‘গেইম অফ থ্রোন্স হেঁটেছে বিপ্লব আর নারী নেতৃত্বের জুজু দেখানো পথেই’ : স্লাভোয় জিজেক

স্লোভেনিয়ান দার্শনিক স্লাভোয় জিজেক আলোচনা করেছেন সদ্য সমাপ্ত টিভি সিরিজ গেইম অফ থ্রোন্সের রাজনীতিক দর্শন নিয়ে। ২৩ মে, ২০১৯-এ ইন্ডিপেন্ডেন্ট এর মতামত বিভাগে প্রকাশিত উক্ত আলোচনাটি এখানে অনুবাদ করা হলোঃ 

গেইম অফ থ্রোন্সের শেষ সিজন দেখে মানুষের হট্টগোল এমন চরমে উঠেছে, যে প্রায় দশ লাখের মতো লোক অনলাইনে আবেদন জানিয়েছে এই সিজনটা বাতিল করে আবার শুটিং করবার জন্য। বিতর্কের আকার দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে, দর্শক এই সিরিজের অন্য পরিণতির জন্য প্রয়োজনে বাজিও ধরতে পারে!

মানুষের অতৃপ্তিগুলো শোনা যাচ্ছে মূলত কয়েকটা বিষয়কে ঘিরেইঃ দুর্বল চিত্রনাট্য (দ্রুত সিরিজ শেষ করবার চাপ, গল্পের জটিল বয়ানটিকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলা), চরিত্রদের দুর্বল মনস্তত্ত্ব (ডেনেরিসের মুহুর্তেই উন্মাদিনীর রুপ নেয়া তার চরিত্রের সাথে খাপ খায় না)- এরকম সব ব্যাপার।

তো, এই বিতর্কে যারা অংশ নিয়েছেন, তাদের মাঝে লেখক স্টিফেন কিং’এর পর্যবেক্ষণটা চোখে পড়বার মতো, যিনি লক্ষ করেছেন, যে দর্শকের অতৃপ্তিটা আসলে গল্পের বাজে সমাপ্তি নিয়ে নয়, বরং সমাপ্তি বিষয়টাকে নিয়েই। আমাদের এই টিভি সিরিজ ভারাক্রান্ত সময়ে, কোনো কিছু অনির্দিষ্টকাল ধরে চলাটাই যখন নীতি, সেখানে ঘোষণা দিয়ে গল্পের বয়ান বন্ধ করাটা রীতিমতো অসহ্য।

সত্যি বলতে, সচরাচর এরকম গথিক পটভূমিতে যেরকম অতিনাটকীয়তা আমরা দেখি, তার চাইতে শেষ সিজনটা আমার কাছে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে। এখানে যুদ্ধের প্রস্তুতি ছিলো, যুদ্ধের শেষে স্বজন হারানোর আহাজারি ছিলো, সব শেষে যোদ্ধাদের জীবনের অন্তঃসারহীনতাও দেখানো হয়েছে। কিন্তু বলতেই হয়, যে যেভাবে তাড়াহুড়ো করে সিরিজটার শেষ দেখানো হলো, সেই উপায়টা বেশ অদ্ভুতই ছিলো। চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্বে যদি বা বিশ্বাস করা যায়, একটা টিভি সিরিজের গল্প বলার পূর্বশর্তগুলো এখানে কিছুতেই পূরণ হয় না।

অষ্টম সিজনে চরিত্রগুলোর মাঝে দ্বন্দ্ব দেখানো হয়েছে মূলত তিন পর্যায়ে। প্রথম পর্যায়ের লড়াইটা ছিলো মানুষের সাথে না-মানুষদের (নাইট কিং’এর নেতৃত্বাধীন মৃত মানুষের সৈন্যদল), দ্বিতীয় পর্যায়ে মুখোমুখি হয়েছিলো মানুষেরই দুই শিবির (শয়তান ল্যানিস্টারদের বিরুদ্ধে ডেনেরিস আর স্টার্কদের যুগ্ম বাহিনী), এবং সর্বশেষে ছিলো ডেনেরিস আর স্টার্কদের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব।

ফলে, এই সিজনের দ্বন্দ্বগুলোর পরিণতিও এগিয়েছে একটা বোধগম্য রাস্তায়। প্রথমে না-মানুষ নাইট কিং পরাজিত হলো, কিংস ল্যান্ডিং ধ্বংসের সাথে সাথে ল্যানিস্টাররাও হারলো, আর শেষে স্টার্কদের মুখোমুখি হলো ডেনেরিস। অর্থাৎ চিরায়ত ভালোমানুষেরা (স্টার্ক পরিবার) তাদের জনগণকে রক্ষা করলো প্রথমে স্বৈরশাসক ল্যানিস্টার আর পরে ডেনেরিসের হাত থেকে; যেখানে শেষের জন নিজেই নতুন ধরনের এক প্রগতিশীল, বারবার যে অসহায় মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

চুড়ান্ত দ্বন্দ্বের সামনে এসে তাই প্রশ্ন জাগে, স্বৈরশাসনকে হটানোর পরে কোন রাস্তাটা আমরা নেবো? একদিকে আছে পুরোনো ধাঁচের শাসন, যেখানে জনগণ জায়গা পাবে মায়ামমতা থাকা একজন সুশাসকের ছাতার নিচে। অন্যদিকে বিদ্যমান পুরো ব্যবস্থাটাকেই ভেঙে নতুন কোনো শাসন ব্যবস্থাকে বেছে নেয়ার সুযোগ।

সিরিজের শেষ পর্বে আমরা দেখি যে বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিপ্লবী কোনো পরিবর্তন আনার সম্ভাবনাটা সিনেমাটোগ্রাফার ওয়াগনার ছুঁড়ে ফেলেছেন, বরং হেঁটেছেন প্রথাগতভাবেই নারীবাদের বিপরীত রাস্তায়। যে সব নারী ক্ষমতার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশ নিতে চায়, তাদের শেষ পর্যন্ত বরদাশত করা হয়নি গল্পের বয়ানে। ভাবটা এমন ছিলো, যে নারী কি আর পুরুষের মতো নাকি? সে ক্ষমতা চায় নিজ পরিবারের ভালোমন্দ নিয়ন্ত্রণের স্থূল স্বার্থে। বা, আরো খারাপ,  নিজের ব্যক্তিগত খামখেয়ালি মেটাতে। স্থানীয় রাজনীতির বৈশ্বিক রুপটা উপলদ্ধির সামর্থ্যটা নারীর থাকে না। পরিবারের ছোট্ট বলয়ে নারীত্বের যে রুপটা ভালোবাসা আর আশ্রয় দেয় সবাইকে, সেটাই রাজনীতির ময়দানে এসে নির্লজ্জভাবে উন্মাদ হয়ে পড়ে। আমাদের খেয়াল করে দেখতে হবে গেইম অফ থ্রোন্সের সবচেয়ে ফালতু দৃশ্যের দিকে, যখন ডেনেরিস গরম চোখে জনকে জানায় যে, যদি ছোকরা তাকে ভালোবাসতে না-ই পারে, তবে এখন থেকে ভীতিই রাজত্ব করুক। যৌনজীবনে অসুখী নারী মাত্রই যখন-তখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে, টিভি পর্দায় মেয়েদের এই রুপে উপস্থাপন করবার এক অশ্লীল প্রয়াস ছিলো ওই দৃশ্যটা।

কিন্তু তিক্ত ব্যপারটার দিকেও আমাদের ফিরে তাকানো দরকার, মানুষ খুন করতে ডেনেরিস হঠাৎ ওরকম খেপে উঠলো ক্যানো? কিংস ল্যান্ডিঙের হাজারো মানুষকে নির্দয়ভাবে ওরকম পুড়িয়ে মারাকে কি নতুন পৃথিবী নির্মাণের অভিযানে কোনো ভাবে নায্যতা দেয়া যায়? এই জায়গায় এসে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, যে চিত্রনাট্যটাও প্রকৃতপক্ষে দুজন পুরুষের হাতেই লেখা। উন্মাদ রাণী হিসেবে ডেনেরিসের আবির্ভূত হওয়াটা পুরোপুরিই পুরুষের খেয়াল; সমালোচকেরা তাই যথার্থই বলছে, যে বংশানুক্রমে পাগলামির ব্যাখাটা ডেনেরিসের মনস্তত্ত্বের সাথে খাপ খায় না। চোখে জিঘাংসা নিয়ে ড্রাগনের পিঠে চেপে ডেনেরিসের গোটা শহর ধ্বংস করে দেবার দৃশ্য আসলে নারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি পুরুষতান্ত্রিক দুনিয়ার চিরকালীন ভয়।

গেইম অফ থ্রোন্স সিরিজের শেষে অন্যান্য প্রধান নারী চরিত্রগুলোর দিকে তাকালেও বিষয়টা পরিষ্কার হয়। ‘ভালো’ নারীর প্রতিনিধি ডেনেরিস, ‘দুষ্ট’ নারীর প্রতিনিধি সার্সেইকে হারিয়েছে ঠিকই; তবে ক্ষমতার স্বাদ তাকে নষ্ট করেছে। নাইট কিং-কে মেরে সবাইকে বাঁচানো আরিয়া যাত্রা করেছে পশ্চিমের দিকে (এমন ভাবে, যেন সে আমেরিকাকে উপনিবেশ বানাতে যাচ্ছে!)।

বাকি থাকে সানসা (নর্থের একচ্ছত্র ক্ষমতা এখন তার হাতে), যার চরিত্রটা আজকের পুঁজিবাদী দুনিয়ার নারীত্বের সংজ্ঞার সাথে খাপে খাপে মিলে যায়ঃ নারীর কোমলতাও তার আছে, আছে একটু একটু ষড়যন্ত্র করার ক্ষমতাও, বর্তমান শাসন ব্যবস্থার জন্য অ্যাকেবারে আদর্শ। নারীকে এভাবে প্রান্তিক করে তুলেই সিরিজের শেষ পর্বটি আজকের বিদ্যমান উদার-রক্ষণশীল শাসন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা এনেছে, জোর গলায় বলেছে, বিপ্লব সর্বদাই নতুন স্বৈরশাসক তৈরি করে; ডেনেরিসকে আওড়ানো জনের বাণী উদ্ধৃত করলেঃ যারা তোমায় ভালাবেসেছে, তারা জানে যে তুমি অসম্ভবকে সম্ভব করেছো। হয়তো এজন্যেই তারা বিশ্বাস করে যে আরো অভাবিত কিছুও তোমার পক্ষে করা সম্ভবঃ দুনিয়াকে এমন করে তোলা, যা আগে কেউ পারেনি। কিন্তু ড্রাগন দিয়ে যদি দূর্গ পোড়াও আর শহর জ্বালিয়ে দাও, তাহলে তুমি আর অন্যদের চাইতে আলাদা কোথায়? 

পরবর্তীতে জনের হাতেই খুন হয় তার ভালোবাসা (আবারো সেই পুরোনো পুরুষতান্ত্রিক ফর্মুলা,  নিজের সুনাম রক্ষার জন্যই নারীকে মরতে হবে), সেই জন; যে এই সিরিজের একমাত্র প্রভাবক যে নতুন কিছু করতে চেয়েছে, যে বিদ্যমান অসাম্যগুলো দূর করে দুনিয়াকে অন্যরকম করতে চেয়েছে।

এমনিতে ন্যায়রাজত্বই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সিরিজের শেষে, কিন্তু ক্যামন সে রাজত্ব? নতুন রাজা হয়েছে ব্র্যান। সে খোঁড়া, কিছুই তার চাওয়ার নেই, সে নীরস ও জ্ঞানী (সেরা শাসকদের আরো একটা গুণ তার আছে, শাসন করতে না চাওয়া)। ব্র্যানের নাম প্রস্তাবে জনৈক অভিজাতের হেসে ওঠার দৃশ্যটাই আমাদের বাকিটুকু বলে দেয়। এবং খেয়াল না করে দর্শকের উপায় থাকে না, যে শেষ পর্যন্ত ডেনেরিসের অনুগত হয়ে থাকা মানুষগুলোর মাঝে সংকরজাতই বেশি (যাদের সেনাপতি ছিলো কৃষ্ণবর্ণের), অন্যদিকে নতুন শাসকেরা সকলেই শ্বেত নর্ডিক।

অতএব শেষ পর্যন্ত বিপ্লবী যে রাণী গায়ের রঙ আর সামাজিক অবস্থানের উর্ধ্বে উঠে সবার জন্য স্বাধীনতা চেয়েছিলো, তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। সবকিছুই এখন স্বাভাবিক, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়নি।

[২৫ মে, ২০১৯]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s