মৃদু মানুষের মাস্তুলহীন মন

(১)
আসগর ফারহাদি যখন জীবনে প্রথমবারের মতো সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে ঢোকেন, ততদিনে তিনি পা রেখেছেন কৈশোরে, আর ইসলামি বিপ্লবের হাত ধরে ইরানের সুপ্রিম লিডার হয়ে বসা আয়াতুল্লাহ রুহুলউল্লাহ খোমেনির বিরুদ্ধে তখন যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন ইরাকের সাদ্দাম হোসেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে মিত্রশক্তির দেশগুলো যে সব সিনেমা বানিয়েছিলো, জাতীয়তাবাদ উস্কে দিতে সেই সব সিনেমাই তখন জোরেশোরে দেখানোর ধুম পড়েছে ইরানের হলগুলোতে। ইরাকের সাথে যুদ্ধ বলে পাবলিকও তখন খুব খাচ্ছে সেই জিনিস।

ফারহাদি যেদিন প্রথম সিনেমা দেখতে যান, গুষ্টির আরো কিছু ভাইবোনকে নিয়ে বাসে করে সেদিন শহরে পৌঁছতে খানিক দেরিই হয়ে যায় তার। হলে ঢুকতে ঢুকতে পেরিয়ে যায় সিনেমার প্রায় অর্ধেক। কিন্তু তাই বলে কি ক্ষুদে দর্শকদের আনন্দ কমে? নাহ, বরং সিনেমার পর্দায় তরুণ এক যোদ্ধা, যে নাৎজিদের রুখে দিতে কড়া ফাইট দিচ্ছিলো পূর্ব ইউরোপের কোথাও, সেটা দেখে সকলে একেবারে বিগলিত। বলাই বাহুল্য, শেষ দৃশ্যে নায়ক যথারীতি গলা কেটে নিয়েছিলো নাৎজি শয়তানদের।

কিন্তু সিনেমা দেখা শেষেও ফারহাদির ঘোর কাটে না। সিনেমার যে অংশগুলো সে দেখতে পায়নি, সেগুলোয় কী হতে পারতো; সেই চিন্তাই দিনের পর দিন ঘুরতে থাকে তার ছোট্টো মাথায়। এবং নিজে সে ক্যামন সিনেমা বানাতে চায়, সে বিষয়েও তখনই স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যায় ক্ষুদে আসগর ফারহাদি।

আমি চাই না দর্শকের কাছে সিনেমাটা শেষ হয়ে যাক। আমি চাই দর্শক যেন ছবি শেষ হয়ে যাবার পরেও সেটা মন থেকে মুছতে না পারে। আমি চাই তারা যেন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে।

আর আসগর ফারহাদির সিনেমার দর্শক মাত্রই জানেন, কতটা সত্য এই দাবি। এ সেপারেশন সিনেমার একেবারে প্রথম দৃশ্যেই যেমন নাদের আর সিমিন ক্যামেরার মুখোমুখি হয়ে জনৈক বিচারকের কাছে বর্ণনা করতে থাকে তাদের দাম্পত্য সমস্যা, বোঝা যায়, প্রতীকী ভাবে দর্শককেই আসলে বিচারকের আসনে বসাচ্ছেন পরিচালক ফারহাদি।

এই দৃশ্য, আমার কাছে, আরো বড় পরিসরে হয়ে ওঠে ফারহাদির সমস্ত গল্পের জন্যই প্রতীকী। আমার আর আমার মতো অজস্র মৃদু মানুষের একান্ত ব্যকিগত যে সংকটগুলো, সিনেমার পর্দায় ফারহাদির চরিত্রগুলো যেন ঠিক সেগুলোই তুলে ধরে। কোন কাজটা ঠিক আর কোন কাজটা আমাদের করা অনুচিত; দর্শকেরা তা জানে। কিন্তু তবু সে কোনো পক্ষ নিতে পারে না। কারণ আসগর ফারহাদি দর্শককে বসিয়েছেন বিচারকের আসনে। এবং এই বিচারটা ঠিক আইনী বিচার নয়। আইনের পুঁথিপুস্তকের চেয়ে বহুগুণে জটিল মানুষের যে মাস্তুলহীন মন, ফারহাদির সিনেমায় দর্শককে সেটারই অনুবাদ করতে হয়।

(২)
কী থাকে আসগর ফারহাদির সিনেমায়? ক্রিস নোলানের মতো মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া আইডিয়া, বং জুন হো এর মতো দুর্দান্ত গপ্পোবাজি, ওয়েস অ্যান্ডারসনের মতো চোখ ট্যারা করে দেওয়া দৃশ্যধারণ? নাহ, ফারহাদির সিনেমায় ক্যামেরা বরং অধিকাংশ সময়ে ঘোরাফেরা করে ঘরের ভেতরেই। কখনো কখনো সেটা স্বাদ বদল করতে যায় প্রতিদিনের ব্যস্ত মিরপুরকে মনে করানো কোনো গাড়ি চলা রাস্তায়, কিংবা গড়পড়তা কোনো কফিশপে, অথবা মগবাজারের গলির ভেতরের কোনো খুব চেনা আর বহু ব্যবহারে জীর্ণ রেস্তোঁরাতে। দা পাস্ট সিনেমায় যেমন দেখা যায় যে চিরকালের স্বপ্নীল প্যারিস শহরও আর উডি অ্যালেনের মতো রোমান্টিকতা মেখে নেই ফারহাদির হাতে, আইফেল টাওয়ার বা সিন নদীকে ছেড়ে এসে সেটা হয়ে গেছে আমাদের প্রতিদিনের ক্লান্তিকর জীবনযাপনের কোনো এক মেট্রোপলিস কেবল।

অথচ আটপৌরে এসব অনুষঙ্গ থেকেই শুধুমাত্র কয়েকটা ব্যক্তি মানুষের গল্প বলে আসগর ফারহাদি বের করে আনেন থ্রিলারের মতোই তীব্র গতি। সিনেমা যত এগোয়, বাড়ে দর্শকের উৎকণ্ঠা। কী হলো, কী হবে; এই মনোভাব বাড়িয়ে তোলে তার বুক ধুকপুক। আমরা আবিষ্কার করি, আমাদের প্রতিদিনের জীবনেই লুকিয়ে আছে কত ছলনা আর রহস্য। দেখতে পাই, আমাদের ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো কত দ্বৈততায় পরিপূর্ণ।

অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নিয়েই এগোচ্ছে বর্তমানের গল্প, প্রাচীন গ্রীক ট্রাজেডিগুলোতে আমরা এই রীতি অনুসৃত হতে দেখেছি। ফারহাদির সিনেমাতেও এমন একটা নিজস্ব রীতি রয়েছে। গল্পটা এখানে প্রায়ই এগোয় এমন কোনো ঘটনার ওপর ভর করে, যা পর্দায় দেখানো হয়নি।

অ্যাবাউট এলি সিনেমায় যেমন এলির উধাও হয়ে যাবার ঘটনাটা পর্দায় দেখানো হয়নি, দা সেলসম্যান সিনেমায় যেমন অস্পষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে কোনো এক যৌন হয়রানির ব্যাপার, এভরিবডি নোজ সিনেমায় যেমন দেখানো হয়নি লরা আর পাচো’র অতীত।

পর্দায় না দেখানো এসব ঘটনা হঠাৎ করেই ফারহাদির সিনেমায় দর্শকের সামনে উঠে আসে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে। গল্পের চরিত্রদের সাজানো জগত ক্রমশ তছনছ হয়ে যায় তখন। একটা সংকট সৃষ্টি করেই ফারহাদি নির্ণয় করতে চান মানুষের মনের পাটিগণিত। বলেনঃ

চরিত্রগুলোকে বোঝানোর জন্য আমার তো একটা সংকট লাগবে ! … ধরুন, লিফটের মাঝে একদল লোক। এখন একতলা থেকে ষোলোতলা পর্যন্ত যদি এই মানুষগুলোর যাত্রাটা নির্বিঘ্ন হয়, তাহলে কিন্তু প্রতিটি লোক অপরের কাছে অচেনাই থেকে গেলো। কিন্তু ধরুন লিফটটা যদি পনেরো থেকে ষোলো তালার মাঝে আধঘন্টার জন্য আটকে যায়, তখন কিন্তু মানুষগুলোর মাঝে একটা মিথস্ক্রিয়া শুরু হবে। সংকটের মুহুর্তেই আমরা নিজেদের আসল চেহারাটা বের করে আনি।

আর ফারহাদির সিনেমায়, লিফট ক্যানো আটকে গেছে, আমাদের কাছে সেই প্রশ্নটা বড় হয়ে ওঠে না আর। বড় হয়ে ওঠে, বন্ধ লিফটের ভেতরে ক্যামন করে ভেঙেচুরে যাচ্ছে গল্পের চরিত্রদের সামাজিক, নৈতিক আর মানসিক অবস্থান। গল্পের মোচড়ের বদলে দর্শক বরং আটকে পড়ে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে চরিত্রগুলো কীভাবে মানসিক দ্বন্দ্বে ছটফট করছে, তা দেখতেই।

ফারহাদির চরিত্রগুলোকে কিছুতেই অনিঃশেষ ভালোবাসা যায় না, তবু যে তাদের সাথে আমরা একাত্ম হই, কারণ আমরা আবিষ্কার করি যে ক্ষুদ্রতায় তারা আমাদের মতোই দুর্বল, নশ্বর।

(৩)
টেনে-টুনে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান বলা যায় ফারহাদিকে, তার বাবার একটা দোকান ছিলো। শিল্প সংস্কৃতি নিয়ে খুব বেশি নিয়ে মাথা না ঘামালেও ছেলের আগ্রহে বাবা-মা কখনো বাদ সাধেননি। তেরো বছর বয়েসেই ফারহাদি তাই নিজের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটা বানিয়ে ফেলেন তরুণদের জন্য আট মিলিমিটারের ক্যামেরা দিয়ে। খোমেনি সরকার শহরে শহরে তরুণ প্রজন্মের জন্য সোভিয়েত ধরনে যে সরকারি সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তৈরি করেছিলো, ক্যামেরাটা এসেছিলো সেখান থেকেই। কী ছিলো ফারহাদির প্রথম সিনেমার বিষয়বস্তু? দুই স্কুল পড়ুয়া কিশোরের একটা রেডিও কুড়িয়ে পাওয়া আর সেটা ভাগাভাগি করা নিয়ে এক গল্প।

খেয়াল রাখা দরকার, মানুষের মাঝে বোঝাপড়া আর অসমাপ্ত গল্পের শক্তি নিয়ে ফারহাদির চিন্তা ভাবনা শুরু হয়ে গেছিলো সেই কৈশোরেই।

চেয়েছিলেন সিনেমা নিয়ে পড়বেন, কিন্তু তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ভাবলো নাট্যকলার জন্যই বেশি যোগ্য। প্রত্যাখ্যানটা পরবর্তীতে শাপে বর হয়ে আসে ফারহাদির জন্য। কারণ ইবসেন আর চেকভেরা তাকে শেখালেন এমন কিছু, যা সিনেমার পর্দা থেকে তিনি শিখতে পারেননি আগেঃ ক্যামন করে গল্প নির্মাণ করা যায় কোনো নির্দিষ্ট নায়ক ছাড়াই, অথবা এমন করে গল্প বলা, যেখানে সকলেই নিজেকে নায়ক বলে ভাবে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই ইরানের বিবিসি বলে খ্যাত IRIB রেডিওর জন্য ধারাবাহিক নাটক লিখে খ্যাতি পেয়ে যান ফারহাদি, ডাক আসা শুরু হয় টিভির প্রযোজকদের কাছ থেকেও। ফারহাদি এবার চুক্তিতে আসেন IRIB এর সাথে, শুরু হয় তার পরিচালক জীবন। ফলে তেইশ বছরে বয়েসেই আসগর ফারহাদি হয়ে বসেন জাতীয় টিভির ধারাবাহিকের লেখক এবং পরিচালক। টেইল অফ আ সিটি নামে একটা ধারাবাহিক শুরু করেন তিনি, যার প্রতিটি পর্বে দেখানো হয় ভিন্ন ভিন্ন সব গল্প। দারিদ্র্য, দেশত্যাগ, মাদক, এইডস রোগ; ফারহাদির ক্যামেরায় একের পর এক সামাজিক ইস্যু উঠে আসতে থাকে ক্রমাগত। সেন্সরশিপের কর্তারা মাঝে মাঝে কিছু দৃশ্য কেটে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওই টিভি সিরিজ ফারহাদিকে করে তোলে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখ।

t100_farhadi.jpg
আসগর ফারহাদি (ছবি সৌজন্যঃ দ্যা টাইমস)

(৪)
খানিক নজর দেয়া যাক ফারহাদির সিনেমাগুলোর গল্পে।

ফারহাদির প্রথম দুটো সিনেমাকে বলা যায় টেইল অফ আ সিটি নামের সেই টিভি ধারাবাহিকেরই গল্পেরই সম্প্রসারণ, আরেকটু গোছালো ভাবে। ড্যান্সিং ইন দা ডাস্ট আর দা বিউটিফুল সিটি নামের এই সিনেমা দুটোয় উঠে এসছে ইরানের প্রান্তিক তরুণ তরুণীরা, যারা পালাতে চায় তাদের চেনা পরিবেশকে পেছনে ফেলে।

ফারহাদির তৃতীয় সিনেমা ফায়ারওয়ার্ক্স ওয়েডনেসডে-এর ঘরানা আবার আলাদা। মধ্যবিত্ত এক দম্পতির অবিশ্বাস ভরা জীবনকে এখানে পর্যবেক্ষণ করে এক তরুণী গৃহপরিচারিকা, সাথে দর্শকের চোখ পড়ে ইরানের সামাজিক শ্রেণি বিভাজনেও। পরের দিনগুলোয় যে সব সিনেমা দিয়ে আসগর ফারহাদিকে চিনবে দর্শক, তার স্বরটা যেন আবিষ্কার করা যায় এই সিনেমাতেই।

পরের সিনেমা অ্যাবাউট এলি-তেও ফারহাদির বিষয়বস্তু প্রেম আর ইরানের সামাজিক প্রথা। কাস্পিয়ান সাগর পারে ছুটি কাটাতে গিয়ে কয়েকটি মধ্যবিত্ত পরিবার কী দারুণ মানসিক টানাপোড়েনের দ্বন্দ্বে পড়ে গেলো, এ ছবিতে দেখানো হয়েছে সে গল্প।

ফারহাদির পরের দুটো ছবিতেই (এ সেপারেশন আর দা পাস্ট) বিষয়বস্তু সম্পর্কের ভাঙন। এ সেপারেশন সম্পর্কের ভাঙনের সাথে যেমন আলাদা করে তুলে এনেছে ইরানের সমাজে শ্রেণি বিভাজনের নারীদের অবস্থান। আর দা পাস্ট তুলে এনেছে সম্পর্কের ভাঙনের সাথে নতুন একটা সম্পর্কে জড়ানোর জটিলতা। বিশেষ করে দা পাস্ট সিনেমায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ফারহাদির আসল ক্যানভাস হলো ব্যক্তি মানুষের মন, পৃথিবীর সমস্ত দেশেই যা অংক মেনে চলে না। আমরা দেখি, যে গল্পের পটভূমি তেহরান থেকে পালটে প্যারিস হয়ে যাওয়াতেও একে চেনা যায় নিখাদ ফারহাদির সিনেমা বলে।

দা সেলসম্যান সিনেমা এগিয়েছে ‘ডেথ অফ আ সেলসম্যান’ নাটকের মঞ্চায়ন নিয়ে ব্যস্ত থাকা এক দম্পতিকে নিয়ে, যেখানে স্ত্রী শিকার হয় একরকমের যৌন হয়রানির। আর এভরিবডি নোজ সিনেমার কেন্দ্রে রয়েছে একটি অপহরণ, আর সেটাকে কেন্দ্র করে উঠে আসা পরিবারের অতীতের কিছু ঘটনা।

(৫)
ফারহাদির সমস্ত কাজের মধ্যে খানিক আলাদা করে বলতেই হয় এ সেপারেশন নিয়ে, খ্যাতি আর আলোচনায় এই সিনেমা বহুদূর ছাড়িয়ে গেছে ফারাহাদির অন্য সমস্ত সিনেমাকে।

সিনেমার প্রথম দৃশ্যেই যে ১৪ বছর একত্রে সংসার করে আসা সিমিন আর নাদের দম্পতি ক্যামেরার মুখোমুখি বিচারকের দিকে তাকায়, সে কথা তো আগেই বলেছি। সিমিনকে আমরা সেখানে দেখি বিচ্ছেদ চাইতে, কারণ ইরান ছেড়ে অন্য কোনো দেশে যেতে চায় সে, যাবার ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে তার, অথচ তার স্বামী রাজি নয় সেটায়। অন্যদিকে আলঝেইমার আক্রান্ত বৃদ্ধ বাবার যত্ন নেবার জন্য কেউ থাকবে না, এই ভাবনা থেকে নাদের দেশেই থাকতে চায়।

ক্যানো দেশ ছাড়তে চায়, প্রশ্নের জবাবে সিমিন কেবল বলে, নিজের মেয়েকে এমন একটা পরিবেশে সে বড় হতে দিতে চায় না। ক্যামন পরিবেশ? সিমিন সেটার উত্তর দিতে পারে না, যাদুকর ফারহাদি ততক্ষণে গল্পকে নিয়ে যান অন্য কোথাও; কিন্তু দর্শকের মাথায় ঘুরতে থাকে সিমিনের জবাব না দেওয়া প্রশ্নটিঃ ক্যামন পরিবেশে বাস করেন ইরানের মেয়েরা?

ভুলে যাওয়া চলে না যে মুক্তির পর অজস্র দর্শকের কাছ থেকে যেমন উষ্ণ অভিবাদন পেয়েছে এই সিনেমা, সাথে কিন্তু গরম গরম গালি খাবার গৌরবও সে অর্জন করেছে। সিমিনের চরিত্রটা দিয়ে পাশ্চাত্যের জীবনের দিকে উন্মুখ তাকিয়ে থাকা ইরানি মধ্যবিত্তদের মানসিকতা দিয়ে নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে বলে কেউ কেউ ফারহাদিকে বাহবা দিয়েছে, আবার আধুনিক যান্ত্রিক জীবনের সামনে রাজিয়ার মতো ধার্মিকদের অসহায়তার সংকটটা প্রকাশ হয়ে গেছে বলে অনেকেই পরিচালককে শুনিয়ে গেছে নিন্দা।

কিন্তু দেশপ্রেমিকদের ওসব উদ্বিগ্নতা সরিয়ে রেখে দর্শকের দৃষ্টিতে তাকালে আমাদের চোখে কেবলই ভাসে নাদেরের কান্নার দৃশ্যটা। ধর্ম নিয়ে বেশি মাথা না ঘামানো আদর্শ মধ্যবিত্ত প্রতিনিধি নাদের খানিক আগেই রুঢ় ব্যবহার করেছে গৃহকর্মী রাজিয়ার সাথে (যার চরিত্রটি ধার্মিক, রক্ষণশীল নিম্নবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি), চুরির অপবাদ দিয়েছে মহিলাটিকে এবং ধাক্কা মেরে তাকে বের করে দিয়েছে ঘরের বাইরে। কিন্তু নাদেরের অসুস্থ বাপকে বিছানার সাথে বেঁধে রেখে গিয়ে কি রাজিয়া আরো গুরুতর অন্যায় করেনি নাদের সাথে? (রাজিয়ারও অবশ্য ব্যক্তিগত কিছু কারণ আছে এই জঘন্য কাজ করার, যা সিনেমায় উন্মুক্ত হয় পরে)।

তবু, মনের ভেতরে নাদের জানে, রাজিয়ার সাথে সে ঠিক ব্যবহার করেনি। ফলে কাঁপতে থাকা ক্যামেরা যখন এগিয়ে যায় নাদেরের ঘাড়ের ওপর দিয়ে, আমরা দেখি, লোকটা ভেঙে পড়েছে কান্নায়। পিতার হাতে বেড়ে ওঠা পুত্র এখন সেবা করছে পুত্রের, এই দৃশ্যের পাশাপাশি দর্শক বোধ করে, যে কী অসহনীয় আর বিপরীতমুখী সব অনুভূতির মাঝ দিয়ে আমাদের হেঁটে যেতে হয় প্রতিদিনের জীবনে।

একবিংশ শতাব্দীর সিনেমায় এমন দৃশ্য সম্ভবত আমরা খুব কমই দেখেছি। ব্যক্তি মানুষের ঔচিত্যবোধের অনুভূতিকে এমন আশ্চর্য বৈপরীত্যে দোলাতে পারার ক্ষমতাও খুব বেশি পরিচালকের নেই।

(৬)
শ্যুটিং শুরুর আগে বহুবার মহড়া দেবার ছাড়াও আসগর ফারহাদি অভিনেতাদের নিয়ে বোঝাপড়া করেন স্থানিস্লাভস্কি’র পদ্ধতিতে। চিত্রনাট্য মুখস্থ করবার বদলে অভিনেতারা সেখানে একে অপরের সাথে মেশেন চরিত্রের ভেতরে ঢুকে গিয়ে, যাতে করে নিজেদের পেছনের গল্পটাকে তারা এমনভাবে ধারণ করতে শেখেন, যেটা পরে স্বতস্ফূর্ত ভাবে অভিনয়ে চলে আসবে। অ্যাবাউট এলি সিনেমার কথাই ধরা যাক। এলি বাগদত্তা ছিলো যে মানুষটির সঙ্গে, পর্দায় সে মানুষটি উপস্থিত হয় সিনেমার একেবারে শেষ দিকে, এলির অন্তর্ধানের পর। কিন্তু ফারহাদির নির্দেশে এ দুজন মহড়ার মাঝে বহুবার একে অপরের চরিত্রটির সাথে বোঝাপড়া করেছে। ফারহাদি মনে করেন এই কাজটা খুব জরুরী ছিলো, নইলে অভিনয়ের সময় অন্যজনের ছবিটা মনে ঠিক স্পষ্ট হবে না।

কিন্তু অভিনেতাদের প্রতি এই অখণ্ড অধ্যাবসায়ের চেয়েও আমায় টানে লোকটার প্রতীকী দৃশ্যের ব্যবহার, ছোট ছোট ঈশারায় কী চমৎকার করে বহু অব্যক্ত কথা বুঝিয়ে দ্যান আসগর।

দা পাস্ট সিনেমার একেবারেই শুরুতেই যখন দেখা যায়, যে গাড়ি পেছাতে গিয়ে খুব সতর্ক থেকেও দুজন মানুষ একটা দুঘর্টনা ঘটিয়ে দেয়; আমরা তখন বুঝি যে অতীতের মুখাপেক্ষী হওয়াটা কী বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে আমাদের জীবনে। একই সিনেমায় এলোমেলো হয়ে থাকা বাড়িটা আমাদের বুঝিয়ে দেয় ম্যারি চরিত্রটির মনোজগতও ক্যামন বিপর্যস্ত। অ্যাবাউট এলি’তে যখন ছুটি কাটাতে আসা দলটি হোটেল খালি না পেয়ে ছুটে বেড়ায় এখান থেকে ওখানে, আমরা তখন বুঝি টানাপোড়েনে থাকা মানুষ কী করে আশ্রয় খুঁজছে একটা থেকে অন্য একটা সম্পর্কে যেয়ে। আবার এ সেপারেশন সিনেমায়, তিরমে নামের কিশোরীটি যে তার বাবা-মায়ের মাঝে সমঝোতার একটি যন্ত্রের বেশি কিছু নয়,বাবার আদেশে মেয়েটিকে পেট্রোল পাম্পের বিক্রেতার সাথে তর্ক করতে নামিয়ে দিয়ে সেই বিষয়টাও আমাদের কাছে স্পষ্ট করেন ফারহাদি।

(৭)
ইরানি কোনো চলচ্চিত্র পরিচালককে নিয়ে বলতে গেলে সে দেশের সিনেমার ওপর আরোপিত সেন্সরশিপের ব্যাপারটা চলে আসাটা অবধারিত। ইরানের প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে যার বানানো সিনেমাগুলো সবসময় দ্রোহে ভরপুর, ফারহাদির কাছের বন্ধু সেই জাফর পানাহির কথাই ধরা যাক।

২০১০ সালে পানাহির বিরুদ্ধে মামলা হয় সিনেমার মাধ্যমে সরকার বিরোধী প্রচারণা চালানোর অভিযোগে। ০৬ বছরের জন্য কারাবাসের শাস্তি পান পানাহি, ২০ বছরের জন্য তার সিনেমা বানানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়, জারি করা হয় দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা। শেষতক অবশ্য পানাহিকে জেল খাটতে হয়নি, এবং নিজের মতোই তিনি এখনো ঘাড়ত্যাড়ামি করে যাচ্ছেন, নির্মাণ করে যাচ্ছেন আন্ডারগ্রাউন্ড কিছু সিনেমা, যেগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ছে দেশে বিদেশে।

তো, ইরানের এই সেন্সরশিপের জন্য কি তাহলে ফারহাদির সিনেমাকে আপোষ করতে হচ্ছে? তার গল্পগুলো কি ঠিক পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে না? ফারহাদি নিজে সেটা মনে করেন না। হ্যাঁ, অন্য দেশে বসে সিনেমা বানালে ফারহাদি হয়তো সেখানে মাথায় অভিনেত্রীদের মাথায় স্কার্ফ চাপিয়ে দিতেন না (ইরানে যা বাধ্যতামূলক), বা তার সংলাপগুলো হয়তো আরো সরাসরি হতো; কিন্তু বড় মাত্রায় তার সিনেমায় কোনো পরিবর্তন আসতো না বলেই তার ধারণা।

এভরিবডি নোজ সিনেমার কথাই ধরি। বহু বছর পর বোনের বিয়ে উপলক্ষে লরা ঘুরতে এসছে নিজ গ্রামে। তারুণ্যে তার সাথে প্রেম ছিলো পাচো’র; সেই পাচো এখনো লরার পরিবারের কাছের মানুষ। এই পুরো ব্যাপারটি ইরানের একটা গ্রামের পটভূমিতেও বেমানান হতো না। কিন্তু গল্পের পটভূমি যেহেতু স্পেন আর শ্যুটিং-এ নেমে ফারহাদি যখন আবিষ্কার করলেন যে স্প্যানিশরা এসব বিষয়ে আরো বেশি উদারমনা, গল্পের নাম তাই পালটে গেলো। চিত্রনাট্যের নাম ‘নোবডি নোজ (কেউ জানে না)’ থেকে হয়ে গেলো ‘এভরিবডি নোজ (সবাই জানে)’

কিন্তু তবু, ফারহাদি অনুধাবন করেন, শিল্পীর জন্য কী ভীষণ প্রতিবন্ধকতা হয়ে আসে সেন্সরশিপের এই কালা কানুন। বলেনঃ

লোকে বলে যে প্রতিবন্ধকতা থাকলে সৃষ্টিশীলতা বেড়ে যায়। আমার মনে হয় এই কথাটা স্বল্পমেয়াদে খাটে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসলে সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দেয়।

প্রায়ই দেশের বাইরে গিয়ে সিনেমা বানালেও, আসগর ফারহাদির মাথায় অবশ্য তার সিনেমার চরিত্রগুলোর মতো পাকাপাকি ভাবে দেশের বাইরে (বলা ভালো, পাশ্চাত্যে) বসত গাড়ার চিন্তা এখনো ঠাঁই পায়নি।

(৮)
ভিনদেশের বুকে, ভিন্ন সংস্কৃতির প্রেক্ষিতে সিনেমা বানাতে গিয়ে কি অসুবিধা হয় ফারহাদির? হওয়ার কথা নয়। ফারহাদির গল্পগুলো এমন ব্যক্তিগত, যে দেশ, ভাষা, সংস্কৃতির বিভাজনের রাজনীতি অপাংক্তেয় থেকে যায় তার বর্ণনায়।

তবে বিভাজনের রাজনীতির শিকার ফারহাদি নিজেও।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, দা সেলসম্যান সিনেমাটা অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পাবার দিন কয়েক পরেই মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক আইনে সাক্ষর করেন, সাদা ভাষায় লোকে যেটাকে মুসলিম ব্যান বলে ডাকে। সেই আইনের অধীনে সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের ওপর জারি করা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশের ওপর ৯০ দিনের এক নিষেধাজ্ঞা।

দিন দুয়েক এক বিবৃতি দিয়ে আসগর ফরহাদি নিজেই অস্কার অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দেন, তবে তার প্রতিনিধিত্ব করতে তিনি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে বসেন দুজন ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকানকে। তাদের একজন ফিরোজ নাদেরি (নাসা’র বিজ্ঞানী), এবং অন্যজন আনুশেহ আনসারি (মহাশূন্যের প্রথম মহিলা পর্যটক)।

কিন্তু ক্যানো নিজের লিখিত বক্তব্য পাঠ করবার জন্য ঠিক এ দুজনকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আসগর ফারহাদি? নাদেরির ধারণা, কারণটা হচ্ছে, মহাশূন্য হতে তাকালে অদৃশ্য হয়ে যায় মানুষের তৈরি করা রাষ্ট্রীয় সীমান্তগুলো।

(৯)
টাইম ম্যাগাজিন ২০১২ সালে দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী লোকেদের তালিকায় নাম তুলেছিলো আসগর ফারহাদির। সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে ফারহাদি অস্কার জিতেছেন দু’বার, এ সেপারেশন আর দা সেলসম্যান এর সুবাদে; যে কীর্তি আগে রয়েছে আকিরা কুরোসাওয়া কি ফেদেরিকো ফেলিনির মতো এক নামে পরিচিত পরিচালকদের।

কিন্তু কাগুজে এসব ফিরিস্তির বাপেরও সাধ্য নেই ফারহাদির গল্পের সৌন্দর্য্যটা বোঝায়।

ফারহাদির গল্প তো আমাদের প্রতিদিনের জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত সেইসব ঘটনা; যা আমরা হাসিমুখে আড়াল করে রাখি অফিসের লাঞ্চবক্সের বিরতিতে, পরিবারের ভোজসভায়, চিবুকের চেয়েও আপন মানুষটার কাছে! ফারহাদির গল্প আমাদের ঢেকে রাখতে চাওয়া অতীতের। ফারহাদির গল্প, নিজের ভুল বুঝতে পেরেও সেটাকে গলার ভেতর চেপে রেখে বাথরুমের ঝরনার নিচে আমাদের নিঃশব্দে কেঁদে ফেলার।

নৈতিকতা আর স্বার্থপরতার স্ব-নির্মিত যে ল্যাবিরিন্থে আমরা লুকিয়ে থাকি দিনভর, তুচ্ছ একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসগর ফারহাদি সেখান থেকে আমাদের বের করে আনেন একটা বিভক্ত রাস্তার মাথায়। অগ্রসর হতে হলে দর্শকের সামনে তখন থাকে দু’টি বিপরীত পথ। সম্পর্ক রাখা অথবা ভেঙে ফেলা, ভালোবাসা অথবা ঘৃণা করা, অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকা অথবা ভবিষ্যতকে পুঁজি করা, জীবনের কাছে ফেরা অথবা মৃতের জন্য শোকপালন। জটিল এসব চিন্তার মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের হৃদয় তখন হয়ে পড়ে মাস্তুলহীন, দিশেহারা।

আর একবিংশ শতাব্দীর এই তুমুল কলরবের মাঝ থেকে মানুষকে নিজের হৃদয়ের দিকে তাকাতে বাধ্য করেন যে শিল্পী, তাকে নমস্য না মেনে উপায় নেই।

[৪ঠা মে, ২০২০]