পর্দা নামার পরে

এমন কী একেবারে শেষ দৃশ্যেও নাটক। সিনেমায় যেমন হয়। বৃষ্টির প্রবল পাতে ভিজে যাচ্ছে সমবেত সুধীমন্ডলীর ফ্যাশনদুরস্ত কোট আর নিখুঁত ছাঁটের প্যান্ট, পাড়ার ফুটবলে পানিজমা কাদা মাঠে দুষ্টু ছেলের দল দৌড়ে যাচ্ছে মাথায় পতাকা চেপে ছপছপ শব্দ করে, আকাশের হস্তক্ষেপে হয়তো ঢেকে গেলো রাষ্ট্রনায়ক এবং নায়িকার চোখের আবেগ। কবে যে বিশ্বকাপের শেষ মুহুর্তে এমন হতে দেখেছি, তা স্মরণাতীত থেকে যায়।

তারপর আসে সেই মুহুর্তটি, একটি মাসের রোলার কোস্টার শেষে ফুটবলের ভ্যাটিকানে চুড়ান্ত হয় আগামী চার বছরের পোপ, পিটার ড্রুরি’র ঘোর লাগা কণ্ঠ জানিয়ে দ্যায় ফুটবলের নতুন রাজা এখন ফ্রান্স। হুগো লরিসের উচ্চকিত হাতের মুঠোয় এক টুকরো অমরত্ব যখন উঠে আসে, ভারি বর্ষণের মাঝে সেটার সাক্ষী হয়ে থাকে ওড়াওড়িতে ব্যস্ত কনফেত্তির হাজারো বুদবুদ।

আর, নায়কের জন্য হাত তালিতে ব্যস্ত পৃথিবীজোড়া মুগ্ধ নয়নের অগণিত ফুটবল প্রেমীর অগোচরে অনেকটা চুপিসারে আরো একটি ঘটনা ঘটে। মহাকালের রিসাইকেল বিনে অগণিত হ্যাশট্যাগের বিগত হয়ে যাবার মুহুর্তটিতে শীতঘুমে চলে যান একটি মাসের পাগল করা অর্কেস্ট্রার পেছনের ফুটবল দেবতা। লুঝনিকিতে পর্দা নামে।

আমাদের নিপুণভাবে আহত করে ছুটে যাবার আগে শেষ নব্বই মিনিটেও লুঝনিকিতে মস্কো দিয়ে গেছে আত্মঘাতী গোল, চোখ ধাঁধানো গোল, বিতর্কিত পেনাল্টি আর গোলকিপারের ভূতুড়ে ভুল। বহুদিনের মাঝে মনে রাখার মতো এই ফাইনালকে ভালো না বেসে তাই পারা যায় না।

শুন্য স্টেডিয়ামের গা ছমছমে নির্জন গ্যালারির দিকে চেয়ে তাই খেলা শেষে মনে হয়- কী অদ্ভুত, কী অবিশ্বাস্য একটি উপন্যাস আমাদের সামনে লেখা হয়েছে রাশিয়ায়। ফুটবল ঈশ্বরের লেখার হাতটি এমনই চালু, যে বেলজিয়ামের সাথে শেষ মিনিটের গোলে পরাজিত জাপানের হাত ধরে আমরাও মাথা নত করেছি, তেমনি স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে হারিয়ে বিশ্বকাপে আসা মেক্সিকান কোনো সমর্থকের জন্য কাঁদতেও আমরা বাকি রাখিনি। চিত্রনাট্যের নাটকীয়তায় ফুটবলের ঈশ্বর এ যুগের জর্জ আর আর মার্টিনকেও যেমন ছাড়িয়েছেন; আবার মঞ্চটা রশিয়া বলেই হয়তো তিনি তলস্তয়ের মতো একশো বিশ মিনিটকেও করে তুলেছেন জীবনের চেয়ে বড়।

অভিবাসীদের পায়ে ভর করে বিশ্বকাপ জেতা ফ্রান্স কি নতুন করে চিন্তা করবে ইউরোপের সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে? জেরদান শাকিরির উদযাপন কি বলকানের তপ্ত পরিস্থিতিতে নতুন করে জন্ম দেবে কোনো ক্ষোভের? যুদ্ধকালীন শৈশবে লুকা মদ্রিচের ফুটবল প্রেমের গল্প শুনে আজ উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠা সিরিয়ার কোনো ধূলা-মলিন শিশু কি পারবে আবার মধ্যপ্রাচ্যে যিশুকে টেনে নামাতে?

প্রশ্নগুলো কঠিন, আরো কঠিন উত্তর জানানোটা। কিন্তু ক্রিস্টাল বলের মতো যাবতীয় দিকনির্দেশের অলৌকিকতা নিয়ে বিশ্বকাপ আমাদের সামনে আসে না, বিশ্বকাপ আসে থাইল্যান্ডের গুহায় আটকে পড়া কিশোরদের জন্য প্রার্থনায় সকলকে একত্র করতে।

সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহটির সবচেয়ে বেশি মানুষ কাল চোখ রেখেছিলো যে লুঝনিকির পানে, সে লুঝনিকিতেই ফাইনালের মাঝপথে পুলিশি প্রহরা ভেদ করে ঢুকে পড়েছিলো কয়েকজন। আন্তর্জালে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই অযাচিত অনুপ্রবেশের দায় স্বীকার করা নারীবাদী ব্যান্ড ‘পুশি রায়ট’-এর বক্তব্য। জনসমক্ষে যে দাবিগুলো ‘পুশি রায়ট’ পৌঁছে দিতে তারা চেয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি হলোঃ সকল রাজবন্দীদের অবিলম্বে মুক্তিদান, সোশ্যাল নেটওয়ার্কের ‘লাইক’ বোতাম চাপার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার না করা, মিথ্যা মামলা দিয়ে কাউকে বিনা কারণে আটক না করা।

নিতান্ত কাকতাল হতে পারে, তবু মনে হয় এই দাবিগুলো- দারুণ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে চলা তৃতীয় বিশ্বের একটি রাষ্ট্রের নাগরিকের গালে থাপ্পড় হয়ে আছড়ে পড়ে।

সেখানে VAR এর ব্যবহার ছাড়াই নির্বিচারে হাতুড়ি মারা যায় কারো পিঠে, সেখানে পুতিন বিরোধীর গায়ে তকমা লাগে রাষ্ট্রদ্রোহীর আর শিক্ষকদের দিকে দলদাস পার্টি তর্জনী উঁচিয়ে ধরে শাসায়, সেখানে ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না!’ ভাষণ বাজানোর দায়ে কাউকে হয়তো হারিয়েও যেতে হতে পারে বন্দুকযুদ্ধে।

কিন্তু এরকম পুতিন রাজ্যেও, সেই নেতিবাচক ট্যাকটিকসের জগতেও বিশ্বকাপ নিয়ে আসে অনুভূতির উৎসব।

সে উৎসবে ভাগ্যের নোংরা ট্যাকলে ছিটকে পড়ে ইরান, দস্তয়েভস্কির জুয়াড়ি হয়ে রাশিয়ার জয়রথ ছুটে যায় সম্মুখে, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জানিয়ে দেন যে নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়, টনি ক্রুসের ফ্রি-কিক ভর করে সাতটি অমরাবতী, টিকে থাকার লড়াইয়ে ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো দরজাটা ক্ষণিকের জন্য মিলিয়ে দেন লিওনেল মেসি, পৃথিবীর সব ধ্বনি-সব রঙ শেষ করে ফুটবলকে শব্দহীন জ্যোছনার ভেতরে উড়ে যাওয়া বুনোহাঁস করে তোলেন বেঞ্জামিন প্যাভার্ড।

শালার এমনই এক বিশ্বকাপ আমরা দেখে নিয়েছি রাশিয়ায়, যে এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পাবে না কো কোনোদিন আর।

ইংল্যান্ডের মতোই বিশ্বকাপের ঈশ্বরও ফিরে গেছে ঘরে। পর্দা নামার পরে লুঝনিকিতে, আমাদের টিভি পর্দায়, আমাদের মননে পড়ে আছে কেবল শুন্যতা। বেদনারও সীমা আছে, কিন্তু শুন্যতার শেষ কোথায়?

ফাঁকা গ্যালারির দিকে চেয়ে তাই আবিষ্কার করি, কতটা পথ আমার সাথে হেঁটে আসা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা চলে গেলেন। চলে গেলেন মাশচেরানো, বুফন আসতেই পারলেন না। হয়তো, চলে গেলেন লিওনেল মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও। তখন মনে হয়, রেফারি ঘড়ি দেখছেন আমাদের দিকে তাকিয়েও, ইনজুরি টাইম ক্রমশ এগিয়ে আসছে। বিশ্বকাপের এককে কারো বয়স আটের বেশি, কারো হয়তো ছয়, কেউ হয়তো পেরিয়ে গেছেন আনলাকি তেরো নাম্বার। বিশ্বকাপের আরেক মানে কি তাহলে বুড়িয়ে যাওয়া?

পৃথিবী আরও চৌদ্দোশো উনষাটবার সূর্যকে দেখে নেবার আগে বিশ্বকাপ আবার ফিরবে না জেনে তাই কেবলই আক্ষেপ হয়। বুনোহাঁস হয়ে ওঠা আমাদের ভাগ্যে নেই, একটি সাধারণ চর্মাবৃত গোলক হয়েই আমাদের নিরেট লাথি খেয়ে যেতে হবে প্রতিদিনের জীবন, অনলাইনের বিচারক আর অফলাইনের গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর পায়ে। এবং মহাকালের ওইটুকু সময় কাটিয়ে দিতে পারলেই, জগতের সবচেয়ে বড় যজ্ঞে আমাদের আবার দেখা হবে ফুটবলের সাথে।

অসহনীয় দুনিয়ার সার্কাসে একটি মাস অনুভূতির ট্রাপিজে ওড়ার সুযোগ দিতে পারে বলেই ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ ভাষা। আর সে ভাষায় কথা বলার সুযোগ করে দিতে, বিশ্বকাপ সকলের জন্য উন্মুক্ত এক গোল টেবিল।

কোনো কোনো মানুষের কাছে ফুটবল জীবন বা মৃত্যুর চেয়েও বেশি কিছু। এই চিন্তা নিছক পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু এর চেয়েও অবাক করা ব্যাপার, কিছু মানুষ এখনো ভাবে যে একটি মাত্র জীবন আর মৃত্যুর মাঝে ফুটবলকে ধারণ করা সম্ভব।

[১৬ জুলাই, ২০১৮]