প্যাটারসন আর পেসোয়াঃ না বাস-ড্রাইভার, না কেরানি

(১)

খেয়াল করলে দেখা যাবে, অজস্র অনাচার আর শ্বাপদে ভরে থাকা আমাদের ক্যারেক্টারলেস ঢাকা শহরকেও কোনো কোনো দিন অসম্ভব সুন্দর দেখায়। এক একটা পথশিশুর মুখের আদলে সেদিন আবিষ্কার করা যায় লেপচা কোনো পিচ্চিকে, কিংবা ভিজে সপসপ প্যান্টে ছিট ছিট কাদা নিয়েও বৃষ্টির পরে নিজেকে মনে হয় সম্রাট। সেইসব দিনে মনে হয়, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা আর সময়ের পৃথিবীতে পঞ্চম কোনো মাত্রা হয়ে আসে সংবেদনশীলতা। আর আমরা জানি, ওই বিশেষ মাত্রাটিকে নিয়ত আবিষ্কার করা যায় একজন কবির হৃদয়ে। আমাদের প্রতিদিনের বিড়ালের মুখে ধরা ইঁদুরের জীবনেও তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগাতে পারে একজন কবি। আর সৌন্দর্য্য আবিষ্কার করতে একজন প্রকৃত কবির পিরামিড কি তাজমহলের প্রয়োজন হয় না, তিনি সৌন্দর্য্যকে খুঁজে নিতে পারেন আমাদের চারপাশের ছড়ানো সাধারণের মাঝ থেকেও। জিম জারমুশের ধীর লয়ের সিনেমা প্যাটারসন দেখে, সেই বিশ্বাসটা মনে আরও পোক্ত হয়।

সিনেমাটার নায়ক নিউ জার্সির প্যাটারসন শহরের বাসিন্দা, তার নামও প্যাটারসন। পেশায় সে বাস ড্রাইভার। সুন্দরী স্ত্রী আর স্ত্রীর পোষা কুকুরকে নিয়ে প্যাটারসনের ছোটো সংসার। আরো অর্থের চাহিদা আছে তাদের জীবনে, কিন্তু কোনো কিছুর ঠিক অভাব নেই। অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতোই, প্যাটারসনের স্ত্রী’ও কিছু একটা হয়ে উঠতে চায় পরিমিতভাবে, কিন্তু আমাদের প্যাটারসন গভীরভাবে অচল মানুষ এই গতিশীল একবিংশ শতাব্দীতে। রক্তে খেলা করা অন্তর্গত কোনো বিষন্নতার তাড়নায় সে চব্বিশ ঘন্টার কবি। লাঞ্চের ফাঁকে, কিংবা রাত নিঝুম হলে বাড়ির সেলারে বসে, অথবা দিনের ডিউটির শুরুতে সে ছোট্টো একটা নোটবুকে টুকে রাখে তার মাথায় ঘোরা পংক্তিমালা।

একটা সর্বক্ষণের ধ্যানে বসে প্যাটারসন আবিষ্কার করে জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সৌন্দর্য্য। সে কিছু হতে চায় না, স্থানীয় পাবে প্রতিরাতে সামান্য একটু আড্ডার বাইরে জীবনের কাছে তার কোনো চাহিদা নেই। কোনো মোবাইল ফোন পর্যন্ত ব্যবহার করে না সে। তার পুরোটা ধ্যান যেন কবিতার জন্য। একটা ছোট্টো ম্যাচ বাক্স, বা একটা ছুটে চলা যাত্রীবাহী বাস, কিংবা একটা কুমড়ো; সামান্য এই জিনিসগুলোও প্যাটারসনের কাছে ধরা দ্যায় কবিতা হয়ে। তার স্ত্রী চায়, প্যাটারসনের নোটবুকে টোকা কবিতাগুলো কপি হোক, পৌঁছে যাক সকলের কাছে। দ্বিধাগ্রস্ত প্যাটারসন সে কাজটা করে উঠতে পারলো কি না, তা নিয়েই এগিয়েছে একটি সপ্তাহের গল্প বলা এই সিনেমা।

জো.jpg

(২)

প্যাটারসন দেখতে গিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছিলো আরো এক কবির কথা। ফার্নান্দো পেসোয়া, যার বুক অফ ডিস্কোয়ায়েট অনেকদিন ধরে শুয়ে আছে আমার বিছানার পাশে। এমন এক বই, যাকে পড়া যায় যে কোনো পৃষ্ঠা খুলে, যে কোনো মুহুর্তে, যেখানে মনে রাখার মতো পংক্তি বা বাক্যবলী দাগাতে হলে দাগাদাগি করতে হয় প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠাতেই।

কিন্তু ক্যানো প্যাটারসন সিনেমা দেখতে গিয়ে মনে পড়ে আমার ফার্নান্দো পেসোয়াকে?

সত্যি বলতে, পেসোয়া নয় শুধু, প্যাটারসন দেখতে গিয়ে আমাদের জীবনানন্দকেও আমার মনে পড়েছে বহুবারই। এবং জীবনানন্দ আর পেসোয়ার মাঝে অজস্র সাদৃশ্য চেষ্টা করলেই খুঁজে পাওয়া যাবে। তবু যে প্যাটারসনের কথা বলতে গিয়ে পেসোয়াকে বেছে নেওয়া, তার কারণ সম্ভবত এই যে জীবনানন্দ জীবদ্দশাতেও একরকম কবি খ্যাতি পেয়েছেন, আর যাবতীয় জাগতিক যন্ত্রণা সত্ত্বেও সেটাকে উপভোগও করতে পেরেছেন অল্পস্বল্প। কিন্তু ফার্নান্দো পেসোয়ার পরিচয়টি ছিলো মূলত অনুবাদকের, জীবদ্দশায় তার প্রকাশিত পাঁচটি বইয়ের একটিই কেবল তার নিজ ভাষা পর্তুগীজে লেখা।

অথচ লিসবন পৌরসভার সাদামাটা এই কেরানিটির মৃত্যুর পর তার ঘরের বাক্সটা থেকে বেরিয়ে এলো পর্তুগীজ সাহিত্যের সেরা সম্পদ। ২৫ হাজারেরও বেশি টাইপকৃত পৃষ্ঠা। অধিকাংশ লেখাই বিচ্ছিন্ন, এলোমেলো, দিনলিপি বা ভাবনাগুছ বলে চালানো যায় সেগুলোকে। বুক অফ ডিস্কোয়ায়েট বা অশান্ত পদাবলী, ওই বিচ্ছিন্ন পঙক্তিমালা থেকেই নির্বাচন করা কিছু অংশ।

(৩)

আবিষ্কার করা যায়,  সারাটি জীবন দিয়েই ফার্নান্দো লিখে গেছেন একটি অত্যাশ্চর্য গল্প, তিনি লিখে গেছেন তার ‘আবিষ্কৃত’ অজস্র কবি আর লিখিয়ের নামে। ক্রিস্টোফার নোলানের প্রেস্টিজ সিনেমার ওই যাদুকরের মতোই, পেসোয়া তার সারাটা জীবনকে ভাগ করে দিয়েছেন লেখার খাতায় ‘কাল্পনিক’ ওসব লেখকের হয়ে নিজের ব্যক্তি জীবনকে আবিষ্কার করতে।

পর্তুগীজ ভাষায় ‘পেসোয়া’ অর্থ ব্যক্তি। আর এই শব্দার্থটাকে আক্ষরিক ভাবেই সত্যি করে তুলেছেন ফার্নান্দো। তিনি ব্যক্তিই ছিলেন, কিন্তু একক নন, একাধিক।

ছয় বছর বয়েসেই পেসোয়া শ্যাভেলিয়্যার দ্যু পা নামের এক কাল্পনিক চরিত্র খাড়া করেন, যার মাধ্যমে তিনি চিঠি লিখতেন নিজেরই কাছে। তেরো বছর বয়েসেই লোকটা তিন কলামের একটা পত্রিকা বের করেন, যেটায় থাকতো গল্প-কবিতা-ইতিহাসের বয়ান। তবে প্রকৃত লেখক ছাড়াও, পেসোয়ার ওই পত্রিকায় ঠাঁই পেতেন বহু কাল্পনিক লেখক আর তাদের ‘নিজস্ব ভাষাভঙ্গীর’ লেখা। এবং ছেচল্লিশ বছর বয়েসে মৃত্যুর সময়েও পেসোয়া ঠিক একই রকম উদ্ভট। তিনি তখন একই সাথে শান্ত স্বভাবের কবি আলবার্তো কেইরো,  ধ্রুপদী ধারার রিকার্ডো রেইস আর নতুন ধরনের কবিতার জনক আলভারো দি কাম্পোস। পেসোয়া শুধু এসব নামে লিখেই যাননি, নিজের জীবনের অংশ নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন এদের এমন কাল্পনিক জীবনবৃত্তান্ত, যাতে করে এইসব কবির লেখার ব্যাখ্যাও পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়।

বুক অফ ডিস্কোয়ায়েট পেসোয়া লিখেছেন জীবনের শেষ বিশ বছর ধরে, কোনো নিরেট তথ্যহীন আত্মজীবনী বলা চলে বইটাকে, পেসোয়া যেটাকে বলেছেন নিজের সাথে নিজের কথোপকথন। কিন্তু এখানেও নিজের সাথে ঠিক নিজে কথা বলেননি পেসোয়া, এখানে তার হয়ে যে লেখকটি কথা বলেছেন, তার নামকরণ করা হয়েছে বার্নার্দো সোরেস। চাকুরি, অভ্যাস, বা দৈহিক বর্ণনা; বার্নাদোর জীবনের অনেক কিছুই মিলে যায় পেসোয়ার নিজের জীবনের সাথে। এমনকি বার্নাদো রাস্তায় নিজেই মুখোমুখি হয় ‘পেসোয়া’র। পুরো ব্যাপারটায় কল্পনার চমৎকারিত্ব এমন চমকে দেয়ার মতো, যে মুগ্ধ না হয়ে পাঠকের আর উপায় থাকে না।

তাই বুক অফ ডিস্কোয়ায়েট যখন পড়ি, পেসোয়ার জীবনটাকেই তখন মনে হতে থাকে কবিতা। ঠিক আমাদের শান্ত শহরের অতি নগণ্য বাস ড্রাইভার প্যাটারসনের মতোই।

(৪)

কথা বলছিলাম প্যাটারসন নিয়ে। এক কবির কথা বলতে গিয়ে যে প্রসঙ্গান্তরে কেবলই এলোমেলো হয়ে পড়ছি, সেই বিক্ষিপ্ততা কাটানোর জন্য পাঠকের সরাসরি চলে যাওয়া উচিৎ কোনো কবির কাছেই।

পেসোয়া যেমন নিজের সম্পর্কে কী ভাবে, একটু দেখা যাকঃ

I am a kind of playing card, from an old, unknown deck, the only card left from that lost pack…;
I am a character in a novel as yet unwritten…
I am nobody, nobody….

পাঠক এবং দর্শকের তখন মনে পড়ে, নিজেকে এমন নো-বডি ভেবে যায় বাসচালক প্যাটারসনও। অন্য কোনো কবির সাথে বাতচিতের ক্ষেত্রে জিভ তার তাই কেবলই তোতলায়। কিন্তু বাইরের সেই প্রগলভতার অভাব সরে গিয়ে তার ওপরেও ভর করে কবিদের সেই চিরন্তন ঐশ্বরিক মুহুর্ত, যখন সে লিখে ফ্যালেঃ

There’s an old song
my grandfather used to sing
that has the question,
“Or would you rather be a fish?”
In the same song
is the same question
but with a mule and a pig,
but the one I hear sometimes
in my head is the fish one.
Just that one line.
Would you rather be a fish?
As if the rest of the song
didn’t have to be there.

পাঠকের তখন মন থেকে সব কিছু সরে গিয়ে, মুছে গিয়ে জেগে থাকে কেবল ওই কথাটাই, থরথর করে একটাই প্রশ্নঃ Would you rather be a fish?

সমস্ত কিছু সরে গিয়ে ওই একটি চিন্তাকেই স্পষ্ট করে তোলাই যে কবিতা, প্যাটারসন কি তার আটপৌরে জীবনে ওই কথাটাই বলতে  চায় না?

উত্তর জানা নেই। কিন্তু বার্নান্দো সোরেসের গলা দিয়ে ফার্নান্দো পেসোয়া’কেও আমরা বলতে শুনিঃ

The truly wise man can enjoy the whole spectacle of the world from his armchair, he wouldn’t need to talk to anyone or to know how to read…

প্যাটারসন আর পেসোয়া তাই, আমার কাছে এখানেই এক হয়ে যায়। তাদের আমার একই সাথে স্মরণ হয় প্রতিদিনের জীবনেও পৃথিবীকে রমণীয় করে দেখবার ক্ষমতায়। সমস্ত ফুলস্কেপ কাগজ ভরানো ফার্স্টবেঞ্চিদের এই শহরে,  ভীষণভাবে ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়া এই পৃথিবীতে প্যাটারসন বা পেসোয়াদের দেখলেই কেবল প্রশ্ন জাগে, বাস-ড্রাইভার কি কেরানি নয়, আমি উদ্দেশ্যহীন কোনো মাছ হতে চাইবো ঠিক কোন মুহুর্তে?

[১২ ডিসেম্বর, ২০১৯]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s