সেলিনা হোসেনের ‘লারা’, ক্রিস নোলানের ‘প্রেস্টিজ’

(১)
যখনই পড়তে বসি সেলিনা হোসেনকে, তার উপন্যাসগুলোর শেষে যেন সঙ্গী করতে হয় এক ধরনের আক্ষেপকে।

ছেলেমানুষি এক ধরনের সাহসিকতা আছে সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে। তার প্রায় সমসাময়িক ঔপন্যাসিকেরা মানুষের মনকে নানা ভাবে ভেঙে দেখানোর যে রাস্তায় হেঁটেছেন, অথবা পূর্বপুরুষ ওয়ালীউল্লাহ কিংবা সৈয়দ হকের উপন্যাসেও যেমন পরিচয় মেলে নক্ষত্রবীথির চেয়েও অচেনা মানব মনের, সেলিনা সেখানে রীতিমতো ছেলেমানুষের মতো যেন পণ করেছেন পাড়ার ওইসব বড় ভাইদের অগ্রাহ্য করার। তার চরিত্ররা যেন মনে করায় আরো প্রায় অর্ধেক শতাব্দী পেছনের শরৎচন্দ্রের উপন্যাসকে, যারা এই পৃষ্ঠায় উপদেশ মারে তো পরের পৃষ্ঠায় কান্না চাপতে ঠোঁট কামড়ায়। Continue reading “সেলিনা হোসেনের ‘লারা’, ক্রিস নোলানের ‘প্রেস্টিজ’”

সাড়ে সাত ঘণ্টা / ২য় পর্ব

( প্যারিসের বুকে প্রিয় লেখকদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ঘোরার গল্পের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব। প্রথম পর্বটা পড়া যাবে এইখানে।)

আরো খানিক পরে আমাদের পরিচিত পর্যটককে দেখা যায় তার ছোট্ট সবুজাভ ব্যাগটি পিঠে ঝুলিয়ে লুক্সেমবার্গ উদ্যান থেকে বেরিয়ে সিন নদীর দিকে হাঁটা দিতে। বিকেলের আলোতে রাস্তায় এখন লোকজন বেড়েছে, তার মাঝে অধিকাংশকেই ছাত্রসমাজের প্রতিনিধি বলে বোধ হয়। ফলে হাঁটতে সুহানের চমৎকার লাগে। একটু কল্পনা করলে নিজেকে সে এমনকি আবিষ্কার করতে পারে ১৯৬৮ এর মে মাসে, ছাত্রজনতার সাথে পথে নেমে দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি এঁকে সে সরকারের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে, তেমন খোয়াবটিও বেশ করে মন্থন করা হয় খানিক। তবে এই কল্পনা প্রবণতার ফলটা সুহান হাতেনাতে পায়। একটা তিন রাস্তার মাথায় এসে সে ভুল পথে খানিক দূরে চলে যায় গন্তব্য হতে, সন্দেহ হওয়ায় তাকে পুনরায় ঠিক লাইনে ফিরতে হয় সেই গুগল ম্যাপ দেখেই। Continue reading “সাড়ে সাত ঘণ্টা / ২য় পর্ব”

সাড়ে সাত ঘণ্টা / ১ম পর্ব

সিম্‌তিয়ের দ্যু মোঁপার্নাস (Cimetière du Montparnasse)-কে পাশ কাটিয়ে যাবার সময় সেটার অনাড়ম্বর ফটকটার দিকে সুহান একটু সম্ভ্রম নিয়ে তাকায় ঠিক, তবে তা মুহুর্তের জন্যেই। বিশাল এই সমাধিক্ষেত্রটা সে ঘুরে দেখতে চায় কখনো। কিন্তু তাড়াহুড়োয় নয়; দীর্ঘ সময় নিয়ে, একটু একটু করে শিশুসুলভ আনন্দে সে আবিষ্কার করতে চায় কোথায় শুয়ে আছেন জাঁ পল সাত্রে, সিমন দ্য বোভোয়ার কিংবা হুলিও কোয়ার্তাজার। আজকের পরিকল্পনায় যেহেতু সিম্‌তিয়ের দ্যু মোঁপার্নাসের জায়গা নেই, এদিকে আর তাকিয়ে তবে ফায়দা কী? চোয়াল শক্ত করে সুহান তাই এগিয়ে যায়, লা ক্লোজরি দে লিলা (La Closerie Des Lilas) জায়গাটা সামনের চৌরাস্তার আশপাশেই কোথাও হবে, কাউকে জিজ্ঞেস করলেই খুঁজে পাবার কথা। Continue reading “সাড়ে সাত ঘণ্টা / ১ম পর্ব”

উপন্যাসের প্রথম লাইন

উপন্যাসের প্রথম বাক্যটা লেখাই নাকি সবচেয়ে কঠিন। সম্ভাব্য পাঠককে বাস্তবের জগত থেকে শব্দ আর কল্পনার জগতটায় সরিয়ে নিয়ে যেতে যে টোপগুলো লেখক ছাড়েন, উপন্যাসের শুরুটা নাকি তার মাঝে সবচাইতে গুরত্বপুর্ণ। ক্যামন ধরনের যাত্রায় নামতে যাচ্ছে পাঠক, প্রথম বাক্যে থাকা লাগে সেটার একটা ইঙ্গিত, থাকতে হয় লেখকের ভাষা কি ভঙ্গির সাক্ষর, আর সাথে অবশ্যই প্রয়োজন পাঠককে আকর্ষণ করবার ক্ষমতা।

আর সেরা উপন্যাসগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, যে উলটো দিক থেকেও ব্যাপারটা সত্য। মানে পাঠকও যদি প্রথম বাক্য থেকেই আটকা পড়ে যায় লেখকের সাথে, তবে সেই উপন্যাস তার মনে একটু গভীরতর দাগই কাটে। বহুদিন পরেও তখন তার মনে ঘুরেফিরে আসে উপন্যাসের শুরুটা। Continue reading “উপন্যাসের প্রথম লাইন”

ইলিয়াসের ডায়েরি, অ্যাটউডের স্মৃতিচারণ

লোভী লোকের পক্ষে গল্প লেখা সম্ভব নয়, এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন মাহমুদুল হক। বিতর্কের বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করলে উক্ত দাবির উভয় পক্ষেই বোধহয় বলবার মতো বক্তার অভাব হবে না। সেদিকে না গিয়ে যদি নজর করি মায়াবী গদ্যকার মাহমুদুল হকের বক্তব্যের আরেকটু ভেতরে, তাহলে কিন্তু তার কথাটার একটা অর্থ দাঁড়ায়, যে গল্প লেখার জগতেও লোভী লোকেরা ঘোরাফেরা করে।

সত্যি বলতে, হাটে-বাজারে-ময়দানে-দপ্তরে ঘোরাফেরা করা মতলববাজদের মতোই, সাহিত্য জগতেও অনেকে পা রাখেন বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে। একটু মনোযোগী পাঠক মাত্রই জানেন, যে সাহিত্য জগতে বিচরণ করা মানুষদের অনেকের ধ্যানজ্ঞানেই লেখাটা খুব বেশি প্রাধান্য পায় না। Continue reading “ইলিয়াসের ডায়েরি, অ্যাটউডের স্মৃতিচারণ”

‘দা জেনারেল অফ দা ডেড আর্মি’ নিয়ে কয়েক ছত্র

ইসমাইল কাদারের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মায় বছর দুয়েক আগে, প্যারিস রিভিউকে তার সাক্ষাৎকারটা পড়ে। খুব বেশি মানুষ কথা বলে না আলবেনিয়ান ভাষায়; কিন্তু অমন একটা ভাষাতেই লিখে ইউরোপের সেরা ঔপন্যাসিকদের একজন বলে স্বীকৃতি পেয়েছেন কাদারে; সে তথ্যের চেয়েও বেশি আগ্রহ জাগে লোকটার ভাবনার বৈচিত্র্য দেখে। আমাদের অতি পরিচিত গ্রিক পুরাণের চরিত্র আর ঘটনাগুলো দিয়ে লোকটা এমন ভাবে আধুনিক যুগকে ব্যক্ত করেন ওই সাক্ষাৎকারে, পড়তে বেশ মজা লাগে আমার। গুগলের শরণাপন্ন হয়ে বেশ কিছু পড়াশোনাও করি তাকে নিয়ে। এবং নিশ্চিত হই, যে লোকটাকে পড়া দরকার। Continue reading “‘দা জেনারেল অফ দা ডেড আর্মি’ নিয়ে কয়েক ছত্র”