প্রথম যেদিন গল্পকার হিসেবে আমি পরীক্ষার সামনে দাঁড়াই, সে ঘটনাটা আজ বলতে চাই। প্রথমবারের মতো সেদিন মনে হয়েছিলো যে কাজটা আমার জন্য নয়।

ঘটনাটা ঘটেছিলো আয়াগুয়া নামের একটা শহরে, বলিভিয়াতে। আমি উঠেছিলাম কয়লা খনির কাছে একটা জায়গায়। স্যান জুয়ানের কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডটা এ শহরেই হয়েছিলো, সেইন্ট জন’স ইভ উদাযপন করতে থাকা পানরত আর নৃত্যরত খনি শ্রমিকদের ওপর সেই সন্ধ্যায় চারদিকের পাহাড়চূড়া থেকে স্বৈরাশাসক ব্যারিন্টোসের আদেশে গুলি চালিয়েছিলো তার সৈনিকেরা।

আমি শহরে আসি সে ঘটনার প্রায় এক বছর পরে, ১৯৬৮’তে; এবং আঁকাবুকির কাজে মন দিয়ে সেখানেই থেকে যাই কিছুদিন। আঁকার ইচ্ছেটা সবসময়ই ছিলো, তবে রংতুলি দিয়ে বাইরের জগতটার সাথে আমি কখনো ঠিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারিনি।

আমার কোনো কোনো পোট্রেটকে বেশ দেখাতো ঠিকই, আবার মুদ্রাক্ষর সাজানোর কাজটাও আমি ভালোই পারতাম; তবুও, আমার ব্যক্তিগত দক্ষতা আর উচ্চাশার মাঝে ব্যবধানটা যেন অনেক বেশি ছিলো। স্থানীয় শিশুদের অনেক ছবি আমি এঁকেছিলাম, দরকার হলেই এঁকে দিতাম কার্নিভাল আর অন্যান্য সামাজিক উৎসবের জন্য পোস্টার’ও। এসব কারণে আয়াগুয়া শহরটা আমাকে গ্রহণ করেছিলো। তীব্র শীত আর দারিদ্যের শহর ছিলো আয়াগুয়া, তবু বলতেই হবে, যে সেই অসহ্য ঠাণ্ডার শহরটাতেও আমার ভালো সময় কেটেছিলো।

আমার বিদায়ের বেলা ঘনিয়ে আসে। ততদিনে খনির মজুরদের আমি বন্ধু হয়ে গেছি, আমার চলে আসাকে উপলক্ষ করে ওরা তাই আগের রাতে একটা পার্টি দেয়, প্রচুর মাল টানার ব্যবস্থা ছিলো ওখানে। গলা ভরে চিচা টানি আমরা, সাথে সুস্বাদু আর কড়া বলিভিয়ান সিংগানি। গানে, ঠাট্টায়, একটার চেয়ে আরেকটা ফালতু কৌতুকে হঠাৎ ভোর পাঁচটা কি ছয়টার দিকে আমার খেয়াল হয়; এখনই বাজবে সাইরেন, এই বন্ধুরা চলে যাবে খনিতে কাজ করতে, আর সমস্ত উৎসব ফুরোবে তখন। আমরা বিদায় নেবো।

সেই বিশেষ মুহুর্তটি উপস্থিত হলে তারা সবাই আমাকে এমনভাবে ঘিরে ধরে, যেন কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে আমায়। কিন্তু না, কোনো অভিযোগ তারা উত্থাপন করে না, বরং বলে, আমাদের বলো সমুদ্র জিনিসটা দেখতে ঠিক কীরকম।

আমি নির্বাক হয়ে যাই। পৃথিবীর পেটের ভেতরে কাজ করার ফলে এই মজুরদের প্রায় সকলেই আক্রান্ত হয় সিলিকোসিস রোগে, ৩০ কি ৩৫ বছরের বেশি বাঁচার সৌভাগ্য তাদের হয় না। সাগর দর্শনের ভাগ্য তাদের কখনো হয় না, আয়াগুয়া শহরে ভাগ্য আর দারিদ্র্যের ক্রমাগত লাথিতে তারা মরে সমুদ্রের ঢেউ চোখে না দেখেই। আমার কাজ এ মানুষগুলোকে নীল জল দিগন্ত দেখানো, এমন শব্দ খুঁজে বের করা, যাতে তারা সমুদ্রে স্নান করতে পারে।

গল্পকার হিসেবে সেটাই ছিলো আমার প্রথম সত্যিকারের পরীক্ষা, শব্দের শক্তি আমি সেদিন থেকেই মনেপ্রাণে বুঝতে শিখি।

আমি লিখি, কারণ মানুষকে আমি নীল জল দিগন্তের সন্ধান দিতে চাই।

[এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানোর ‘হান্টার অফ স্টোরিজ’ গ্রন্থ থেকে]