
(১)
শেহান করুণাতিলকার সাথে পরিচয় আক্ষরিক অর্থেই ‘চান রাইতে’। রমজানের ঈদের ঠিক আগের সন্ধ্যাটায় কিছু করবার খুঁজে না পেয়ে কিন্ডলে পড়া শুরু করলাম শেহানের প্রথম উপন্যাস ‘চায়নাম্যানঃ দা লিজেন্ড অফ প্রদীপ ম্যাথু’। আর কয়েক পাতা পড়তেই আবিষ্কার করলাম, পাঠক হিসেবে আরও একবার ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দ দিচ্ছে উপন্যাসটা। ক্রিকেট ভক্ত হিসেবে বইটার স্বাদ তাড়িয়ে তাড়িয়ে গ্রহণ করতে তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, এই উপন্যাস পড়তে হবে পুরোদস্তুর কাগুজে বই কিনেই।
মাস দুয়েকের মাঝে যোগাড় করা হলো ‘চায়নাম্যান’-এর পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া সংস্করণ। উপন্যাসটা ঢাউস আকারের, প্রায় ৫০০ পাতার। অথচ, পড়তে গিয়ে এমন আনন্দ হলো, শ্রীলঙ্কান লেখক শেহান করুণাতিলকার পরবর্তী—এবং বুকার পুরস্কার জেতার সুবাদে আরও বিখ্যাত কাজ—উপন্যাস ‘দা সেভেন মুনস অফ মালি আলমেইদা’ও সংগ্রহ করতে দেরি করলাম না। বিলম্ব হলো না, সেটা পড়ে শেষ করতেও।
টানা দুই উপন্যাস পড়ার সুবাদেই বোধ হয়, শেহানকে নিয়ে বেশ আগ্রহ তৈরি হলো পাঠক মনে। অন্তর্জালে খানিক ঘোরাঘুরি করে পড়া হলো লোকটার কিছু সাক্ষাৎকারও। জানলাম, অল্প বয়েসে রকস্টার হতে চেয়েছিলেন শেহান করুণাতিলকা। আর গানের ভূত তার মাথা থেকে এখনও পুরোপুরি নামেনি। ঘন্টা দুয়েক লেখা হলেই লোকটা এখনো টেবিল ছেড়ে উঠে যায়, শুরু করে পড়ার ঘরে ফেলে রাখা গিটার নিয়ে ট্যাং-ট্যাং করে জ্যামিং। রকস্টারদের মতো শখ করে হাতের আঙুলে কালো নেইল-পলিশও মাখতে ভালোবাসেন শেহান। এমনকি, বুকার পুরস্কার তুলে ধরার মুহুর্তেও সেই কালো নেইল-পলিশ জ্বলজ্বল করে দর্শকের চোখে।
সব মিলিয়ে, শেহান করুণাতিলকা ও তার উপন্যাসদ্বয় নিয়ে মনে তৈরি হয় নানা আকারের বুদবুদ। শ্রীলঙ্কান উপন্যাসের নতুন রকস্টারকে নিয়ে সেই বুদবুদগুলো স্বল্প পরিসরে ধরে রাখতেই এই আলাপ।
(২)
প্রথমেই ‘চায়নাম্যান’ প্রসঙ্গ। ইতোমধ্যেই শেহানের এই ‘অভিষেক উপন্যাস’ অর্জন করে নিয়েছে এক গাদা ‘কাল্ট ফলোয়ার’। বিশেষ করে ক্রীড়া-সাহিত্যের পাঠকরা তো এই একটি উপন্যাস পাঠান্তেই ভক্ত বনে গেছে লেখকের। তা কী আছে এই উপন্যাসে?
আছে, অবসরে যাওয়া মদ্যপ ক্রীড়া সাংবাদিক গামিনি করুনাসেনার একটা মোহের গল্প। মদ খেতে খেতে লিভার শেষ করে দেওয়া গামিনি জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে স্থির করে, তার দেখা সেরা শ্রীলঙ্কান বোলার—প্রদীপ ম্যাথুকে নিয়ে একটা বই লিখবে সে। সেই প্রদীপ ম্যাথু, যে সব্যসাচী হিসেবে যে বল করতে পারতো ডান-বাম দু হাতেই, বাতিল হয়ে যাওয়া এক টেস্ট ম্যাচে যে একাই এক ইনিংসে নিয়েছিলো নিউজিল্যান্ডের দশ উইকেট। শ্রীলঙ্কা ৯৬’ সালে বিশ্বকাপ জেতার আগের কয়েক বছরে স্কোয়াডে অনিয়মিত ভাবে ডাক পাওয়া সেই প্রদীপ ম্যাথু কোথায় হারিয়ে গেছে? উত্তর খুঁজতে নেমে ডুবে থাকা গামিনি টের পায়, শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের বাঁক বদলে দেওয়া ঘটনাগুলোর সাথে কেমন অদ্ভূত ভাবে জড়িয়ে আছে ওই চায়নাম্যান বোলারের জীবন, অথচ সেই লোকটাকেই রীতিমতো বিস্মরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের কর্তারা। প্রদীপকে নিয়ে বুড়ো সাংবাদিক গামিনির অবসেশন তবু কাটে না, বন্ধু আরিয়ারত্নেকে সাথে করে সে খুঁজে চলে তামিল পরিবারে জন্ম নেওয়া ওই বোলারের ইতিহাস।
গল্প এটুকুই। কিন্তু খেলার পাতার নিজস্ব শব্দাবলীর দুর্দান্ত ব্যবহার, আর উপমা হিসেবেও খেলার জগতের দারুণ সব মুহুর্ত টেনে এনে শেহান করুণাতিলকার ‘চায়নাম্যান’ পাঠককে অবিরাম দিয়ে চলে নতুন রকমের একটা কিছু পড়ার স্বাদ। সেই স্বাদ একদিকে যেমন সিডনির মাঠে ব্রায়ান লারার ডাবল সেঞ্চুরি দেখার মতো ধ্রুপদী, অন্যদিকে সেটা আধুনিক বাজবলের মতো ঠোঁটের কোণায় বিস্ময় ফোটায়।
(৩)
কিন্তু উদ্দিষ্ট এই উপন্যাস— উইজডেন যাকে জায়গা দিয়েছে ক্রিকেট বিষয়ক শ্রেষ্ঠ বইদের ছোট্ট তালিকাতেও (তালিকার একমাত্র উপন্যাসটাই ছিলো ‘চায়নাম্যান’)—কি কেবল ক্রিকেটের গল্প, খেলার গল্প?
একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, ব্যাপার তেমনটা নয়। উপন্যাসের নামটাই আদতে দ্ব্যর্থবোধক। ক্রিকেটীয় পরিভাষায় ‘চায়নাম্যান’ বলতে বোঝায় বামহাতি আন-অর্থোডক্স লেগস্পিনার। অথচ উপন্যাসে স্পষ্ট হয়, শ্রীলঙ্কানদের কথ্য ভাষায় ‘পনিটেল চায়নাম্যান’ বলে একটা সম্বোধন বেশ চালু, যেটার ব্যবহারিক অর্থ হলো ‘সরল’ বা ‘বোকা’ (বাংলাদেশে আমরা যেমন কাউকে ‘মফিজ’ বলে ডাকি)। শিরোনামের এই দ্বৈততা দারুণ ভাবে সপ্রযুক্ত হয়ে গেছে উদ্দিষ্ট উপন্যাসের জন্য। একদিকে যেমন সেটা কথা বলেছে ক্রিকেট নিয়ে, অন্যদিকেঃ খুব নিচু স্বরে হলেও, কথা বলেছে শ্রীলংকার রক্তাক্ত ইতিহাস নিয়ে। দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা নিয়ে শেহান ছিলেন যথেষ্ট স্বল্পবাক, একটা-দুটা বাক্যে লঙ্কান গৃহযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনার ইঙ্গিত দিয়েই তিনি চুপ করে গেছেন।
লক্ষ করার মতো ব্যাপার, বোলার হিসেবে প্রদীপ ম্যাথুর অনুকরণপ্রিয়তাও। নেটে কিংবা মাঠে, অবিশেষণসম্ভব প্রতিভার অধিকারী প্রদীপ অনুকরণ করতে পারতো অন্য যে কোনো বোলারকেই। ডানহাতি বা বাঁহাতি, পাকিস্তানি বা অস্ট্রেলিয়ান—যে কোনো বোলারের বোলিং অ্যাকশনই অনায়াসে উঠে আসতো প্রদীপের কবজি থেকে আঙুলে। কিন্তু অনুকরণ করতে যেমন স্বচ্ছন্দ সে, কেন প্রদীপ নিজের বোলিং-এ ততটা মনোযোগী হয়ে উঠলো না কখনো? সেটা কি স্রেফ তার উপমহাদেশি মনের হীনমন্যতা? … মনে খচখচ করতে থাকে জিজ্ঞাসাটা। আর উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে যখন ম্যাথু বলে ‘দেশের বাইরে আমরা শ্রীলঙ্কানরা অনেক পরিশ্রম করি!’; তখন, প্রতিভা লালনে উপমহাদেশের চিরকালীন ব্যর্থতা বা অনিচ্ছার কথা খেয়াল করে পাঠক দীর্ঘ একটা শ্বাস না ফেলে পারে না।
আলোচনার দাবি রাখে সাদা চামড়ার জনি গিলগুলির চরিত্রটাও। খেলাপাগল এই দিলখোলা মানুষটা, বড় কোনো ম্যাচ এলেই যে মদ্যপানে সঙ্গী হয়ে ওঠে গামিনি আর আরিয়ারত্নের—সে কি আদতে শ্রীলঙ্কার মাটিতে একদা উপনিবেশ করা ক্ষয়িষ্ণু শ্বেতাঙ্গদের প্রতীক? অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের সাথে যৌনকর্মের দায়ে জনির প্রেপ্তার হওয়া কি এটাই বলতে চায় না, যে নতুন শতাব্দীতে ইংরেজরা ক্রমশ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে শ্রীলঙ্কায়?
… ছোট্ট ছোট্ট এইসব ইঙ্গিতেই খেলার আড়ালে আরও অনেক কিছুর কথা বলে যায় ‘চায়নাম্যান’। খেলা নিয়ে উপন্যাস তো আগেও পড়েছি আমরা। ফিকশনের মাঝে পাঠকের মনে পড়বে মতি নন্দীর কিশোর উপন্যাসগুলোর কথা (‘জীবন অনন্ত’ বা ‘বুড়ো ঘোড়া’ যেমন)। নন-ফিকশন বিবেচনা করলে এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো ছাড়াও শঙ্করীপ্রসাদ বসুর ‘লাল বল লারউড’ কেও টানা যাবে। কিন্তু পুরোদস্তুর লিটারারি ফিকশন হিসেবে ওগুলোর সবকিছুকে ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর চলে গেছে ‘চায়নাম্যান’। প্রদীপ ম্যাথুর অনুসন্ধানে নেমে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের উত্থানের গল্প বলার আড়ালে দ্বীপদেশটার ইতিহাসকেও যেভাবে টেনে আনা হলো এই উপন্যাসে, নিঃসন্দেহে সেটা শেহানের প্রথম উপন্যাসকে এই শতকের ‘দা গ্রেট শ্রীলঙ্কান নভেল’ হবার দৌড়ে জায়গা করে দেয়।
(৪)
‘চায়নাম্যান’-এর পর লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাসের জন্য একটা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে তার পাঠকদের। ব্যক্তিগত জীবনে শেহানের দুই সন্তানের জন্ম সেটার একটা কারণ। তবে শেহানের দ্বিতীয় উপন্যাস যখন বের হয়, এক যুগের দীর্ঘ অপেক্ষাটা তখন মধুরই লাগে পাঠকের। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় এই বইটা প্রথমে ভারতীয় এক প্রকাশনা থেকে ‘চ্যাটস উইথ দা ডেড’ নামে বের হয় ২০০০ সালে। তবে সেই উপন্যাসটা বহির্বিশ্বের পাঠকের কাছে খানিক জটিল হয়ে যাচ্ছে দেখে পাণ্ডুলিপিটা ফের সম্পাদকের টেবিলে পাঠান শেহান।
ফলাফলঃ ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘দা সেভেন মুনস অফ মালি আলমেইদা’-এর জন্য শেহান করুণাতিলকার বুকার জয়।
(৫)
উপন্যাস হিসেবে ‘সেভেন মুনস…’ কে বাক্সে ফেলাটা কঠিন। উপন্যাসটা কিছুটা মার্ডার-মিস্ট্রি, কিছুটা রাজনৈতিক স্যাটায়ার, কিছুটা ভৌতিক গল্প, আবার কিছুটা বিষম ভালোবাসার গল্পও বটে। প্রথম উপন্যাসে শেহানের বিষয়বস্তু ছিলো শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট, এবারের উপন্যাসে তিনি বিষয় করে তোলেন সিংহলিজ আর তামিলদের মাঝে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধকে।
‘চায়নাম্যান’ উপন্যাসের কথক গামিনিকে পাঠক যেমন শুরু থেকেই প্রাণ খুলে বিশ্বাস করতে পারে না (কারণ মদ্যপ সাংবাদিকের জবানিতে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন চরিত্র টেনে এনে ফ্যাক্ট আর ফিকশনের মাঝের পর্দাটা বিলীন করে দেন লেখক), ঠিক তেমনটা ঘটে ‘সেভেন মুনস…’-এর ক্ষেত্রেও। উপন্যাসের শুরুতেই পাঠক যখন দ্যাখে যে মালি আলমেইদা কথা বলছে দ্বিতীয় পুরুষে, আর কিছুক্ষণের মাঝেই যখন আবিষ্কার করা যায় মালির মৃতদেহটা টুকরো টুকরো— পাঠক তখন একটা সংশয়ে পড়ে যায় কথকের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে।
বয়ানকারী হিসেবে এই উপন্যাসে কেন দ্বিতীয় পুরুষ বেছে নিলেন, সেটার একটা চমৎকার উত্তর দিয়েছেন শেহানঃ
দেহের মৃত্যুর পরে যেটা বেঁচে থাকে—আমার মনে হয়েছে— সেটা হলো মানুষের মাথার ভেতরের কণ্ঠটা। আমার মাথার ভেতরে যে কণ্ঠটা আছে, সেটা কথা বলে দ্বিতীয় পুরুষে। অন্য কারো মাথার ভেতরের কণ্ঠ কেমন ভাবে কথা বলে, তা আমি জানি না—কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেটা কথা বলে দ্বিতীয় পুরুষে। যেন অন্য কেউ আমাকে নির্দেশ দেয়ঃ হ্যাঁ, আজকে তুমি ওই শার্টটা পড়লেই ভালো করতে!
(৬)
ঘুরে আসা যাক ‘সেভেন মুনস…’ উপন্যাসের কাহিনিতে।
গল্পের কেন্দ্র এখানে মালি আলমেইদা নামের এক ফটোগ্রাফার। জুয়ারি, সমকামী এবং নাস্তিক এই লোকটা উপন্যাসের শুরুতেই নিজেকে আবিষ্কার করে মৃতদের জগতে। কেন মরেছে, কীভাবে মরেছে– সেটা সে মনে করতে পারে না। অথচ এভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে প্রস্তুত ছিলো না মালি, এখনও সে মন থেকে মৃত্যুটাকে মেনে নিতে পারছে না। মৃত্যুর পরের এই জীবনে তার তাই লক্ষ্য হয়ে ওঠেঃ ‘নাপাম বোমা আক্রান্ত ভিয়েতনামের ওই মেয়েটার ছবির মতো’ তার তোলা কিছু চমৎকার ফটোগ্রাফ দুনিয়ার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেই কাজে সফলতার জন্য মালি তাই তার প্রেমিক দিলন আর দিলনের কাজিন (এবং জীবিত মালির প্রেমিকার ভূমিকায় অভিনয় করা) জ্যাকির কানে নিজের কথাগুলো পোঁছে দিতে চায়।
কিন্তু জীবিত মানুষের কাছে নিজের কথা বয়ে নেয়া মৃত মানুষদের জন্য দুরুহ। মালিকে তাই আকৃষ্ট করে প্রতিশোধকামী এক আত্মা, যে লোভ দেখায়ঃ মালি পারবে জীবিত মানুষের কানে সরাসরি কথা বলতে, এমনকি তাদের আচরণ প্রভাবিত করতেও—বিনিময়ে তাকে শুধু নিজের আত্মা বন্ধক রাখতে হবে মহাকালী নামের এক শক্তির কাছে। অন্যদিকে, মৃত্যুর পরের এই জগতে উপকারী কিছু আত্মাও আছে, তারা চেষ্টা করছে মালিকে আলোর জগতে নিয়ে যেতে। আর আলোর সেই জগতে পৌঁছবার জন্য মালির হাতে সময় আছে মাত্র সাত চাঁদ বা এক সপ্তাহ।
(৭)
বোঝাই যায়, বেশ নাটকীয় ঘটনায় পূর্ণ উদ্দিষ্ট উপন্যাসের জমিন। কিন্তু মৃত্যু পরবর্তী জগতসজ্জা তৈরিতে শেহানের মুন্সিয়ানায় পাঠক রহস্যোপন্যাসের মতোই তাড়িয়ে তাড়িয়ে পড়তে পারে ‘সেভেন মুনস…’কে।
আর সাথে, গোটা উপন্যাসের পটে সশব্দে বাজতে থাকে আশির দশকের শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের দামামা। জেভিপি, এলটিটিই, সরকারি আর্মি— কেউই সেখানে সন্ত নয়, সবার হাতেই লেগে আছে নিরপরাধ মানুষের রক্ত।
অথচ রক্তপাত বা নৃশংসতা ধরে রাখা ছবিগুলো নয়, এমনকি সাংবাদিকের সাহসী স্কুপের সাক্ষী হয়ে থাকা ছবিগুলো পর্যন্ত নয়; শেষ পর্যন্ত কলম্বোর গ্যালারিতে ঝুলতে থাকে মালির সেইসব ফটোগ্রাফ—যেখানে আছে সূর্যাস্ত আর সূর্যোদয়, পাহাড় আর সৈকত, বনরুই আর হাতি, এবং মানুষ। পাঠকের মন এক আশ্চর্য বেদনায় নিমজ্জিত হয় তখন।
সাক্ষাৎকারে শেহান জানাচ্ছেন, ১৯৯০ সালে নিহত শ্রীলঙ্কান একটিভিস্ট রিচার্ড ডি জয়সা’র জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই মালি আলমেইদা চরিত্রের সৃষ্টি। সকল পক্ষের সাথেই শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিলো রিচার্ড ডি জয়সার। ইতিহাসের সেই সূত্রকে কাজে লাগিয়ে শেহানের সৃষ্ট মালিও ছবি তুলেছে কখনো সেনাবাহিনি, কখনো তামিল টাইগার্স, কখনো মার্কিস্টদের হয়ে। তবে, কর্মকাণ্ড আর যৌনজীবনে রিচার্ডকে অনুসরণ করলেও মালির চরিত্রে জুয়া এবং ফটোগ্রাফির নেশাটা শেহানের নিজেরই আরোপ করা।
(৮)
আঙুলের কালো নেইল-পলিশের সুবাদেই কি না কে জানে, কালো কৌতুকীতে শেহান অনন্য। পরিস্থিতি আর চরিত্র অনুযায়ী লাগসই সংলাপের মধ্য দিয়ে তার সেই রসবোধ পাঠককে আলোড়িত না করে পারে না।
নিজেকে তিনি ভালোবাসেন জঁনরা ঔপন্যাসিক বলতে—যে গোয়েন্দা উপন্যাস, মার্ডার-মিস্ট্রি লিখতে ভালোবাসে। আর, শেহানের মতে, শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে অ্যাতো অ্যাতো অমীমাংসিত খুনের উপস্থিতি আছে যে এরকম রক্তাক্ত উপন্যাস লেখার পটভূমি হিসেবে দেশটা বেশ মানানসই। তবে, শ্রীলঙ্কার এই দশা যে আরও অনেক দেশের পাঠকেরও অভিজ্ঞতায় আছে, সেটাও শেহান অবহিত। তার কথায়ঃ
নেপাল, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারতের মানুষের অভিজ্ঞতা আমাদের চাইতে খুব আলাদা নয়! বিচার-বহির্ভূত হত্যা, এখানে-সেখানে লাশের পাহাড়– গোটা উপমহাদেশেই আমরা এসব দেখে অভ্যস্ত। কাজেই আমি জানতাম, যদি ঠিকভাবে লিখতে পারি, অন্ততঃ দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ এই গল্পে নিজ নিজ সমাজকে আবিষ্কার করতে পারবে। আমি আসলে একটা দক্ষিণ এশিয়ান ডিস্টোপিয়াকে লিখতে চেয়েছিলাম, আর দক্ষিণ এশিয়ায় এমন বহু ডিস্টোপিয়াই আছে।
(৯)
সম্প্রতি বাচ্চাদের বই প্রকাশের জন্য ভাইকে সাথে নিয়ে ‘পাপায়া বুকস’ নামের একটা প্রকাশনা সংস্থা খুলে বসেছেন শেহান। আপাতত দুটো বইয়ের কাজ করছেন তারা, যার একটা হবে পোকামাকড় নিয়ে। রঙিন ছবির সাথে হালকা একটা গল্প দিয়ে কীভাবে বাচ্চাদের মন ভালো করা যায়, আপাতত মানুষটা ব্যস্ত আছেন সেই ভাবনায়।
আশা রাখি, বুড়ো পাঠকদের জন্যেও ইতোমধ্যেই ভাবতে শুরু করেছেন শেহান করুণাতিলকা। ক্রিকেট আর যুদ্ধের পর, শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের কোন দিকটা তিনি সামনে নিয়ে আসেন—পাঠক হিসেবে সেই কৌতূহল আমার এখন ষোলো আনা।
[সেপ্টেম্বর, ২০২৫]
প্রিয় পাঠক,
০৭ বছর ধরে একক শ্রমে গড়ে তোলা এই ওয়েবসাইটকে আমি চেষ্টা করেছি অগণিত বাংলাভাষী ওয়েবপোর্টালের মাঝে স্বতন্ত্র করে তুলতে। নানা স্বাদের এসব লেখা নির্মাণে আমাকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে যথেষ্ট সময় আর শ্রম। এছাড়াও, পাঠক, আপনি এসব লেখা পড়তে পারছেন কোনো ধরনের বিজ্ঞাপণের উৎপাত ছাড়াই।
কাজেই প্রিয় পাঠক, স্বেচ্ছাশ্রমের এই ওয়েবসাইট চালু রাখতে প্রয়োজন হচ্ছে আপনার উৎসাহের। আমরা চাইঃ এই সাইটের কোনো লেখা যদি আনন্দ দেয় আপনাকে, কিংবা আপনার উপকারে আসে- সেক্ষেত্রে আপনি সংগ্রহ করতে পারেন আমার প্রকাশিত বইগুলো, এই লিংক থেকে।
আপনার সামান্য উৎসাহ বাংলাভাষী অন্তর্জালকে করে তুলতে পারে আরও আকর্ষণীয় লেখায় সমৃদ্ধ!
Debasish Mazumder
ধন্যবাদ সুহান, শেহানকে পড়বার প্রচুর আগ্রহ জাগালেন।
সুহান রিজওয়ান
পড়ে ফেলুন ভাই। আশাহত হবার সম্ভাবনা কম।