
(১)
সোশ্যাল মিডিয়ার মব ট্রায়ালের বাস্তবতা উপেক্ষা করার দিন এখন গত, আক্ষরিক অর্থেই দুনিয়া আজ চলে গেছে অন্ততঃ টুয়েলভ মিলিয়ন অ্যাংগ্রি ম্যানের হাতে। অথচ অনলাইন নির্ভর এসব বিচারের সংস্কৃতি নিয়ে ভালো কাহিনির মুখোমুখি হয়েছি খুব কম। ভাবতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে কেট ব্লানশেট অভিনীত টড ফিলিপসের সিনেমা ‘টার’-এর কথা। এছাড়াও খেয়াল হয় পছন্দের টিভি সিরিজ ‘নিউজরুম’-এর কয়েকটা পর্ব, যেখানে ধুয়ে দেওয়া হয়েছে নেটিজেনদের বিচারক হয়ে ওঠার ব্যাপারটাকে। তবে বইয়ের পাতায় বিষয়টাকে তীব্র ভাবে আবিষ্কার করা—আমার অভিজ্ঞতায় অন্ততঃ হয়ে ওঠেনি অ্যাতোদিন।
পাঠক হিসেবে সেই অপ্রাপ্তি কেটে গেলো নিক দ্রাসোর চিত্রোপন্যাস ‘সাবরিনা’ পড়ে।
ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীতের তালিকায় এখনতক জায়গা পাওয়া একমাত্র গ্রাফিক-নভেল এই ‘সাবরিনা’ (২০১৮ সালের লং-লিস্টে)। অনুজ প্রিতমের কাছ থেকে পাওয়া এই তথ্যটার চেয়েও বেশি আলোড়িত হলাম বইটার বিষয়বস্তু জেনে— সোশ্যাল মিডিয়া কালচার। আরেক সুহৃদ তাহসিন রেজার মাধ্যমে বইটার একটা সফটকপিও তাই যোগাড় করে ফেললাম দ্রুত।
আর পড়তে বসে রীতিমতো থাপ্পড় খেলাম। ছোট ছোট, প্রায় শুন্য সব প্যানেলের মাঝ দিয়ে যে কাহিনিটা পড়লাম, ভালো একটা বহুস্তরী লিটারারি উপন্যাসের মতোই সেটা আলোড়িত করে গেলো পাঠককে।
(২)
কাহিনির শুরুতে, অল্প কিছু সময়ের জন্যই উদ্দিষ্ট উপন্যাসের পাঠক পায় সাবরিনা নামের মেয়েটিকে। তারপরই কাহিনি চলে যায় তুমুল বিষণ্ণতা-আক্রান্ত যুবক টেডির কাছে। আবিষ্কার করা যায়ঃ সাবরিনা নিখোঁজ হয়েছে। আর একদিকে সেই বেদনা, অন্যদিকে মিডিয়া সার্কাসের মাঝে পড়ে নিজের শহর থেকে টেডি পালিয়ে চলে এসেছে ছেলেবেলার বন্ধু কেলভিনের কর্মস্থলে, আশ্রয় নিতে। এয়ারপোর্টে দুই বন্ধুর মোলাকাতের দৃশ্যে টেডির আচরণ দেখেই পাঠক বুঝতে পারে, ভীষণ ভাবে ভেঙেচুরে গেছে ছেলেটার ভেতরটা।
কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র টেডির বন্ধু কেলভিন। পেশাগত জীবনে সে সামরিক বাহিনির এয়ারফোর্সে কর্মরত, পারিবারিক জীবনে আপাতত একা— স্ত্রী তার সেপারশনে চলে গেছে ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে। পরিচিত কারো সাথেই ঠিক সংযোগ করতে না পারা এই কেলভিনই এবার দায়ে পড়ে চেষ্টা করে নার্ভাস ব্রেকডাউনে ভুগতে থাকা টেডিকে স্বাভাবিক করে তুলতে। সেই চেষ্টায় অবশ্য খুব একটা লাভ হয় না। ফলে রাত জেগে সে অনলাইনে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলে যায় তার সহকর্মীদের সাথে (সামরিক জীবনের প্রতি লেখকের খোঁচা, নিঃসন্দেহে!)।
কাহিনির আরেক উল্লেখ্য চরিত্র সাবরিনার বোন সান্দ্রা। টেডি যেমন শহর আর মিডিয়া সার্কাস থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে, সান্দ্রা তেমনটা পারেনি। বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক একটা জীবন বজায় রাখতে চাইলেও ভেতরে সেও পাচ্ছে তুমুল কষ্ট। মানুষের সঙ্গ তার সহ্য হচ্ছে না, ব্যর্থ হচ্ছে কাজে মন বসাতেও।
কেলভিন, টেডি আর সান্দ্রা— উপন্যাসের এই তিন প্রধান চরিত্রের জীবনই আচমকা পালটে যায়, যখন দেশের সমস্ত সংবাদমাধ্যমে অজ্ঞাত কেউ ডাকযোগে পাঠিয়ে দেয় একটি ভিডিও ক্যাসেট। সেই ভিডিও ক্যাসেটে আছে নৃশংস উপায়ে সাবরিনাকে খুন করার দৃশ্য।
আর অদ্ভূত এই খবরটা ছড়িয়ে যেতেই শুরু হয় উপন্যাসের মূল পর্ব, যখন সোশ্যাল মিডিয়া জগৎ একযোগে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এই ‘ভাইরাল’ ঘটনাটি নিয়ে।
(৩)
প্রাচীন গ্রিক নাটকগুলোর মতোই, ঘটনা দেখান না নিক দ্রাসো — তিনি বরং দেখান ঘটনার পর মানুষগুলোর প্রক্রিয়া।
ব্যক্তিগত ট্রমা বলতে গেলে ন্যাংটা করেই রেখেছিলো সাবরিনার প্রেমিক টেডিকে, কিন্তু নেটিজেনেরা তাকে টেনে নামায় অনলাইনের আরও নির্দয় পাঁকে। নাইন-ইলেভেন আর স্যান্ডি হুক স্কুল শুটিং ঘরানার জাতীয় ট্রাজেডির মতোই, সাবরিনা হত্যার পেছনেও বিশাল সব ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করে সোশ্যাল মিডিয়ার ওই শার্লকের বাচ্চারা। তাদের ভাষ্যঃ সেই ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে আছে সেনাবাহিনিও, নইলে দুনিয়ায় অ্যাতো জায়গা থাকতে বেছে বেছে ডিফেন্সে কর্মরত কেলভিনের কাছেই কেন আশ্রয় নিতে যাবে সাবরিনার বয়ফ্রেন্ড?
… মানুষের মুখোমুখি হতে না চেয়ে বদ্ধ ঘরে একাকী এইসব বালছাল পডকাস্ট শুনে যায় টেডি, আর নিপুণ ছবিতে পাঠকের কাছে ধরা পড়তে থাকে ছেলেটার পরিবর্তন। একটা সময় শঙ্কা জাগে, ষড়যন্ত্রে সেনাবাহিনির জড়িত থাকার তত্ত্বে বিশ্বাস স্থাপন করে টেডি নিজের বন্ধুকেই কিছু একটা করে বসবে না তো?
অন্যদিকে, কেলভিনের জীবনও হয়ে ওঠে দুঃসহ। কর্মস্থলে শিফটের শুরুতে মানসিক অবস্থা নির্দেশ করে যে ফর্মটা পূরণ করতে হয়, সেখান থেকে পাঠক টের পায়, পাশের ঘরের টেডির দুঃস্বপ্নগুলো অস্থির করে তুলেছে কেলভিনকেও। বিশেষ করে যখন টেডির আশ্রয়দাতা হিসেবে সেও ভাইরাল হয়ে পড়ে, অনলাইনে যখন হাজার-হাজার মেইল ছুটে আসে তার দিকে, তখন পাঠকের বেশ মায়াই লাগে। তার মাঝেই—যতটা পারে— কেলভিন চেষ্টা করে যায় টেডির দেখভাল করতে। কিন্তু তার সহমর্মিতার মাঝেও ছড়িয়ে থাকে একরকম নিস্পৃহতা। টেডির খোঁজ রাখতে গিয়ে কেলভিন যখন খেয়ালই করে না যে তার বিড়ালটা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, তখন পাঠকের খেয়াল হয়—নিস্পৃহতার অভিযোগেই কেলভিনকে ছেড়ে গেছিলো তার স্ত্রী।
পাশের মানুষের প্রতি আস্থা না রাখার এই সভ্যতায় তাই, পাঠকের হৃদয় ভয়ে দুরুদুরু করে ওঠে যখন অচেনা একটা মানুষ গাড়িতে তুলে নেয় টেডিকে। পাঠকের মনে হতে থাকে, অনলাইনের বিষ এখন এই আগন্তুকের মাধ্যমে অফলাইনেও রক্তাক্ত করবে টেডিকে। কিন্তু তেমনটা হয় না। কেউ কেউ আজও রাস্তা খুঁজে নেবার সময় নিঃশব্দে সঙ্গে থাকে টেডিদের।
(৪)
চিত্রোপন্যাস যেহেতু, নিক দ্রাসোর আঁকা ছবি নিয়েও কয়েকটা কথা বোধহয় বলা দরকার।
নির্দিষ্ট কোনো উপায়ে সাজানো হয়নি ছবির প্যানেলগুলো। প্রায়ই এমন হয়েছে, বিশাল একটা প্যানেল এসে জায়গা দখল করেছে দুই বা তিনটা সারির মাঝে কিংবা শেষে। এইসব জায়গায় এসে পাঠক সবসময় দ্বিধায় পড়ে যে এইবার কী কায়দায় পড়তে হবে গল্পটা। পাঠককে এই দ্বিধা দিতে চাওয়ার ব্যাপারে দ্রাসো নিশ্চিতভাবে সচেতন।
গোটা উপন্যাসের তিন-চতুর্থাংশ প্যানেলেই চরিত্রদের দেখা যায় নিশ্চুপ, হয় তারা নির্জীব সব বস্তুর মাঝে হেঁটে যাচ্ছে, কিংবা অন্য মানুষের সান্নিধ্যেও হারিয়ে আছে কোথায়। আপাত দৃষ্টিতে ব্যস্ত মানুষগুলোকে তাই সতত ঘিরে রেখেছে একটা বিশাল শুন্যতা। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায় এই পাতাটাঃ

এমনকি, যখন কাহিনির চরিত্ররা আলাপ করে নিজেদের মাঝে— তখনও সেই শুন্যতার বোধ একেবারে উবে যায় না পাঠকের মন থেকে। উপন্যাসের শেষে, যখন কেলভিন যাত্রা শুরু করে নতুন একটা শহরের উদ্দেশ্যে, তখনও দ্রাসোর দক্ষ আঁকুনিতে পাঠকের মনে নতুন কোনো ভাব জাগে না। বরং জীবনের বিচ্ছিরি সেই পর্বটা যেন আগের মতোই বহমান থাকে।
গোটা উপন্যাসের সবচেয়ে রঙিন এবং ভরাট হচ্ছে সেই প্যানেলগুলো, যেখানে কেলভিনের মেয়ের ফেলে যাওয়া বইগুলো দেখানো হয়। ট্রমা-ভারাক্রান্ত টেডি যখন সেইসব রঙিন ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে অপলকে, পাঠক তখন বোঝেঃ টেডির জীবন এখন ওই ছবির মতো নয়, বর্ণমালা শেখানোর মতো করে কেউ আজ তাকে জীবনের অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছে না।
(৫)
কেলভিনের বাহ্যিক নিস্পৃহতা, ভেতরে ভেতরে টেডিকে ভেঙে ফেলা বেদনা, আর শান্তির খোঁজে হন্য হয়ে ছোটা সান্দ্রাকে দেখতে দেখতেই পাঠক পড়ে যায় ‘সাবরিনা’। আর টের পায়, প্রায় কৌশলহীন উপায়ে নিক দ্রাসো কী করে বলে দিচ্ছেন যুগের সরলতম সত্যটাঃ মানুষের জীবনের গতিপথ আজ চলে গেছে অন্য কারও আঙুলে, অনলাইন খবরের আওতায় একবার ঢুকে পড়লেই মানুষের গল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য কেউ।
বেদনায় নীল মানুষকেও তাই পডকাস্টের অচেনা স্বরে শুনতে হয় নিজের সম্পর্কে অকাট মিথ্যা, অবিরাম পড়তে হয় ছ্যাঁচড়া সাংবাদিকের ক্যামেরা আর মাইক্রোফোনের বেয়োনেটের সামনে, রাতের ঘুম ভাঙানো মেইলে পেতে হয় একগাদা হুমকি। সিঁটিয়ে না গিয়ে মানুষের তখন উপায় কোথায়? শোকের চাইতেও, শোক পরবর্তী এই সাইবার ট্রমাই হয়ে ওঠে তার জীবনের পরম সত্য।
টুকরো সব ফুটেজ, সূত্রহীন স্ক্রিনশট—এমন সব সত্য-মিথ্যা মেশানো দলিল হাজির করা অনলাইন গোয়েন্দাগিরির এই জমানায় ব্যক্তি মানুষের তাই মুক্তি মেলে না। চাকরি ছেড়ে নতুন শহরে পাড়ি জমাতে গিয়ে কেলভিন যখন আশ্রয় নেয় মোটেলে, গভীর রাতে ঘরের দরজায় আঘাত করা ওই মাতালের মতোই তাই বহিরাগতরা অবিরাম হানা দিয়ে চলে আমাদের ব্যক্তিগত পরিসরে।
কখন সেই দরজা ভেঙে পড়বে, সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নীরব হয়ে থাকে চলতি শতাব্দী।
[নভেম্বর, ২০২৫]
প্রিয় পাঠক,
০৭ বছর ধরে একক শ্রমে গড়ে তোলা এই ওয়েবসাইটকে আমি চেষ্টা করেছি অগণিত বাংলাভাষী ওয়েবপোর্টালের মাঝে স্বতন্ত্র করে তুলতে। নানা স্বাদের এসব লেখা নির্মাণে আমাকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে যথেষ্ট সময় আর শ্রম। এছাড়াও, পাঠক, আপনি এসব লেখা পড়তে পারছেন কোনো ধরনের বিজ্ঞাপণের উৎপাত ছাড়াই।
কাজেই প্রিয় পাঠক, স্বেচ্ছাশ্রমের এই ওয়েবসাইট চালু রাখতে প্রয়োজন হচ্ছে আপনার উৎসাহের। আমরা চাইঃ এই সাইটের কোনো লেখা যদি আনন্দ দেয় আপনাকে, কিংবা আপনার উপকারে আসে- সেক্ষেত্রে আপনি সংগ্রহ করতে পারেন আমার প্রকাশিত বইগুলো, এই লিংক থেকে।
আপনার সামান্য উৎসাহ বাংলাভাষী অন্তর্জালকে করে তুলতে পারে আরও আকর্ষণীয় লেখায় সমৃদ্ধ!
Leave a Reply