মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী সমাগত হলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দারুণ সরগরম হয়ে ওঠে তাকে নিয়ে আক্ষেপে। কেন মানিক জনপ্রিয় হলেন না, অথবা বিশ্ব দরবারে অনুবাদের মাধ্যমে তাকে আরো পরিচিত করে তোলা গেলে কী হতে পারতো; এমন সব প্রশ্ন ঘোরে প্রচুর। প্রশ্নের চেয়েও বেশি ঘোরে মানিককে নিয়ে বলতে বলতে জীর্ণ হয়ে পড়া কিছু তথ্যঃ বাজি ধরে গল্প লেখা, নামের বদল, মদ্যপানের নেশা, আর্থিক দুর্গতি, মার্ক্সিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি, ফ্রয়েডবাজি।

এমনকি, মানিকের লেখা নিয়েও যখন বলতে যাই আমরা, বিশেষতঃ তার উপন্যাস নিয়ে, ঘুরে ফিরে পুনরুচ্চারিত হয় কেবল কয়েকটা নাম। পুতুলনাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি, জননী। কেউ কেউ তুলে আনেন দিবারাত্রির কাব্য আর চতুষ্কোণকেও। এগুলোর বাইরে যেন মানিকের উপন্যাসই নেই আর। অথচ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস জগত এই কয়েকটি নামের বাইরেও আরো বিস্তৃত। তদুপরি, তরুণদের সাথে মানিকের সংযুক্তি অনেকাংশেই প্রথাগত পাঠ্যসূচীর মাধ্যমে বলে, তাকে আলাদা করে খুঁজে নেবার তাড়নাটাও যেন খানিক কম। আর অন্তর্জালে যেহেতু তরুণরাই সরব অপেক্ষাকৃত বেশি, ঝলমলে সব বিদেশি এবং ভারি নামের আড়ালে এখানে সহজেই হারিয়ে যান মানিক, কোনোদিকে পিছিয়ে না থেকেও।

অন্তর্জালে সেই অভাববোধ থেকেই, এই লেখায় চেষ্ঠা থাকলো মানিকের বাকি উপন্যাসগুলোর মাঝ থেকে পছন্দের কয়েকটাকে বেছে নেবার। বলে নেয়া ভালো, ক্রম এখানে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক নয়।

০১। জীবনের জটিলতা (১৯৩৬)
একটা কুড়িয়ে পাওয়া অচল আনি নিয়ে ভাই-বোন বিমল আর প্রমীলা শৈশবে কিছু কিনতে পাবে বলে যে জটিলতায় জড়িয়ে পড়লো, প্রতীকী দৃশ্য হিসেবে সেই আবেশ ছড়িয়ে থাকলো সারাটা উপন্যাস জুড়েই। অচল আনির মতোই, বাজারে মূল্য নেই এমন ভাবাবেগে মানিকের প্রধান দুই চরিত্র ভাইবোন পুতুল নাচলো অনেকক্ষণ।

বিমলকে ভালোবাসে লাবণ্য (উপন্যাসে প্রায় অনুপস্থিত এক চরিত্র), প্রমীলার পেছনে কিছুদিন ঘুরে নগেন (উপন্যাসে সেও প্রায় অনুপস্থিত এক চরিত্র) সাথী হয় ঐ লাবণ্যেরই। বিমল নিজে স্বভাবে কবি, সে কিন্তু প্রেমে পড়ে পাশের বাড়ির শান্তার; পুরানো দিনের ব্লাউজ পড়া ও সাদাসিধে শান্তা। শান্তার স্বামী অধর তাকে ভালোবাসে, কিন্তু কতটা পশুর মতো, যেন বিমলের সাথে একটা প্রতিযোগিতা হচ্ছে তার।

প্রেম সংক্রান্ত এসব জটিলতা নিয়েই এ উপন্যাস দারুণ টানটান, মানিকের অন্য উপন্যাসের চাইতে সংলাপের আধিক্য এখানে চোখে পড়ার মতো বেশি।

০২। অমৃতস্য পুত্রাঃ (১৯৩৮)
১৯৩৮ এর রচনা, তখনো বাংলার মধ্যবিত্ত কলকাতা অঞ্চলে একটা নির্দিষ্ট রুপ পেতে শুরু করেছে মাত্র, ব্যক্তির যন্ত্রণা তখনো অতটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু যেহেতু প্রকৃত ঔপন্যাসিক সর্বদা অসুখী, মানিক তাই আবিষ্কার করলেন, আধুনিক মানুষ মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছে বহু আগেই।

উপন্যাসের কাহিনি অনুপম এবং শঙ্করকে নিয়ে। দুজনের ঠাকুরদা এক হলেও পিতা আলাদা, ফলে ছোটবেলা থেকে এরা বড় হয়েছে ভিন্ন পরিবেশে। শঙ্কর বড় হয়েছে ঠাকুরদার সাথে থাকা উকিল বাপের বিত্ত বৈভবে। সে কলেজে পড়ে আর্টস। ফাঁকি দিয়ে, ও চাঁদা দিয়ে সে আজকাল বক্তৃতায় মহাপুরুষ হয়ে লোকের তালি পাচ্ছে। সে প্রেমে পড়েছিলো তরঙ্গের, অথচ মেয়েটি প্রত্যাখ্যান করেছে। শঙ্করের ঠিক উলটো পিঠে দাঁড়িয়ে অনুপম। বাবার মৃত্যুর পর মা সাধনার কঠোর কৃচ্ছসাধনের মধ্যে দিয়ে সে বড় হয়েছে, কলেজে সায়েন্স পড়ছে। ভাষণে সে’ই কলেজের সেরা বক্তা। এই ছেলেটির প্রেমেই পড়েছিলো তরঙ্গ।

আপাত ভিন্ন এই দুই মানুষকেও অসাধারণ এক শেষ দৃশ্যে মানিক টেনে আনেন একই সমতলে। (মজার ব্যাপার, প্রিয় গল্পকার হুমায়ূন আহমেদের বহু তরুণী চরিত্রই তাদের ভালোবাসার মানুষের কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছে, সেগুলোর ভঙ্গিটা যেন মিলে যায় এই উপন্যাসের তরঙ্গ চরিত্রটা আত্মহত্যার পূর্বে অনুপমকে যে চিরকুট পাঠিয়েছে, তার সাথে!)

০৩। শহরতলি (১ম খন্ড) (১৯৪০)
শহরের উপকন্ঠে একটার পর একটা বাণিজ্যিক কারখানা গড়ে ওঠার পটে প্রাচীন সব প্রতিষ্ঠানের সাথে নতুন যুগের পুঁজিবাদী আর মুনাফাখোর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরোধ, এমন গল্প আমাদের বহুবার শোনা হয়েছে ইতোমধ্যে। অথচ মানিকের লেখা বলেই, শহরতলি এদের সবার চাইতে আলাদা।

অনেক চরিত্র এই উপন্যাসে, কিন্তু ভয়ানক স্বল্পবাক মানিক তাদের প্রত্যেককে করে তোলেন স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় চরিত্রে যশোদা নামের যে নারীটি আছে, মানিকের উপন্যাস জগতেই তার তুলনা পাওয়া কঠিন।

সিক্যুয়েল হিসেবে শহরতলির দ্বিতীয় একটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিলো পরে, তবে প্রথমটার পাশে সেটাকে খানিক বেমানানই মনে হয়েছিল।

০৪। অহিংসা (১৯৪১)
সাধু বলে পরিচিত সদানন্দের একটা আশ্রম আছে, সেটার পরিচালক তারই বন্ধু বিপিন। সদানন্দ ভণ্ড, কিন্তু কোথায় যেন ধর্ম আর আধ্যত্মিকতা বিষয়ে গভীর কিছু ভাবনাও সে লালন করে। তবে মাধবীলতা নামে একটি মেয়ে আসার পরে আশ্রমের সমস্তটা উল্টেপাল্টে গেলো। এই হলো উপন্যাসের পট। অন্যভাবে বলতে গেলে, আশ্রমব্যবসার অন্তরালে লোক ঠকানো মানুষদের নিয়ে এই উপন্যাস।

কিন্তু শুধু সামাজিক বক্তব্যই যদি মারেন, লেখকের নাম তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কেন? কখনো লেখকের বর্ণনা, কখনো চরিত্রদের চেতনাপ্রবাহ; একটার মাঝে অন্যটাকে ঢুকিয়ে দিয়ে মানিক উদ্ভাবন করলেন একটা দুরুহ বর্ণনাভঙ্গি। আর আশ্রমব্যবসার মোড়কটাকে বাইরে রেখেই ঢুকে পড়লেন মানব মনের এমন দুরুহ সব কোণে, বাংলা সাহিত্যেই যেটার জুড়ি মেলা ভার। মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন যে পাঠক, অহিংসা তার জন্য অবশ্য পাঠ্য।

০৫। জীয়ন্ত (১৯৫০)
নিজের রাজনীতিকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলোর পটভূমি হিসেবে মানিক প্রায় প্রতিবারই ব্যবহার করেছেন কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা, একমাত্র ব্যতিক্রম হলো জীয়ন্ত, এই উপন্যাস রচনাকালের চাইতে কিছুটা দূরত্বের পটভূমিতে লেখা।

জীয়ন্ত উপন্যাসের সময়কাল ১৯২৬ সালের পরের সময়টা। গান্ধী অহিংস আন্দোলন শুরু করেছেন, কিন্তু মাঝপথে সেটাকে থামিয়েও দিয়েছেন দিয়েছেন। সর্বস্তরের মানুষ, বিশেহশ করে তরুণরা তাই নানা মতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেউ বলে গান্ধীই ভুল, কারো কাছে তার রাস্তাই ঠিক। কেউ রাশিয়ার কম্যুনিজমে আন্দোলনের বিষয়ে পড়ছে, কেউ চায় স্বদেশি আন্দোলনে ইংরেজ হটাতে। এমন একটা সময়েই, উপন্যাসের মূল চরিত্র প্রকাশ ওরফে পাকা খতিয়ে দেখতে চাইছে জীবনটাকে। জীবনের বিচিত্র স্বাদ নিতে বেশ্যাপাড়ায় যেতেও আপত্তি নেই তার। সে চামারদের সাথেও তাড়ি খায়, আবার উকিলের ছেলের সাথেও মেশে নির্দ্বিধায়। এবং নতুন মামি সুধার প্রতিও তার রয়েছে এক ধরনের প্রেম।

আশ্চর্য পর্যবেক্ষণ মানিকের। কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের রাজনীতিতে ব্যবহার করবার জন্য চামারদের বস্তি পুড়িয়ে হিন্দু আর মুসলিমদের দাঙ্গার পট তৈরি করা হয়। পোস্ট-ট্রুথের এই সময়ে দাঁড়িয়েও লক্ষ করি, রাজনীতির নষ্ট বয়ানে অমিতাভ আর প্রতিমার প্রেমও হয়ে পড়ে কালিমালিপ্ত। কার্লটন সাহেব কী করে ইংরেজদের আধিপত্য ধরে রাখছে বাঙালি বাবুর ওপর, সেটাও মানিকের চোখ এড়ায় না।

খেয়াল করা দরকার, মানিকের মতোই এই উপন্যাসের নায়ক প্রকাশও ১৯২৬ সালে ক্লাস নাইন পড়ুয়া। জায়গায় জায়গায় মানিকের সাথে তার আরো মিল লক্ষণীয় হয়ে ওঠে উপন্যাসে। এমন একটা মতও আছে, যে লেখকজীবনের ইতিকথা বা কলমপেষার ইতিকথা নামে যে আত্মজীবনী লিখতে চেয়েছিলেন মানিক, জীয়ন্ত তারই একটা উপন্যাস সংস্করণ।

০৬। আরোগ্য (১৯৫৩)
মানিকের সেরা উপন্যাসগুলোর একটা। অনেকটা পুতুলনাচের ইতিকথার মতোই, একটা দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শুরু হয় উপন্যাসটা, তারপর পাঠক ঢুকে যায় কেন্দ্রীয় চরিত্র কেশবের মনোজগতে।

কেশব গাড়ি চালায়, প্রতিরাতে কাজ শেষে সে ফিরে যায় শহরতলিতে থাকা তার পরিবারের কাছে। সেখানে পাশের বাড়ির বিধবা মায়ার সাথে সে পায় শারিরীক সুখ, মায়া তাকে নিয়ে ঘর বাঁধতে চায় এমনকি পালিয়েও। অথচ কেশব তা চায় না। ক্যানো, তার সমস্যা কোথায়?

মনোচিকিৎসক দত্ত জানায় কেশবের ভালোবাসা আসলে দুজনের প্রতি। একজন শহরের ধনীর স্বাধীনচেতা মেয়ে ললনা, যার বাপের গাড়ি কেশব চালায়। অন্যজন মায়া, যার কাছে দিনশেষে কেশব ফেরে শারিরিক সুখের জন্য। স্বাধীন এবং নতুন ভারতের আশ্চর্য প্রতীক হয়ে কেশব দুলতে থাকে মধ্যবিত্তের শহর আর নিম্নবিত্তের শহরতলির মাঝে।

০৭। হলুদ নদী সবুজ বন (১৯৫৬)
শহর কিংবা গ্রাম সরিয়ে রেখে মানিক প্রথমবারের মতো বনভূমির কাছের মানুষের জীবন আঁকলেন এই উপন্যাসে, লেখক জীবনের শেষ পর্যায়েও নতুন একটা স্বাদ আবিষ্কার করা গেলো তার লেখায়।

হলুদ নদী সবুজ বন উপন্যাসের পটভূমি ঘোলা কাদায় হলদে হয়ে যাওয়া এক নদী, পাশেই সমৃদ্ধ বন, সেথায় সুন্দরী আর গর্জন গাছের ভিড়ে হেঁটে বেড়ায় বাঘ। বনের নানা সংগ্রহ থেকে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য রয়েছে কয়েকটা কারখানা, সেখানে রয়েছে ইংরেজ আর দেশি সাহেব, তারা আড্ডাও দেয় ক্লাবঘরে।

উপন্যাসের শুরুতেই বাঘ মেরে বসে দেশি শিকারি ঈশ্বর, কিন্তু ইংরেজ রবার্টসন আর দেশি বড়লোকের বাচ্চা প্রভাস উভয়েই এই বাঘ মারার কৃতিত্ব চায়। অভাবের তাড়নায় ঈশ্বরও দুজনের কাছ থেকেই টাকা খায়। ঘটতে শুরু করে একের পর এক ঘটনা।


…  সংক্ষেপে এই হলো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনাবলীর একাংশ। বলা বাহুল্য, বর্ণিত তালিকা একেবারেই নিজস্ব পছন্দের সাক্ষর বহন করে, কোনোভাবেই একে নিরপেক্ষ বলা যায় না। যথার্থ সেরাদের নির্বাচন করতে পারনি, তা ভেবে, স্বীকার করি, খানিক অপরাধবোধও হচ্ছে।

তবে, এই তালিকার কল্যাণে ভবিষ্যতে কোনো পাঠক নতুন করে আবিষ্কার করবে মানিকের অবিশষণসম্ভব উপন্যাসের জগৎটি, সে আশায় বুক বেঁধে ওই অপরাধবোধকে আপাতত উড়িয়ে দিচ্ছি।

[মে, ২০২১]

প্রিয় পাঠক,
কয়েক বছর ধরে একক শ্রমে গড়ে তোলা এই ওয়েবসাইটকে আমি চেষ্টা করেছি অগণিত বাংলাভাষী ওয়েবপোর্টালের মাঝে স্বতন্ত্র করে তুলতে। নানা স্বাদের এসব লেখা নির্মাণে আমাকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে যথেষ্ট সময় আর শ্রম। এছাড়াও, পাঠক, আপনি এসব লেখা পড়তে পারছেন কোনো ধরনের বিজ্ঞাপণের উৎপাত ছাড়াই।

কাজেই প্রিয় পাঠক, স্বেচ্ছাশ্রমের এই ওয়েবসাইট চালু রাখতে প্রয়োজন হচ্ছে আপনার প্রণোদনার। আমরা চাইঃ এই সাইটের কোনো লেখা যদি আনন্দ দেয় আপনাকে, কিংবা আপনার উপকারে আসে- সেক্ষেত্রে ০১৭১৭ ৯৫৩০৮৭ (Personal) নাম্বারে বিকাশ (bKash) করে আপনি প্রণোদনা দিয়ে আমাদের উৎসাহিত করবেন।

আপনার সামান্য উৎসাহ বাংলাভাষী অন্তর্জালকে করে তুলতে পারে আরও আকর্ষণীয় লেখায় সমৃদ্ধ!