লেখালেখি

শাহরিয়ার কবিরের সেরা ১০ কিশোর উপন্যাস

অনলাইনে কিংবা চায়ের কাপের আড্ডায় কিশোর বয়েসীদের জন্য ভালো বইয়ের খোঁজ করতে দেখি অনেককে। আন্তর্জালের কল্যাণে বিদেশি ভাষার সুদৃশ্য কিশোরোপযোগী বইগুলোর নামধাম জানা সকলের জন্যেই সহজ এখন। কিন্তু বিপণনের আয়তনের স্বল্পতা হোক, বা সংশ্লিষ্টদের অনীহা; বাংলা প্রকাশনাগুলোর ক্ষেত্রে সেই ঘরানার বইগুলো নিয়ে বেশি আলোচনা দেখি না খুব একটা। বাংলাদেশের কিশোর সাহিত্যে মুহম্মদ জাফর ইকবালের অবস্থানটি দুর্দান্ত সবল, কিশোর বয়েসীদের জন্য ভালো বইয়ের তালিকায় সবাই তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর রচিত গল্প উপন্যাসের কথাই সচরাচর বলেন।

আড়ালে চলে যান শাহরিয়ার কবির।

অথচ, বলতে লোভ হয়, সাহস করে বলেই ফেলি তাই, যে শুধু কিশোর বয়েসীদের উপযোগী উপন্যাসের কথা বললে বাংলাদেশি লেখকদের ভেতরে শাহরিয়ার কবির আমার কাছে অদ্বিতীয়।

মুহম্মদ জাফর ইকবালের বইয়ের চরিত্র যে কিশোর-কিশোরীরা, তাদের দুষ্টুমির ঘরানাটা হাকলবেরি ফিনের মতোইঃ কৈশোরের শুভবোধ দিয়ে দুষ্ট ছেলের দলের অশুভকে পরাজিত করবার সেই চিরন্তন গল্পে কখনো কখনো রোমান্সের উপস্থিতি।

শাহরিয়ার কবিরের কিশোর উপন্যাসে বয়ঃসন্ধির রোমান্সের ভাবটা আরো বেশি স্পষ্টই নয় শুধু, তার গল্পের ধরনটাও পক্ষপাত করে হাকলবেরি ফিনের চাইতে সোভিয়েত ঘরানার কিশোর উপন্যাসগুলোর প্রতিই। কিশোরদের মাঝে ভালোর বোধটা উস্কে দিতে শাহরিয়ার কবির তার লেখার একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলেন রাজনীতি আর ইতিহাস সচেতনটাকে। সাদাকালোর চাইতে একটু বেশি যেন ধূসর শাহরিয়ার কবিরের কিশোর উপন্যাসের চরিত্রগুলো, অন্ততঃ ছকে ফেলা জঁরা উপন্যাসে যতটা হওয়া সম্ভব, ততটুকু।

অথচ আমাদের কৈশোরে খুব আগ্রহ নিয়ে পড়া শাহরিয়ার কবিরের উপন্যাসগুলোকে নিয়ে এখন আলোচনা প্রায় হতেই দেখি না আর। সেই অভাববোধ থেকেই, এ লেখায় চেষ্টা থাকলো শাহরিয়ার কবিরের কিশোর উপন্যাসগুলোর মাঝ থেকে সেরা ১০টা বেছে নেবার। বলে নেয়া ভালো, ক্রম এখানে কোনোভাবেই শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক নয়।

০১/ পুবের সূর্য
বাংলাদেশের প্রথম কিশোর উপন্যাস, শুধু এই একটা কারণেই তালিকায় রাখা যায় পুবের সূর্যকে। যুদ্ধকালীন সময়ের ক্ষত সরাসরি তুলে ধরেছে বলে আনোয়ার পাশার উপন্যাস রাইফেল রোটি আওরাত যথেষ্ট সমাদৃত বাংলাদেশের পাঠকের কাছে, পুবের সূর্য’ও সেই পথে হেঁটেছে।

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে কলকাতায় চলে যাওয়া শাহরিয়ার কবিরের সাথে পরিচয় ঘটে শিবরাম চক্রবর্তীর। শিবরামের সূত্র থেকে আলাপ হয় মৃণাল দত্তের সাথেও। মৃণাল দত্ত তার রোশনাই নামক কিশোর পত্রিকার শারদীয় সংখ্যার জন্য লেখা চেয়ে বসেন শাহরিয়ার কবিরের কাছে। শাহরিয়ারও তখন সেই ১৯৭১ সালের কলকাতায় বসে যুদ্ধদিনের উপন্যাস লিখলেন ঢাকার এক কিশোরের বয়ানে, যা পরের বছর কলকাতা থেকে ছাপা হয়ে ঢাকায় আসে।

০২/ নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়
সম্ভবত শাহরিয়ার কবিরের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস। ধানশালিকের দেশ পত্রিকায় বেরোনো এই উপন্যাস বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। ১৯৭৮ এর লাইপজিগ আন্তর্জাতিক বইমেলায় বিশ্বের সেরা পাঁচ কিশোর উপন্যাসের একটা বলে পুরস্কৃত হয়েছিলো নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়। কক্সবাজারের দক্ষিণে বাড়ি কিনলেন নেলী খালা, আর সেখানে শুরু হলো ভূতের উপদ্রব; এমন একটা পটভূমিতে আবির-বাবু-ললি-টুনি নামের চার টিনেজারের অভিযান নিয়ে টিভি নাটকও নির্মিত হয়েছিলো পরে।

উল্লেখ্য, এক যুগ পরে আবির-বাবু আর নেলী খালা-জাহেদ মামাদের নিয়ে পাথারিয়ার খনি রহস্য নামেও একটা উপন্যাস লিখেছিলেন শাহরিয়ার কবির; ধারণা করি সিক্যুয়েল উপন্যাসও বাংলাদেশের কিশোর সাহিত্যে সেটাই প্রথম।

০৩/ হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা
শাহরিয়ার কবিরের সবচেয়ে পরিণত কিশোর উপন্যাসগুলোর একটি। কমলালেবুর ঘ্রাণ আর শীতের ছুটির ঘন্টার মাঝে আবু-রামু-বিজুদের সাথে দেখা হয়ে যায় পলাতক রাজনৈতিক কর্মী দুলালদার, ওরা তাকে আশ্রয় দেয় নিজেদের চিলেকোঠায়। হাসি খালার মেয়ে সোনিয়া ছাড়াও উপন্যাসটা জুড়ে থাকে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের সময়টায় বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টিগুলোর কর্মকাণ্ড।

খেয়াল রাখা দরকার, রাজনীতি সচেতনতা আর যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা কিশোরদের মন, শাহরিয়ার কবিরের উপন্যাসে এ ব্যাপারগুলো বারবার এসেছে।

০৪/ হানাবাড়ির রহস্য
আশির দশকে পত্রিকায় প্রথম প্রকাশের সময় এই  উপন্যাসের নাম ছিলো রাজবাড়ির রহস্য, পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশিত হয় নতুন নামে।

কুটুমবাড়িতে বেড়াতে গেলো রাতুল,  সঙ্গে রয়েছে তার সহপাঠী এবং সম্পর্কে তার ছোড়দির দেবর রবি। জানা গেলো রবিদের গ্রামটায় তাদের পুর্বপুরুষেরা দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষী অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটনার। এখনো নাকি গ্রামের এক পোড়ো রাজবাড়িকে ঘিরে ভয়ের সব গল্পগাঁথা বোনে এলাকার মানুষ। অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী রাতুল সেই গ্রামে গিয়েই আরেক সাহসী কিশোর নবুকে নিয়ে পরিকল্পনা করলো রবিকে ভয় দেখানোর। কিন্তু হিচককীয় ঘরানার মতোই, কাহিনি মোড় নিলো অন্যদিকে।

০৫/ সীমান্তে সংঘাত
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিয়ে সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম উপন্যাস এটাই, কিশোরোপযোগী হলেও।

সময়কালটা ১৯৮০, যখন টুটুলের বাবা দুর্নীতিতে জড়াতে না চেয়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিলেন। চাষাবাদের ইচ্ছা আর নতুন করে সব গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে সপরিবারে টুটুলরা গেলো খাগড়াছড়ির রামগড়ে। পরিচয় হলো স্থানীয় হাইস্কূলের হেডমাস্টারের ছেলে বিদ্যুতের সাথে, সর্বহারা পার্টির পালিয়ে বেড়ানো যুবক আসিফের সাথে। মেজর জেনারেল মঞ্জুর আর শান্তিবাহিনীর মেজর রিকের আলাপনে পাঠক পরিচিত হয়ে উঠলো পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনীতিক সমস্যাগুলোর সাথে।

০৬/ নিকোলাস রোজারিওর ছেলেরা
শীতের ছুটিতে স্কুলের নিকোলাস স্যারের অধীনে স্কাউটিং করতে বেরিয়ে পড়লো একদল স্কুলপড়ুয়া। স্যারের দেয়া ধাঁধাঁ মিলিয়ে পথ খুঁজে তারা এসে হাজির হলো এক জমিদার বাড়িতে, সেখানে তখন চলছে সিনেমার শ্যুটিং।

১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি নিজেই ভারি সিনেমা-বান্ধব, চাইলে চমৎকার কিশোর সিনেমা বানানো সম্ভব কাহিনিটা দিয়ে।

০৭/  আলোর পাখিরা
জামাতে ইসলামের নেতারা যখন জোটের কল্যাণে ক্ষমতায়, আর ভারতে ভাঙা হয়েছে বাবরী মসজিদ, সে সময়টায় বাংলাদেশ যে হঠাৎ করেই যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখলো, কিশোরদের জন্য লেখায় তো বটেই, সংবেদনশীল এ বিষয়টি বাংলাদেশের উপন্যাসেই প্রায় বিরল। আলোর পাখিরা সেই কাজটা দারুণভাবে করেছে।

পুরোন ঢাকার স্কুলপড়ুয়া দুই বন্ধু রতন আর পিন্টু। গলায় গলায় তাদের ভাব, অথচ ধর্মকে কেন্দ্র করে খোদ ঢাকা শহরেই কারা যেন দুই বন্ধুর মাঝে বুনতে চাইলো বিভেদ। বাবরী মসজিদ ভাঙার পরবর্তী ঢাকা শহরের পরিস্থিতি জানতেও চমৎকার দলিল পরের ঘটনাগুলো। 

০৮/ কার্পেথিয়ানের কালো গোলাপ
বার্লিন প্রাচীর পতনের সময়টায় পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চেয়ে যে বিক্ষোভ হচ্ছিলো, সেইসব ভিনদেশি পটভূমিতে শাহরিয়ার কবির বেশ কিছু উপন্যাস লিখেছেন। তবে পটভূমি বিদেশ হলেও উপন্যাসগুলোর কেন্দ্রে সর্বদা ছিলো বাঙালি কিশোর-কিশোরীরাই। রাজপ্রাসাদে ষড়যন্ত্র বা বাভারিয়ার রহস্যময় দুর্গ, এই বইগুলো প্রায় একই ধাঁচে লেখা। তবু যে কার্পেথিয়ানের কালো গোলাপ-কে বেছে নিলাম, কারণ বর্ণনাভঙ্গি আর রাজনীতির মারপ্যাঁচে এই উপন্যাসটা অন্যগুলোর চাইতে অনেক পরিণত।

চাচার বাড়িতে আশ্রিত সুজন দুর্বিষহ জীবনের মাঝে একদিন ছাত্র ইউনিয়নের তরুণ প্রতিনিধি হিসেবে আমন্ত্রণ পায় রুমানিয়ার বুখারেস্টে। অন্যদিকে আকাশ নামে তুখোড় এক সাংবাদিক, মার্কিনি হলেও যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুবক, ভয়েস অফ আমেরিকার পক্ষ থেকে সেও হাজির রুমানিয়ায়। সময়টা ১৯৮৯, প্রতিবেশি দেশগুলোর অনুকরণে সেখানেও শোনা যাচ্ছে স্বৈরশাসক চসেস্কুর পতনের ডাক। তিমিসোয়ারা আর বুখারেস্টে ঘটতে শুরু করলো একের পর ঘটনা।

০৯/ রত্নেশ্বরীর কালো ছায়া
রত্নেশ্বরীর কালো ছায়াকে বেছে নেবার কারণ, এখানে গল্পটা কিশোরীদের নিয়ে। ক্ষুদে পাঠিকাদের অনুযোগেই নাকি শাহরিয়ার কবির তার এই উপন্যাসটা লিখেছেন ভক্ত কিশোরীদের নৈবেদ্য দিতে।

জাতীয় পতাকা ওঠাতে দেওয়া নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে স্কুল শিক্ষকের চাকরি ছাড়লেন তানিয়ার বাবা। সব ছেড়ে চলে গেলেন মীর্জাপুরের কাছে এক গ্রামে, সাম্প্রদায়িকতায় তটস্ত হয়ে থাকা সেই গ্রামে মেয়েদের স্কুল নির্মাণের জন্য শুরু হলো প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই; উপন্যাসটা এগিয়েছে এমন একটা কাহিনি নিয়ে।

১০/ অনীকের জন্য ভালোবাসা
শাহরিয়ার কবিরের ব্যতিক্রমী এই উপন্যাসটা আদ্যন্তই কিশোর অনীকের ব্যক্তিগত গল্প। অনীক জন্মগত ভাবে বাংলাদেশি হলেও তার বেড়ে ওঠা লন্ডনে, সে ভাঙা পরিবারের সন্তান। তার মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে, এবং নতুন বাবা দিব্যেন্দুর সাথে বোঝাপড়ার গল্প নিয়েই এই উপন্যাস এগিয়েছে।

সেরা দশে জায়গা না দিলেও একটু বিশেষ করে বলতে চাই আরো তিনটি বইয়ের কথা।
বার্চবনে ঝড় (সমাজতন্ত্রের পতন চেয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে বুলগেরিয়ায়, এমন পটভূমিতে বাঙালি কয়েক তরুণের কাহিনি)।
লুসাই পাহাড়ের শয়তান (পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীনে সাম্প্রদায়িক শক্তির পোষকদের মুখোমুখি হয়ে পড়ে কজন তরুণ।)
বহুরুপী ( শিংটোলার এক বিশাল প্রাচীন জমিদার বাড়ির পটে একদল কিশোর কিশোরীকে নিয়ে লেখা এই উপন্যাস নিখাদ অ্যাডভেঞ্চারধর্মী, রাজনীতির ছায়াপাত একদম অনুপস্থিত।)

সংক্ষেপে এই হলো শাহরিয়ার কবিরের কিশোরোপযোগী রচনাবলীর একাংশ। বলা বাহুল্য, বর্ণিত তালিকা একেবারেই নিজস্ব পছন্দের সাক্ষর বহন করে, কৈশোরের স্মৃতির ছানি আমাকে নিরপেক্ষ থাকতে দেয়নি কিছুতেই। যথার্থ সেরাদের নির্বাচন করতে পারনি, তা ভেবে, স্বীকার করি, খানিক অপরাধবোধও হচ্ছে।

তবে, এই তালিকার কল্যাণে ভবিষ্যতে কোনো পাঠক নতুন করে আবিষ্কার করবে শাহরিয়ার কবিরের আঁকা কিশোর মনের জগতটি, সে আশায় বুক বেঁধে ওই অপরাধবোধকে আপাতত উড়িয়ে দিচ্ছি।

[জানুয়ারি, ২০২১]

Previous

হেমিংওয়ে, অন্য লেখকদের নিয়ে

Next

ইসমাইল কাদারের অন্য আলবেনিয়া

4 Comments

  1. বাহ, দারুণ একটা কাজের লেখা হয়েছে এটা। অনেকগুলোই না-পড়া। বার্চবনে ঝড়, নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়, একাত্তরের যীশু আর বাভারিয়ার দূর্গ- এগুলা সবচেয়ে প্রিয় ছিল আমার।
    অনেক ধন্যবাদ।

  2. জে

    অনেক ধন্যবাদ আপনাকে বইগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য!

Leave a Reply to সুহান রিজওয়ান Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: