প্রচ্ছদ নিয়ে কয়েক লাইন

  • সম্ভাব্য প্রচ্ছদ নিয়ে কোনো রকম স্বপ্ন দেখা ছাড়াই যদি কোনো ঔপন্যাসিক তার উপন্যাস শেষ করে ফেলতে পারেন; তবে তিনি নিঃসন্দেহে প্রজ্ঞাবান, পুরোদস্তুর পরিণত একজন মানুষ। কিন্তু যা তাকে একদিন লেখক করে তুলেছিলো, ভেতরের সেই ছেলেমানুষি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন।
  • যখন সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোকে স্মরণ করি, তাদের প্রচ্ছদটাকেও তখন আমাদের মনে ভেসে ওঠে।
  • প্রচ্ছদ দেখে যদি আরো বেশি পাঠক বই কেনে, আমাদের সেটা ভালো লাগে। এবং সেই পাঠকদের কথা মাথায় রেখে যে বইগুলো লেখা হয়, সমালোচকেরা যদি সেগুলোকে ধুয়ে দেন; সেটাও আমাদের ভালো লাগে।
  • প্রচ্ছদে যদি নায়ককে ফুটিয়ে তোলা হয় খুঁটিনাটি সহ; লেখক নয় শুধু, পাঠকের কল্পনাকেও সেটা অপমান করে।
  • প্রচ্ছদশিল্পীরা যখন ঠিক করে ‘লাল এবং কালো’ উপন্যাসের ওপরে লাল আর কালো রঙের মলাট থাকবে, কিংবা ‘নীল বাড়ি’ শিরোনামের কোনো বইয়ের ওপরে তারা যখন বসায় নীল রঙের কোনো বাড়ি; আমরা তখন বুঝি যে শিরোনামকে অনুসরণ করলেও বইটাকে তারা আদৌ পড়ে দেখেনি।
  • কোনো বই পড়ার বহু বছর পরেও যদি আমরা কখনো তার প্রচ্ছদের মুখোমুখি হই, আমাদের তখন মনে পড়ে যায় সেই প্রাচীন দিনটা, যখন কোনো এক জায়গায় গুটিসুটি মেরে বসে আমরা ক্রমশ আবিষ্কার করেছিলাম বইটার ভেতরের পৃথিবীটাকে।
  • সার্থক বইয়ের প্রচ্ছদ এক রকমের সুরঙ্গ, প্রতিদিনের নীরস জীবন থেকে সেটা আমাদের নিয়ে যায় বইয়ের ভেতরের জীবনটায়।
  • বইয়ের দোকানের যে আকর্ষণী যাদু, সেটা বইয়ের জন্য নয়, বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য।
  • বইয়ের নাম আসলে মানুষের নামের মতোই, লাখো বইয়ের মাঝ থেকে নাম দিয়েই আমরা একটা বইকে আলাদা করতে পারি। কিন্তু বইয়ের প্রচ্ছদ হলো মানুষের মুখের মতোঃ হয় তারা আমাদের সুখের কোনো স্মৃতি মনে করায়, কিংবা তারা আমাদের প্রতিশ্রুতি দেয় যে অচিরেই আমরা মুখোমুখি হবো স্বাদ না নেওয়া কোনো অভিজ্ঞতার। আমরা তাই বইয়ের প্রচ্ছদকে দেখি গভীর আগ্রহ নিয়ে, ঠিক মানুষের মুখের মতোই।


    [অরহান পামুকের ‘আদার কালার্স’ সংকলনের ‘নাইন নোটস অন বুক কাভার’ এর অনুবাদ]

শিকারী

১৮৬০ এর ২৯ জানুয়ারি জন্মেছিলেন আন্তন চেকফ।
লোকটা এমন ভাবে লিখেছে, যেন সে কিছুই বলছে না।
এবং সে সবই বলেছে।

এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো

[টীকাঃ  আন্তন চেকফের গল্পে ইম্প্রেশনাজিম ঘরানার শিল্পীদের ছায়া দেখেছিলেন তলস্তয়, চেকফের গল্পকে বোঝাতে গেলে, এই কথাটা দারুণ মানানসই।

অপূর্ব সব গল্প লিখে গেছেন চেকফ। ছোটর মাঝেও ছোট যে গল্পগুলো, সেখানে তিনি মানুষকে ধরেছেন একটা মুহুর্তের মহিমায় তার গোটা জীবনকে টেনে এনে। আর গল্প যখন একটু বড় হয়েছে, রাশিয়ার নানা স্তরের আপাদমস্তক বৈশিষ্ট্যহীন মানুষগুলোই তার বয়ানে হয়ে উঠেছে চিরকালের মানুষ।

‘শিকারী’ গল্পটা জুলাই, ১৮৮৫ তে লেখা। অল্প কথায় বহু না-বলা-গল্প বলার চেকফীয় ক্ষমতা এখানে পুরোমাত্রায় প্রকাশিত।]

তপ্ত আর দমবন্ধ গুমোট দিন। আকাশে কোনো মেঘ নেই। রোদেপোড়া ঘাসগুলোকে মনে হচ্ছে নিরানন্দ, নিরাশ, বৃষ্টি হলেও তারা যেন আর কখনো সবুজ হবে না। অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে নীরব, নিশ্চল, যেন গাছগুলো মাথা তুলে তাকিয়ে আছে কোথাও বা অপেক্ষা করছে কিছু একটার।

হেমিংওয়ে, অন্য লেখকদের নিয়ে

বিজ্ঞানীসুলভ অধ্যাবসায় নিয়ে লেখালেখির কাজটাকে গাণিতিক ছকের মতো করে তুলেছিলেন কোন্‌ লেখক, ভাবতে গেলে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের নামটাই সবার আগে মাথায় আসে। বাংলাভাষী লেখকদের মাঝে লেখার দক্ষতা অর্জনকে শাস্ত্রের মতো করে তোলার ব্যাপারটা যে সৈয়দ শামসুল হকের মাঝে দেখি, কাকতালীয় মনে হয় না মোটেই, যখন জানতে পাই যে তাকেও তার সহধর্মিনী আনোয়ারা সৈয়দ হক ডাকতেন ‘হেমিংওয়ে’ বলে।

কালভিনোর ‘সিক্স মেমোজ’ নিয়ে কয়েক ছত্র

পড়া হলো লেখালেখি নিয়ে ইতালো কালভিনের বেশ কিছু বক্তব্যের সংকলন ‘সিক্স মেমোজ ফর দা নেক্সট মিলেনিয়াম’। ১৯৮৪-৮৫ এর দিকে The Charles Eliot Norton Lectures সিরিজের অংশ হিসেবে এই বক্তব্যগুলো প্রস্তুত করেছিলেন কালভিনো।

আগামী শতাব্দীর (অর্থাৎ এই একবিংশ শতাব্দীর) সাহিত্যের সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি নিয়ে কয়েকটা প্রবন্ধ জায়গা পেয়েছে আলোচ্য সংকলনে। শোনা যায়, এই বিষয়ে মোট আটটি প্রবন্ধ লেখার পরিকল্পনা ছিলো কালভিনোর, কিন্তু অকাল প্রয়াণের কারণে কাজটি সম্পূর্ণ করা আর হয়ে ওঠেনি তার। ফলে, নামে ‘সিক্স মেমোজ’ হলেও অত্র শতাব্দীর সাহিত্যচর্চার পাঁচটি মাত্রা নিয়েই আলাপ করা হয়েছে এখানে।

কয়েক টুকরো গ্যালিয়ানো

এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানোকে নিয়ে আগেও লিখেছিলাম। দুর্দান্ত এক লেখক লোকটা। শব্দের ব্যবহারে তার চেয়ে পরিমিত গদ্যলেখক দেখিনি আর। ক্ষমতাসীনদের লেখা ইতিহাসকে ভেঙে চুরে গ্যালিয়ানো এমনভাবে তুলে ধরেন প্রাকৃতজনের বয়ান, সেটাকে কবিতা বললেই যেন মানায় বেশি।

গ্যালিয়ানোর আলোচিত বই মিররসঃ স্টোরিস অফ অলমোস্ট এভরিওয়ান থেকে নির্বাচিত কয়েকটা ভুক্তি এখানে অনুবাদের চেষ্টা করলাম। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, গ্যালিয়ানোর লেখার সৌন্দর্য্য আর কাব্যিকতার অনুবাদ আমার ল্যাংড়া কী-বোর্ডের সাধ্যতীত।

মার্কো পোলো
নিজের ভ্রমণকাহিনি শ্রুতিলিখনের সময়ে তিনি ছিলেন জেনোয়ার কারাগারে। কারাগারের অন্য বন্দীরা তার বলা সমস্ত গল্পই বিশ্বাস করতো। সাতাশ বছর ধরে প্রাচ্যের পথে পথে হেঁটে বেড়ানো মার্কো পোলোর অভিযানের কাহিনি শুনতে শুনতে প্রতিটি বন্দীই যেন ঘুরে আসতো কারাগারের বাইরে।

তিন বছর পরে, তিনি ভেনিস থেকে নিজের বই প্রকাশ করলেন। ‘প্রকাশ’ বলছি ঠিকই, কিন্তু ইউরোপে প্রিন্টিং প্রেস আসতে তখনো দেরি। হাতে লেখা কয়েকটা কপি ঘুরে বেড়ালো পরিচিত মন্ডলে। অল্প যে কিছু পাঠক মার্কো পোলো পেয়েছিলেন, তাদের কেউ সেই বইয়ের একটা অক্ষরও বিশ্বাস করেনি।

কথাসাহিত্যের বন্দনা

পাঁচ বছর বয়েসে, বলিভিয়ার কোচাবাম্বার দে লা স্যালে একাডেমিতে, ব্রাদার হুস্তিনিয়ানোর কাছে আমি পড়তে শিখি। আমার জীবনে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রায় সত্তর বছর পরেও স্পষ্ট মনে করতে পারি বইয়ের পাতার শব্দকে মনের ভেতরে ছবি করে তোলার সেই যাদু কীভাবে আমার জীবনকে ভরিয়ে দিয়েছে; সময়ের আর ভূগোলের দেয়াল ভেঙে কীভাবে সেটা আমাকে ক্যাপ্টেন নিমোর সাথে সাগরতলে বিশ হাজার লিগ ঘুরিয়ে এনেছে; এথোস, পর্থোস, আরামিস আর দাঁরতানিয়ার সাথে কীভাবে সেটা আমাকে যুদ্ধে নামিয়েছে রাণীর বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রিশেল্যুর বিপক্ষে; মারিউসের নিশ্চল দেহ পিঠে নেয়া জাঁ ভালজাঁর সাথে কীভাবে সেটা আমায় হোঁচট খাইয়েছে প্যারিসের নর্দমায়।

‘আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে দেখার পর’: গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন স্ত্রী ম্যারি ওয়েলশকে সাথে করে, প্যারিসের সেন্ট মাইকেল ব্যুলেভার্দে ১৯৫৭ সালের এক বৃষ্টিভেজা বসন্ত দিনে, দেখামাত্রই তাকে আমি চিনতে পেরেছিলাম। তিনি হাঁটছিলেন রাস্তার অন্যপাশে, লুক্সেমবার্গ পার্ক বরাবর; গায়ে ছিলো তার একটা ভারি শার্ট, একটা বহু ব্যবহৃত কাউবয় প্যান্ট আর মাথায় বেসবল খেলার টুপি। চোখে থাকা ধাতব রিমটা অবশ্য তার সাথে মোটেই মানায়নি; গোলাকার ছোট চশমাটা তাকে দিচ্ছিলো অকালে বুড়িয়ে যাওয়া দাদুর মর্যাদা। তার বয়স তখন ৫৯, এবং লোকটা তখনো বিশাল আর প্রায় অতিরিক্ত চোখে পড়ার দাবিদার। কিন্তু তবু, নিজেকে সে যেমন দেখাতে চায়, তেমন অমানুষিক শক্তসমর্থ লোকটাকে মনে হয়নি। কারণ মানুষটার নিতম্ব ছিলো মাংসহীন, আর কাঠুরেদের জন্য উপযুক্ত শক্ত জুতোয় তার পা জোড়াকে মনে হচ্ছিলো কিছুটা কৃশকায়। পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর মাঝে আর চতুর্দিকে ঘিরে থাকা সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের মধ্যে তাকে অ্যাতো প্রাণবন্ত লাগছিলো, যেটা দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে মানুষটা আর মাত্র চার বছর বাঁচবে।

Page 1 of 2

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: Content is protected !!