
গল্পটা প্রতি চার বছরে ফিরে ফিরে আসতো লাতিন আমেরিকার সাহিত্য জগতে।
মানুষটা নাকি তখন একমাসের জন্য বাড়ির দরজা বন্ধ রাখে, দরজার বাইরে নোটিশ দেয়ঃ খেলা দেখার জন্য বন্ধ। ওই একটা মাস নাকি মানুষটা টিভির সামনে নিজের প্রিয় চেয়ারে বসে শুধু খেলা দ্যাখে, আর সেটা নিয়ে লিখে যায়।
মানুষটা এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো, খেলাটা ফুটবল, আর সময়টা বিশ্বকাপ।
প্রিয় লেখক, ইতিহাসবিদ গ্যালিয়ানো আর বেঁচে নেই—কিন্তু তার সেই খেলা দেখার পাগলামিকে প্রতিনিয়ত দেখতে পাই অনেকের মাঝে। বিশ্বকাপ এলেই রাত জেগে খেলা দেখা যেন বাঙালির উৎসব-মনা প্রবৃত্তির একটা দিককে প্রকাশ করে নতুন ভাবে।
তবে, খেলা যারা দেখেন না—অথচ ভালোবাসেন সিনেমা দেখতে, বিশ্বকাপের মাসে তো ফুটবল নিয়ে তাদেরও কথা বলতে হয়! আজকের পোস্টের আলোচনা তাই সিনেমা-প্রেমী সেইসব পাঠকের জন্যেই।
ফুটবল কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে যে সব সিনেমা, তার মাঝে আমার নিজের পছন্দের ৫টাকে তুলে আনার চেষ্টা করলাম টুকরো আলাপে।আশা রাখি, সিনেমা-দর্শক নয় শুধু, ফুটবলকে যারা ভালোবাসেন, তারাও আনন্দ পাবেন তালিকার সিনেমাগুলো দেখতে বসে।
০১) ফিভার পিচ (১৯৯৭)
নিক হর্নবির উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমায় ফুটবলের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হিয়েছে এক ভক্তের জীবন।
শৈশবে ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তান ছিলো পল। কোনো কিছুতেই তাকে আগ্রহী করতে না পেরে বাবা তাকে একদিন নিয়ে যান আর্সেনালের খেলা দেখাতে। তারপর থেকে সারাটা জীবন আর্সেনালের সাথে বাধা পড়ে যায় পলের ভাগ্য। কৈশোর পেরিয়ে মাঝবয়েসেও তার আর্সেনাল প্রেম থাকে অটুট, রীতিমতো উন্মাদনা।
তবু চপলমতি এই স্কুল-শিক্ষক পলের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে জীবনকে হালকা ভাবে না নেওয়া শিক্ষিকা সারাহ। কিন্তু সেই প্রেমেও ছায়া ফেলতে থাকে আর্সেনালের জন্য পলের ভালোবাসা। তারপর, দারুণ জমাট এক মৌসুম কাটিয়ে আর্সেনাল যখন শিরোপার খুব কাছাকাছি, তখনই পল আর সারাহর জীবনে ঘটতে থাকে একের পর এক ঘটনা।
০২) ড্যামড ইউনাইটেড (২০০৯)
ফুটবল ইতিহাসের আলোচিত এক চরিত্র ব্রায়ান ক্লফ, চালু মুখের জন্য মিডিয়া যাকে তুলনা করতো এমনকি মোহাম্মদ আলির সাথেও।
প্রথম জীবনে ডার্বি কাউন্টির কোচ ছিলেন ক্লফ। তখন প্রিমিয়ার লিগ কাঁপানো দল যে লিডস ইউনাইটেড, তাদের শরীর-নির্ভর গা জোয়ারি ফুটবল খেলার তীব্র সমালোচক ছিলেন মানুষটা। সত্যি বলতে, ফুটবল দর্শনের পার্থক্য নয়– এই সমালোচনার বড় উৎস ছিলো ক্লফের অসূয়া, কারণ ছোট এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে লিডসের ম্যানেজার ডন রিভির প্রতি ক্লফের ছিলো তুমুল ব্যক্তিগত ক্রোধ। ভাগ্যের পরিহাসে, ডন রিভি যখন হয়ে পড়লেন ইংল্যান্ড জাতীয় দলের ম্যানেজার—লিডস ইউনাইটেড তখন ম্যানেজার করে আনলো তাদের সবচেয়ে বড় সমালোচক ব্রায়ান ক্লফকেই।
ইতিহাস বলবে, সহকারী হিসেবে বন্ধু পিটার টেইলরকে সাথে নিয়ে দ্বিতীয় সারির ক্লাব ডার্বি কাউন্টিকে ইংল্যান্ডের লিগ সেরা করে তুলেছিলেন ব্রায়ান ক্লফ। আরও পরে, নটিংহাম ফরেস্টের সাথে তো লিখেছিলেন চিরকালীন রুপকথা—তারত অধীনে আশির দশকের শেষে পরপর দুই বছর ইউরোপ সেরার শিরোপা (এখন যেটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) জিতে নেয় দলটা।
কিন্তু সিনেমা হিসেবে ‘ড্যামড ইউনাইটেড’ এর অনন্যতা যেখানেঃ সাফল্যের সেই সব গল্প না বলে তা তুলে আনতে চেয়েছে লিডস ইউনাইটেডের ব্যর্থ ব্রায়ান ক্লফকে। দেড় মাসের মতো স্থায়ী সেই চাকরিতে ডন রিভির ছায়ার সাথে লড়তে থাকা ব্রায়ান ক্লফের ব্যক্তিগত সব ভঙ্গুর মুহুর্তই এই সিনেমার প্রাণশক্তি।
০৩) মন্টেভিডিও, গড ব্লেস ইউ (২০১০)
তালিকার সবচেয়ে ‘মসলাদার’ সিনেমা। ফুটবলের সাথে সাথে কমেডি, রাজনীতি, তুমুল সুন্দরী নায়িকা—সবই আছে ভ্লাদিমির স্তানকোভিচের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমায়।
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের সময় উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিও’তে খেলতে যাবার আমন্ত্রণ পায় তৎকালীন ইউগোস্লাভিয়া। ঠিক হয় মূলত সার্বিয়ার শহর বেলগ্রেডের প্রধান ফুটবল ক্লাবটা থেকেই নির্বাচন করা হবে বিশ্বকাপের স্কোয়াড। দলের প্রধান দুই খেলোয়াড়ের একজন হলো তিরকে, গরীব ঘর থেকে আসা যে ছেলেটা তুমুল পায়ের কারুকাজ জানে। অন্যজন ইতোমধ্যে দেশের প্লে-বয় সুপারস্টার, মোওজা।
কাহিনি জমে যায়, যখন দ্বন্দ্ব লাগে তিরকে আর মোওজার মাঝে– সুন্দরী দুই নায়িকার কারণে!
৪) ডিয়েগো ম্যারাডোনা (২০১৯)
জীবনানন্দের ট্রাঙ্কে থাকা কবিতার মতোই, স্বামীর ক্যারিয়ার শেষ হবার বহু বছর পরে, ডিয়েগো ম্যারাডোনার স্ত্রী ক্লডিয়া কোথা থেকে যেন খুঁজে পেলেন মানুষটার খেলোয়াড়ি জীবনের অমূল্য সব ভিডিও ফুটেজ। সেই সব ফুটেজ থেকে আসিফ কাপাডিয়া তৈরি করলেন ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’ নামের এক ডকুমেন্টারি।
ম্যারাডোনার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত কয়েকটি বছর এই ডকুমেন্টারির কেন্দ্র। বার্সেলোনা থেকে এসে ইতালির নিচু সারির ক্লাব নেপলসকে কীভাবে ইউরোপের সেরা করে তুললেন ফুটবলের যে ঈশ্বর, তিনি নিজে কীভাবে বন্দি হয়ে গেলেন ইতালিয়ান মাফিয়াদের হাতে—সেই গল্প বলেছে এই ডকুমেন্টারি। আবিষ্কার করেছে, ইতালির আঞ্চলিক রাজনীতি আর মাদকের সম্পর্ক কীভাবে হ্রস্ব করেছে ম্যারাডোনার ক্যারিয়ার।
প্রিয় সিনেমার তালিকায় এটাই একমাত্র ডকুমেন্টারি। কিন্তু গল্পের পরতে পরতে যে উত্তেজনা এখানে, কল্পনায় ভর করে বানানো বহু সিনেমাও সেটার পাশে দাঁড়াতে পারে না।
০৫) অফসাইড (২০০৬)
সম্ভবতঃ, তালিকার সবচাইতে আলোচিত সিনেমা—সমালোচকদের বহুল প্রশংসা পাওয়া।
ফুটবল ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে নারী দর্শকদের প্রবেশ নিষেষ ছিলো যে সময়টায়, ঠিক তেমন এক সময়ে— ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ইরানের এক ম্যাচে—ছেলের ছদ্মবেশে স্টেডিয়ামে আসে এক তরুণী। খেলা দেখতে চায় সে। কিন্তু অচিরেই কর্তৃপক্ষ তাকে এবং তার মতো আরও কিছু ছদ্মবেশী নারীকে আটক করে। যেখানে তাদের আটকে রাখা হয়, সেখান থেকে শোনা যেতে থেকে নিচের চলমান ফুটবল ম্যাচের সমস্ত শব্দ- কিন্তু জানালায় উঁকি মারা যায় না কিছুতেই। পাহারার দায়িত্বে থাকা এক তরুণ সৈনিকের সাথে বন্দীদের আলাপ জমে যায়, ঘটনা ঘটতে শুরু করে।
মায়েস্ত্রো জাফর পানাহি এই সিনেমায় কিছু অংশ সত্যিই শুট করেছিলেন ইরান জাতীয় ফুটবল দলের একটা ম্যাচে।
… লেখার শেষে এসে দেখি, গড়পড়তা স্পোর্টস মুভির যে ছক—সমস্ত প্রতিকূলতার বিপরীতে গিয়ে আন্ডারডগ কোনো দল বা চরিত্রের বিজয়, বর্ণিত সিনেমাদের প্রতিটাই ছিলো তার চাইতে আলাদা। সম্ভবতঃ সে কারণেই অবচেতন মন এদের রেখে দিয়েছে পছন্দের তালিকায়।
যে তুমুল আনন্দ আমি পেয়েছি সিনেমাগুলো দেখে, কোনো নতুন দর্শক যদি এই তালিকার সাহায্যে তার ভাগ পান— বিশ্বকাপের এই মৌসুমে সত্যিই বড় ভালো লাগবে!
[৩১ মে, ২০২৬]
নতুন লেখা মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুনঃ
প্রিয় পাঠক,
০৭ বছর ধরে একক শ্রমে গড়ে তোলা এই ওয়েবসাইটকে আমি চেষ্টা করেছি অগণিত বাংলাভাষী ওয়েবপোর্টালের মাঝে স্বতন্ত্র করে তুলতে। নানা স্বাদের এসব লেখা নির্মাণে আমাকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে যথেষ্ট সময় আর শ্রম। এছাড়াও, পাঠক, আপনি এসব লেখা পড়তে পারছেন কোনো ধরনের বিজ্ঞাপণের উৎপাত ছাড়াই।
কাজেই প্রিয় পাঠক, স্বেচ্ছাশ্রমের এই ওয়েবসাইট চালু রাখতে প্রয়োজন হচ্ছে আপনার উৎসাহের। আমরা চাইঃ এই সাইটের কোনো লেখা যদি আনন্দ দেয় আপনাকে, কিংবা আপনার উপকারে আসে- সেক্ষেত্রে আপনি সংগ্রহ করতে পারেন আমার প্রকাশিত বইগুলো, এই লিংক থেকে।
আপনার সামান্য উৎসাহ বাংলাভাষী অন্তর্জালকে করে তুলতে পারে আরও আকর্ষণীয় লেখায় সমৃদ্ধ!
Leave a Reply