শীতসন্ধ্যার ল্যাম্পপোস্টের আড়ালের বাংলাদেশ

প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ,আজকের এই আয়োজনে আমায় আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। স্বীকার করে নেয়া ভালো, যে তাজউদ্দীন আহমদের মতো মানুষকে নিয়ে স্মরণসভায় আলোচনা করবার মতো প্রজ্ঞাবান আমি মোটেই নই। সে কাজ অন্য আলোচকেরা করবেন। আমি কাজ করি শব্দ নিয়ে, উপন্যাস নিয়ে। আর ঘটনাচক্রে আমার প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস প্রচেষ্টা, সাক্ষী ছিলো শিরস্ত্রাণ, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জীবনকে কেন্দ্র করেই লেখা। ফলে, সাদাকালো অক্ষরের মাঝ দিয়ে শ্রদ্ধেয় তাজউদ্দীনের সাথে একটা উল্লেখযোগ্য সময় আমি যাপন করেছি, এখনো করছি। সেই সূত্রেই বোধ করি, আজকের আলোচনায় আয়োজকেরা আমায় কথা বলার যোগ্য মনে করেছেন। আমি কথা বলবো মূলতঃ  দুটো বিষয় নিয়ে। প্রথমতঃ তাজউদ্দীন আহমদকে আমি ঠিক কীভাবে আবিষ্কার করেছি, আর দ্বিতীয়তঃ আজকের বাংলাদেশে তাজউদ্দীনকে ঠিক কোনখানে আমি খুঁজে পাই।

আমাদের দুর্ভাগ্য, যে তাজউদ্দীন আহমদকে জানার জন্য কোনো নজর কাড়া প্রয়াস আমাদের সামনে কখনোই ছিলো না। তাকে চেনানোর জন্য এবিং মিসৌরির বাইরে কেউ কখনো বিজ্ঞাপণী বিলবোর্ড ঝুলিয়ে দ্যায়নি। আমাদের বিপরীত শব্দ আর পাটিগণিতে ভরপুর পাঠ্যবইতে, তাজউদ্দীন ছিলেন সামাজিক বিজ্ঞানের কিছু নীরস শব্দ। নবগঠিত মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন তাজউদ্দীন আহমদ, এর বেশি অবস্থিতি, লোকটা কোথাও পায়নি। ফলে,তাজউদ্দীন কখনো আমাদের হয়ে ওঠেননি। আমার, এবং আরো অনেকের শৈশবে তাই, তাজউদ্দীন কুয়াশার আড়ালে প্রায় অনুপস্থিত সম্ভ্রমে ঢেকে থাকা একটা নাম কেবল,শীতের সন্ধ্যায় একটা ল্যাম্পপোস্টের বেশি কিছু সেটা নয়।

তাজউদ্দীনকে সামগ্রিকভাবে চেনার শুরুটা, আমার ক্ষেত্রে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় প্রবেশের পর, বেশ কিছু সমমনা বন্ধু আমি খুঁজে পাই। এবং তাদের নানামুখী পাঠ্যভ্যাস;বইপত্র/সিনেমা/গান নিয়ে তাদের যে চিন্তার বুদবুদ; সেটার সাথে পরিচিত হয়ে আমার নিজস্ব জগৎটা একটা বড়সড় ধাক্কা খায় তখন। তো উত্তর-তিরিশের উলটো পিঠের সেই বিশ্ববিদ্যালয় দিনে, আমি একসময় খেয়াল করি, যে সমসাময়িক কোনো ঘটনার কাটাছেঁড়া যখন একদল মানুষ করতে যায়, যতই তারা কাছাকাছি চিন্তার হোক,তাদের ব্যাখ্যাগুলো তখন ঠিক নৈর্ব্যক্তিক থাকে না। প্রত্যেকেই আমরা নিজের অবস্থান থেকে এক একটা সত্যের জন্ম দেই, এবং তা নিয়ে রীতিমতো অটল হয়ে থাকি। কিন্তু ক্যানো একএকটা ঘটনার অনুবাদ করতে গিয়ে আমরা আনাড়ি অনুবাদকের মতো ভিন্ন সব উপসংহারে পৌঁছাই? কারণ খুঁজতে গিয়ে আমার মনে হয়, জবাবটা লুকোনো আছে একজন মানুষ ইতিহাসকে কীভাবে দ্যাখে,তার ওপরে।

ব্যক্তিগত এই সিদ্ধান্তে আসার পর; আমি তাই এই ভূখণ্ডের, এই জাতিরাষ্ট্রের অতীতের দিকে আরেকটু মনোযোগ দেই। একটি ফুলকে বাঁচাতে চেয়ে যুদ্ধ করেছিলো যে জাতি, ক্যানো তারা সাড়ে তিনযুগ পরেই নিথুয়া পাথারে নেমে সাহায্যের জন্য হাঁকডাক শুরু করেছে, সেটা বুঝতে এই আত্মঅনুসন্ধান অপরিহার্য বলে আমার মনে হয়েছিলো। এবং সেই অনুসন্ধানে নেমে আবিষ্কার করি, সার্কাসের রিংমাস্টারের মতো ইতিহাসকে পোষ মানিয়ে,সেটাকে লাফাতে বাধ্য করানো হয়েছে বাংলাদেশে। আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহুর্ত ছিলো মুক্তিযুদ্ধ; অথচ একটা রয়েল বেঙ্গল বাঘের গায়ে যতগুলো ডোরাকাটা থাকে,এই মুক্তিযুদ্ধকেও ঠিক ততভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা বাংলাদেশের মানুষ করেছে। তবে নানা মুনির এই বহুমুখী বয়ানের মাঝেও, একটু আলাদা করে একজন মানুষের দিকে চোখ যেতে যায়। ভিড়ের মাঝে একাকী এই মানুষটি তাজউদ্দীন।

মুক্তিযুদ্ধ এবং তার অব্যবহিত আগের ও পরের সময়টা নিয়ে যখন কেউ স্মৃতিচারণা করেন, কূটনীতিক অথবা সাধারণ মানুষ অথবা সম্মুখ যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো নায়ক; লক্ষ করি, আমাদের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে সবাই অন্ততঃ একটিবার স্যালুট মেরে যান। এবং তারা সকলেই দুটি প্রসঙ্গে একমত, স্বাধীনতার প্রতি তাজউদ্দীনের অক্লান্ত নিষ্ঠা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তার এক ধরনের পৌরাণিক আনুগত্য।

তাকে নিয়ে সমসাময়িকদের এমন মুগ্ধতা খেয়াল করে প্রথমবারের মতো আমার মনে হয়েছিলো; যে গৃহবিবাদের ধাক্কা আর অপ্রাপ্য অপবাদের মুখে উনিশশো একাত্তরে দাবার বোর্ডে নড়বড়ে হয়ে থাকা মন্ত্রীটি, তাজউদ্দীন, তিনি আসলে আমাদেরই মতোন। মূল্যবোধের প্রতি যথাসম্ভব বিশ্বস্ত থাকা যে বাঙালি প্রতিনিয়ত ক্ষমতাসীনের চোখ রাঙানি সহ্য করে যায়, শুভবোধকে ধারণ করা যে মানুষ চিরটাকাল অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে পেশীশক্তির দাপট দেখে, তাজউদ্দীন ঠিক তাদেরই একজন।

অথচ এই মানুষটা সময়ে সময়ে হার মানিয়ে দ্যান সিনেমার পর্দার সবচেয়ে আদর্শবাদী চরিত্রকেও। লক্ষ করি,বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে বেমানান রকম এক ধরনের স্থিরতা, এক ধরনের দূরদর্শীতা, সেই শৈশব থেকেই ঘিরে রেখেছে মানুষটাকে। অকল্পনীয় লাগে,যখন দেখি এ যুগের আদর্শ ফার্স্ট বয়দের মতো না হয়ে স্কুল পড়ুয়া তাজউদ্দীন আদালতে যাচ্ছেন উকিলের প্রশ্নোত্তর শুনতে এবং হোস্টেলে ফিরে বন্ধুকে বলছেন,জজ সাহেব অমুক শব্দটা না বলে তমুক শব্দটা বললেই বরং মানাতো! আবার মুক্তিযুদ্ধের তুমুল মুহুর্তেও দেখি, অসুস্থ পিয়নের মাথায় তাজউদ্দীন নিজেই পানি ঢালছেন দাপ্তরিক কাজের পাহাড় ভুলে গিয়ে। এক জীবনে নায়কোচিত অনেক কিছুই তাজউদ্দীন করেছেন, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই চিন্তাশীল আর মানবিকতায় পূর্ণ একজন মানুষ হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা তার মাঝে ছিলো। তার সাথে সময় কাটাতে যেয়ে, এই উপলদ্ধিই আমায় ঠ্যালা মেরেছে সবচেয়ে বেশি।

কিন্তু অমন আদর্শ নিয়ে চলা যে তাজউদ্দীন, যিনি সময়ে সময়ে শেখ মুজিবের ছবি নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙ্গে পড়তেন লাজুক কিশোরীর মতো অথচ বাংলাদেশের শত্রুদের সামনে শুধু ফাইল হাতেই ছিলেন ভীষণ নটোরিয়াস, তার পরিণতিটা ক্যানো ওরকম হলো?

প্রশ্নটার সরাসরি কোনো উত্তর হয় না, তবে নানা ধরনের অব্যক্ত সমীকরণ মিলিয়ে হয়তো একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আর সমীকরণের শেষে পাওয়া যায় স্বাধীন বাংলাদেশে তাজউদ্দীন আহমদের একলা হয়ে পড়া। শেষের এই বিষয়টি আমাকে খুব স্পর্শ করেছিলো। আরও তরুণ এবং আরও মূর্খ ছিলাম বলেই হয়তো, যুদ্ধদিনের শিরস্ত্রাণ যে শান্তির দিনে রাজমুকুট হয়ে উঠতে পারেনি, সে দুঃখটা আমার ভেতরে তখন এমন জমাট বাধে, যে মনে হয় তাজউদ্দীনকে নিয়ে কিছু একটা আমি লিখে ফেলতে পারি। আবেগ যখন আরো ডালপালা ছড়ায়,তখন মনে হয় যে তাজউদ্দীনের গল্প বলতে গেলে ক্যানভাসটা উপন্যাসের চাইতে ছোটো হলে চলে না। উপন্যাসের ভুরু কুঁচকানো শর্ত পূরণ বা সেরকম কোনো চিন্তায় আমি কিন্তু তখন সময় দেইনি। আমি কেবল চেয়েছিলাম তাজউদ্দীনকে একা হয়ে পড়তে দেখার যে বিষণ্ণতা, অন্য কয়েকজনের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে। মুকুট নামের মানুষটার গল্প, এবং কেবল গল্পটাই, আমি বলতে চেয়েছিলাম।

তো, এই হলো তাজউদ্দীনকে নিয়ে আমার উপন্যাস লিখতে চাওয়ার পেছনের বয়ান। এখন আলোচ্য হচ্ছে, আজকের বাংলাদেশে; যেখানে যাত্রাদলের বিবেকের পার্টে অভিনয় করছে চাটুকার, যেখানে সকলের কাছে প্রিয় মুখেরা শুধু জ্যোছনার কথাই বলে, অথচ জননীর কাছে আসে না; সেই বাংলাদেশে তাজউদ্দীন কী করতেন আজ? তিনি কি তার সেই বাইসাইকেলে চড়ে ঘুরে ঘুরে দেখতেন কী হচ্ছে বিশ্বজিৎ আর নুসরাতদের সাথে? মনে গভীর দুঃখ নিয়ে তিনি কি আরো একবার অপ্রিয় সত্যগুলো অনুচ্চারিত রেখে দিতেন তার প্রিয় মুজিব ভাইয়ের কাছে?

জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা ছিলো যে বাংলাদেশে; আমরা দেখছি সেটি এখন দাঁড়িয়ে আছে গণপরিবহন আর প্রশ্নফাঁসের মাফিয়াদের হাত ধরে, দাঁড়িয়ে আছে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ আর অভিজিৎ রায়ের রক্তের ওপরে। ডানপন্থার চড়তে থাকায় উন্মাদনায় যখন সায় জানাচ্ছেন আমাদের সবচেয়ে আস্থাভাজন মানুষগুলোও, এই বাংলাদেশে তখন স্টেটসম্যান তাজউদ্দীনের জায়গা কোথায়?

এ প্রশ্ন অনেকের। রাজনীতি সচেতন মানুষ, ইতিহাস সচেতন মানুষ, বাংলাদেশের ভবিষ্যত বুঝতে চাওয়া সর্বজ্ঞ দার্শনিক থেকে শুরু করে পাঠচক্রের প্রশ্নে জর্জর তরুণ; সকলেই জানতে চায়, তাজউদ্দীনকে কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে? ড্রয়িংরুমের দেয়ালে কামরুল হাসানের যত ছবি, রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত সাবিনা ইয়াসমিন, নাটক সরণির যত পায়ের আওয়াজ, সবাই জানতে চায়, তাজউদ্দীন এখন কোথায়?

আগেই বলেছি, উপস্থিত বাকি বক্তাদের মতো আমি প্রজ্ঞাবান নই কোনোভাবেই। তাজউদ্দীন কোথায় আছেন জানতে চেয়ে আমি তাই খোঁজ করেছি আমার ব্যক্তিগত জীবনে। এবং জেনেছি, তাজউদ্দীন আছেন আমার নোটবুকে, তাজউদ্দীন আছেন আমার ঘাড়ত্যাড়ামিতে, তাজউদ্দীনের সন্ধান পাওয়া যায় আমার উপন্যাস লেখার টেবিলে।

জানি, শুনে ভুরু কুঁচকাবেন অনেকেই। নড়বড়ে এক মঞ্চের ওপরে যে মানুষটি গঠন করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীন সরকার, তরুণ এবং হতে-চাওয়া-এক-ঔপন্যাসিকের ব্যক্তিগত অনুষঙ্গে টেনে তাকে ছোট করে ফেলার মানেটা কী? ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন তাই।

প্রথমেই আসি নোটবুকে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ফিওদর দস্তয়েভস্কি থেকে একালের ওরহান পামুক; সমস্ত ঔপন্যাসিককেই আমরা খসড়া খাতা ব্যবহার করতে দেখেছি। একজন লেখক যখন কোনো মানুষকে পর্যবেক্ষণ করেন, সেই ব্যক্তির যত অভ্যাস, যত একান্ত গল্প, কৌতূহল জাগানো যত মন্তব্য; সবই তিনি গুটিগুটি অক্ষরে লিখে রাখেন তার নোটবুকে। আমিও সেই চেষ্টা করি। কিন্তু দিনে বা রাতে যখনই সেই খসড়া খাতা আমার হাতে উঠে আসে, আমি দেখতে পাই সেই তাজউদ্দীনকে, যিনি তার ছাত্রজীবন থেকে ১৯৭৫ এর সেই ঘোর দুর্যোগের সময়েও লিখে গেছেন ডায়েরি।

ডায়েরির পাতায় পাতায় তিনি লিখে গেছেন ওথেলো নাটক থেকে শুরু করে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা দেখার কথা, লিখেছেন কৃষকের অবস্থা দেখে কী করে তিনি আঁচ পাচ্ছেন অর্থনৈতিক মন্দার, লিখেছেন কী করে মহাত্মা গান্ধীর তিরোধান তাকে ভারাক্রান্ত করে দিচ্ছে। তাজউদ্দীনের প্রায় সমস্ত ডায়েরি হারিয়ে গেছে, কিন্তু যে সব ডায়েরি উদ্ধার করা গেছে, সেসবের পাতায় চোখ বুলানো মাত্রই পাঠক আবিষ্কার করতে পারে যে কী করে একজন মানুষের চিন্তাগুচ্ছ পরিণত হয়ে উঠছে। এবং আজ একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বসে, শুধু ঔপন্যাসিক নয়, যদি কোনো গবেষকও তার নোটবুকে টুকে নিতে চায় সমাজের কলকব্জাগুলো কীভাবে একটির সাথে আরেকটি জট পাকিয়ে গেছে সে বিবরণ, বা কোনো স্থপতি যখন লিপিবদ্ধ করতে থাকে অপরিকল্পিত নগরায়নের সম্ভাব্য সমাধান; আমি জানি বর্তমানের চেয়ে আরেকটু বাসযোগ্য একটা বাংলাদেশ গড়ার সংকল্প তখন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ডায়েরি বা নোটবুক, আমার কাছে তাই চিন্তার প্রতীক। আর যে মানুষটি বৈশ্বিক একটা দৃষ্টিভঙ্গি সাথে করে বাংলাদেশকে নিয়ে চিন্তা করছে, আমি নিশ্চিত, তাজউদ্দীন তার মাঝে আছেন।

নোটবুক যেমন লেখকের কাছে কারো চিন্তাধারার প্রতীক; ঠিক তেমনই, গোয়ার্তুমি তার কাছে একটা অস্ত্র।

আজ ধারণা করি, উপন্যাস যে লিখতে চায় প্রতিভা বলে কোনো কিছু অস্তিত্ব তার কাছে নেই। অনুপ্রেরণা বলে যদি কিছু থাকে, সেটাও এক একজনের ক্ষেত্রে কাজ করে এক এক ভাবে। তার কাছে অনিবার্য কেবল একটা ব্যাপারই, গোয়ার্তুমি। প্রতিটা সাদা পৃষ্ঠা লেখকের কাছে আসলে যুদ্ধক্ষেত্র, সত্যকে খুঁজে পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন ধরে তাকে সেটার সাথে একাকী যুদ্ধ করতে হয় ঘাড় ত্যাড়া করে।

এবং একলা লড়বার উদাহরণে তাজউদ্দীনের চাইতে উপযুক্ত কাউকে খুঁজে পাওয়া দুস্কর। উনিশশো একাত্তরে সীমান্ত পেরোবার পর থেকে বহুবার একলা লড়তে হয়েছে তাজউদ্দীনকে। তিনি মন্ত্রীত্ব লোভী বলে আখ্যা পেয়েছেন, শিলিগুঁড়ির সভায় তার বিরুদ্ধে প্রবল বেগে উড়েছে অনাস্থা প্রস্তাবের পতাকা, ক্যাবিনেট সভায় তাকে বারবার ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে অপমানের থাপ্পড়। কিন্তু স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তিনি ছিলেন অনমনীয় এক সাইপ্রাস গাছ। সত্যের পক্ষে থেকে লড়ে যাবার এই গুণটি তার মাঝে আমরা আগেও দেখেছি মুসলিম বয়েজ স্কুলের ক্লাস নাইনে, যখন তাজউদ্দীন অঙ্কের শিক্ষকের মুখের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন তার অন্যায় আচরণের; পরেও আমরা তার ওই একগুঁয়েমির দর্শন পাবো, যখন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারাকেও গরুর দড়ি নিয়ে খোঁটা দিতে তাজুদ্দীনের আটকাবে না।

আজও তাই বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তে প্রথার বিরুদ্ধে, সংস্কারের বিরুদ্ধে একলা হয়ে কেউ যখন লড়ছে; আমি জানি, তাজউদ্দীনকে সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়। তরুণ কোনো বিজ্ঞানী যখন তার আবিষ্কৃত সফটওয়্যার উন্মুক্ত করে দ্যায় বিনামূল্যে, অথবা বাংলাদেশের জার্সি গায়ে খেলার মাঠে কোনো আদিবাসী কিশোরী যখন জিতে যায় প্রতিক্রিয়াশীলদের চাপিয়ে দেয়া ফতোয়ার বিরুদ্ধে; খেয়াল করলে দেখা যাবে, একগুঁয়ে তাজউদ্দীন তখন আশপাশেই কোথাও হাসছেন।

এবং বলতেই হবে, তাজউদ্দীনকে, আমি প্রতিদিন আবিষ্কার করি আমার উপন্যাস লেখার টেবিলে।

অকিঞ্চিৎ জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ উপন্যাসের টেবিলে কাটিয়ে, আজ বোধ হয় আমার, যে  উপন্যাস লেখার যাত্রা আসলে লেখকের নিজস্ব কোনো অসুখের মোকাবেলা। মাসের পর মাস আর বছরের পর বছর সাদা পৃষ্ঠাকে সামনে রেখে নিজের ভেতরে যে অভিযান ঔপন্যাসিক চালায়, সেটির পেছনে আসলে থাকে একরকম আবিষ্কারের নেশা। নিজের ভেতর দ্বিতীয় কাউকে আবিষ্কার, নিজেকে ভেঙে ফেলে দ্বিতীয় কারো সংকটকে আবিষ্কার। সাহিত্যের ইতিহাস, সবসময়ই অন্য কেউ হয়ে ওঠার ইতিহাস। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন নিজেকে রুপান্তরিত করেছিলেন পদ্মা নদীর মাঝিতে, অত্থবা তলস্তয় যেমন নিজেকে ভেঙে ফেলে ভেতরে আবিষ্কার করেছিলেন আন্না কারেনিনাকে।

আর উপন্যাসের টেবিলে বসে প্রতিটি দিন আমি মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পারি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা তাজউদ্দীন আহমদের মতো মানুষেরা কতটা মহৎ শিল্পী। একজন ভালো ঔপন্যাসিক একটা সমাজকে নিজের ভেতরে ধারণ করেন; একজন বঙ্গবন্ধু বা তাজউদ্দীন একটা গোটা ভূখন্ডকে নিজের মাঝে ধারণ করেছিলেন। একজন লেখক নিজেকে রুপান্তরিত করতে পারেন অন্য কোনো মানুষে, তাজউদ্দীন নিজেকে রুপান্তরিত করেছিলেন সমগ্র বাংলাদেশে।

ফিরে তাকাই কুয়ালালামপুরের এডিবি সভায়। নানা রকম ফাইলপত্র দেখিয়েও যখন সন্তুষ্ট করা যাচ্ছে না দাতাগোষ্ঠীকে, তাজউদ্দীন তখন বলেছিলেন, আপনারা কি চান আমি হাঁটু গেড়ে বসে ঋণ প্রার্থনা করি? আজ আমি বুঝি, প্রবল ব্যক্তিত্ববান তাজউদ্দীন সে মুহুর্তে নিজেকে ভেঙে ফেলেছিলেন, নিজেকে রুপান্তরিত করেছিলেন বাংলাদেশের অজস্র প্রয়োজনের মুখপাত্রে।

আজ যখন ফিরে তাকিয়ে দেখি যে কলকাতার থিয়েটার রোডের দোতলা বাড়িতে বর্ষণমুখর রাতের শেষে তাজউদ্দীন দৃষ্টি রেখেছেন জানালায়, আমি জানি তার রক্তলাল চোখে তখন জায়গা পেয়েছে প্রতিটি শরণার্থীর ব্যক্তিগত বেদনা।

ঘোরলাগা এক সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হয়ে সীমান্ত পাড়ির পূর্বে তাজউদ্দীন যখন চিরকুট পাঠিয়েছিলেন জোহরা তাজউদ্দীনকে, বাংলাদেশের ইতিহাসের মনোযোগী পাঠক জানে এবং জানবে, মানুষটি তখন নিজের সাথে সাথে তার পরিবারকেও আবিষ্কার করেছিলেন বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অংশ হিসেবে; দ্বিতীয় কেউ হয়ে ওঠার এমন উদাহরণ, পৃথিবীর মহত্তম সাহিত্যকর্মেও দুর্লভ।

সেলফি দ্যুতি আক্রান্ত রেস্তোরাঁয় না খুঁজে আমাদের তাই তাজউদ্দীনকে খুঁজতে হবে আরেকটু দূরে। মফস্বলী যে তরুণ পাঠচক্রের ছায়ায় বাতাস দিচ্ছে আরো দশজনকে, যে তরুণী লাইব্রেরির ধূলোমলিন বইয়ের তাক নাড়াচাড়া করে অনুসন্ধান করতে চাইছে সমাজের ভবিষ্যত, পাগলাটে যে মাঝবয়সি লোকটা অজস্র বৃক্ষের গা থেকে পরম মমতায় পেরেক তুলে দিচ্ছে, যে কিশোর বিনাপয়সায় পড়িয়ে যাচ্ছে পথশিশুকে, যে যুবক রক্তের সন্ধানে তোলপাড় করছে হাসপাতালের অলিগলি; কিংবা এদের মতো অন্য আরো যাদের বুকের মাঝে কেবল আমি সর্বস্ব ব্যক্তির বদলে এক টুকরো বাংলাদেশ আছে, আমি জানি, তাজউদ্দীনকে আমরা সেসব মানুষের মাঝেই খুঁজে পাবো।

উপসংহার টানতে হয় তাই এই সিদ্ধান্ত দিয়ে যে, আজকের বাংলাদেশেও তাজউদ্দীন আছেন। উদার অসাম্প্রদায়িক একটা সমাজ গড়ায় চিন্তাধারায় তাজউদ্দীন আছেন, অনমনীয় হয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকায় তাজউদ্দীন আছেন। তাজউদ্দীন আছেন নিজের জন্য একটা বাংলাদেশ চাওয়ায় নয়, তিনি আছেন নিজেকেই বাংলাদেশ করে নেওয়ার মাঝে।

বক্তব্য শেষ করবো, আরো একবার তাজউদ্দীনের পাশে আমাদের ক্ষুদ্রতা তুলনা করে। মানুষটি নিজেকে আড়াল করে ইতিহাস লিখতে চেয়েছিলেন, এবং আমাদের বর্বর রুচি তাকে সত্যিই অনেকাংশে ঠেলে দিয়েছে বিস্মৃতির ধূলোর আড়ালে। আজ এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি ভারাক্রান্ত বক্তব্যের দিকে ফিরে তাকিয়ে বেশ বুঝতে পারি, যে বলার সুযোগ পেয়েও নিজেকে আড়াল করতে চাওয়া অসম্ভব কঠিন এক কাজ। অথচ তাজউদ্দীন এই কাজটি করতে পেরেছিলেন প্রচণ্ড অনায়াসে। আমার, এবং বাংলাদেশের অক্ষমতা, তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থেকে এখনো কিছুই আমাদের শেখা হয়নি।

আপনাদের সবাইকে অজস্র ধন্যবাদ আমার কথাগুলো ধৈর্য্য নিয়ে শোনার জন্য।

[২৩ জুলাই, ২০১৯-এ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর আয়োজিত তাজউদ্দীন আহমদের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠানে দেয়া স্মারক বক্তব্য। বক্তব্যটির ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করে ঋণী করেছেন বন্ধু জাহরা জাহান পার্লিয়া। ]

 

 

One thought on “শীতসন্ধ্যার ল্যাম্পপোস্টের আড়ালের বাংলাদেশ

  1. পুরোটা এক নাগাড়ে পড়লাম। ভালো লেগেছে। তাজউদ্দীনরা এখনও সমাজে না থাকলে সমাজ ক্রাম্বল করবে। তাই তাজউদ্দীন সৃষ্টির জন্য তাজউদ্দীন চর্চা জরুরী। ধন্যবাদ।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s