(১)
বাংলাদেশের সিনেমাকে মোটাদাগে বোধহয় ভাগ করা যায় দুই শ্রেণীতে। পুরোদস্তুর ফর্মূলা নির্মিত বাণিজ্যিক সিনেমা এবং উঁচু শিল্পমান লক্ষ্য করে নির্মিত সিনেমা। জানি না বড় পরিসরে সত্য কি না, তবে গত কয়েক বছরের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে মনে হয়—এই দুইয়ের মাঝেও খুব ধীরে একটা শ্রেণী বাংলা সিনেমায় তৈরি হচ্ছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাঝ দিয়ে প্রযুক্তি-শিক্ষিত দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন যে পরিচালকেরা, তারা অনেকেই বড়পর্দার জন্য সিনেমা নির্মাণ করে মধ্যবিত্ত দর্শকের মাঝে ছোট-মাঝারি-বড় নানা আকারের আলোড়ন তুলছেন। এবং আলোড়নগুলো ঠিক বিক্ষিপ্ত বলে মনে হচ্ছে না।

অন্যভাবে বলতে গেলে, প্রায় নিয়মিত বিরতিতে নতুন যে সব সিনেমা চলে আসছে অনলাইনের আলোচনায়—তাদের একটা বড় অংশকেই আজকাল নাম শুনেই কোনো নির্দিষ্ট বর্গে ছুঁড়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সম্প্রতি ফেসবুকের হোমপেজে দর্শকদের অভিনন্দন-স্নাত মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম পরিচালিত সিনেমা ‘দেলুপি’ ঠিক এই প্রেক্ষিতেই আলাপের দাবিদার। ফর্মূলা সিনেমা কিংবা আর্টসি ফিল্ম, দুটোর বুড়িই হালকা করে ছুঁয়ে গিয়ে পরিচালক এখানে বড়দৈর্ঘ্যের নাটক নয়, দর্শকদের পুরোদস্তুর সিনেমা দেখার অনুভূতিই দিলেন।

(২)
গণঅভ্যুত্থানে পলায়ন করেছে রাষ্ট্রের শাসক, তার ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়েছে প্রত্যন্ত গ্রাম দেলুপিতেও। এখন গ্রামের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ক্ষমতাচ্যুত দল ফিরে এসে নতুন করে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাইছে। তার মাঝেই বাঁধ ভেঙে গিয়ে পানির তোড় দখল করে নিয়েছে গ্রামের অনেকটুকু, সেই পানি নেমে গেলেও বাঁধের দুরবস্থায় এলাকার লোকে হয়ে থাকে সন্ত্রস্ত। প্রাকৃতিক আর রাজনৈতিক এসব অস্থিরতার মাঝেও জীবন দেলুপিতে থেমে নেই। সেখানে পূজো হচ্ছে, মিষ্টি একটা প্রেম চলছে প্রায় কিশোর পার্থ ও প্রায় কিশোরী নূপুরের মাঝে। কিন্তু শিল্পচর্চা? যাত্রা করতে চায় যে দলটা, তারা কি এই দেলুপিতে চালিতে যেতে পারবে নিজেদের অভিনয়?

প্রায় একশো মিনিটের সিনেমা ‘দেলুপি’ এগিয়ে গেছে এই কাহিনি নিয়েই।

(৩)
বিশেষ করে বলতে হয় সিনেমা নির্মাণের পেছনের গল্পটাও।

নির্মাতা তাওকীর জানাচ্ছেন, ‘দেলুপি’ নামটি এসেছে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়ন থেকে। গত বছরের আগস্ট মাসের ঠিক পরপরই বাঁধ ভেঙে দেলুটি ইউনিয়নে বন্যার পানি ঢুকে পড়লে সেখানে চলে যায় তাওকীরের প্রোডাকশন হাউজ ফুটপ্রিন্ট। বন্যাপীড়িত মানুষের জীবনের নানা ধরনের সংকট ধরে রাখার আগ্রহটাই প্রধান ছিলো সেই উদ্যোগের। সেখানেই স্থানীয় মানুষদের পাশে থেকে, তাদের সাথে ত্রাণের খিচুড়ি ভাগ করে খেয়ে তাওকীররা শুনতে থাকেন তাদের নিজস্ব গল্প, তার মাঝ থেকেই উঠে আসে সিনেমার কাহিনি।

সিনেমার ওপেনিং ক্রেডিটে যে নির্মাণ-এর জায়গায় বলা হয়েছে ‘মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম ও দল’, ব্যাপারটা তাই নিঃসন্দেহে কাকতালীয় নয়। অজস্র স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণেই তৈরি হয়েছে উদ্দিষ্ট সিনেমার আত্মা।

আর, আগ্রহী দর্শক জানেন এটাও, ইতোপূর্বে ‘শাটিকাপ’ এবং ‘সিনপাট’-এর মতো দুটো ওয়েবসিরিজ নির্মাণেও দেখা গিয়েছিলো কাহিনির ভৌগোলিক পটকে বাস্তব করে তুলে আনা এমন চিত্রায়ণ। তাওকীরের কাজের সেটাই ধারা।

(৪)
নির্মাণের এসব ট্রিভিয়া আর অ্যানেকডোটকে পাশ কাটিয়ে তাকাই যদি, তাহলে সিনেমা হিসেবে কেমন বলা যায় ‘দেলুপি’কে? এক শব্দে বলতে গেলেঃ উপভোগ্য।

মূল কারণঃ একই সাথে প্রেম, রাজনীতি এবং যাত্রাশিল্পের গল্প বলার মতো বহুমাত্রিক প্রচেষ্টাতেও সিনেমার গল্পটা ছিলো আগাগোড়া সরল। সাথে, বাণিজ্যিকভাবে সফল হবার সমস্ত গুণও সিনেমায় উপস্থিত। পার্থ আর নূপুরের ছিমছাম মফস্বলী প্রেমের গল্পটা ঠিকই দোলা দিলো দর্শককে, আড্ডার সদস্য পলাশের বিভিন্ন সংলাপ দিলো যথেষ্ট কমিক রিলিফ।

বিশেষ করে রাজনৈতিক ধারাভাষ্যের ক্ষেত্রে তাওকীরের সচেতনতার তারিফ করতে হয়। ভূতপূর্ব ক্ষমতাশালীর শেষ আশ্রয় হচ্ছে কাদায়, আবার সেই কাদা থেকেই উঠে আসছে আরও একজন শোষক— চক্রপূরণের এই দৃশ্য দুটো ছিলো চমৎকার। আবার ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা তরুণদেরও যে কিছু বলা যাচ্ছে না ইদানিং, আলতো করে সেই খোঁচাও তুলে আনা হলো সংলাপে। পক্ষপাতহীন এই গল্পের শেষটাও হলো ইতিবাচক, বাঁধের ওপর মানব-বন্ধনের সময় যাত্রা মঞ্চস্থ করার দৃশ্যটা হলের দর্শকদের অনেকের মনেই দাগ কাটলো। হ্যাঁ, বাস্তবের রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে ইচ্ছাপূরণের দোষে দুষ্টও বোধ করি বলা যায় এমন পরিণতিকে– তবে বড়পর্দার সিনেমার কাছে মানুষের প্রত্যাশা তো এমনটাই!

পার্থ আর বাঁধের গল্পের মাঝে সংযোগ হয়ে থাকা ‘মিহির’-এর গল্পটাও বোধহয় আরেকটু উন্মোচন করা যেতো। তবে, স্বীকার করি, টুকটাক ওসব অভিযোগ মুছে গেলো ‘জাকির চেয়ারম্যান’ আর ‘মিহির’ এর স্বছন্দ অভিনয়ে।

(৫)
লোকজ ন্যারেটিভের ঘ্রাণ একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে তাওকীরের নির্মাণে। সিনেমা হোক, কি ওয়েব-ধারাবাহিক—তাওকীরের কাজ নিয়ে বলতে গিয়ে আলোচকেরা তাই রীতিমতো নিয়ম করে প্রশংসা করেন তার ন্যারেটিভের, হাততালি পায় গল্পের সত্যিকারের ভৌগোলিক পটভূমি থেকে তুলে আনা একেবারে নতুন অভিনেতাদের অভিনয়।

কিন্তু, শুধুমাত্র প্রান্তিক জীবনের গল্প মার্কা অতি-ব্যবহারে নষ্ট হয়ে যাওয়া উপমাও যেন ঠিক পরিষ্কার করতে পারে না তাওকীরের দেখানো জীবন। ছিমছাম ড্রয়িংরুমের টিভিপর্দায় দেখা প্রান্তিক জীবনের বাস্তবতার চাইতে সেই জীবনের বাস্তবতা বহুগুণ ক্লেদাক্ত, আরও অনেক বেশি অসভ্য-অমার্জিত-বারুদ ধরা ভাষা। দেখতে দেখতে টের পাই, বাংলাদেশে এ এক নতুন ঘরানা; ম্যাজিক বা নিও রিয়ালকে পাশ কাটিয়ে তাওকীরের হাতে তৈরি হচ্ছে একরকমের আল্ট্রা-রিয়েলিজম।

তাওকীর নিজের কাজ নিয়ে অতিরিক্ত উচ্চকিত নন। দেশে বিদ্যমান নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মাঝেই তিনি ক্রমশ প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছেন সিনেমা/ওয়েব-সিরিজ নির্মাণের একটা নতুন মডেলঃ যেখানে স্টারদের ব্যস্ত শিডিউলকে পাশ কাটিয়ে দিনের পর দিন নির্দিষ্ট এলাকায় সময় নিয়ে শ্যুটিং করা হচ্ছে, আরোপিত সমস্যার বদলে অভিনেতাদের সংলাপে উঠে আসছে সত্যিকারের কোনো স্থানীয় সংকট। বাংলাদেশের মতো জায়গায় এই মডেল অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ফলপ্রসু—নিঃসন্দেহে।

কিন্তু এই পদ্ধতি অনুকরণ কি আরও নির্মাতাদের পক্ষে সম্ভব? নিশ্চিত হতে পারি না। ক্যামেরা নিয়ে অকুস্থলে চলে গিয়ে স্থানীয় মানুষের মাঝ থেকেই খুঁজে নেওয়া হচ্ছে গল্প, এমন অপ্রস্তুত অবস্থায়—বাংলাদেশ কেন, দুনিয়ার অধিকাংশ দেশেই—কাজ করতে বোধহয় পরিচালকদের অনীহা থাকবে। টাকা-পয়সার চেয়েও, সম্ভবত অর্নিদিষ্ট কালের জন্য সময় বিনিয়োগ করতেই আটকাবে তাদের।

তাওকীর ইসলামের কাজের ধারাটি তাই একেবারেই নিজস্ব। আশা রাখি, সেই স্বকীয়তা ধরে রেখেই তার সৃষ্টিশীলতা দীর্ঘায়িত হবে। আশা রাখি, আরও বেশি করে স্থানীয় মানুষের গল্পকে তিনি তুলে আনবেন তার ক্যামেরায়।

[ডিসেম্বর, ২০২৫]

প্রিয় পাঠক,

০৭ বছর ধরে একক শ্রমে গড়ে তোলা এই ওয়েবসাইটকে আমি চেষ্টা করেছি অগণিত বাংলাভাষী ওয়েবপোর্টালের মাঝে স্বতন্ত্র করে তুলতে। নানা স্বাদের এসব লেখা নির্মাণে আমাকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে যথেষ্ট সময় আর শ্রম। এছাড়াও, পাঠক, আপনি এসব লেখা পড়তে পারছেন কোনো ধরনের বিজ্ঞাপণের উৎপাত ছাড়াই।

কাজেই প্রিয় পাঠক, স্বেচ্ছাশ্রমের এই ওয়েবসাইট চালু রাখতে প্রয়োজন হচ্ছে আপনার উৎসাহের। আমরা চাইঃ এই সাইটের কোনো লেখা যদি আনন্দ দেয় আপনাকে, কিংবা আপনার উপকারে আসে- সেক্ষেত্রে আপনি সংগ্রহ করতে পারেন আমার প্রকাশিত বইগুলো, এই লিংক থেকে

আপনার সামান্য উৎসাহ বাংলাভাষী অন্তর্জালকে করে তুলতে পারে আরও আকর্ষণীয় লেখায় সমৃদ্ধ!