লেখালেখি

হাসনাত আবদুল হাই’এর ভ্রমণ-জগত

(১)
প্রিয় ভ্রমণ-গদ্যকারের নাম ভাবতে গিয়ে বাঙালি পাঠককে প্রথমেই সবুট স্যালুট মারতে হয় সৈয়দ মুজতবা আলীকে। একদম আটপৌরে গদ্যে সুনীল গাঙ্গুলীও আমাকে নানা জায়গা ঘুরিয়ে এনেছেন অক্ষর দিয়ে, তাকেও আমি রাখবো নিজের প্রিয় ভ্রমণ-লেখকের তালিকায়। বলতে হবে, মাত্র খান দুয়েক বইয়ের মাধ্যমেই প্রিয় পর্যটক-লেখক হয়ে ওঠা রাইকার্ড কাপুচিনস্কির নামটাও।

কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা হয় বাংলাদেশে আমার প্রিয় ভ্রমণ-গদ্যকার কে, তখন?

ভেবে দেখলে, খুব বেশি নাম বিবেচনায় উঠে আসে না। হুমায়ূন আহমেদ থেকে মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো বহুপ্রজ লেখকেরা তো বটেই, সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেম বা মুনতাসীর মামুনের মতো একটু পাশে সরে থাকা লেখকেরাও ভ্রমণ-কাহিনি পিপাসু পাঠকদের উপহার দিয়েছেন সুলিখিত কিছু বই। বিশেষ করে বলতে হবে শুধু ভ্রমণ সংক্রান্ত রচনা দিয়েই প্রায় তারকা-খ্যাতি পেয়ে যাওয়া মাঈনুস সুলতানের নাম, তার ‘কাবুলের ক্যারাভান সরাই’কে তো রীতিমতো আধুনিক ‘দেশে-বিদেশে’ বলতে হয়। একদম হালের ভ্রমণ-লেখক সঞ্জয় দে কিংবা ফাতিমা জাহানের রচনাও বেশ লাগে পড়তে। তাঁদের প্রত্যেকের রচনাই নিঃসন্দেহে দারুণ নিজস্বতা ও সৌন্দর্য্য-মণ্ডিত। তবু, নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বাংলাদেশে আমার প্রিয় ভ্রমণ-গদ্যকার হাসনাত আবদুল হাই।

ছাত্রাবস্থায় কিংবা সরকারি আমলা হিসেবে ভ্রমণের সুযোগ বিস্তর পেয়েছেন হাসনাত। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি লিখে যাচ্ছেন তার সেইসব ভ্রমণের অভিজ্ঞতাই। খেয়াল করলে দেখা যাবে, জার্নাল ঘরানার রচনা বলে স্থান-পট ছাড়াও আরেকটা রঙ জায়গা নিচ্ছে তার ভ্রমণ-গদ্যের ক্যানভাসেঃ কালস্রোত। হ্যাঁ, মুসাফির হিসেবে হাসনাত চাক্ষুষ করেছেন এমন সব স্থান আর মানুষ, যারা সময়ের প্রবাহে জায়গা করে নিয়েছেন আমাদের সামষ্টিক চেনাজানায়। ফলে নিছক ভ্রমণ-কাহিনির বাইরে একটা ঐতিহাসিক ফটোগ্রাফের মূল্যও জুড়ে যাচ্ছে তার রচনার সাথে।

আজ মনে পড়ছে, সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদের নকশার সৌন্দর্য্য উপভোগ কিংবা আধ-পাগলা সেই কম্প্যুটার বিজ্ঞানীর সাথে কিলিমানজারোর ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সেই অভিজ্ঞতা ছাড়াও ফেলিনির সাথে কাজ করা শামসুদ্দীন আবুল কালামের সঙ্গ আমি পেয়েছি হাসনাতের কলমে। মনে পড়ছে, নীরদ সি চৌধুরী কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিবাহিনী নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করা সুবীর ভৌমিকের সাথেও হাসনাতের আলাপ দেখে হবার কথা। ঈর্ষাও হয়েছিলো, ষাটের দশকের আমেরিকায় মার্টিন লুথার কিং-এর সাথে হাসনাতের সাক্ষাতের কথা পড়ে।

বাংলাভাষী যে পাঠক ভ্রমণ-কাহিনি পড়তে ভালোবাসেন, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ০৩ (তিন) খণ্ডের ভ্রমণ-সমগ্র তাই হতে পারে তার জন্য এক দারুণ আকর্ষণীয় বস্তু। মৃদু ঈর্ষাও বরাদ্দ থাকলো সেই পাঠকের জন্য, যিনি প্রথমবারের মতো স্বাদ নেবেন ওই সংকলনগুলোর।

(২)
শুধু ভ্রমণ-কাহিনিই কি লিখেছেন হাসনাত আবদুল হাই? … না, তেমনটা নয়। এন্তার গল্প-উপন্যাস লিখেছেন তিনি। প্রণয়ন করেছেন নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই। অনুবাদ করেছেন বাংলা কবিতা। অর্থনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কলাম তো আজও তিনি নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন পত্রিকায়।

ফলে, কেবল ভ্রমণ-লেখক হিসেবে বিবেচনা না করে তার কর্মবিস্তৃতি বুঝতে আমাদের খেয়াল করা উচিৎ পুরোদস্তুর লেখক হিসেবেই তার সঞ্চারপথটা।

ধারণা করি, বাঙালি পাঠকের কাছে হাসনাতের মূল পরিচয় ‘নভেরা’ আর ‘সুলতান’ এর লেখক হিসেবে। শিল্পী সুলতান আর ভাস্কর নভেরার বৈচিত্রময় জীবনকে হাসনাত ধরেছেন জীবনী-মূলক উপন্যাসের ধাঁচে। আর বাংলাদেশে, যেখানে তথ্য সংরক্ষণ করার কোনো প্রতিষ্ঠানগত ঐতিহ্য নেই, সেখানে উদ্দিষ্ট দুই শিল্পীর জীবনকে ‘জানতে’ বাঙালি পাঠক উপন্যাসকেই মূল আশ্রয় করবেন- সেটাই স্বাভাবিক। উল্লেখ্য দুই উপন্যাসের ভালো-মন্দ নিয়ে নানা কথা বলা গেলেও হাসনাতের নিবেদনটা তাই সেখানে প্রশংসনীয়।

সত্যি বলতে, ‘লাস্ট ফর লাইফ’ খ্যাত আরভিং স্টোনের মতোই, জীবনী-মূলক উপন্যাস রচনার প্রতি জোরালো এক ঝোঁক লক্ষ করা যায় হাসনাতের লেখালেখির যাত্রায়। নভেরা বা সুলতান ছাড়াও তার উপন্যাসের জগতে তিনি স্থাপন করতে চেয়েছেন আরজ আলী মাতুব্বর, পটুয়া কামরুল হাসান, এমনকি সৈয়দ শামসুল হককেও। হাসনাতের সেই প্রচেষ্টাগুলো অবশ্য খুব বেশি আলোচিত হয়নি। তবে ওসব বইতেও লক্ষ করেছি – ‘নভেরা’ বা ‘সুলতান’ এর মতোই –  তথ্যভিত্তিক বাস্তবতার অধিক নিবেদন যেন খাটো করে দিয়েছে উপন্যাসের শিল্প-সম্ভাবনা।

বাস্তবতার প্রতি ওই প্রতি অতি বিশ্বস্ততার কারণেই বোধহয়, আলোচনার বাইরে থেকে গেছে হাসনাতের জীবনী-ভিত্তিক উপন্যাস ছাড়া অন্য উপন্যাসেরা। অথচ, মনে পড়ছে, সেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও ‘মোড়েলগঞ্জ সংবাদ’ আর ‘বাইরে একজন/হাসান ইদানিং’ উপন্যাস দুটি পড়ে বেশ আলোড়িত হয়েছিলাম। তাঁর গল্পসমগ্রও পড়া হয় তখনই, যদিও বিশেষ করে কোনো গল্পের নাম স্মরণ হয় না আজ।

কিন্তু, হাসনাত আবদুল হাইয়ের একটি গল্পের নাম আমার –এবং অনেকে পাঠকেরই– তীব্র ভাবে মনে আছে।

২০১৩ সালে, গণজাগরণ মঞ্চ যখন যুদ্ধাপরীদের ফাঁসি চেয়ে তুমুল আবেগে নাচাচ্ছে আমার সময় এবং শহরকে, ঠিক সেই সময় দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘টিভি ক্যামেরার সামনে মেয়েটি’  নামের ওই গল্পটি দারুণ ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিলো আমাদের মাঝে। শাহবাগে প্রজন্ম চত্বর গড়ে ওঠার পেছনে যে স্বতঃস্ফূর্ত চেতনা, সেটির বিচ্ছিরি এক প্রহসন (বলা ভালো বিকৃতিই) দেখা গিয়েছিলো উদ্দিষ্ট গল্পে – উত্তাল সেই সময়ের প্রেক্ষিতে যা ছিলো নিতান্ত অদূরদর্শী। বলতে খারাপ লাগে, কিন্তু নিজের অন্তর্গত রুঢ়তাকে ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলতে বাধ্য হচ্ছিঃ বর্ষীয়ান লেখক হাসনাত আবদুল হাই সেই গল্পটি লিখে নিজের লেখক সত্ত্বার প্রতি সুবিচার করেননি। প্রজন্মের স্পন্দন বুঝতে তিনি আপাদমস্তক ব্যর্থ হয়েছিলেন।

পরবর্তীতে, বহু পাঠকের প্রতিবাদে হাসনাত পত্রিকার পাতায় ক্ষমা চেয়েছিলেন গল্পটি লেখার জন্য। পাঠক হিসেবে বিশ্বাস করতে চাই, নিজের ভুল স্বীকারে হাসনাত আন্তরিক ছিলেন। সত্যিকারের লেখক তো নিজের বিশ্বাস আর উপলদ্ধিকে অনবরত প্রশ্ন করেন, প্রয়োজনে সেগুলোকে তিনি বাতিলও করতে পারেন। সেই গল্প লেখার পর এক দশক পরে, আজ ৮৭ ছুঁই ছুঁই বয়েসেও অবিরাম লিখে যাচ্ছেন যে হাসনাত – তিনি নিশ্চয়ই নিজের ওই লেখক সত্ত্বাকে আগাগোড়া অস্বীকার করতে পারেন না। 

(৩)
কিন্তু রাজনৈতিক অদূরদর্শীতার বিচারে নয়, লেখকের চূড়ান্ত বিচার নিশ্চয়ই তার অক্ষরের মাঝে। ফলে গল্প-জনিত ওই বিতর্কের পরেও হাসনাত আবদুল হাইয়ের নতুন প্রকাশিত যে কাজগুলো আমার আগ্রহ জাগিয়েছে, আমি সেগুলো পড়েছি।

সেই প্রেক্ষিতেই অনেকদিন ধরে মাথায় একটা চিন্তা ঘুরছিলো যে হাসনাতের ভ্রমণ-গদ্যগুলো নিয়ে বড় পরিসরের কিছু একটা লিখবো। কিন্তু যা হয়। গুছিয়ে করবো ভেবে অনেক কাজই আমাদের আর করা হয়ে ওঠে না।

তারপর গত এক সপ্তার মাঝে হঠাৎ পড়ে ফেলা হলো হাসনাতের মোটামুটি নতুন দুটো ভ্রমণ-গদ্য। একটি ‘একদা, সোভিয়েত ইউনিয়নে’ (অন্যপ্রকাশ, ২০২৪), অন্যটি ‘নদীপথে, সঙ্গে ইউলিসিস’ (অন্যপ্রকাশ, ২০২৩)।

স্বল্প সময়ের মাঝে বই দুটো পড়ে মনে হলো, অগোছালো হলেও এই ভ্রমণ-গদ্যগুলো নিয়ে কোথাও দু’কথা লিখে রাখি। সামগ্রিক ভাবে না পারলেও হাসনাতের ভ্রমণ-গদ্যের জগতের অন্ততঃ বুড়িটা ছুঁয়ে আসা দরকার। দরকার, দীর্ঘ লেখক জীবনের এই পর্যায়ে হাসনাত ঠিক কীভাবে পেশ করছেন তার ভ্রমণ-কাহিনিগুলোকে – তেমন অনুসন্ধান।

সেই ইচ্ছা থেকেই এই টুকরো আলাপের জন্ম, যা মূলত সীমাবদ্ধ থাকবে উদ্দিষ্ট দুটো ভ্রমণ-কাহিনিতেই।

(৪)
প্রথমেই বলা যাক ‘একদা, সোভিয়েত ইউনিয়নে’ প্রসঙ্গে।

সুদূর ১৯৭৮ সালে ১০ দিনের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘুরতে গিয়ে যে সব নোট নিয়েছিলেন হাসনাত, তারই ভিত্তিতে (এবং ভেঙে-যাওয়া-দেশটি সম্পর্কে পরবর্তীতে আরও কিছু বইপত্র আশ্রয় করে) নির্মিত এই ভ্রমণ-কাহিনিটি। ‘দৈনিক সমকাল’ পত্রিকায় যখন থেকে কিস্তি আকারে প্রকাশ পাচ্ছিলো এই ভ্রমণ-বিবরণী, সত্যি বলতে তখন থেকেই – অনিয়মিত হলেও –বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়ছিলাম ধারাবাহিকটি। সেই ধারাবাহিকটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হচ্ছে জেনে সংগ্রহ করতে তাই দেরি করিনি।

হাসনাতের অন্য অনেক ভ্রমণ- গদ্যের মতোই উদ্দিষ্ট বইটি শুরু হয় বিমানবন্দর থেকে। বলতে গেলে যাত্রার শুরু থেকেই – মানে রাশান প্লেন যাত্রারম্ভ করবার পূর্বেই – পাঠক জেনে যায় যে বহু বাঙালি ছাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নে যাবার সময় জুতো বা সিগারেটের মতো দুষ্প্রাপ্য জিনিস নিয়ে যায় কালোবাজারে বিক্রি করে চড়া দাম পেতে। তবে কি সোভিয়েত ইউনিয়ন আগাগোড়াই এমন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত? এমন একটা আলাপ থেকেই সমবায় মন্ত্রণালয়ের বড়কর্তা হাসনাত ও তার সহযাত্রীরা – সমবায় আন্দোলনের দুই কর্মী – জড়িয়ে যান যুক্তি ও প্রতিযুক্তির জালে।

সেই আলাপটাই যেন বাকি ভ্রমণ-বিবরণ জুড়ে প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে। ‘অল এনিম্যাল আর ইকুয়াল, বাট সাম এনিম্যাল আর মোর ইকুয়াল দ্যান আদার্স!’ আপ্তবাক্যের মতোই আমরা দেখি ক্ষমতাবৃত্তের কিছু মানুষ কি বিপুল ক্ষমতার অধিকারী সোভিয়েত ইউনিয়নে, আমাদের দেখা হয় মস্কো থেকে বাকু হয়ে লেনিনগ্রাদ পর্যন্ত এমনকি সরকারি কর্মচারীরা পর্যন্ত কেমন তটস্থ হয়ে আছে কোনো অজানা ভয়ে। ঝরঝরে লিফট আর অব্যস্থাপনায় নিমজ্জিত সেই ধূসর দেশেই হাস্যজ্জ্বল বাবুর্চি ইয়ানোভিচের মতো কয়েকটা মানুষ জ্বলজ্বল করে ওঠে চিরকালের রুশ সাহিত্যের মতো।

বলাই বাহুল্য, ১৯৭৮ সালে নেয়া নোটের ভিত্তিতে রচিত এই ভ্রমণ-স্মৃতির অনেকটাই কাল্পনিক সংলাপমুখর। কিন্তু পাঠকের মনে হয় তাতে করে যেন বরং গতিময়তাই এসেছে কাহিনিতে। তদুপরি, মূল ভ্রমণ কাহিনির শেষে বেশ কিছু পরিশিষ্ট যোগ করায় এই বই ঠিক যেন ভ্রমণ-কাহিনিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তারা এমন কিছু তথ্য বা ব্যাখ্যা যুক্ত করে – যা সে যুগের সোভিয়েতকে বুঝতে আরেকটু সহায়ক। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় ‘ট্রটস্কি ও স্টালিন’ এবং ‘দ্যা নিউ ক্লাসঃ মিলোভান যিলাস’ পরিশিষ্ট দুটোর কথা।

সোভিয়েতে এভাবে এক ঝলক উঁকি মারার পরদিনই আবার আমাকে দেখা যায় এক নতুন যাত্রায়, হাসনাতের সাথে এবার আমি সহযাত্রী হই সদরঘাট থেকে খুলনাগামী এক লঞ্চে। এখন ১৯৯৩ সাল, চাইলেই ঢাকা থেকে বিমানে যশোর হয়ে খুলনা পৌঁছানো যায় মাত্র কয়েকঘন্টায়, তবু কেন ২৬ ঘন্টার দীর্ঘ এই লঞ্চযাত্রা আমাদের?

কারণটা বেশ উদ্ভটঃ দীর্ঘ এই যাত্রায় হাসনাত পড়ে শেষ করতে চান জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’, আপাদমস্তক জটিলতায় মোড়ানো যে উপন্যাস তার পড়বো-পড়বো করেও পড়া হয়ে ওঠেনি এখনও।

বলতেই হয়, হাসনাতের অন্যান্য ভ্রমণ-কাহিনি থেকে ‘নদীপথে, সঙ্গে ইউলিসিস’ স্বভাবে বেশ আলাদা। তাঁর অন্যান্য ভ্রমণ-কাহিনিতে যেমন সহযাত্রী, নিসর্গ বা চলার পথের ঘটনাই হয়ে ওঠে মুখ্য; ‘নদীপথে, সঙ্গে ইউলিসিস’ মোটেও তেমনটা নয়। এখানে লঞ্চযাত্রাটি হয়ে গেছে গৌণ, কাহিনির মুখ্য-চরিত্র হয়ে উঠেছে বরং ওই ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসটি। নিসর্গের বদলে হাসনাত পাঠককে স্বাদ দিতে চান জয়েসের ওই অক্ষর-নির্মিত দুর্বোধ্য জগতটার।

শুরুতেই পাঠককে চমকে দেয় একটা কাকতালীয় ব্যাপারঃ সদরঘাট থেকে হাসনাতের লঞ্চযাত্রা শুরু হয় যখন (১৬ জুন সকাল ০৮টা), ইউলিসিস উপন্যাসও আরম্ভ হয় ওই একই দিন-ক্ষণে (১৯০৪ সালের ১৬ জুন সকাল ০৮ টায়)!

মজার এই সমাপতন দিয়ে শুরু হয় বইটা তারপর এগিয়ে চলে হাসনাতের ‘ইউলিসিস’ পাঠ দিয়ে। শব্দ, বাক্য – এমনকি অনুচ্ছেদও লাফ দিয়ে এড়িয়ে হাসনাত শেষ করেন উপন্যাসের এক-একটা অধ্যায়, আর মার্জিনে মন্তব্য লিখে রাখার মতো পাঠকের সাথে ভাগ করেন বিবিধ বিষয়ে তার চিন্তা, প্রশ্ন, পর্যবেক্ষণ।

কখনো কখনো অধ্যায়ের শেষে দম নিতে লঞ্চের কেবিনের বাইরে এলে হাসনাতের বিদেশি সহযাত্রীরাও হয়ে ওঠেন পাঠকের এই সমন্বিত ‘ইউলিসিস’ পাঠের অংশ। কখনো ‘ইউলিসিস’ নিয়েই আলাপ জমে ওঠে হাসনাতের সহকর্মী প্রাক্তন এক ইংরেজির শিক্ষকের সাথে, কখনো কমিক রিলিফ দিয়ে যায় লঞ্চের বাটলার লতিফ। আর ওভাবেই দেখতে দেখতে ফুরিয়ে আসে ‘ইউলিসিস’ এর আঠারোটি অধ্যায়। একরকম ‘স্কিম-রিড’ করে হাসনাত পড়া শেষ করেন উদ্দিষ্ট উপন্যাসটা।

সত্যি বলতে, গোটা বই জুড়ে হাসনাতের আলাপে বেশ কিছু পুনরাবৃত্তি ছিলো, পাঠকের কাছে কোথাও কোথাও তার মার্জিনের মন্তব্যরা ছিলো বড় বেশি সংক্ষিপ্ত – যারা দাবি রাখে আরও বিস্তারিত আলোচনার। কিন্তু এসব খামতি সত্ত্বেও মোটাদাগে পাঠকের যেন দেখা হয়ে যায় উদ্দিষ্ট উপন্যাসটার একটা বেশ চলনসই ট্রেলার।

বলতে হবে ‘নদীপথে, সঙ্গে ইউলিসিস’ এর পরিশিষ্টদের কথাও। হোমারের ওডিসির সাথে জয়েসের ইউলিসিস-এর সংযোগটা কোথায়, শতবর্ষ পরেও উপন্যাসের ন্যারেটিভে কেমন ভূমিকা রাখছে ‘ইউলিসিস’ – এসবের বাইরেও পরিশিষ্টে যুক্ত আছে টেরেন্স কিলিন এবং ড্যানিয়েল মুঁহল প্রণীত ‘ইউলিসিস’ এর একটা অধ্যায় ভিত্তিক সারসংক্ষেপ। আমার মতো যে সব পাঠক একাধিকবার চেষ্টা করেও ‘ইউলিসিস’ পড়তে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের কাছে দুধের বিকল্প হিসেবে ওই সার-সংক্ষেপটা বেশ স্বাদু ঘোল।

ইংরেজিভাষী পাঠকের কাছে একটু দুর্বোধ্য উপন্যাসগুলো (‘ইউলিসিস’ যেমন, কিংবা উমবার্তো ইকো’র ‘গোলাপের নাম’) সহজবোধ্য করে তোলবার জন্য নানা রকমের সহায়ক বই পাওয়া যায়। নীলক্ষেতের গাইড বই বই নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় বেড়ে উঠেও – বাংলা ভাষায় তেমন কোনো ‘আউট বই’ আমার চোখে পড়েনি। সেদিক বিবেচনায় ভ্রমণ-কাহিনির মৃদু স্বাদের সাথে বিশ্বসাহিত্যের একটা ক্লাসিকের সংক্ষিপ্ত স্বাদ দিয়েছে বলে ‘নদীপথে, সঙ্গে ইউলিসিস’ এর বিশিষ্টতা যথেষ্টই উল্লেখ করবার মতো।

(৫)
‘একদা, সোভিয়েত ইউনিয়নে’ আর ‘নদীপথে, সঙ্গে ইউলিসিস’ শেষ করে মনে হতে থাকে, দুটো বইয়ের মাঝে কোথায় যেন একটা সাদৃশ্য আছে। মোটাদাগের সাদৃশ্যটা আবিষ্কার করতে অবশ্য সময় লাগে না। হ্যাঁ, উভয় বইয়ের শেষেই নানা ধরনের সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ, আলোচনা যোগ করায় তারা ঠিক প্রথাগত ভ্রমণ-কাহিনি থাকেনি আর। একটা উপন্যাসকে একজন পাঠক, আর একটা দেশকে একজন পর্যটক যেমন ব্যক্তিগত পরিসরে আবিষ্কার করেন – তার বাইরেও বেশ প্রসারিত একটি তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি পাঠকের সামনে হাজির করতে চাওয়ার প্রবণতা আছে আলোচ্য বই দুটোয়।

কিন্তু এ প্রচেষ্টার বৃহত্তর তাৎপর্য কোথায়? আমরা কি তবে বলতে পারি যে লেখালেখির এ পর্যায়ে বর্ষীয়ান লেখক হাসনাত আবদুল হাই তার ভ্রমণ-গদ্যে নতুন কোনো মাত্রা আবিষ্কার করতে চাচ্ছেন?

নিশ্চিত করে উত্তর দেয়াটা কঠিন।

তবে, আগ্রহী পাঠক লক্ষ করতে পারেন, হাসনাত এখনও প্রচণ্ড সক্রিয় লেখক হিসেবে। ভ্রমণ-গদ্যে নতুন নীরিক্ষার কথা তো বললামই। এছাড়া, ফেসবুক পোস্টের সূত্র ধরে এখনও হাসনাত অনুসন্ধানী সাংবাদিকের তৎপরতায় ভাষা আন্দোলনের ভুলে যাওয়া এক নায়িকার জীবন তুলে আনছেন উপন্যাসের আদলে (‘কল্যাণী/মমতাজ’)। কিংবা ডিস্টোপিয়ান জগত নিয়ে ইদানিং বাংলা ভাষায় তরুণদের যে মাতামাতি – হাসনাত সেদিকেও কাজ করতে চাইছেন উপন্যাসের জগতে (‘স্যাংগ্রিলায় সাত দিন’)।

হ্যাঁ, একবিংশ শতাব্দীর প্রায় সিকি পথ পেরিয়ে এসে বাংলা উপন্যাসকে আমরা যেখানে দেখতে চাই – হয়তো হাসনাতের রচনা সর্বদা ঠিক সেখানে গিয়ে আঘাত করছে না; হয়তো আমাদের এই দুর্দান্ত গতির অনলাইন জগতে পাঠকের নানামুখী প্রবণতার সুঁই অনেকদিক থেকেই বিদ্ধ করতে পারে সেই রচনাগুলোর কেন্দ্র এবং বিন্যাসকে। কিন্তু এটাও সত্য, কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে চাওয়ার যে প্রয়াস, লেখকের জীবনে সেটাই একমাত্র সুপার-পাওয়ার। অবিরাম লেখা, আর সেই লেখা দিয়ে নিজেরই পূর্ব-স্থাপিত গণ্ডী অতিক্রম করার মাঝেই থাকে লেখকের উচ্চাভিলাষ। হাসনাত ক্রমাগত তেমন উচ্চাভিলাষ প্রদর্শন করে যাচ্ছেন।

আর সাহিত্যকে কি শেষতক লেখকের উচ্চাভিলাষ বাদে অন্য কিছু বলা যায়?

(৬)
একটু আগেই বললাম, যে ‘একদা, সোভিয়েত ইউনিয়নে’ আর ‘নদীপথে, সঙ্গে ইউলিসিস’ বইদুটোয় লেখকের ব্যক্তিগত ভ্রমণ-স্মৃতির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে বিবিধ তাত্ত্বিক আলাপ। অন্যভাবে বললে, খতিয়ে দেখতে চাওয়ার মাইক্রোস্কোপের সাথে যুক্ত হয়েছে সেখানে যুক্ত হয়েছে লেখকের ব্যক্তিগত চশমা।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখালেখিকে –যদ্দুর সম্ভব– মাইক্রোস্কোপে খতিয়ে দেখা শেষ করে, মনে হচ্ছে তার ভ্রমণ-গদ্য সম্পর্কে ব্যক্তিগত মুগ্ধতার চশমাটা দেখানোটা কমই হয়েছে এই আলাপে।

দীর্ঘ হয়ে ওঠা এই আলাপের শেষে এসে তাই, তুলে দিচ্ছি নিজেরই এক যুগ পুরোনো জার্নালের একটা ভুক্তি। হয়তো, তার ভ্রমণ গদ্যের প্রতি নিজের ভালোবাসাটা তাতে খানিক স্পষ্ট করা যাবে।  হয়তো, আশা রাখি, ভবিষ্যতের পাঠকরাও হাসনাতের ভ্রমণ-রচনাকে পড়বেন একই রকম ভালোবাসা নিয়ে।

 “ হাসনাত আবদুল হাইয়ের ভ্রমণ-সমগ্রের দ্বিতীয় খন্ডে অনেকগুলা ছোট-ছোট ভ্রমণকাহিনীর একটা সংকলন ছিলো। ‘কলকাতা-রাণাঘাট’, ‘যশোরে’, ‘পৈতৃকভূমিতে’ এরকম নাম ছিলো রচনাগুলোর।

এমনিতেই হাই সাহেবের বর্ণনা দারুণ লাগে। কিন্তু ওই বইটা দারুণ লেগেছিলো অন্য কারণে। কোন বিদেশের বর্ণনা নেই; নেই ইট-কাট-পাথর-সবুজ দেখবার মুগ্ধতা। বরং সেটা যেন এক সময় পরিব্রাজকের গল্প; যেখানে এক সরকারী চাকুরে ঘুরে ঘুরে ফিরছেন তার শৈশব কাটানো শহরগুলোতে আর আবিষ্কার করছেন অন্য এক ছায়াশহর। পাশের বাসার কম্যুনিস্ট ভদ্রলোকের নাটকীয় সিগারেট টানা, ছেলেবেলায় চাচার হাত ধরে বহুদুরের হাটে মাটির ভাঁড়ে চা খেতে যাওয়া, পুরনো জমিদারবাড়ির পোকায় কাটা লাইব্রেরির মলাটছেঁড়া রহসোপন্যাস –হাই সাহেব কেমন করে যেন মুগ্ধ করে রেখেছিলেন ঐ বইটায়।

…ঈদের ছুটিতে চাঁদপুর গেলাম, একদিনের ট্যুর।

চাঁদপুর আব্বার শৈশবের শহর। তো আব্বার সাথে বিকালে ঘুরতে বের হলাম। দেখি, আব্বা একটু পরপর উচ্ছাসে ভেসে যান। ওই তো তার ফুটবল খেলার মাঠ’ ওই তো- ছাদ ভেঙ্গে পড়া ঐ লাল বাড়িটায় মোশারফ থাকতো; নদীর ওই তীরে তার কত বিকেল কেটেছে; ওই লাইব্রেরিটার এককোণে বসে ইংরেজী রচনা লিখে আব্বা পেয়েছিলেন তার জীবনের প্রথম পুরষ্কার…

কখনো কখনো ভীষণ রাগী, ভীষণ একগুঁয়ে, ভীষণ অচেনা আব্বাকেও আমার হাসনাত আবদুল হাইয়ের বর্ণনার মতো চেনা মনে হয়। ”


[এপ্রিল, ২০২৩]

প্রিয় পাঠক,
কয়েক বছর ধরে একক শ্রমে গড়ে তোলা এই ওয়েবসাইটকে আমি চেষ্টা করেছি অগণিত বাংলাভাষী ওয়েবপোর্টালের মাঝে স্বতন্ত্র করে তুলতে। নানা স্বাদের এসব লেখা নির্মাণে আমাকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে যথেষ্ট সময় আর শ্রম। এছাড়াও, পাঠক, আপনি এসব লেখা পড়তে পারছেন কোনো ধরনের বিজ্ঞাপণের উৎপাত ছাড়াই।

কাজেই প্রিয় পাঠক, স্বেচ্ছাশ্রমের এই ওয়েবসাইট চালু রাখতে প্রয়োজন হচ্ছে আপনার প্রণোদনার। আমরা চাইঃ এই সাইটের কোনো লেখা যদি আনন্দ দেয় আপনাকে, কিংবা আপনার উপকারে আসে- সেক্ষেত্রে ০১৭১৭ ৯৫৩০৮৭ (Personal) নাম্বারে বিকাশ (bKash) করে আপনি প্রণোদনা দিয়ে আমাদের উৎসাহিত করবেন।

আপনার সামান্য উৎসাহ বাংলাভাষী অন্তর্জালকে করে তুলতে পারে আরও আকর্ষণীয় লেখায় সমৃদ্ধ!

Previous

কী নামে ডাকবো একুশে ফেব্রুয়ারিকে?

Next

আলমগীর হোসেন অড্রে হেপবার্নকে ভালবেসেছিল

3 Comments

  1. নীলা

    ভালো লিখেছেন। উনার ভ্রমণ-বিষয়ক লেখাগুলো পড়ার আগ্রহ পেলাম।

    • সংগ্রহ করে ফেলেন। ভালো লাগবে আপনার।

    • স্বাধীন প্রান্ত

      বেশ ভালো লেখা। আপনার পড়া আরও কিছু ভ্রমণকাহিনির নাম জানতে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: