লেট দেয়ার বি লাইট

০১)

বড়পর্দার মাঝখানে ভেসে ওঠে ইংরেজী অক্ষরে লেখা ‘স্টপ’ শব্দটি। সেটি ক্রমান্বয়ে বড় হতে থাকে, একসময় সমস্ত পর্দা অধিকার নেয়। নেপথ্যে শোনা যায় কথকের কণ্ঠস্বর। ‘স্টপ’, ‘স্টপ’, ‘স্টপ’, ‘স্টপ’, ‘স্টপ’…

কলকাতা টাউন হলের সমবেত দর্শকেরা দীর্ঘ একটা সময় চুপ করে থাকেন নিজ জায়গায়। এরপরে ধীরে ধীরে করতালি শুরু হয়, তালির শব্দ বাড়তেই থাকে- একসময় তা স্তিমিত হয়ে যায়।

জহির রায়হান পেছনের সারি থেকে চুপচাপ বেরিয়ে আসেন। প্রদর্শনীর পরের এই সময়টুকু তাঁর পছন্দ না। এখন প্রশংসাবাণী ছুটে আসবে, দর্শকেরা একে অপরের কাছে নিজের পছন্দ-অপছন্দ সবিস্তারে জানান দেবে। হট্টগোল। জহির রায়হান নীরবে থাকতে ভালোবাসেন। আশেপাশের একটা নীরব জায়গা খুঁজে বের করে তিনি তাই ক্যাপস্টান ধরান।

একাকীত্ব স্থায়ীত্ব হয় মিনিট পনেরোর। লম্বাটে এলো জুলফি আর মোটা চশমার এক যুবক খুঁজে বের করে তাকে। জহির ভাই! জানতাম আপনাকে এখানেই পাওয়া যাবে। আপনি তো আবার শো’ এর পরের সময়টা সহ্য করতে পারেন না! 

জহির রায়হান মৃদু হাসেন, কোন কথা বলেন না। আলমগীর কবিরকে তাঁর বড় পছন্দ।

দর্শকেরা সিনেমাটা দেখে খুব আবেগতাড়িত হয়ে গেছে, জহির ভাই। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ভারতীয় বন্ধুরাও ভালো সাড়া দিচ্ছে। ডিরেক্টর তপন সিনহা তো আপনাকে না দেখে যেতেই চাইলেন না প্রথমে, আমি পরে বুঝিয়ে-টুঝিয়ে…

আরেকটা ডকুমেন্টারি বানানোর কথা ভাবছি, বুঝলা।  জহির রায়হান মাঝপথেই কথা বলে ওঠেন। হানাদারদের গণহত্যাটাকে আরেকটু বেশি করে ফোকাস করবো সেটায়। সেইটার নাম ঠিক করলাম এতক্ষণ। ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’। সমিতির সাথে প্রাথমিক আলোচনা করা হয়ে গেছে। কাজে নামতে হবে তাড়াতাড়ি।

কর্ম পরিকল্পনার বিস্তৃতি শুনে আলমগীর কবির একটু হতচকিত হয়ে পড়েন। ও।… তাহলে, পরেরটার সব রেডি করে ফেলেছেন জহির ভাই?

জহির রায়হান অল্প হাসেন। সব রেডি।

তবে পরমুহুর্তেই তিনি আবার গম্ভীর। দেশের জন্যে খারাপ লাগে, বুঝলা। বড়দা, পান্না ভাবী, আম্মা, সুচন্দা- ওদের অনেক দিন দেখি না। এফডিসি যাই না কতদিন। সবকিছুর জন্যেই খারাপ লাগে। বিশেষ করে বড়দার জন্যে খুব বেশি পেট পুড়ে।… তোমার এমন লাগে না?

শ্যামলীর বাসার কথা মনে করে আলমগীর কবিরেরও একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে, তবে তিনি তা সযতনে গোপন করেন। বেশি মন খারাপ করবেন না জহির ভাই। সামনে অনেক কাজ। … এই তো, দেখবেন- খুব তাড়াতাড়িই দেশ স্বাধীন হবে। তখন স্বাধীন দেশে ফিরে গিয়ে আমরা আবার সবাইকে দেখতে পারবো। দেখবেন, দেখা হবে। খুব তাড়াতাড়িই হবে।… 

সেই মুহুর্তে আলমগীর কবির ভুলে যান যে যুদ্ধ সবসময় বাকি পৃথিবী মিথ্যা করে দেয়। যা হওয়ার, তা হয় না। যা ঘটবার, তা ঘটে না।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আলবদর বাহিনী তাই জহির রায়হানের প্রাণপ্রিয় বড়দা,শহীদুল্লা কায়সারকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

 

০২)

শাহরিয়ার কবির একদৃষ্টিতে তার চাচাতো ভাই জহিরের দিকে চেয়ে রইলেন।

জহির দেশে ফিরেছে ১৮ ডিসেম্বর। দেশে ফিরেই বড়দার অপহরণের খবর পেয়ে একদম ভেঙ্গে পড়েছে। তার দুই চাচাতো ভাই একে অপরকে খুব তীব্রভাবেই ভালোবাসতো,শাহরিয়ার কবির জানেন।

জহির ভাইকে খুব ব্যস্ত দেখাচ্ছে। ছাই রঙ প্যান্ট, সাদা শার্টের সাথে হালকা হলুদ কার্ডিগানে ফর্সা জহিরকে খুব মানিয়েছে। জহিরের যেন শাহরিয়ার কবিরের দিকে তাকাবার অবসর নেই। দ্রুত হাতে ঘড়ি পড়ে নিতে নিতে সে বলে এসে পড়েছো? গুড। আমরা এক্ষুনি বেরিয়ে পড়বো। …ভোরে টেলিফোন এসেছে একটা। দাদাকে নাকি বিহারীরা মীরপুরে আটকে রেখেছে। আমায় যেতে বললো।

ফোন করে এমন খবর কে দিতে পারে, শাহরিয়ার কবিরের তা মাথায় আসে না। রফিক? রফিক নামের ভণ্ডটা নয় তো? জহির ভাইয়ের ব্যস্ততা দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে শাহরিয়ার কবিরের। গত একমাসে জহির ভাইয়ের মাঝে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এসেছে। পীর-ফকির জাতীয় বুজরুকিতে একদম বিশ্বাস ছিলো না ওনার। এখন দাদার অভাবেই সে অতিন্দ্রীয়বাদী হয়ে উঠেছে পুরোমাত্রায়। ভাগ্যে বিশ্বাস করছেন। আজমীর শরীফও ঘুরে এসেছে, হাত দেখে ভবিষ্যত বলা গুরুও বাগিয়েছে একটা। সেই লোকের নাম রফিক, সে ব্যাটাই জহির ভাইকে আশ্বাস দিয়েছে যে বড়দা এখনো বেঁচে আছে। লোকটার সাথে একবারই দেখা হয়েছে শাহরিয়ার কবিরের। জহির ভাইকে সরাসরি বলেছিলেন তিনি, মানুষটাকে তার প্রতারক বলে মনে হয়েছে। জহির ভাই সেদিন সশব্দে তার গালে চড় মেরেছিলেন। যা বোঝো না, তা নিয়ে কথা বলো না।

চমকে গিয়েছিলেন সেদিন শাহরিয়ার,জহির ভাইয়ের উপর লোকটার প্রভাব দেখে।

রেডি? – হঠাৎ প্রশ্নে ভাবনা থামে শাহরিয়ার কবিরের, দ্যাখেন, পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে প্রস্তুত জহির ভাই।

ড্রয়িংরুমের একপ্রান্তে বসে থাকা জাকারিয়া হাবিব, পান্না কায়সারের ভাই আর সুচন্দার ভাই; এই তিনজনের উদ্দেশ্যে জহির রায়হান হাঁক দ্যান। চলো, বের হই। দুটো গাড়ি আছে। জায়গার সমস্যা হবে না।… আরে, সময় নিয়ে ভেবো না। কায়েতটুলী থেকে মীরপুর ১২ যেতে কতক্ষণই বা আর লাগবে।

নীচে নেমে গাড়িতে উঠবার সময় শাহরিয়ার কবির শুনতে পেলেন জহির ভাইয়ের কণ্ঠ। পান্না ভাবীকে বলছেন, ভাবী, দাদাকে না নিয়ে আজ কিন্তু আর ফিরবো না।

দুটো গাড়ি একত্রে স্টার্ট দিলো। গন্তব্য মীরপুর ১২।

শাহরিয়ার কবির ঘড়ির দিকে তাকান। ৩০ শে জানুয়ারি,১৯৭২। সকাল ১০টা বেজে ২৭ মিনিট।

বাইরে নিস্তেজ রোদ। একটি সদ্যস্বাধীন অগোছালো দেশ। একটি অগোছালো দেশ, আর ঢাকার বাতাসে কীসের হাহাকার।

০৩)

ল্যান্স নায়েক আমির হোসেনের কাছে বিষয়টা ভালো ঠেকছে না,একদম না। গত চারদিন ধরে এরকম উত্তেজনার মাঝে থাকায় স্নায়ূটা খুব উত্তপ্ত হয়ে আছে বলেই কি? কে জানে! আমির হোসেনের অবচেতন মন থেকে থেকে সতর্ক করে দিচ্ছে তাকে,আজ কিছু একটা ঘটবেই।

আমির হোসেন দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ডি কোম্পানি, ১২ নং প্লাটুনের ল্যান্স নায়েক। গত ২৭শে জানুয়ারি থেকে উপরের নির্দেশে এই মীরপুর এলাকায় অবাঙ্গালি বিহারীদের কাছে জমা থাকা অস্ত্র উদ্ধারে পাঠানো হয়েছে তার প্লাটুনকে।

তা ঝামেলাটা লাগলো গতকাল, ২৯শে জানুয়ারির বিকেলে। প্লাটুন কমান্ডার সুবেদার মমিন সহ আমির হোসেন এবং আরো চার সৈনিক গিয়েছিলো মীরপুর ১২ নম্বর সেকশন রেকি করতে। হঠাৎ করেই এলাকার পানির ট্যাঙ্কির পশ্চিমপ্রান্ত হতে ৬০/৭০ জন বিহারী তাদের পিকআপ ভ্যানটি ঘেরাও করে ফেলে। তাদের দাবি, খাবার ও পানি সরবরাহ না করলে তারা এই পিকআপ আটকে রাখবে। সুবেদার মমিন ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি বুঝে তাদের শান্ত করলে অবশ্য লোকজন পিকআপটা ছেড়ে দেয়। স্থায়ী ঘাঁটি মীরপুর ১এর টেকনিকাল স্কুলে ফিরে আসতে এরপর আর কোন গ্যাঞ্জাম হয়নি।

আজ সকাল হতেই প্রস্তুত হয়ে ওঠে ডি কোম্পানি। পরিস্থিতি যে গুরুতর, তা অনুধাবন করতে দেরী হয় না আমির হোসেনের। বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব মইনুল হোসেন চৌধুরী সশরীরে এসে নির্দেশ দিয়ে গেছেন কোম্পানি কমাণ্ডার ক্যাপ্টেন হেলাল মোরশেদকে। হেলাল মোরশেদ দেরী না করে চলে গেছেন ১২ নং সেকশনে। অতএব, সময় নষ্ট না করে আমির হোসেনের প্লাটুনও যাত্রা করে সেই দিকে, সঙ্গী থাকে পেছনে পুলিশের গাড়ি।

সবগুলো গাড়ি এসে থামে ১২ নং সেকশনের পানির ট্যাঙ্কির আশেপাশে। ক্যাপটেন হেলালের নির্দেশে ১২ নং প্লাটুনের সদস্যদের পাঠিয়ে দেয়া হয় নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে। কেবল সিপাহী আকরাম আর আমির হোসেনের জায়গা স্থির করা হয়েছে এই পানির ট্যাঙ্কির কাছে।

ল্যান্স নায়েক আমির হোসেন সশব্দে থুতু ফেলে। জায়গাটা নিচু,অনেক জলাশয় চারপাশের ফাঁকা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তার আর আকরামের দায়িত্ব হলো আশেপাশের কোন মহল্লায় যেন অস্ত্র পাচার হতে না পারে, সেদিকে নজর রাখা। তবে আমির হোসেনের দ্বিতীয় আরেকটা দায়িত্বও আছে।

আসবার পথে কথাটা বলেছিলেন সুবেদার মমিন। আমির হোসেন, একটু নজর রাইখো তো পিছের দিকে। পিছের গাড়িতে একটা মেজর সাব আছে। সাংবাদিকও ভি আছে একখান।

সাংবাদিক, স্যার? আমির হোসেন নিশ্চিত হতে চেয়েছিলো। মানে,এই এলাকায় সিভিলিয়ানদের ঢুঁকা নিষেধ না স্যার?

আমিও তো হেইডাই জানতাম! সুবেদার মমিন খুব বিরক্ত। মাগার এই সাংবাদিক ভিয়াইপি। লগে আরো লোক আছিলো। ক্যাপটেনে হেগোরে অনুমতি দেয় নাইক্যা। ক্যাবল এই মানুষটারে আইবার দিছে।

আমির হোসেন অদূরে হালকা-পাতলা গড়নের সাংবাদিকটিকে দেখতে পান,তার চারপাশে বেশ কিছু পুলিশ সদস্যকেও দেখা যাচ্ছে। আমিরের সেই বোধটা আবার ফিরে আসে। কিছু একটা ঘটবেই আজ,নিশ্চিত। ঘটবেই।

এবং তা ঘটে।

বেলা ১১টা নাগাদ হঠাৎ করেই যেন কোথাও পাগলাঘন্টি বেজে ওঠে। দক্ষিণ দিক থেকে একাধিক গুলির শব্দ ভেসে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রবৃত্তির তাগিদেই লাফ দিয়ে আমির হোসেন আশ্রয় নেয় পাশ্ববর্তী ইটের স্তূপের আড়ালে। সতর্ক ছিলো সে, কিন্তু তাই বলে এরকম গোলাগুলির মাঝে পড়তে হবে- সেটা তার মাথায় আসেনি।

সাবধানে মাথা উঁচিয়ে বামপাশে লক্ষ্য করা মাত্রই আমির হোসেনের পেটের ভেতর পাক দিয়ে ওঠে। খানিক আগেও বেঁচে ছিলো যে পুলিশেরা, অতর্কিত গুলি হামলায় তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মৃত। এবং এই দলে সাংবাদিকটিও আছেন। লোকটার কার্ডিগানের একাংশ ভিজে গেছে রক্তে।

মাথায় রক্ত উঠে যায় ল্যান্স নায়েক আমির হোসেনের। প্রচণ্ড এক অজানা ক্রোধে পাশের খেজুর গাছটার আড়ালে লাফ দিয়ে চলে যায় সে। হাতের এলএমজি’টা দক্ষিণ মুখে তাক করতেই আবারো আসে আক্রমণ।

এবার উত্তর দিক হতে। শ’খানেক বিহারী হাতে দা- ছুরি হাতে উর্দুতে হুঙ্কার দিতে দিতে ছুটে আসতে থাকে তাদের দিকে। প্রচণ্ড আক্রোশে মাটিতে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলোকেই দা দিয়ে কোপ দিতে থাকে তারা, মৃতদেহগুলোকে টেনে নিতে থাকে পানির ট্যাঙ্কির দিকে। একটা ছোট্ট দল দেখা যায় তার দিকে ছুটে আসতে।

উপায়ান্তর না দিকে হাতের এলএমজি তুলে একপশলা ব্রাশ করে দিলো আমির হোসেন। ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়া আক্রমণকারীরা হতভম্ব অবস্থা কাটাবার আগেই ল্যান্স নায়েক ঝাঁপ দিলো পাশের কাদাপানির জলাশয়ে। ঝাঁপ দেবার আগে সর্বশেষ যে দৃশ্য তার চোখে পড়ে,তা হলো ছাই রঙ প্যান্ট- সাদা শার্টের-হালকা হলুদ কার্ডিগানের সাংবাদিকের দেহটাকে বিহারীরা টেনে নিয়ে যাচ্ছে পানির ট্যাঙ্কির দিকে।

০৪)

অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে মৃদু শব্দে চলমান প্রজেক্টর। পর্দায় ছবি চলছে। প্রজেকশন রুমের তিনজন দর্শকের মাঝে একজনের চোখ নিবিষ্টভাবে পর্দায় নিবদ্ধ। অপর দুইজন অপেক্ষা করছেন।

অপেক্ষার পালা ফুরিয়ে ছবি শেষ হয়। একজন উঠে আলো জ্বেলে দেন ঘরের। মনোযোগী দর্শক ভুরু কুঁচকে তখনো পর্দার দিকে তাকিয়ে আছেন, সেখানে কোন ছবি চলমান নয়।

দীর্ঘদেহী দর্শকটি খানিক পর বলেন, তোমরা বলছো, কোন কিছু কাগজে লেখা নেই? পরিচালকের মাথাতেই ছিলো পুরোটা?

হ্যাঁ, স্যার। সিনেমাটোগ্রাফার আফজাল চৌধুরী সায় দ্যান। জহির তো আসলে ছবি তৈরীর কাজে নামার আগেই পুরো ছবিটা মাথায় তৈরী করে নিতো। কাগজে স্যার তেমন কিছুই লেখা থাকতো না। তা, পকেটে ছয় আনা পয়সা নিয়ে যে ছেলে একটা রঙ্গিন সিনেমা বানিয়ে ফেলতে পারে…

কী যেন নাম বললে ছবিটার? ‘লেট দেয়ার বি লাইট’, না? দর্শক ভদ্রলোক বলে ওঠেন, তিনি থুতনিতে হাত দিয়ে ভাবছেন এখনো। তার এই ভঙ্গীটা সংবাদপত্রিকার কল্যাণে বহু মানুষের কাছেই পরিচিত। যদ্দুর মনে পড়ে, কয়েক বছর আগে তোমাদের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই তো অনুষ্ঠান করে ছবিটার ঘোষণা এসেছিলো। তাই তো,নাকি?

একজাক্টলি! নির্দিষ্ট করে বললে সেভেন্টির অগাস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে।  ঘরের তৃতীয় ব্যক্তি, মোটা চশমার আলমগীর কবির বলেন। যেটুকু দেখলেন স্যার, ওটুকুই কাজ শেষ করা হয়েছিলো ছবির। এরপর যুদ্ধই শুরু হয়ে গেলো। ছবির নায়ক যাকে দেখলেন, ওমর চিশতি- ছেলেটা পাকিস্তানের। নায়িকা ছিলো আমাদের ববিতা। যুদ্ধের মাঝে এই ছবির কাজ জহির ভাই এগিয়ে নিতে চান নি।
… তো এখন আমাদের খুব ইচ্ছে স্যার,যদি এই ছবিটা কোনক্রমে শেষ করা যায়। জহির ভাইয়ের শেষ ছবি, বোঝেনই তো…

সমস্যা হচ্ছে, এই ফুটেজগুলো দেখে আমি আসলে কোনক্রমেই আঁচ করতে পারছি না পরিচালকের উদ্দেশ্য কী ছিলো। কাগজে যদি টুকটাক কোন নোটও লেখা থাকতো, তাহলে হয়তো চেষ্টা করা যেতো। দর্শক ভদ্রলোকের কণ্ঠ একটু হয়তো হতাশ শোনায়।

কিন্তু স্যার আপনি যদি না পারেন, তাহলে...- আলমগীর কবিরের স্বরে তীব্র আকুতি।

অনুনয়ের কেন্দ্রে থাকা দর্শক উঠে দাঁড়ান। ঘরের মৃদু আলোতে এই প্রথম বোঝা যায়,মানুষটা সাধারণ কেউ নন। তাঁর ঋজু, দীর্ঘদেহী শরীরের দিকে তাকিয়ে আলমগীর কবিরের মনে পড়ে যায় এই মানুষটি সম্পর্কে আকিরা কুরোসাওয়া কী বলেছিলেন, সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা যে দেখেনি, সে লোক পৃথিবীতে বাস করেও চাঁদ আর সূর্য দেখেনি।

কিংবদন্তীর সেই সত্যজিৎ রায় মন্থর হেঁটে ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ফটোগ্রাফটির কাছে যান। ছবিতে জহির রায়হান হাসছেন। ছবির নীচে লেখাঃ “ জহির রায়হান। জন্মঃ ১৯ আগস্ট, ১৯৩৫। মৃত্যুঃ _ _ _”

সত্যজিৎ হার স্বীকার করেন। সত্যি বলতে কী,এরকম অভিজ্ঞতা আমার আগে হয় নি। ভেবেছিলাম তোমাদের সাহায্য করতে পারবো। কিন্তু পারছি না। ছেলেটার মাথার ভেতরে যে কী চিন্তাটা ছিলো এই ছবি বানানোর পেছনে, সেটা আমি এই ফুটেজ দেখে ধরতে পারিনি। সাধারণ কোন পরিচালক তো এইভাবে ডকুমেন্টেশন না রেখে ছবি বানানোর কথা কল্পনাও করবে না।

ছবিহীন পর্দার দিকে তাকিয়ে সত্যজিৎ রায় একটু যেন আনমনা হয়ে পড়েন। অবশ্য, জহির রায়হান তো আর সাধারণ কেউ ছিলো না…

[১৯ আগস্ট, ২০১১]

তথ্যসূত্রঃ
১। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র- খন্দকার মাহমুদুল হাসান
২। এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য- মইনুল হোসেন চৌধুরী(অবঃ)
৩। অমি রহমান পিয়ালের ডেথ অফ আ জিনিয়াস পোস্ট সূত্রে প্রাপ্ত দুইটি পেপার কাটিং

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s