বিচ্ছিন্নতার দহন

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝখানে ফিওদর মিখাইলেভিচ দস্তয়েভস্কি তার ছোট্ট উপন্যাসিকা নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ডে রোপণ করেছিলেন বিশেষ এক চিন্তাধারার বীজ, অস্তিত্ববাদ। আজ আমরা জানি, পরের দেড়শো বছরে চিন্তার ওই স্রোত ছড়িয়ে গেছে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো। বিংশ শতাব্দীর উপন্যাসের জগতে অস্তিত্ববাদ কতটা প্রভাব রেখেছে, কিংবা সাত্রে বা কাম্যু থেকে শুরু করে আমাদের ওয়ালীউল্লাহ পর্যন্ত কীভাবে নেড়েচেড়ে দেখেছেন অস্তিত্ব নিয়ে গল্পের নায়কের ভীষণ সংকটমুখর জীবনযাপনকে; সে সব বিষয়েও বহু আলোচনা হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। কিন্তু সত্য কথাই হচ্ছে নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ডের কাছে পুনরায় ফিরে এসে গিয়ে সাহিত্য জগতে এই উপন্যাসের প্রভাব বিস্তার বিষয়ে ঠিক মন দিতে পারিনি। বরং, একবিংশ শতাব্দীর ঢাকা শহরের পথে যেমন সকল লোকের মাঝে বসে নিজস্ব মুদ্রাদোষে আমার যেমন নিজেকে কেবলই আলাদা, ক্ষুদ্র আর অকিঞ্চিৎ মনে হয়; সেই একই দশা আমি এই উপন্যাসে দেখতে পেয়েছি সেন্ট পিটার্সবাগের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে অজ্ঞাতবাসে যাওয়া লোকটির। মনে হয়েছে, নিজের ভেতর আমার অজস্র অনাবিষ্কৃত স্বরকে দস্তয়েভস্কি ভাষা দিয়েছেন এই ছোট উপন্যাসিকায়। লক্ষ করেছি বিস্ময়ে; মানুষ, মানুষের সমাজ আর এদের পারষ্পরিক মিথস্ক্রিয়া সংক্রান্ত নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ আজ অ্যাতো বছর পরেও অক্ষয়, সার্বজনীন।

কিন্ত ঠিক কী নিয়ে লেখা দস্তয়েভস্কির নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড? উত্তরটা নিজস্ব উপায়ে আমরা প্রত্যেকেই জানি, কেবল অভিজ্ঞতা লাভের রাস্তাটা সকলের আলাদা ছিলো।

পরীক্ষার খাতায় লিখতে লিখতে আঙুল যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন খেয়াল করলে দেখা যায়, যে এক ধরনের জেদ আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, অমুক প্রশ্ন বা খাতার দফারফা না করে আমরা তখন থামি না। ফুটবলের মাঠে নব্বই মিনিট নিজেকে উজাড় করে দেবার পরে যখন ঘোষণা আসে বাড়তি তিরিশ মিনিটের, টিভি পর্দায় আমরা দেখি যেসব খেলোয়াড় ইতোমধ্যে সর্বস্ব দিয়ে ফেলেছে নিজের, বাড়তি এই তিরিশ মিনিটে তাদের চোয়াল কী করে যেন হয়ে ওঠে আরো শক্ত। ভীষণ যন্ত্রণা নিয়েও তারা খেলে যেতে পারে। এই যে নিজেকে অবসন্ন করে ফেলা, নিজেকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করে আর ভেঙে ফেলে এক ধরনের মহানুভবতা আরোপ করা; দস্তয়েভস্কি তার নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ডে আশ্রয় করেছেন এই যন্ত্রণা পাবার সুখটাকেই। তবে শুধু এটুকু বললে সম্পূর্ণটা বলা হয় না যেন। উপন্যাসের জগতে অস্তিত্ববাদকে টেনে আনার সাথে দস্তয়েভস্কি কখনো তুলে এনেছেন মানুষের বিজ্ঞান নির্ভর ভবিষ্যতের স্বরুপ, কখনো বা এনেছেন পাশ্চাত্যের প্রভাবে বদলে যেতে থাকা রাশিয়ার শহর। উপন্যাসটার পাতায় পাতায় লেখককে তাই কখনো মনে হয় নাগরিক ক্লান্তিতে পিষ্ট এক মানুষ, কখনো বা মনোবিজ্ঞানী, কখনো বা মহাপ্রজ্ঞাবান কোনো দার্শনিক।

সত্যি বলতে, এসব ভূমিকার যে কোনোটাতেই দস্তয়েভস্কিকে দিব্যি নামিয়ে দেয়া চলে। চেতনার উপস্থিতিই যে সমস্ত বেদনার জন্য দায়ী, এই সহজ কথাটি তার চাইতে স্পষ্ট করে আগে আর বললো কে? রীতিমতো দার্শনিকের স্বরে এই সত্য উচ্চারণ করার পরেও লোকটা আবার হয়ে যাচ্ছেন নিখাদ সমাজবিজ্ঞানী। জানাচ্ছেন যে, মানুষ কখনোই আজীবন গণিতের সূত্রমতো চলবে না। বিজ্ঞান যদি অংক কষে মানুষকে আগেই জানিয়ে দেয় যে জীবনের প্রতিটি ধাপে কীভাবে চললে তার উন্নতি হবে সবচাইতে বেশি,  তবু মানুষ কোথাও না কোথাও ওই অংক এবং যুক্তির দেয়াল ভাঙবেই। কেবল নিজের স্বাতন্ত্র্য নিজের কাছে প্রমাণ করার জন্যেই যেন নির্ধারিত নিয়ম বা নিয়তি ভেঙে মানুষ হাঁটে এরকম অনিশ্চিত পথে। মানুষের বিষয়ে একমাত্র নিশ্চিত হয়ে রয় কেবল তার এই অনিশ্চয়তা!

উপন্যাসের প্রথম ভাগে এসব কথাই ঝাঁঝালো স্বরে পাঠককে জানান দেয় উপন্যাসের চল্লিশ বছর বয়েসি নায়ক, আপাতত সে অজ্ঞাতবাসে গেছে সেন্ট পিটার্সবার্গের মানুষের সমাজ থেকে, লুকিয়ে আছে এক গর্তে। আর উপন্যাসের দ্বিতীয়ভাগে সে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ষোলো বছর পূর্বে। তরুণ বয়েসের বিবিধ ঘটনা সে বিবৃত করে। কোনো এক লোক তাকে ধাক্কা মেরেছিলো, বেশ সাধারণ ঘটনাই, কিন্তু গর্তবাসী মানুষটার কাছে এই ঘটনা যেন তার অস্তিত্বকে উপেক্ষা করার সামিল। এরপর নিজের কিছু সহপাঠী যখন একত্রিত হয়, তাদেরকে তীব্রভাবে অপছন্দ করলেও আমাদের গল্পের নায়ক তখন রীতিমতো গায়ে পড়ে ঢুকে যায় তার পানের আসরে, কিন্তু তাদের কাছ থেকে কাঙ্খিত সম্মান সে এখানেও আদায় করতে পারে না। মদ্যপ অবস্থায় সে তখন রাত কাটায় এক তরুণী প্রমোদবালার সাথে, প্রকৃত ভালোবাসা নিয়ে লম্বা লম্বা বাণী দিয়ে মেয়েটিকে সে প্রভাবিতও করে, এবং বাড়ি ফিরে অপেক্ষায় থাকে মেয়েটির আগমনের। কিন্তু মেয়েটি যখন সত্যিই এসে দাঁড়ায় তার দরজায়, সে কি তাকে গ্রহণ করতে পারে?

নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড উপন্যাসিকায় নায়ক এভাবেই কথা বলার ছলে, খেলে যায় পাঠকের মন নিয়ে। সকলের সাথেই সে চিৎকার করে, রাগারাগি করে; কিন্তু এরপর নিজেই আবার ক্ষমা চায়, নিজেকে ব্যাখ্যা করতে চায়, প্রমাণ করতে চায় যে সে নিরপরাধ। আর অল্প পরেই সে আবার ফেটে পড়ে রাগে, পুনরায় নিজেকে ভেঙে ফেলে খানিক পর পর। বারবার নিজেকে যন্ত্রণা দিয়ে গল্পের নায়ক এভাবেই যেন পাঠকের মাঝেও ছড়িয়ে দেয় যন্ত্রণা পাবার সুখ, প্রমাণ করতে চায় সমাজ থেকে নিজের বিচ্ছিন্ন হবার যথার্থতা।

প্রতিটি মহৎ রচনার দ্যোতনায় আমাদের কৌতূহল হয় লেখকের দিকে ফিরে তাকানোর। ব্যক্তি দস্তয়েভস্কির দিকে পাঠক যদি তাকায় তো দেখতে পাবে, এই মানুষটি তার অজ্ঞাতবাসের নোটের খসড়া করেছিলেন ১৮৬৩’তে। এবং পরের বছর এই উপন্যাসিকার প্রথম দিকের অংশগুলো প্রকাশিত হয় এক সাহিত্যপত্রিকায়, যেটার সম্পাদক ছিলেন দস্তয়েভস্কির নিজেরই ভাই, মিখাইল। উপন্যাস নয়, প্রকৃতপক্ষে দস্তয়েভস্কি তখন লিখতে চেয়েছিলেন একটি সমালোচনা, তার হাত সে সময় নিশপিশ করছিলো রাশিয়ান লেখক নিকোলাই চেরনিশভস্কি’র “আমরা কী করবো?” নামের উপন্যাসের বিপরীতে কড়া একটা জবাব দেবার জন্য।

জার রাজতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে কী করে শিল্পবিপ্লবকে সাথে নিয়ে রাশিয়াকে একটা সমাজতান্ত্রিক শাসনের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়, চেরনিশভস্কি’র উপন্যাসটি ছিলো তাই নিয়ে। তৎকালীন রাশিয়ার পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের মাঝে ওই উপন্যাস বেশ সাড়া ফেলেছিলো। এমনও শোনা যায়, যে কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটাল’এর চাইতে চেরনিশভস্কির উপন্যাসটিই লেনিনকে অধিক উদ্বুদ্ধ করেছিলো বিপ্লবের পথে। তবে এই মতবাদ আমাদের দস্তয়েভস্কিকে প্রভাবিত করতে পারেনি। চেরনিশভস্কি’কে জবাব দেবেন বলে কলম ধরেও দস্তয়েভস্কি কখনোই তার প্রতিশ্রুত ওই সমালোচনাটি লিখে উঠতে পারেননি ঠিক, কিন্তু নিজের ভাবনাকে তিনি অনুদিত করেছিলেন উপন্যাসের আদলে, নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড লিখে। উপন্যাসটির রাশিয়ান নামকরণের আক্ষরিক অনুবাদ দাঁড়াবে, ‘মেঝের তক্তার নিচ থেকে লেখা চিরকুট’। এবং, পাঠকের খেয়াল থাকতে পারে, উপন্যাসের পাতায় কথক বক্তব্য রাখছে এমন করে, যেন সে কথা বলছে একঝাঁক শিক্ষিত ও আধুনিক দীক্ষায় দীক্ষিত ভদ্রলোকদের সাথে, তাদের বোঝাচ্ছে সমাজতন্ত্র আর ‘প্রত্যেকে মানুষ পরের তরে’ জাতীয় কথাবার্তার অসারতা। তাহলে এদের চাইতেই বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েছে আমাদের গল্পের নায়ক?

জীবনের পরিণত পর্বে ইউরোপিয়ান মতবাদের সাথে নিজের রুশী সত্ত্বার পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠা ব্যক্তি দস্তয়েভস্কিকে বিবেচনায় নিলে, আমাদের মনে হয়, গর্তবাসী নায়কের আড়ালে দস্তয়েভস্কি আসলে বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েছিলেন ইউরোপিয়ান ঘরানার মতবাদের চাইতে। হয়তো তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন, সমস্ত বড় শিল্পীর মতোই, নিজ দেশের মাঝে সম্পূর্ণ বিশ্বকে ধারণ করতে না পেরে।

আমাদের জানা নেই এই ধারণার কতটা এলোমেলো অনুমান। কিন্তু স্পষ্ট অনুভব করা যায়, নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড সেই উপন্যাস, যেখানে দস্তয়েভস্কি সত্যিই হয়ে উঠছেন সেই লেখক, যাকে পৃথিবী আবিষ্কার করেছে মানুষকে বিচার করবার এক অব্যর্থ আতশ কাঁচ হিসেবে। সামনের দিনে যখন প্রকাশিত হবে তার ‘প্রেস্তুপ্লেনিয়ে ই নাকাজানিয়ে’ (অপরাধ ও শাস্তি); উপন্যাসের মনোযোগী পাঠক তখন জানবে যে ভেতরে বিষের বালি জমিয়ে নিজেকে যন্ত্রণাবিদ্ধ হবার সুখ দিয়ে, নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, দস্তয়েভস্কি অজ্ঞাতবাসে মুখ বুজে মুক্তো ফলিয়েছেন।

নিজেকে ক্ষয় করে ফেলা ছাড়া সত্যিকারের উপন্যাস লেখা যায় না কিছুতেই, আমার এই একান্ত ব্যক্তিগত আবিষ্কারকে দস্তয়েভস্কি প্রমাণ করে দিয়েছেন হাতে কলমে। একজন লেখক যখন সত্যিই লিখতে বসেন লেখার টেবিলে, অনিবার্যভাবে তাকে দহন সইতে হয় ভেতরে। বিচ্ছিন্নতার অজ্ঞাতবাসে নিজেকে আবদ্ধ করে দস্তয়েভস্কি সেই দহন সহ্য করেছেন। আর আমরা দেখেছি, যে তিনি উপন্যাস লিখেছেন। এবং অনাগত দিনের অজস্র পাঠক অগণিতবার আশ্চর্য হয়েছে এই ভেবে, যে দস্তয়েভস্কির মতো করেও উপন্যাস লেখা যায়।

[১৭ মে, ২০১৯]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s