কয়েক টুকরো গ্যালিয়ানো

এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানোকে নিয়ে আগেও লিখেছিলাম। দুর্দান্ত এক লেখক লোকটা। শব্দের ব্যবহারে তার চেয়ে পরিমিত গদ্যলেখক দেখিনি আর। ক্ষমতাসীনদের লেখা ইতিহাসকে ভেঙে চুরে গ্যালিয়ানো এমনভাবে তুলে ধরেন প্রাকৃতজনের বয়ান, সেটাকে কবিতা বললেই যেন মানায় বেশি।

গ্যালিয়ানোর আলোচিত বই মিররসঃ স্টোরিস অফ অলমোস্ট এভরিওয়ান থেকে নির্বাচিত কয়েকটা ভুক্তি এখানে অনুবাদের চেষ্টা করলাম। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, গ্যালিয়ানোর লেখার সৌন্দর্য্য আর কাব্যিকতার অনুবাদ আমার ল্যাংড়া কী-বোর্ডের সাধ্যতীত।

মার্কো পোলো
নিজের ভ্রমণকাহিনি শ্রুতিলিখনের সময়ে তিনি ছিলেন জেনোয়ার কারাগারে। কারাগারের অন্য বন্দীরা তার বলা সমস্ত গল্পই বিশ্বাস করতো। সাতাশ বছর ধরে প্রাচ্যের পথে পথে হেঁটে বেড়ানো মার্কো পোলোর অভিযানের কাহিনি শুনতে শুনতে প্রতিটি বন্দীই যেন ঘুরে আসতো কারাগারের বাইরে।

তিন বছর পরে, তিনি ভেনিস থেকে নিজের বই প্রকাশ করলেন। ‘প্রকাশ’ বলছি ঠিকই, কিন্তু ইউরোপে প্রিন্টিং প্রেস আসতে তখনো দেরি। হাতে লেখা কয়েকটা কপি ঘুরে বেড়ালো পরিচিত মন্ডলে। অল্প যে কিছু পাঠক মার্কো পোলো পেয়েছিলেন, তাদের কেউ সেই বইয়ের একটা অক্ষরও বিশ্বাস করেনি। Continue reading “কয়েক টুকরো গ্যালিয়ানো”

কথাসাহিত্যের বন্দনা

পাঁচ বছর বয়েসে, বলিভিয়ার কোচাবাম্বার দে লা স্যালে একাডেমিতে, ব্রাদার হুস্তিনিয়ানোর কাছে আমি পড়তে শিখি। আমার জীবনে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রায় সত্তর বছর পরেও স্পষ্ট মনে করতে পারি বইয়ের পাতার শব্দকে মনের ভেতরে ছবি করে তোলার সেই যাদু কীভাবে আমার জীবনকে ভরিয়ে দিয়েছে; সময়ের আর ভূগোলের দেয়াল ভেঙে কীভাবে সেটা আমাকে ক্যাপ্টেন নিমোর সাথে সাগরতলে বিশ হাজার লিগ ঘুরিয়ে এনেছে; এথোস, পর্থোস, আরামিস আর দাঁরতানিয়ার সাথে কীভাবে সেটা আমাকে যুদ্ধে নামিয়েছে রাণীর বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রিশেল্যুর বিপক্ষে; মারিউসের নিশ্চল দেহ পিঠে নেয়া জাঁ ভালজাঁর সাথে কীভাবে সেটা আমায় হোঁচট খাইয়েছে প্যারিসের নর্দমায়। Continue reading “কথাসাহিত্যের বন্দনা”

‘আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে দেখার পর’: গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন স্ত্রী ম্যারি ওয়েলশকে সাথে করে, প্যারিসের সেন্ট মাইকেল ব্যুলেভার্দে ১৯৫৭ সালের এক বৃষ্টিভেজা বসন্ত দিনে, দেখামাত্রই তাকে আমি চিনতে পেরেছিলাম। তিনি হাঁটছিলেন রাস্তার অন্যপাশে, লুক্সেমবার্গ পার্ক বরাবর; গায়ে ছিলো তার একটা ভারি শার্ট, একটা বহু ব্যবহৃত কাউবয় প্যান্ট আর মাথায় বেসবল খেলার টুপি। চোখে থাকা ধাতব রিমটা অবশ্য তার সাথে মোটেই মানায়নি; গোলাকার ছোট চশমাটা তাকে দিচ্ছিলো অকালে বুড়িয়ে যাওয়া দাদুর মর্যাদা। তার বয়স তখন ৫৯, এবং লোকটা তখনো বিশাল আর প্রায় অতিরিক্ত চোখে পড়ার দাবিদার। কিন্তু তবু, নিজেকে সে যেমন দেখাতে চায়, তেমন অমানুষিক শক্তসমর্থ লোকটাকে মনে হয়নি। কারণ মানুষটার নিতম্ব ছিলো মাংসহীন, আর কাঠুরেদের জন্য উপযুক্ত শক্ত জুতোয় তার পা জোড়াকে মনে হচ্ছিলো কিছুটা কৃশকায়। পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর মাঝে আর চতুর্দিকে ঘিরে থাকা সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের মধ্যে তাকে অ্যাতো প্রাণবন্ত লাগছিলো, যেটা দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে মানুষটা আর মাত্র চার বছর বাঁচবে।

Continue reading “‘আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে দেখার পর’: গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ”

‘গেইম অফ থ্রোন্স হেঁটেছে বিপ্লব আর নারী নেতৃত্বের জুজু দেখানো পথেই’ : স্লাভোয় জিজেক

স্লোভেনিয়ান দার্শনিক স্লাভোয় জিজেক আলোচনা করেছেন সদ্য সমাপ্ত টিভি সিরিজ গেইম অফ থ্রোন্সের রাজনীতিক দর্শন নিয়ে। ২৩ মে, ২০১৯-এ ইন্ডিপেন্ডেন্ট এর মতামত বিভাগে প্রকাশিত উক্ত আলোচনাটি এখানে অনুবাদ করা হলোঃ 

গেইম অফ থ্রোন্সের শেষ সিজন দেখে মানুষের হট্টগোল এমন চরমে উঠেছে, যে প্রায় দশ লাখের মতো লোক অনলাইনে আবেদন জানিয়েছে এই সিজনটা বাতিল করে আবার শুটিং করবার জন্য। বিতর্কের আকার দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে, দর্শক এই সিরিজের অন্য পরিণতির জন্য প্রয়োজনে বাজিও ধরতে পারে!

মানুষের অতৃপ্তিগুলো শোনা যাচ্ছে মূলত কয়েকটা বিষয়কে ঘিরেইঃ দুর্বল চিত্রনাট্য (দ্রুত সিরিজ শেষ করবার চাপ, গল্পের জটিল বয়ানটিকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলা), চরিত্রদের দুর্বল মনস্তত্ত্ব (ডেনেরিসের মুহুর্তেই উন্মাদিনীর রুপ নেয়া তার চরিত্রের সাথে খাপ খায় না)- এরকম সব ব্যাপার। Continue reading “‘গেইম অফ থ্রোন্স হেঁটেছে বিপ্লব আর নারী নেতৃত্বের জুজু দেখানো পথেই’ : স্লাভোয় জিজেক”

নীল জল দিগন্ত

প্রথম যেদিন গল্পকার হিসেবে আমি পরীক্ষার সামনে দাঁড়াই, সে ঘটনাটা আজ বলতে চাই। প্রথমবারের মতো সেদিন মনে হয়েছিলো যে কাজটা আমার জন্য নয়।

ঘটনাটা ঘটেছিলো আয়াগুয়া নামের একটা শহরে, বলিভিয়াতে। আমি উঠেছিলাম কয়লা খনির কাছে একটা জায়গায়। স্যান জুয়ানের কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডটা এ শহরেই হয়েছিলো, সেইন্ট জন’স ইভ উদাযপন করতে থাকা পানরত আর নৃত্যরত খনি শ্রমিকদের ওপর সেই সন্ধ্যায় চারদিকের পাহাড়চূড়া থেকে স্বৈরাশাসক ব্যারিন্টোসের আদেশে গুলি চালিয়েছিলো তার সৈনিকেরা। Continue reading “নীল জল দিগন্ত”

লেখকের বিচার

সিসলিতে- সারাটা জীবন যে জেলায় আমি কাটিয়েছি, যে তিনতলা বাড়িতে আমার দাদী কাটিয়েছেন জীবনের চল্লিশটা বছর, ঠিক তার উল্টোদিকের এক আদালতে আগামী শুক্রবার আমাকে দাঁড়াতে হবে আদালতের কাঠগড়ায়। আমার অপরাধ, তুর্কী জাতীয়তাবাদের অনুভূতিতে প্রকাশ্যে আঘাত করা। সরকারি কৌসুলি আমার তিন বছরের জেল চাইবেন। হয়তো আমার দুশ্চিন্তা করা উচিৎ; কারণ এই আদালতেই, একই অপরাধের দায়ে আর্মেনিয়ান-তুর্কি সাংবাদিক হারান্ত দিঙ্ককে দাঁড়াতে হয়েছিলো, এবং সংবিধানের ৩০১ নম্বর ধারায় তিনি দোষী প্রমাণিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমি আশাবাদী। আমার উকিলের মতো আমিও মনে করি যে আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটা দুর্বল, মনে হয় না আমার জেলে যেতে হবে। Continue reading “লেখকের বিচার”