প্রায়ই এমন হয়, উপন্যাসের পাতা থেকে এক-একটা কথা আমাদের মনের ভেতর যেন মূর্তি হয়ে বসে। কোনো এক প্রখর গ্রীষ্মের দুপুরে ওভাবেই মাহমুদুল হক আমার ভেতরে গড়ে তুলেছিলেন একটা আস্ত অজন্তা ইলোরা। বলেছিলেন –

আসলে জীবন মানেই শৈশব; জীবনভর মানুষ এই একটা ঐশ্বর্যই ভাঙ্গিয়ে খায়, আর কোনো পুঁজিপাট্টা নেই তার।

আলবেনিয়ার ঔপন্যাসিক ইসমাইল কাদারের ক্রনিকল ইন স্টোন পড়তে বসে ঘুরে-ফিরে কেবল ওই কথাটিই মনে পড়ে। বিষয়ে গম্ভীর অথচ বয়ানে সরল এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় বহুবার অনামা এক বালকের ভেতর দিয়ে নিজের শৈশবকে উদ্ধার করেছেন কাদারে, বোঝা যায়। শৈশবকে পুনরুদ্ধার করবার ক্ষমতা খুব বেশি লেখকের থাকে না। আর এটাও আমাদের জানা, যে গড়পড়তা মানকে ছাড়িয়ে গিয়ে তিনিই হয়ে উঠতে পারেন অনন্য লেখক, যিনি ব্যক্তির ভেতর থেকে তুলে আনতে পারেন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রকে। দুটো শর্তকেই পূরণ করতে পেরেছেন বলে, ক্রনিকল ইন স্টোন উপন্যাসের শেষে ইসমাইল কাদারে’র দিকে পাঠককে তাই তাকাতে হয় নতুন মুগ্ধতায়।

উপন্যাসটা আসলে অদ্ভুত এক পাথুরে শহরের দিনলিপি। কেটে যায় শতাব্দীর পর শতাব্দী, সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্যের হাত বদল হয়ে যায়; কিন্তু ছোট্টো শহরটার পাথুরে দেয়াল আর রাস্তা কেবলই দেখে যায় নশ্বর মানুষের নোংরা আর কদর্য পদাঘাত। কেউ বলে দেয়নি, কিন্তু পাঠক যখন জানতে পারে যে আলবেনিয়ার প্রান্তে পড়ে থাকা গিরোকাস্তার নামের ছোট্ট এক পাথুরে নগরীর সাথে মিলে যায় উপন্যাসের পটভূমি শহরটা, আর এটাও যখন জানা যায় যে ওই গিরোকাস্তার শহরেই ইসমাইল কাদারের জন্ম; উপন্যাসের অনেকটুকুই যে আসলে আত্মজৈবনিক, তা বুঝতে কি তখন কিছু বাকি থাকে আর?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন এক শীতের রাতে, পাথুরে দেয়াল আর ছাদ হয়ে চৌবাচ্চায় পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়বার অপূর্ব এক দৃশ্য দিয়ে শুরু উপন্যাসের। কাদারের বর্ণনায় পুরো অধ্যায়টিকেই মনে হয় যেন কবিতা, মনে হয় কার্তিকের কুয়াশায় মহীনের ঘোড়াকে দেখবার মতো করে অস্পষ্ট ভাবে আমরা দেখছি দৃশ্যটাকে। কিছুদূর এগোতে বোঝা যায়, কুয়াশার বাপেরও সাধ্য নেই দৃষ্টির এই অস্পষ্টতা তৈরি করে; অস্পষ্টতার ওই দেয়াল আসলে সৃষ্টি করেছে আরো সর্বগ্রাসী কিছু, ওই দেয়াল আসলে দূরত্বের তৈরি, আর দূরত্বটা আমাদের প্রাপ্তবয়স্ক মনের সাথে আমাদের শৈশবের মূর্খ অথচ রুপকথায় ভরে থাকা মনের।

জানা যায়, শত শত বছর ধরে গিরোকাস্তার শহরকে নিজেদের আওতায় নিয়েছে ভিনদেশি শাসকেরা। কখনো রোমান তো কখনো নরমান, কখনো বাইজেন্টাইন তো কখনো তুর্কি; নানা জাতের সৈনিকেরা লেফট-রাইট করে করে মাড়িয়ে গেছে পাথুরে ওই নগরীর অলিগলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তো বেড়ালের মুখের উলের বলের মতোই আজ ইতালি, কাল গ্রিক আর পরশু জার্মানদের পদদলিত হয়েছে শহরটা। আর উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে থাকা অনামা বালকটি দু’চোখে অগাধ কৌতূহল নিয়ে আমাদের যে গল্প বলে গেছে, তা আসলে ছড়িয়ে আছে ওই বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়টা জুড়ে।

কিন্তু যুদ্ধের নৃশংসতা নয়, কাদারের দক্ষ হাতে জটিল এই পৃথিবীটা দুরন্ত ছেলেটির কল্পনাপ্রবণ চোখে ধরা দেয় একদম অন্যরুপে। কসাইখানায় গরু জবাইয়ের দৃশ্য তাকে প্রভাবিত করে, মা-চাচীদের কাছ থেকে শুনে শুনে ডাইনীর জাদুটোনার প্রত্যক্ষ প্রমাণও সে পায় খেলতে গিয়ে। আমাদের সবার মতোই সেও আবিষ্কার করে যে নানাবাড়িতে বেড়াতে গেলে সপ্তাহের দিনগুলো শুক্র-শনি বা রবি’র মতো নাম হারিয়ে পরিণত হয় কেবল ছুটির উপলক্ষে, সেও অন্য সবার মতোই অব্যাখ্যানীয় প্রেমে পড়ে মার্গারিটা নামের ভরযুবতীর। শৈশবে কাদারে যখন তার সমবয়েসি ছিলেন, তার চাইতে একটু অভিজ্ঞই যেন বোধ হয় আমাদের উপন্যাসের নায়ককে, যেন বড় বেশি ঘটনাবহুল তার শৈশব। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের ওই অংশটায় ক্ষণে ক্ষণে পাল্টেছে রাজনীতির ছক। কৌতূহলী শিশুর চোখ বাদে নিরপক্ষেভাবে সেসব নাটক দেখে গেছে গিরোকাস্তারের পাথুরে দুর্গটা কেবল।

১৯৭১ সালে প্রথমবার প্রকাশিত হবার পর থেকে বহুবার এই উপন্যাসের পরিমার্জন করেছেন খুঁতখুঁতে কাদারে, শেষবার করেছেন ২০০৪ সালে। সাহিত্যমান বাদে হয়তো রাজনীতিও তাকে প্রভাবিত করেছে উপন্যাসে বর্ণিত নানা ইঙ্গিতকে নতুন করে লিখতে। ধারণাটা আরেকটু দৃঢ় হয় ক্রনিকল ইন স্টোন-এর পাতায় পাতায় কাদারের দেয়া বিবিধ ইঙ্গিতকে লক্ষ করলে।

যুদ্ধকালীন আলবেনিয়ায় হানাদারদের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলো তিন ধরনের ‘স্বদেশী’রা। এক ভাগে ছিলো জাতীয় ফ্রন্টের লোকজন, উপন্যাসে যাদের উল্লেখ করা হয়েছে ‘বালিস্টস’ বলে। এক ভাগে ছিলো আরো গোছালো আর কর্মতৎপর আলবেনিয়ার কম্যুনিস্ট পার্টি, উপন্যাসে ইসা আর জাবের নামে যে দুটি তরুণের মেধার দীপ্তিতে মুগ্ধ আমাদের নায়ক, তারা ওই কম্যুনিস্ট পার্টিরই সদস্য। আরো আছে আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী রাজা প্রথম জগের অধীন বাহিনী, উপন্যাসে এদের উল্লেখ করা হয়েছে ‘ইসা তোস্কা’র দলের লোক’ বলে। যদিও সরাসরি কিছু বলা হয়নি কোথাও, তবু বোঝা যায়, পাথুরে শহরের জনজীবনটা নিজ দেশের মানুষের হাতেই ত্রিধা-বিভক্ত হবার একটা বেশ পষ্ট ছবি এঁকেছেন কাদারে। বলাই বাহুল্য, প্রায় গৃহযুদ্ধের মতো বিবাদমান সে ছবিটা, ভবিষ্যতে এনভার হোজ্জার একনায়কত্বের অধীনে চলে যাওয়া আলবেনিয়ার সরকারি ভাষ্যের সাথে একেবারেই মেলে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, শুধু ইসমাইল কাদারের নয়, গিরোকাস্তার কিন্তু একই সাথে এনভার হোজ্জার’ও জন্মস্থান।

ক্রনিকল ইন স্টোন-এর প্রথম ইংরেজি অনুবাদক আরশি পিপা একটা বেশ কৌতূহল জাগানো পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করেছিলেন এ উপন্যাস নিয়ে। বলেছিলেন, উপন্যাসে বর্ণিত দাঁড়ি গজানো যে তরুণীর কথা বলা হয়েছে, অথবা বলা হয়েছে অর্ধেক পুরুষ আর অর্ধেক নারী যে মানুষটার খুন হবার কথা; তাদের অসম্পূর্ণ যৌনতার ইঙ্গিত দিয়ে কাদারে নাকি আসলে ইশারা দিয়েছেন হোজ্জার যৌন জীবনের দিকে। আলবেনিয়ার শিক্ষিত সমাজে এ ব্যাপারটি সকলেই কমবেশি জানতো যে ছাত্রাবস্থায় ফ্রান্সে থাকার সময় থেকেই এনভার হোজ্জা জড়িয়ে পড়েছিলেন সমকামী সব সম্পর্কে। কল্লা হারানোর ভয়েই হয়তো, কাদারে বেশ শক্ত প্রতিবাদ করেছিলেন আরশি পিপার এমন ভাষ্যের। তবে সেটি না করলেও ক্ষতি ছিলো না, কারণ ক্রনিকল ইন স্টোন পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে কখনোই ওই উদ্ভট ধারণাটির জন্ম হয় না। বরং ঈর্ষা হয় শিশুর কল্পনাশক্তিকে। ঈর্ষা হয়, যে ক্যানো আমরা রক্তাক্ত পৃথিবীতে তার মতো ঘুমুতে পারি না।

ব্যাপারটা তাই নেহাত কাকতালীয় নয়, যে আমাদের ক্ষুদে নায়ক ভীষণ আলোড়িত হয়ে ওঠে ম্যাকবেথ পাঠ করে। ক্ষমতার জন্য মানুষের চিরন্তন লোভের দিকে ইসমাইল কাদারের বুদ্ধিদীপ্ত একটি ইঙ্গিত বলে ঘটনাটাকে চিহ্নিত করা যায় ঠিক। কিন্তু অন্যভাবে ভাবলে মনে হয়, কর্তব্যপরায়ণ ম্যাকবেথকে যেমন পালটে দিয়েছিলো রক্তের স্বাদ; যুদ্ধের স্বাদও আমাদের অনামা নায়ককেও তেমন করে বদলেই দিয়েছে। জীবনভর যে ঐশ্বর্য ভাঙিয়ে মানুষ খায়, ইসমাইল কাদারে সেই স্বপ্নের শৈশবকে করে তোলেন ভীষণ বৈপরীত্যে ভরপুর। উপন্যাসটা যেন এগিয়ে চলে যুদ্ধকে কেন্দ্রে রেখে তবু যেন লড়াইকে এড়িয়ে। দুনিয়া যেন ভীষণ নোংরা অথচ উপন্যাসের সেটা যেন আসে দারুণ অলৌকিক হয়ে।

ক্রনিকল ইন স্টোন আসলে তাই, অনুসন্ধিৎসু শৈশবের এক অলৌকিক অনুবাদ। বৈঠকখানার বদলে মানুষ যখন আশ্রয় নেয় ভূগর্ভে, বিমান যখন নিজেই মানুষের পিঠে চেপে পাহাড় পাড়ি দেয়, আড্ডার বদলে তরুণ যখন ঝুলে থাকে ফাঁসিকাঠে; পাঠককে তখন বুঝতে হয়, অলৌকিক সেইসব দিনেও আসলে সমস্ত কিছুই ছিলো স্বাভাবিক।

নাকি কিছুই আসলে ঠিক ছিলো না?

গিরোকাস্তারের নীরব হয়ে থাকা পাথরগুলো ছাড়া এই প্রশ্নের জবাব অন্য কারো জানা নেই।

[৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯]