তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন স্ত্রী ম্যারি ওয়েলশকে সাথে করে, প্যারিসের সেন্ট মাইকেল ব্যুলেভার্দে ১৯৫৭ সালের এক বৃষ্টিভেজা বসন্ত দিনে, দেখামাত্রই তাকে আমি চিনতে পেরেছিলাম। তিনি হাঁটছিলেন রাস্তার অন্যপাশে, লুক্সেমবার্গ পার্ক বরাবর; গায়ে ছিলো তার একটা ভারি শার্ট, একটা বহু ব্যবহৃত কাউবয় প্যান্ট আর মাথায় বেসবল খেলার টুপি। চোখে থাকা ধাতব রিমটা অবশ্য তার সাথে মোটেই মানায়নি; গোলাকার ছোট চশমাটা তাকে দিচ্ছিলো অকালে বুড়িয়ে যাওয়া দাদুর মর্যাদা। তার বয়স তখন ৫৯, এবং লোকটা তখনো বিশাল আর প্রায় অতিরিক্ত চোখে পড়ার দাবিদার। কিন্তু তবু, নিজেকে সে যেমন দেখাতে চায়, তেমন অমানুষিক শক্তসমর্থ লোকটাকে মনে হয়নি। কারণ মানুষটার নিতম্ব ছিলো মাংসহীন, আর কাঠুরেদের জন্য উপযুক্ত শক্ত জুতোয় তার পা জোড়াকে মনে হচ্ছিলো কিছুটা কৃশকায়। পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর মাঝে আর চতুর্দিকে ঘিরে থাকা সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের মধ্যে তাকে অ্যাতো প্রাণবন্ত লাগছিলো, যেটা দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে মানুষটা আর মাত্র চার বছর বাঁচবে।

সবসময় যেমনটা হয়, মুহুর্তের জন্য আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম দ্বিধাবিভক্ত। কী করা উচিৎ এখন? আমি কি রাস্তা পেরিয়ে লোকটার কাছে একটা সাক্ষাৎকার চাইবো, না বলে আসবো তার জন্য জমিয়ে রাখা আমার যাবতীয় শংসাবচন? বুঝতে পারলাম না। কিন্তু দুটো কাজই আমার কাছে প্রচণ্ড কঠিন লাগলো। তখনও আমার ইংরেজির বিদ্যা ছিলো আজকের মতোই চাষাড়ে, আর আমি নিজে নিশ্চিত ছিলাম না যে আমাদের ওই বুলফাইটারের স্প্যানিশ ভাষার জ্ঞান কী রকম। ফলে দুটো কাজের কোনোটাই না করে আমি মুখের কাছে দুই হাত জড়ো করলাম, টারজানের মতো, এবং এদিকের ফুটপাথ থেকে অন্যদিকের উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়লাম, ‘মা-য়ে-স্ত্রো!’

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে জানতেন, ঘিরে থাকা ছাত্রজনতার মাঝে তিনি ছাড়া এমন কোনো ওস্তাদ নেই, যাকে এ নামে ডাকা যায়। তিনি ফিরলেন, হাত তুললেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে চ্যাঁচিয়ে উঠলেন শিশুর স্বরে, ‘আ-দিওস, আ-মিগো-ও!’

ওই একটিবারই আমি তাকে দেখেছি।

ততদিনে আমি ২৮ বছরের এক সাংবাদিক, একটা উপন্যাস বেরিয়ে গেছে, কলম্বিয়াতে একটা সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছি; তবু প্যারিসে এসে আমি কোনো কূল পাচ্ছিলাম না। ওস্তাদ বলে মনে আমি জায়গা দিয়েছিলাম উত্তর আমেরিকার এমন দুই ঔপন্যাসিককে, যাদের মাঝে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তখনো পর্যন্ত ছাপার অক্ষরে তাদের প্রকাশিত সমস্ত কিছু আমি পড়েছি; সম্পূরক হিসেবে নয়, বরং বলা যায় উল্টোটা। আমি তাদের পড়েছি সম্পূর্ণ আলাদা, একে অন্যের প্রভাবমুক্ত সাহিত্যকর্মের উদাহরণ হিসেবে। দুজনের একজন ছিলেন উইলিয়াম ফকনার, যাকে কখনো আমি সরাসরি দেখিনি; এবং আমার কল্পনায় যিনি কেবল আসতেন কার্টিয়ার ব্রেসনের তোলা ওই বিখ্যাত পোর্ট্রেটটার মতো, কৃষকসুলভ শার্টে একজোড়া ছোট্টো সাদা কুকুরের পাশে বসে হাত চুলকানোর ভঙ্গিমায়। আরেকজন ছিলেন ওই স্বল্পায়ূ মানুষটা, যিনি মাত্র আমাকে বিদায় জানালেন রাস্তার ওপাশ থেকে, আর আমার ভেতরে এমন একটা ছাপ রাখলেন যেন সারাজীবনের জন্য মনে রাখার মতো কিছু আমার সাথে ঘটেছে।

একজন ঔপন্যাসিক নাকি কোনো উপন্যাস পড়ে কেবল সেটা কীভাবে লেখা হয়েছে তা জানতে। কথাটা কে বলেছে জানি না, কিন্তু আমার মনে হয় ব্যাপারটা সত্য। উপন্যাসের পাতায় যে রহস্যটা সাদাচোখে উন্মোচন করা যায়, শুধু সেটা ভেদ করে আমাদের স্বস্তি নেই, আমরা জানতে চাই উপন্যাসটা কীভাবে জোড়া লাগানো হলো, সেটাও। ব্যাপারটা ঠিক ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। ঘড়ির মতো উপন্যাসটাকে টুকরো টুকরো করে সেটার নির্মাণ-রহস্য ভেদের পর আমরা তা আবার জোড়া দেই। ফকনারের ক্ষেত্রে এই কাজটা করতে মন সায় পায় না, কারণ লোকটার লেখার ধরনটা ঠিক সুসংবদ্ধ নয়, বরং সে যেন নিজের পুরাণের জগতে এলোমেলো হাঁটছে, ঠিক যেন ক্রিস্টালের দোকানে ছেড়ে দেওয়ায় হতবুদ্ধি হয়ে যাওয়া একপাল ছাগলের মতো। তার লেখাকে ভেঙে ছোট ছোট টুকরা করা হলে তাই অবশিষ্ট থাকে শুধু স্প্রিং বা স্ক্রু, পুরো লেখাটাকে আর উদ্ধার করা যায় না।

হেমিংওয়ের লেখা আবার পুরো বিপরীত; আবেগ কম, উদ্যম কম, উন্মাদনা কম, কিন্তু দারুণ রকম তীব্র, সমস্ত স্ক্রু-সহই যেন সেটা মালগাড়ির উপর সাজিয়ে রাখা। হয়তো সে জন্যেই ফকনার সেই লেখক যিনি ছায়া ফেলেছেন আমার আত্মার ভেতরে, আর হেমিংওয়ের প্রভাব পড়েছে আমার লেখার কারিগরিতে; শুধু তার বইগুলোর জন্যেই নয়, লেখালেখি নামের শাস্ত্রটায় ওপর কারিগরির প্রভাব বিষয়ে তার অসামান্য দখলের জন্যও।

প্যারিস রিভিউ পত্রিকায় জর্জ প্লিম্পটনকে দেয়া সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারে, হেমিংওয়ে বলেছিলেন যে সর্বকালের জন্যেই- রোমান্টিক ধারণায় আচ্ছন্ন হয়ে লোকে সৃষ্টিশীলতা নিয়ে যাই বলুক না ক্যানো- ভালো আর্থিক অবস্থা আর সুস্বাস্থ্য লেখালেখিতে কাজে লাগে, বলেছিলেন যে সবচেয়ে কঠিন ব্যাপারগুলোর একটা হলো শব্দগুলো ঠিকভাবে সাজানো, বলেছিলেন যে লেখা যখন কঠিন হয়ে ওঠে তখন একজন লেখকের উচিৎ তার নিজের বইগুলোই আরেকবার পড়া যাতে করে তার মনে পড়ে যে ব্যাপারটা সারাজীবনই কঠিন ছিলো, বলেছিলেন যে যে কোনো জায়গাতেই টানা লিখে যাওয়া যায় যদি কোনো মেহমান বা টেলিফোন না আসে; এবং বলেছিলেন যে বহুল উচ্চারিত ‘সাংবাদিকতা একজন লেখককে শেষ করে দেয়!’ কথাটা আসলে মিথ্যা। ব্যাপারটা বরং উলটো, সাংবাদিকতা ব্যাপারটা ভুলে গেলেই লেখক ভুলে যাবেন লেখার কায়দা। তিনি বলেছিলেন, ‘একবার যদি লেখালেখি কারো প্রধান বদভ্যাস আর প্রধান আনন্দ হয়ে ওঠে,  মৃত্যু ছাড়া সেটাকে থামানোর কোনো রাস্তা নেই।’ আর সব শেষে, তিনি শিখিয়েছিলেন যে লেখা কেবল তখনই থামানো উচিৎ, যখন কেউ জানে যে আগামীকাল সে ঠিক কী লিখবে। আমার মনে হয় না লেখালিখি বিষয়ে এরচেয়ে ভালো কোনো উপদেশ দেয়া সম্ভব। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শত্রু যা, প্রতিদিন সকালে সাদা কাগজের সাথে যুদ্ধ করা, নিঃসন্দেহে সেটার সবচেয়ে বড় টোটকা হেমিংওয়ের উপদেশটাই।

হেমিংওয়ের সমস্ত লেখাতেই পরিষ্কার যে সেটার ভেতরের আত্মাটা উজ্জ্বল কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। কারণটাও বোধগম্য। তার অন্তর্গত শক্তির যে ছটফটানি, কারিগরি দিয়ে যেটাকে শক্তভাবে দমন করা হয়েছে, উপন্যাসের বিস্তৃত আর বিপদজনক পরিসরে সেটাকে বয়ে নেয়া যায় না। হেমিংওয়ের প্রকৃতিটাই অমন, আর তার জন্য কাল হয়েছিলো নিজের ওই সীমাকে অতিক্রম করতে চাওয়া। এজন্যেই লেখার ভেতরে আরোপিত যা কিছু আছে, অন্য লেখকদের তুলনায় তার ক্ষেত্রে সেটা দ্রুত ধরা পড়ে। তার উপন্যাসগুলোকে মনে হয় বেখাপ্পা বেড়ে যাওয়া ছোটগল্পের মতো, সেখানে অনেক কিছু  ঠেসে ঢোকানো। অন্যদিকে, তার ছোটগল্পগুলোর সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হলো, পড়লে মনে হয় সেখানে যেন কিছু একটা নেই, আর সেটাই গল্পগুলোকে করে তুলেছে সুন্দর আর রহস্যময়। হোর্হে লুই বোর্হেস, আমাদের সময়ের সেরা লেখকদের যিনি একজন, তার সীমাবদ্ধতার ধরনটাও এমন, কিন্তু নিজের প্রজ্ঞায় তিনি কখনো সেটা অতিক্রম করতে চাননি।

সিংহের দিকে যখন ফ্রান্সিস ম্যাকোম্বার একটা মাত্র গুলি চালায়, শিকারীদের জন্য ব্যাপারটা ছিলো শিক্ষণীয়, একই সাথে ছিলো লেখালেখির বিজ্ঞানের মূলসূত্র’ও। একটা ছোটগল্পে হেমিংওয়ে লিখেছিলেন যে লিরিয়ার একটা ষাঁড়, ম্যাটাডোরের বুক ছুঁয়ে ফিরে গেলো, ‘বিড়াল যেভাবে ঘরের কোণে ফিরে যায়’, সেভাবে। একান্ত বিনয়ের সাথে বলতে চাই, এই পর্যবেক্ষণ করতে হলে নিজেকে এমন বেকুব করে তুলতে হবে, সবচেয়ে মহৎ লেখকদের পক্ষেই যা সম্ভব। হেমিংওয়ের লেখা আগাগোড়াই এমন সব সরল আর ঝকঝকে পর্যবেক্ষণে ভরপুর। যাদের মধ্য দিয়েই আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় সাহিত্য নিয়ে তার একান্ত সংজ্ঞাটাঃ কোনো গল্প তখনই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়, তখন সমুদ্রে ভাসা বরফখন্ডের মতো সেটার আট ভাগের সাত ভাগই চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকে।

ব্যাপারটা প্রশ্নের উর্ধ্বে, যে অতি সচেতন কারিগরির জন্যেই হেমিংওয়ের উপন্যাসগুলো প্রসিদ্ধি পাবে না, বরং সেরকম গৌরব পাবে তার গোছালো ছোটগল্পগুলোই। ‘ফর হুম দা বেল টোলস’ উপন্যাস নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, যে এই বই লেখার জন্য তার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিলো না, প্রতিদিন লিখতে বসে তিনি সেটা আবিষ্কার করেছিলেন একটু একটু করে। না বললেও চলতো, ব্যাপারটা এমনিতেই বোঝা যায়। অন্যদিকে, তার তাৎক্ষণিক ভাবে লিখে ফেলা ছোটগল্পগুলো বরং অভেদ্য।

তুষারঝড়ের কারণে স্যান ইসিদ্রো উৎসবের ষাঁড়ের লড়াই যখন বাতিল হয়ে গেলো, মাদ্রিদের সেই মে মাসের সন্ধ্যায়, এক বসায় লিখে ফেলা হেমিংওয়ের গল্প তিনটা সেরকমই, জর্জ প্লিম্পটনকে তিনি নিজে একথা বলেছিলেন। গল্পগুলো ছিলো ‘দ্যা কিলারস’, ‘টেন ইনডিয়ানস’, ‘টুডে ইজ ফ্রাইডে’। পাঠক জানে, এই তিনটা গল্পই ফাটাফাটি। আমার ব্যক্তিগত পছন্দ হচ্ছে ‘ক্যাট ইন দ্যা রেইন’ গল্পটা, তার সমস্ত শক্তি যেন ওই গল্পে সংকুচিত হয়ে আছে।

তা যাই হোক, ভাগ্যের নিদারুণ পরিহাস বলে মনে হলেও, আমার কাছে তার সবচেয়ে দারুণ আর মানবীয় সৃষ্টি বলে মনে হয় তার সবচেয়ে অসফল কাজটাকে, ‘অ্যাক্রস দ্যা রিভার এন্ড ইনটু দ্যা ট্রি’জ’। তিনি বলেছিলেন যে এই লেখাটা শুরু হয়েছিলো ছোটগল্প হিসেবেই, কিন্তু পরে সেটা হারিয়ে যায় উপন্যাসের অরণ্যে। কাজটায় অ্যাতো নির্মাণজনিত ফাঁক, সাহিত্যিক কারিগরিগুলোতে অ্যাতো ভুল আর সংলাপগুলো এমন আড়ষ্ট ও কল্পিত; বোঝাই যায় না যে এর নির্মাতা অক্ষরের ইতিহাসের সেরা কারিগরদের একজন। ১৯৫০ সালে বইটা যখন বেরোয়, এর সমালোচনা ছিলো লক্ষ্যহীন অথচ হিংস্র। বিষয়টা হেমিংওয়ের খুব লেগেছিলো, এবং হাভানা থেকে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে একটি আবেগী টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন, তার মাপের লেখকের জন্য ব্যাপারটা অসম্মানের। অথচ এটা যে তার সেরা উপন্যাস শুধু তাই না, সাথে তার সবচেয়ে ব্যক্তিগত উপন্যাসও ছিলো, কারণ এটা তিনি লিখেছিলেন অনিশ্চিত এক শরতের শেষে, ফেলে আসা দিনগুলোর জন্য নস্টালজিয়া আর জীবনের কয়টা বছর অবশিষ্ট আছে সেই তিক্ত আশঙ্কাকে আশ্রয় করে। অন্য কোনো বইতেই তিনি নিজেকে অ্যাতো উন্মুক্ত করেননি, যেমন খুঁজে পাননি নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আঙ্গিক। যাবতীয় সৌন্দর্য্য আর কোমলতা নিয়েও এই বইতে তিনি তাই ফোটাতে পারেননি তার সারা জীবনের বাণীঃ বিজয় বড় অর্থহীন। উপন্যাসটার প্রোটাগনিস্টের মৃত্যুটা, আপাতদৃষ্টিতে যা ছিলো স্বাভাবিক ও শান্ত, আসলে ছিলো হেমিংওয়ের আত্মহত্যারই পূর্ব ইঙ্গিত।

কেউ যখন লেখালেখির কাজে নিজেকে অতটা সময় নিয়োজিত রাখে, তাও অমন তীব্রতা আর ভালোবাসা নিয়ে,  তখন বাস্তবতা থেকে গল্পের জগতকে আলাদা করবার কোনো উপায় তার থাকে না। দিনের পর দিন আর ঘন্টার পর ঘন্টা আমি বই পড়ে কাটিয়েছি সেইন্ট মাইকেলের সেই ক্যাফেতে; উষ্ণ, পরিচ্ছন্ন আর বন্ধুভাবাপন্ন ছিলো বলে লেখালেখির জন্য হেমিংওয়ে যেটাকে একটা ভালো জায়গা বলে ভাবতেন। এবং মনে মনে আমি সবসময় সেই মেয়েটাকে খুঁজেছি; যাকে এক প্রবল হিম বাতাসের দিনে হেমিংওয়ে এই ক্যাফেতে ঢুকতে দেখেছিলেন, যে ছিলো অপূর্ব সুন্দর আর স্নিগ্ধ, যার চুল ছিলো কাকের ডানার মতো আড়াআড়ি করে কাটা। সমস্ত কিছু অধিকার করে নেয়ার যে তীব্র শক্তি তার লেখায় ছিলো, তা দিয়ে হেমিংওয়ে মেয়েটার জন্য লিখেছিলেন, ‘তুমি আমার, এই প্যারিসও আমার!’

যা কিছু তিনি বর্ণনা করেছেন, মুহুর্তের জন্য যেটা তার হয়েছে, সবটাই তিনি চিরকালের জন্য দখল করে নিয়েছেন।

প্রতিবার ১২ নাম্বার র‍্যু দে লিদিয়নের পাশ দিয়ে যাবার সময় আমি দেখতে পাই, তিনি আলাপে ব্যস্ত সিলভিয়া বিচের সাথে, এমন এক বইয়ের দোকানে যেটা এখন আর আগের মতো নেই, তিনি সময় কাটাচ্ছেন, সন্ধ্যা ছয়টা বাজলেই হয়তো জেমস জয়েস এসে পড়বেন! জীবনে একবার মাত্র কেনিয়ার প্রেইরিতে গেলেও সেখানকার সমস্ত বুনো মহিষ আর সিংহ, এবং শিকারের সবচেয়ে গোপন কায়দাগুলো চলে এসেছে তার অধিকারে। তিনি মালিক হয়ে গেছেন বুলফাইটার আর প্রাইজ হান্টারদের, শিল্পীদের আর বন্দুকবাজদের; যারা মুহুর্তের জন্য তার হৃদয়ে স্থান পেয়েছিলো। তিনি শুধু নাম নিয়েছেন; আর ইতালি, স্পেন বা কিউবার মতো দুনিয়ার অর্ধেক জায়গা চলে এসেছে তারই আওতায়। হাভানার কাছে, কোজিমার নামে এক ছোট্ট গ্রামে যেখানে বাস করতো ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি এর সেই নিঃসঙ্গ জেলে, সেখানে সেই জেলের বীরত্বের বর্ণনা দেয়া একটা ফলক আছে, সাথে রয়েছে সোনায় বাঁধানো হেমিংওয়ের একটা আবক্ষ মূর্তি। কিউবার ফিঞ্চা দে লা ভেগায়, যে বাড়িটায় তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন, থেকেছিলেন মৃত্যুর কিছুদিন আগেও, অরণ্যের ছায়াতলে সে বাড়িটা এখনো আগের মতোই আছে। সেটা অক্ষত থেকে গেছে মানুষটার বিচিত্র সব বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে, তার যত শিকারের ট্রফি নিয়ে, তার লেখার টেবিল নিয়ে, মৃত মানুষের জুতোর বিশাল সংগ্রহ নিয়ে, জীবনজুড়ে পাওয়া অগণিত সে সব উপহার যা মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত তার সাথে ছিলো- সে সব নিয়ে; যে সব সামগ্রী এখনো বেঁচে আছে মানুষটার মৃত্যুর পরেও, কারণ শুধু মালিকানার অধিকারেই হেমিংওয়ে তাদের জাদু করেছেন, দিয়েছেন প্রাণ।

কয়েক বছর আগে, আমি ফিদেল ক্যাস্ট্রোর গাড়িতে উঠেছিলাম- যিনি বুভুক্ষুর মতো সাহিত্য পড়েন- এবং দেখেছিলাম সিটে পড়ে আছে লাল মলাটে বাঁধানো একটা ছোট্ট বই।

‘হেমিংওয়ের বই,’ ক্যাস্ট্রো আমায় বলেছিলেন। ‘ লোকটা আমার ওস্তাদ!’

সত্যিই, মৃত্যুর ২০ বছর পরেও হেমিংওয়ে আজও দেখা দেন এমন সব জায়গায় যেখানে লোকে তাকে খুঁজে পাবার কথা চিন্তাই করবে না; ঠিক যেমনটা আমি তাকে দেখেছিলাম কষ্টসহিষ্ণু আর অল্প কিছু দিনের আয়ূ নিয়ে, মে মাসের এক সকালে সেন্ট মাইকেল ব্যুলেভার্দে, যখন তিনি রাস্তার ওপাশ থেকে আমায় বলেছিলেন, ‘বিদায় বন্ধু!’ 

[গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ স্মৃতিচারণ করেছিলেন তার সাহিত্যিক গুরু আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে নিয়ে। ১৯৮১ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত উক্ত লেখাটির অনুবাদ এখানে  প্রকাশ করা হলো।]