লেখালেখি

Author: সুহান রিজওয়ান Page 1 of 13

প্রচ্ছদ নিয়ে কয়েক লাইন

  • সম্ভাব্য প্রচ্ছদ নিয়ে কোনো রকম স্বপ্ন দেখা ছাড়াই যদি কোনো ঔপন্যাসিক তার উপন্যাস শেষ করে ফেলতে পারেন; তবে তিনি নিঃসন্দেহে প্রজ্ঞাবান, পুরোদস্তুর পরিণত একজন মানুষ। কিন্তু যা তাকে একদিন লেখক করে তুলেছিলো, ভেতরের সেই ছেলেমানুষি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন।
  • যখন সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোকে স্মরণ করি, তাদের প্রচ্ছদটাকেও তখন আমাদের মনে ভেসে ওঠে।
  • প্রচ্ছদ দেখে যদি আরো বেশি পাঠক বই কেনে, আমাদের সেটা ভালো লাগে। এবং সেই পাঠকদের কথা মাথায় রেখে যে বইগুলো লেখা হয়, সমালোচকেরা যদি সেগুলোকে ধুয়ে দেন; সেটাও আমাদের ভালো লাগে।
  • প্রচ্ছদে যদি নায়ককে ফুটিয়ে তোলা হয় খুঁটিনাটি সহ; লেখক নয় শুধু, পাঠকের কল্পনাকেও সেটা অপমান করে।
  • প্রচ্ছদশিল্পীরা যখন ঠিক করে ‘লাল এবং কালো’ উপন্যাসের ওপরে লাল আর কালো রঙের মলাট থাকবে, কিংবা ‘নীল বাড়ি’ শিরোনামের কোনো বইয়ের ওপরে তারা যখন বসায় নীল রঙের কোনো বাড়ি; আমরা তখন বুঝি যে শিরোনামকে অনুসরণ করলেও বইটাকে তারা আদৌ পড়ে দেখেনি।
  • কোনো বই পড়ার বহু বছর পরেও যদি আমরা কখনো তার প্রচ্ছদের মুখোমুখি হই, আমাদের তখন মনে পড়ে যায় সেই প্রাচীন দিনটা, যখন কোনো এক জায়গায় গুটিসুটি মেরে বসে আমরা ক্রমশ আবিষ্কার করেছিলাম বইটার ভেতরের পৃথিবীটাকে।
  • সার্থক বইয়ের প্রচ্ছদ এক রকমের সুরঙ্গ, প্রতিদিনের নীরস জীবন থেকে সেটা আমাদের নিয়ে যায় বইয়ের ভেতরের জীবনটায়।
  • বইয়ের দোকানের যে আকর্ষণী যাদু, সেটা বইয়ের জন্য নয়, বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য।
  • বইয়ের নাম আসলে মানুষের নামের মতোই, লাখো বইয়ের মাঝ থেকে নাম দিয়েই আমরা একটা বইকে আলাদা করতে পারি। কিন্তু বইয়ের প্রচ্ছদ হলো মানুষের মুখের মতোঃ হয় তারা আমাদের সুখের কোনো স্মৃতি মনে করায়, কিংবা তারা আমাদের প্রতিশ্রুতি দেয় যে অচিরেই আমরা মুখোমুখি হবো স্বাদ না নেওয়া কোনো অভিজ্ঞতার। আমরা তাই বইয়ের প্রচ্ছদকে দেখি গভীর আগ্রহ নিয়ে, ঠিক মানুষের মুখের মতোই।


    [অরহান পামুকের ‘আদার কালার্স’ সংকলনের ‘নাইন নোটস অন বুক কাভার’ এর অনুবাদ]

কহেন লিওনার্ড কোহেন

গান ভালোবাসা মানুষের কাছে লিওনার্ড কোহেন যথেষ্ট পরিচিত এক নাম। পৃথিবীজোড়া লোকটার খ্যাতির মূল কারণ বোধহয় এটাই, যে ভূগোল আর সংস্কৃতির গণ্ডীতে আটকে না থেকেই একজন সংবেদনশীল মানুষ কোহেনের গানের মাঝে নিজেকে খুঁজে নিতে পারে। আহামরি কোনো গায়কী কিংবা চটুল যন্ত্রের কারিকুরিময় সুর নয়, কোহেনের গান সোজাসাপ্টা শব্দে ভর করে শ্রোতাকে বরং দেয় নৈরাশ্য; শ্রোতাকে সেটা বলে, পৃথিবীতে আরো অজস্র মানুষ তোমার মতোই বিপন্ন।

ইমতিয়ার শামীমের সঞ্চারপথ

(১)
কোথাও পড়েছিলাম, সকল মহৎ উপন্যাসই মোটা দাগে তিনটা চেনা ছকে এগোয়। একটা ছকে কোনো জনপদে নতুন কোনো ব্যক্তি কিংবা বর্গের আগমন ঘটে (দস্তয়েভস্কির ‘ব্রাদার্স কারামাজভ’ যেমন), একটা ছকে দুটো বিপরীত শক্তি পরস্পরের মুখোমুখি হয় (তলস্তয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিস’ এই ঘরানার রচনা)। আর উপন্যাসের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ছক যেটা, সেটা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টি বেরিয়ে পড়ে একটা যাত্রা কি অভিযানে; সারভান্তেসের ডন কিহোতের দিগ্বিজয় কিংবা বিভূতিভুষণের অপুর অপরাজিত হয়ে ওঠাটা তেমন যাত্রারই উদাহরণ।

পাঠক যদি স্বীকার করে নেয় যে উপন্যাস পড়া মানে অন্য কারো জুতোয় পা রাখা, তখনই সে বুঝে ফেলে, যে কেন বর্ণিত তৃতীয় ছকটির নকশাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সাহিত্যে। উপন্যাস যখন পড়ি, আমরা কি তখন প্রকৃতপক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি বা বর্গের সঞ্চারপথকেই আশ্রয় করি না?

শিকারী

১৮৬০ এর ২৯ জানুয়ারি জন্মেছিলেন আন্তন চেকফ।
লোকটা এমন ভাবে লিখেছে, যেন সে কিছুই বলছে না।
এবং সে সবই বলেছে।

এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো

[টীকাঃ  আন্তন চেকফের গল্পে ইম্প্রেশনাজিম ঘরানার শিল্পীদের ছায়া দেখেছিলেন তলস্তয়, চেকফের গল্পকে বোঝাতে গেলে, এই কথাটা দারুণ মানানসই।

অপূর্ব সব গল্প লিখে গেছেন চেকফ। ছোটর মাঝেও ছোট যে গল্পগুলো, সেখানে তিনি মানুষকে ধরেছেন একটা মুহুর্তের মহিমায় তার গোটা জীবনকে টেনে এনে। আর গল্প যখন একটু বড় হয়েছে, রাশিয়ার নানা স্তরের আপাদমস্তক বৈশিষ্ট্যহীন মানুষগুলোই তার বয়ানে হয়ে উঠেছে চিরকালের মানুষ।

‘শিকারী’ গল্পটা জুলাই, ১৮৮৫ তে লেখা। অল্প কথায় বহু না-বলা-গল্প বলার চেকফীয় ক্ষমতা এখানে পুরোমাত্রায় প্রকাশিত।]

তপ্ত আর দমবন্ধ গুমোট দিন। আকাশে কোনো মেঘ নেই। রোদেপোড়া ঘাসগুলোকে মনে হচ্ছে নিরানন্দ, নিরাশ, বৃষ্টি হলেও তারা যেন আর কখনো সবুজ হবে না। অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে নীরব, নিশ্চল, যেন গাছগুলো মাথা তুলে তাকিয়ে আছে কোথাও বা অপেক্ষা করছে কিছু একটার।

ইসমাইল কাদারের অন্য আলবেনিয়া

গল্প লেখার প্রয়োজনে সৈয়দ হক যখন একদিন আবিষ্কার করলেন যে প্রতিটি গল্পে তাকে কোনো গ্রামীণ জনপদ নিয়মিতই উদ্ভাবন করতে হচ্ছে, তখন তিনি এমন একটা কাল্পনিক জনপদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেন, যেটাকে ব্যবহার করা যাবে তার সমস্ত গ্রামীণ গল্পের পটভূমি হিসেবে। সৃষ্টি হলো সৈয়দ হকের ‘জলেশ্বরী’, নদীতীরের কয়েকটি কাল্পনিক চর নিয়ে গঠিত যে জনপদকে তিনি বহুবার ব্যবহার করেছেন তার গল্প উপন্যাসে। সত্যি বলতে, লেখকের প্রয়োজনে কাল্পনিক জনপদ তৈরির ব্যাপারটা সাহিত্যে নতুন কিছু নয়; আর কে নারায়ণের ‘মালগুঁড়ি’, কিংবা গার্সিয়া মার্কেজের ‘মাকেন্দো’ নামগুলোও কিন্তু দেশ বিদেশের পাঠকের কাছে  অতি পরিচিত, লেখকদের বয়ানে সেই জনপদগুলো পাঠকের কাছে হয়ে উঠেছে বাস্তবের চাইতেও অধিক বাস্তব।

শাহরিয়ার কবিরের সেরা ১০ কিশোর উপন্যাস

অনলাইনে কিংবা চায়ের কাপের আড্ডায় কিশোর বয়েসীদের জন্য ভালো বইয়ের খোঁজ করতে দেখি অনেককে। আন্তর্জালের কল্যাণে বিদেশি ভাষার সুদৃশ্য কিশোরোপযোগী বইগুলোর নামধাম জানা সকলের জন্যেই সহজ এখন। কিন্তু বিপণনের আয়তনের স্বল্পতা হোক, বা সংশ্লিষ্টদের অনীহা; বাংলা প্রকাশনাগুলোর ক্ষেত্রে সেই ঘরানার বইগুলো নিয়ে বেশি আলোচনা দেখি না খুব একটা। বাংলাদেশের কিশোর সাহিত্যে মুহম্মদ জাফর ইকবালের অবস্থানটি দুর্দান্ত সবল, কিশোর বয়েসীদের জন্য ভালো বইয়ের তালিকায় সবাই তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর রচিত গল্প উপন্যাসের কথাই সচরাচর বলেন।

আড়ালে চলে যান শাহরিয়ার কবির।

হেমিংওয়ে, অন্য লেখকদের নিয়ে

বিজ্ঞানীসুলভ অধ্যাবসায় নিয়ে লেখালেখির কাজটাকে গাণিতিক ছকের মতো করে তুলেছিলেন কোন্‌ লেখক, ভাবতে গেলে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের নামটাই সবার আগে মাথায় আসে। বাংলাভাষী লেখকদের মাঝে লেখার দক্ষতা অর্জনকে শাস্ত্রের মতো করে তোলার ব্যাপারটা যে সৈয়দ শামসুল হকের মাঝে দেখি, কাকতালীয় মনে হয় না মোটেই, যখন জানতে পাই যে তাকেও তার সহধর্মিনী আনোয়ারা সৈয়দ হক ডাকতেন ‘হেমিংওয়ে’ বলে।

Page 1 of 13

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: Content is protected !!