সিঁড়ি ভাঙা শেষ হলে

প্রেস্তুপ্লেনিয়ে ই নাকাজানিয়ে, রাশান এই শব্দদ্বয়ের অনুবাদ দুনিয়াজোড়া ইংরেজির হাত ধরে হয়ে গেছে ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট, বাংলা করলে দাঁড়ায় অপরাধ ও শাস্তি। কিন্তু প্রেস্তুপ্লেনিয়ে নাকি এমন এক শব্দ, ক্রাইম/অপরাধ যার কাছাকাছি কেবল, কিন্তু পুরোটা বোঝায় না কিছুতেই। অর্থটা নাকি ‘লঙ্ঘন’, সেটা হতে পারে কোনো আইনের, অথবা কোনো নৈতিকতার সীমানায় থাকা আচরণের।

তবে দস্তয়েভস্কির উপন্যাস অপরাধ ও শাস্তি যখন পড়ি; শব্দের অর্থের ওই গ্যাঞ্জামে মাথা ঘামানোর অবসর আমার হয়নি। এই উপন্যাস পড়া হয়েছে জ্বরের মাঝে। আমার আজও মনে পড়ে, একটা ঘোরের মাঝে যেন আমি পাতার পর পাতা উলটে যাচ্ছি উপন্যাসের, মনে হচ্ছে যে তরুণ রাস্কলনিকোভ’ও আমার মতোই ঘোরগ্রস্ত আর ক্রমাগত কষ্ট পাচ্ছে মাথার ভেতরে।

উনিশ শতকের রাশিয়ায় সেন্ট পিটার্সবার্গের তরুণ রাস্কলনিকোভ এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র, সে কেবলই তার চিলেকোঠার ঘুপচি ঘরে বসে ভাবে। পত্রিকায় প্রকাশিত তার একটি প্রবন্ধ বেশ কৌতূহলজনক। রাস্কলনিকোভ সেখানে ব্যক্ত করেছে যে মানুষের মাঝে যারা অত্যন্ত প্রতিভাবান, নিজের স্বার্থে এবং বৃহত্তর সমাজের কল্যাণের জন্য তারা এমনকি সামাজিক আর নৈতিকতার মানদণ্ড ফিট করা আচরণগুলো লঙ্ঘন করতেই পারে। এজন্য দরকারে খুন করতেও এই প্রতিভাবান মানুষদের কোনো সমস্যা হওয়া উচিৎ নয় বলে রাস্কলনিকোভের ধারণা, আর এই তত্ত্বকে প্রকাশ করতে একটা প্রবন্ধও সে লিখেছে বলে জানা যায়।

রাস্কলনিকোভ নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তে মাঝপথে দারিদ্র্যের কারণে পড়া ছেড়েছে, তার মা এবং বোনও দারিদ্র্যপীড়িত, তাদের বাস রাজধানী থেকে দূরের কোনো মফস্বলে। এমতাবস্থায় রাস্কলনিকোভ নিজের সাথেই বোঝাপড়ায় আসে যে যে প্রতিভাবান বলেই নিজের স্বার্থে এবং বৃহত্তর সমাজের কল্যাণের জন্য এক সুদখোর বুড়িকে সে হত্যা করবে। নিখুঁত একটি অপরাধের ছক কেটে কুড়াল দিয়ে রাস্কলনিকোভ খুন করে বুড়িকে,  সেই হত্যাকাণ্ড দেখে ফেলে বলে বুড়ির বোনকেও সে হত্যা করে ঘটনাস্থলেই।

তবে খুনের সাথে সাথেই রাস্কলনিকোভের পিছু নেয় তার অনুতাপ, শুরু হয় আত্মযন্ত্রণা। বুড়ির কাছ থেকে লুট করা অর্থকড়ি কী করবে, বুঝতে না পেরে সেগুলোকে রাস্কলনিকোভ লুকিয়ে রাখে। আর হয়ে ওঠে অসুস্থ, প্রায়শ’ই প্রলাপ বকা এক যুবক। তার পেছনে লেগে যায় পুলিশ। কিন্তু গোয়েন্দা কাহিনির মতো কেবল খুনীকে চিহ্নিত করবার লক্ষ্যে চোর-পুলিশ খেলা চলে না অত্র উপন্যাসে, বরং সুযোগ্য পুলিশ অফিসার পরফিরি পেত্রোভিচ আর রাস্কলনিকোভের মাঝে চলতে থাকে কথার মারপ্যাঁচ। উপন্যাসের যেসব জায়গায় এই দুজন মুখোমুখি হয়েছে আর একে অন্যেকে তারা হারাতে চেয়েছে বুদ্ধিমত্তা আর যুক্তিতে, দারুণ উপভোগ্য সে জায়গাগুলো।

কিন্তু কী ঘটে রাস্কলনিকোভের নিজের সাথে বোঝাপড়ার?

একদিকে সবল, দৃঢ়চেতা চরিত্রের মানুষ; আর অন্যদিকে দুর্বল, মাথা ঝুঁকিয়ে রাখা মানুষ; এমন দুই দলে পৃথিবীকে ভাগ করার চিন্তা খুব বৈপ্লবিক কিছু নয়। বহু পূর্বেও এই বিশ্বাস ছিলো, আমরা জানি, আজকের পৃথিবীতেও মানুষ বোধহয় নিজের ভেতরে ভাবে এমনটাই। তবে দস্তয়েভস্কির রাস্কলনিকোভ কেবল ভেবেই থেমে থাকেনি, সে একজোড়া খুনও করে ফেলেছে। অথচ সে কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারে না নিজের বিচারে, কিছুতেই উঠতে পারে না সংশয়ের উর্ধ্বে। অন্য দশটা গড়পড়তা মানুষের চেয়ে সে প্রতিভাবান, ফলে খুনের অপরাধে বিচলিত হবার কিছু নেই; ওই তত্ত্ব দিয়েও নিজেকে আশ্বস্ত সে করতে পারে না আর। সে আবিষ্কার করে, বৃহত্তর মানবজাতি অথবা মায়ের অর্থাভাব দূর করার জন্য সে খুন করেনি, সে খুন করেছে কেবল নিজেরই কারণে।

রাস্কলনিকোভ অনুধাবন করে, কেবল ইচ্ছার বশে মানুষ যা খুশি তাই করে বেড়াতে পারে না। কেবল বুদ্ধিমত্তা আর যুক্তির সিঁড়ি ভেঙে লক্ষ্যে পৌঁছলেই যে জীবনকে সাজানো যায় না, এই বোধ রাস্কলনিকোভের মনে উদয় হয় তখন। মানুষের জীবনকে অনেকাংশেই অর্থবহ করে তোলে বিমূর্ত সব আচরণ, আর সুখের জন্য আত্মাকে সইতে হয় বেদনা। পুলিশের কাছে এসে রাস্কলনিকোভ তাই সমস্ত কিছুই খুলে বলে অকপটে, সে জানে যে শাস্তিভোগ না করলে শান্তি সে পাবে না।

রাস্কলনিকোভ কি আত্মহত্যা করতে পারতো না? পারতো হয়তো। দস্তয়েভস্কির নোটবুকে টুকে রাখা লেখা থেকে আবিষ্কার করা যায় এটাও যে রাস্কলনিকোভের স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে তিনিও ভেবেছিলেন। তবে সেই পথে গেলে যুক্তিকেই জিতিয়ে দিতে হতো আত্মার দাবির বিপরীতে, কিন্তু আমরা বুঝি এবং জানি যে দস্তয়েভস্কি উপন্যাসে মানুষের চির রহস্যঘেরা আত্মার দিকেই দিক নির্দেশ করেছেন বারবার। আর উপন্যাসের শেষ প্রান্তে যখন সোনিয়ার পা ধরে কেঁদে ওঠে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি রাস্কলনিকোভ, পাঠক তখন জেনে যায় যে আমাদের নায়কের দ্বৈত সত্ত্বা থেকে শেষতক বেরিয়ে এসেছে মানুষের মিনমিন করা চিরদুর্বল চরিত্রটিই। বলে রাখা ভালো, রাস্কলনিকোভ শব্দটি মূল নিহিত আছে রাস্কোল শব্দটিতে, এর অর্থ ভাঙন বা দ্বিধাবিভক্ত।

দস্তয়েভস্কির ব্যক্তি জীবনের দিকেও আমাদের একটু ফিরে তাকানো দরকার। জারের বিপক্ষে রাজনীতিক কর্মকাণ্ডের জন্য মৃত্যুদণ্ড পান তিনি, এবং শেষ মুহুর্তে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে থেকে বেঁচে গিয়ে পান নয় বছরের কারাবাস এবং নির্বাসন। ফিরে আসার পরে জনপ্রিয়তার পথে তাকে ফিরিয়ে আনে এই অপরাধ ও শাস্তি। এমনকী, এটাও বলা যায় মোটামুটি নিশ্চিত ভাবে, যে দস্তয়েভস্কির সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ এই উপন্যাসটিই।

কারাবাসের পর যখন ফিরে এলেন দস্তয়েভস্কি, যৌবনের অনেক উদার প্রগতিশীল (র‍্যাডিক্যাল কি বলা যায় সেগুলোকে?) মতবাদকেই ছেড়ে তিনি তখন যথেষ্ট রক্ষণশীল। পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি আর ধর্মাচরণ, যেগুলোকে যৌবনে তার বেশ আকাঙ্খনীয় মনে হয়েছিলো; এখন নতুন চোখে দস্তয়েভস্কি আবিষ্কার করেন সে সবের দেউলিয়াপনা। আর রাশিয়াও সে সময়টা ছিলো নানা মতবাদে টালমাটাল। সেখানে জারপন্থী মতবাদ ছিলো, ছিলো অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ান চার্চের প্রভাব, সংখ্যায় কম হলেও ছিলো উল্লেখ্য করার মতো র‍্যাডিক্যাল পন্থীদের উত্থান। রাস্কলনিকোভ নিজেও স্বীকার হয়েছে এই মতবাদগুলোর টানাপোড়েনের। তার পরিবারে বিরাজ করেছে চার্চভিত্তিক ধর্মীয় আবহ, অথচ তার নিজের পড়াশোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাশিয়ার র‍্যাডিক্যাল মতবাদের সূচনাটা হয়েছিলো এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেই।)।

উপন্যাসের বাকি চরিত্রদের মতোই, রাস্কলনিকোভ’ও তাই ভেতরে ভেতরে পুড়েছে। কিন্তু অন্যদের চাইতে তার দহনের ধরনটা একটু আলাদা। লেবেজিয়াতনিকভ যেমন আঁকড়ে ধরেছে একধরণের ইউটোপিয়ার সমাজতন্ত্রের ধারণা, সোনিয়ার মনে হয়েছে ঈশ্বর আর ত্যাগের আদর্শকে আশ্রয় করলেই শান্তি মিলবে এই সমাজে। কিন্তু রাস্কলনিকোভ আত্মার ওপর এই অত্যাচার সহ্য করতে পারেনি, সে একটা পথ বেছে নিয়েছে। পাগল অথবা ছিটগ্রস্থ সে হতে পারে, তবে সমাজ আর ঈশ্বরের নিয়মকে ভেঙে নতুন কিছু করবার দুঃসাহস সে দেখিয়েছে। প্রচলিত নিয়মে অনাস্থা দেখিয়ে এরকম বিপ্লবীপনা উপন্যাসে আর দেখিয়েছে কেবল সভিদ্রিগাইলভ, বাকি সকলেই যেন সমাজকে কেবল অনুসরণ করে গেছে, বদলাতে চেষ্টা করেনি।

অপরাধ আর শাস্তির বিষয়টি উপন্যাসে ফিরে এসেছে বারবার। চরিত্রগুলো নানা ধরনের অপরাধ করেছে পাতার পর পাতা জুড়ে, তবে কখনো তারা শাস্তি পেয়েছে, কখনো পায়নি।

মার্মাদেলভ যেমন এক ধরনের নৈতিক অপরাধে দোষী, কাতেরিনা ইভানোভনার জীবনটা সে অতিষ্ট করে তুলেছে অদূরদর্শীতায়। মারা গিয়ে লোকটা শাস্তি পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার বেঁচে থাকা পরিবারটাই বরং এতে সম্পূর্ণ পথে বসেছে। লুজিন যেমন সোনিয়াকে বানাতে চেয়েছে চোর, আইনের চোখে তার অপরাধটা নিশ্চিত হলো না বলেই সে বোধ হয় শাস্তি পেলো না। সোনিয়া নিজে কিন্তু আবার উপার্জনের রাস্তা না দেখে হলুদ টিকেট নিয়ে জড়িয়ে পড়েছে বেশ্যাবৃত্তির অপরাধে।সভিদ্রিগাইলভের অপরাধ রাস্কলনিকোভের বোন দুনিয়ার প্রতি, কিন্তু দুনিয়াও বাধ্য হয়ে গুলি ছোঁড়ে ওই লোকটার দিকে।  তবে অ্যাতো সব অপরাধের ভিড়ে চূড়ান্ত অপরাধ আমাদের রাস্কলনিকোভেরই, সাইবেরিয়ায় নির্বাসন পেয়ে সেটার শাস্তিও সে পায়।

এরকম অগণিত ঘটনার জালে আমাদের জড়িয়ে এগিয়ে গেছে উপন্যাস অপরাধ ও শাস্তি, দস্তয়েভস্কি যেখানে পাঠকের হাত ধরে তাকে নিয়ে গেছেন মানুষের মনের জটিল থেকে জটিলতর ঘুপচিতে। স্নেহহীন অদ্ভুত এক সমাজে বেড়ে উঠেছে রাস্কলনিকোভ, একটি ঘৃণ্য অপরাধীকে সে জন্ম দিয়েছে তার ভেতরের ঘনীভূত দারুণ ঘৃণা থেকে। আর উপন্যাসের পাতায় পাতায় ফিওদর দস্তয়েভস্কি সমাজের প্রতি রাস্কলনিকোভের অবিরাম ক্ষোভের মাঝ থেকে হঠাৎ হঠাৎ বের করে এনেছেন ব্যক্তির চিরন্তন আদল, অনেকটা নিয়মিত বিরতিতে উঁকি মেরে যাওয়া সেন্ট পিটার্সবার্গের অন্ধকার গলিপথের মতোই।

[এপ্রিল, ২০১৯]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s