
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশি সাহিত্যের একটা বাঁক বদল ঘটেছে। বিশ্বায়নের হাত ধরে মার্গারেট অ্যাটউডের ডিস্টোপিয়া কি ডেভিড লিঞ্চের হরর—সবই ঢুকে গেছে বাঙালির জনমানসে, ফিকশনের জগতেও গত দশক থেকে সেটার একটা প্রতিফলন পাওয়া যায়। নতুন যে লেখকেরা লিখতে শুরু করেন এই সময়টায়— জঁরা হোক কি লিটারারি ফিকশন, উভয় ধারাতেই —পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্য আর চোখে পড়ার মতো আত্মবিশ্বাস দেখা যায় তাদের মাঝে। উদ্দিষ্ট এসব লেখকের মাঝে এক দশক পরেও যারা টিকে গেছেন আর পাঠকের কাছে যাদের পরিচিতি ক্রমশ বাড়ছে—তানজীম রহমান তাদের মাঝে অন্যতম।
অনুবাদ আর অনেকটা প্রথাগত জঁরা ফিকশন দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও লেখক হিসেবে তানজীম ক্রমশ উচ্চাভিলাষী হয়েছেন। আর ইদানিং তিনি যেন পাঠককে টেনে নিতে চাচ্ছেন সেই সব গলিতে, যে পথগুলো আমরা দৈনন্দিন জীবনে এড়িয়ে যাই অস্তিত্ববাদী মন থেকে উৎসারিত কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হবার ভয়ে।
মানুষে মানুষে সংযোগের সমস্যা আর অস্তিত্বের অসহনীয়তাকে বুঝতে চাওয়া অমন কিছু জিজ্ঞাসা জমেই গড়ে উঠেছে উপন্যাস ‘মহাশূন্যতায়’ -এর ভরকেন্দ্র।
উপন্যাসের কাহিনিটার প্রেক্ষাপট খুব নতুন নয়। মহাকাশের অসীম শূন্যতায় ভেসে চলেছে ‘সময়সিন্ধু’ নামের এক মহাকাশযান। সেই মহাকাশযানে গবেষণায় মত্ত আছে এক বৈজ্ঞানিক দম্পতি। তাদের দাবি, ছায়াপথের সীমান্তে গিয়ে এমন এক পরীক্ষা তারা করবে—যা বদলে দিতে পারে বিজ্ঞানের ইতিহাস। গুরুত্বপূর্ণ এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার বিস্তারিত পত্রিকায় লিখবে বলে মহাকাশযানে উপস্থিত হয়েছে এক গল্পকার। তবে, ‘সারেং’ নামের এই গল্প-নির্মাতা আর ‘বৃত্ত’ নামে তার সহচর যন্ত্রমানবটি সময়সিন্ধু’তে পা রাখার পর থেকেই ঘটতে শুরু করে একের পর এক উদ্ভট ঘটনা। উপন্যাস ‘মহাশূন্যতায়’ এগিয়ে যায় সেই সব ঘটনার মাঝ দিয়েই।
অথচ, পাঠক অনুভব করে, বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি ঘরানার অতি চেনা পটে শুরু হয়েও ‘মহাশূন্যতায়’ নিজেকে আলাদা করতে থাকে ধীরে ধীরে। ঘটনা নয়, বরং নানা ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা, দার্শনিক প্রশ্নই যেন ক্রমশ দখল করতে থাকে উপন্যাসের জমিন।
সারেং যেমন অনুভূতি আর যুক্তির দ্বন্দ্ব নিয়ে বাচালপনা করে বৃত্তের কাছে, সে বলতে চায় সংবেদনশীল মানুষ জীবনে ক্লান্ত হতে বাধ্য। কখনো আবার সারেং এমনও বলে, যে মানুষ আদতে কাউকে ভালোবাসে নিজেকে ভুলে থাকার জন্যেই। বর্ণনার এসব অংশে ‘মহাশূন্যতায়’ হয়ে ওঠে সুলিখিত ওইসব অস্তিত্ববাদী উপন্যাসগুলোর মতো, যেখানে মানুষ মাথার ভেতরে সর্বক্ষণ এক ধরনের অসহায়তায় ভোগে। আবার পরবর্তীতে নিজের স্বামীকে নিয়ে বিজ্ঞানী নার্গি যখন মুখ খোলে, তখনও পাঠকের মনে হয় যে ব্যক্তিগত যোগাযোগহীনতার একটা অসীম শুন্যতাও ঘিরে রেখেছে উদ্দিষ্ট মহাকাশযানকে।
লক্ষণীয়, ধ্রুপদী সাহিত্যের অতি-পরিচিত এসব প্রসঙ্গকে খতিয়ে দেখতে গিয়ে তানজীম ‘মহাশূন্যতায়’ উপন্যাসে বেশ সচেতন ভাবেই ব্যবহার করেন জঁরা ফিকশনের কিছু উপাদান। বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি আর রোমাঞ্চোপন্যাসের সীমানায় ঘোরাঘুরি করে তিনি প্রায়শই ঢুকে যান হরর ঘরানাতেও। বিশেষ করে বলতে হয় সারেং যখন অবচেতন মনের বিমূর্ত ভয়ের মুখোমুখি হচ্ছে, সেই দৃশ্যগুলোর কথা। সেখানে The Temptation of St. Anthony বা Landscape with a Girl Skipping Rope এর মতো বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলো থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ব্যাখ্যাতীত কিছু দানব তৈরি করেন তানজীম। সালভাদর দালির প্রতি লেখকের এই নৈবেদ্য একদিকে যেমন পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে উপন্যাসটাকে, অন্যদিকে তেমন বাংলাভাষী মহাকাশচারী চরিত্রগুলোকেও বেশ বৈশ্বিক মনে হতে থাকে।
তবে এটাও ঠিক, স্থানিকতা আর বৈশ্বিকতার একটা টানাপোড়েন যেন গোটা উপন্যাস জুড়েই পাঠককে অস্বস্তিতে রাখে। উপন্যাসের চরিত্ররা কি এখানে বাঙালি? বাংলাদেশি? বোঝা যায় না। হ্যাঁ, তাদের হাতের যন্ত্রের নাম ‘কাচকুপী’, ডার্ক ম্যাটারকে তারা ‘কৃষ্ণ কণা’ বলে সম্বোধন করে, মহাকাশযান সময়সিন্ধুতে বসে তারা তেলেভাজা খায়; তবু তাদের চলনে-বলনে স্থানিকতার ছাপ যেন স্পষ্ট হয়ে আসে না। ক্রিকেটার সাকিব কিংবা মানিক বন্দোপাধ্যায় ক্যামিও দিয়ে গেলেও চরিত্রগুলোর চেতনা-প্রবাহে উপস্থিত থাকে হাইড্রার মতো প্রাণী; কোয়ার্ক, লেপটন আর ক্রিকেটের মতো শব্দগুলোকে তারা ঠিকই উচ্চারণ করে ‘মরা’ ভাষায়। খুশি হতাম, যদি বাংলাভাষী মহাকাশচারীর মানস প্রতিষ্ঠায় তানজীম আরেকটু উচ্চাভিলাষী হয়ে তৈরি করতেন আরও নতুন কিছু বাংলা শব্দ।
ছোট এই আক্ষেপটা অবশ্য মনে থাকে না উপন্যাসের শেষাংশে এসে। ‘মহাশূন্যতায়’ সেখানে আরও একবার বাঁক বদলায়, এবং অস্তিত্ববাদী উপন্যাসের আওতা থেকে বেরিয়ে চলে যায় পৌরাণিক কাহিনির ঘরানায়। বৃত্তের জবানবন্দীর মাধ্যমে গল্পটা শেষ হয় মহাজাগতিক এক চক্রের ইঙ্গিত দিয়ে। পাঠকের তখন আরও একবার মনে হয়, মহাশুন্যে চিৎকার করা কুকুরের চাইতে মানুষের জীবন আলাদা কিছু নয়। জীবন মাত্রই অনন্ত শুন্যতা। প্রেম কিংবা ঈশ্বরের মতো ধারণাও তাকে নির্বাণ দিতে অক্ষম।
গল্পের এই ধারণা নতুন নয় ঠিকই, কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাস তো চিরকালই চেনা প্রশ্নদের নতুন ভাবে উপস্থাপনের ইতিহাস। সেই বিবেচনায়, বাংলাদেশের উপন্যাস সাম্প্রতিক কালে যে পথে হাঁটছে– সেই রাস্তায় কিছুক্ষণ ঘুরে আসা যায় ‘মহাশূন্যতায়’ পাঠের মাধ্যমে।
বাংলা উপন্যাসের আরও শাণিত, আরও বৈশ্বিক হয়ে ওঠার যাত্রায় সামনের দিনে এমন আরও উপন্যাস আমাদের জন্য অপরিহার্য।
[ কিছুদিন আগে, আফসার ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত তানজীম রহমানের উপন্যাস ‘মহাশুন্যতায়’ ইংরেজিতে অনুবাদ করে কলকাতা-কেন্দ্রিক প্রকাশনী অ্যান্টোনিম। অনুদিত উপন্যাসের নাম রাখা হয় Null।
ওপরের আলোচনাটি উদ্দিষ্ট ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকার জন্য লিখিত, রচনাকালঃ আগস্ট ২০২৫।]
নতুন লেখা মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুনঃ
প্রিয় পাঠক,
০৭ বছর ধরে একক শ্রমে গড়ে তোলা এই ওয়েবসাইটকে আমি চেষ্টা করেছি অগণিত বাংলাভাষী ওয়েবপোর্টালের মাঝে স্বতন্ত্র করে তুলতে। নানা স্বাদের এসব লেখা নির্মাণে আমাকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে যথেষ্ট সময় আর শ্রম। এছাড়াও, পাঠক, আপনি এসব লেখা পড়তে পারছেন কোনো ধরনের বিজ্ঞাপণের উৎপাত ছাড়াই।
কাজেই প্রিয় পাঠক, স্বেচ্ছাশ্রমের এই ওয়েবসাইট চালু রাখতে প্রয়োজন হচ্ছে আপনার উৎসাহের। আমরা চাইঃ এই সাইটের কোনো লেখা যদি আনন্দ দেয় আপনাকে, কিংবা আপনার উপকারে আসে- সেক্ষেত্রে আপনি সংগ্রহ করতে পারেন আমার প্রকাশিত বইগুলো, এই লিংক থেকে।
আপনার সামান্য উৎসাহ বাংলাভাষী অন্তর্জালকে করে তুলতে পারে আরও আকর্ষণীয় লেখায় সমৃদ্ধ!
Leave a Reply