ইমতিয়ার শামীমের সঞ্চারপথ

কিছু বই আছে, যেগুলো পড়ার পরে মাথার ভেতর ক্রমাগত বুদবুদ ফাটে। এমন একধরনের চিন্তা বা বোধ তখন কাজ করে যে পাঠক জেনে যান, বাদবাকি হার্ডকাভার কি পেপারব্যাকের চাইতে বুকশেলফে এই বিশেষ বইটিকে একটু আলাদা রাখা দরকার। তেমন বই নিয়ে কথা বলাটা মুশকিলের ব্যাপার। ইমতিয়ার শামীমের উপন্যাস আমরা হেঁটেছি যারা  নিয়ে লিখতে বসে সেই দশাই হয়েছে।

বাংলাদেশের সাহিত্য চর্চার উঠানটিতে ইমতিয়ার শামীম বেশ পরিচিত লেখক। আমাদের চিঠি যুগ কুউউ ঝিকঝিকডানাকাটা হিমের ভেতরআত্নহত্যার স্বপক্ষে, গ্রামায়নের ইতিকথা, কখনও বৃষ্টিশেষে’র মতো তার বহু কাজকেই আমি অনুসরণ করেছি সজ্ঞানে। কিন্তু স্বদেশ এবং স্বকালের মাটিকাটায় লিপ্ত থাকা পরিশ্রমী লেখকদের ক্ষেত্রে যা হয় আর কি, লোকটার বইগুলোকে খুঁজে পেতে রীতিমতো ঘাম ফেলতে হয়। পরিচিত এক পড়ুয়াকে ইমতিয়ার শামীমের সমস্ত বই একত্রে উপহার দেবো বলে খুঁজছি দীর্ঘদিন, আমার মুঠোফোনে বইয়ের দোকানদার এখনো ফিরতি বার্তা দিলো না। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাই, এমন হওয়াটা বিচিত্র নয় যে আলোচ্য লেখকের আমরা হেঁটেছি যারার মতো উপন্যাসও কোনো কোনো পাঠকের চোখ এড়িয়ে যাবে। এই লেখাটির উদ্দেশ্য তাই বলতে গেলে ইমতিয়ার শামীমের সেই সঞ্চারপথটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ। তবে সর্বজ্ঞ সমালোচকের ভূমিকায় অভিনয় করাটা আমার জন্য একেবারেই অসম্ভব, তারচেয়ে আনাড়ি পাঠকের পার্টে নেমে সোজা বাংলায় দুয়েকটা কথা বলার চেষ্টা করা যায়।

আমরা হেঁটেছি যারা উপন্যাসটি আমার হাতে এসেছিল এ বছরের গোড়ার দিকে, ফেব্রুয়ারির মেলায়। একলা এলোমেলো হাঁটতে গিয়ে বইটি চোখে পড়ে, এবং মনে আসে যে এই বই সম্বন্ধে বাছাবাছা ভালো কথা শুনিয়েছিলেন কোনো সুহৃদ। হাতে নিয়ে পাতা উল্টাই। জীর্ণশীর্ণ হয়ে আসা প্রচ্ছদ প্রায় দেড়যুগের পুরানো। দোকানদার আমার অনুরোধে একটি সুদৃশ্যতর কপি খুঁজতে গিয়ে ঘেমে যায়, কিন্তু অমন কিছু নেই যেহেতু, সে আর দেবে কোত্থেকে? অতএব আমি বাসায় ফিরি জনান্তিক প্রকাশনীর ওই আধমরা প্রকাশনাটি নিয়েই।

পড়তে বসি আরও কদিন পর। এবং দ্বিতীয় পৃষ্ঠা থেকেই আমার দশা হয় র‍্যাটাটুলি অ্যানিমেশনে রেমির রান্নার স্বাদ প্রথমবারের মতো নেয়া সেই ফুড ক্রিটিক আন্তন ইগোর মতো, আমি সতর্ক হয়ে উঠি, শীর্ণ আকারের বইটি তখন থেকেই আমাকে ক্রমাগত দিয়ে যায় আঘাত। তথাগতের সাথে হাঁটতে হাটঁতে নির্জন পৌষ সন্ধ্যায় কুয়াশার ফুল না দেখে অথবা একটি জনপদের জীবনের নিভৃত কুহক না বুঝে পাঠকের তখন উপায় থাকে না।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র তথাগত। কাহিনির শুরুতেই জানা যায়, শ্রেণিশত্রু খতম করা রাতবাহিনী চাঁদা দাবি করেছে তথাগতের মুক্তিযোদ্ধা পিতার কাছে। রাতবাহিনীর তখন প্রবল প্রতাপ, তাদের জন্য গ্রামে গ্রামে নিয়োজিত করা হয়েছে জামার হাতায় তর্জনী খচিত রক্ষকদলকে। কিন্তু এই রক্ষকদলও খরচাপাতি ছাড়া কাউকে নিরাপত্তা দিতে অক্ষম। প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা তথাগতের পিতা একটিই রাস্তা দেখেন, তাকে যোগ দিতে হবে মশালবাহিনীতে। কিন্তু পিতা বাড়ি থেকে সরে পড়লে তথাগতের পরিবারটি রাতবাহিনী বা রক্ষকদলের আক্রোশ থেকে রেহাই পায় না। গ্রন্থাগারের বই পুড়িয়ে রাতবাহিনী তাদের বিপ্লব সেরে নেয়, আর হাঁস-মুরগি-বাছুর ধরে নিয়ে রক্ষকদলও তাদের রক্ষাযজ্ঞ সম্পন্ন করতে থাকে। ফলে তথাগত, যে কিছুদিন আগেও উনিশ শ একাত্তরের অব্যবহিত পরের সময়টিতে মুক্তিযোদ্ধা পিতার হাত ধরে গ্রামের পথে হেঁটে বেড়িয়েছে বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর আগের পক্ষের মেয়ে মনীষার সাথে; সেই তথাগত, বাবার মুখে গল্প শুনে যে হয়ে পড়ত আর্কাদি গাইদারের তিমুর; সেই তথাগত, যার পিতা গ্রামের সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জন্ম দিয়েছিলেন রবিনসন ক্রুশোর মতো একটি বাড়ির, সে বড় মানুষ হয়ে ওঠে ওই রাতবাহিনী আর রক্ষকদলসমৃদ্ধ একটি রাতের অভিজ্ঞতাতেই।

কেন্দ্রীয় চরিত্রের নামকরণের দিকে একটু সতর্ক হয়ে আরেকবার লক্ষ করা যায়। তথাগত। ইমতিয়ার শামীম আমাদের মনে করাচ্ছেন এমন একজনকে, দীর্ঘপথ হেঁটে যার হয়ে গেছে নির্বাণ লাভ। অবশ্য বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের ওই বিশেষ কালটি একজন সংবেদনশীল মানুষের কাছে অ্যাতোটাই জরা-ব্যাধি-মৃত্যু সংকুল, যে নির্বাণের ভান না ধরে তার আর উপায় নেই। রক্ষকদল প্রকাশ্যেই একে ধরছে, তাকে মারছে, কিন্তু মেজর ডালিম রেডিওতে ঘোষণা দিল তো এরপর তাদের আর দেখা পাওয়া যায় না। ফলে সকলেই তথাগতের মতো নির্বাক দর্শক হয়ে ওঠে। আবার দেখা যায় যে মশালবাহিনী থেকে ফিরে আসছে তথাগতের পিতা, শেখ মুজিবের ছবি এখনো তিনি টানিয়ে রাখেন দেয়ালে, কিন্তু তাকে পুনরায় ধরে নিয়ে যাচ্ছে পরিপাটি জলপাইবাহিনী, চিরতরে। ততদিনে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে স্কুলের মৌলভি স্যার, সে জানিয়ে দিচ্ছে জাতীয় পোষাক আচকান আর মেয়েদের মাথা ঢাকা এখন থেকে বাধ্যতামূলক, এবং হ্যাঁ/না ভোটের যাঁতাকলে তাকে কিছুটা হলেও জায়গা ছাড়ছে খালকাটা পার্টির লোকেরা।

বাংলাদেশ আর জীবনানন্দের রুপসী বাংলায় প্রচুর তফাৎ বলেই পথ-ঘাট-মাঠের ভেতর এখানে আর আলো থাকে না। ইমতিয়ার শামীম তা জানেন বলেই আশ্চর্য এক বর্ণনায় তার উপন্যাসটি  আমাদের কেবল অন্ধকারের দিকে হাঁটায়। তথাগত গ্রাম ছেড়ে যাবে শহরে। কিন্তু সেখানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে জিতে ছাত্রেরা আয়োজন করবে ড্রাম ভর্তি বাংলা মদ আর ব্লু ফিল্মের, সেখানে চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া শুভ্রা মেয়েটিকে দিন বদলের ধাক্কায় গাইতে হবে চটুল কোনো গান। আর একের পর এক বাহিনীর গরমের চোটে তখন আর দাঁড়ানো যাবে না। জলপাই বাহিনী থাকবে, সাথে যোগ হবে রগকাটা বাহিনী। এই রগকাটা বাহিনী স্কুল কলেজে গিয়ে ধর্মপালনের সদুপদেশ দেবে, আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখলের সময় এরা কম্যুনিস্টের রগ কাটলে পুণ্য কতটা বেশি—সেই হিসাবও করবে। এসবের ফাঁক দিয়েই দেশে গণতন্ত্র আসবে। আর গণতন্ত্র এলেই যেহেতু সব ঠিক, কাজেই ধর্ষণের কোনো সেঞ্চুরি হবে না, কোনো বুদ্ধিজীবী কবি বলবে না যে, এরা অন্য দল থেকে আসা ছেলেপিলে। সকলেই জানে যে এই ধর্ষকেরা অন্য কোনো দলের, এরা কেউ সহীহ পেঙ্গুইনবাহিনী নয়।

রাজনীতিমনস্কতার পাশে যে বিষয়টা বলবার মতো থাকে এই উপন্যাসে, সেটা হলো একই সাথে তথাগতের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতে অবস্থান। বর্ণনার জোরে নির্দিষ্ট কোনো কালে তিনি নেই; একটি বাক্য শুরু করবার আগ পর্যন্ত ধারণা করা যায় না লেখক কোন সময়বিন্দুতে অবস্থান করছেন। তবে সমস্তটা পড়ে গেলে আবার এটাও বলা যাবে যে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখক একটা ধারাবাহিক অবনমনই দেখিয়ে গেছেন।

সম্প্রতি পড়া আরও এক উপন্যাস পেটালস অফ ব্লাড-এর কথা স্মরণ করা যায় এ প্রসঙ্গে। নগুগি ওয়া থিয়াংগোর এ উপন্যাসটিতে বেশ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে মাও মাও বিদ্রোহের পরের দশকটিতে কেনিয়ার বদলে যাবার হালচাল। কয়েকটি মানুষের শহরমুখী যাত্রা, যার মাধ্যমে উঠে আসছে একটি জনপদের ইতিহাস—থিয়াংগো গল্প বলেছেন এভাবেই। কিন্তু সেই ইলমর্গ গ্রামের মুনিরা, কারেগা বা আবদুল্লাহ আমাদের সামনে ব্যক্তি হিসেবে যতটা উপস্থিত, বাংলাদেশের তথাগত তেমনটা নয়। নগুগি ওয়া থিয়াংগো জনপদের ইতিহাস বাতলাতে গিয়ে আশ্রয় করেছেন ব্যক্তির সংশয় আর ব্যক্তির ক্ষয়, অন্যদিকে ইমতিয়ার শামীম তথাগতকে একেবারে দর্শকের মতোই হাঁটিয়ে নিয়েছেন ইতিহাসের পথে। ব্যক্তির যে সংশয়—সেটা এ উপন্যাসে জায়গায় জায়গায় উপস্থিত, তবে প্রতীকি। তথাগত যতটা একক, তার চাইতেও বেশি তাই সামষ্টিক। সৎ বোন মনীষায় তার প্রথম নারীসঙ্গ হলেও একসময় প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সপ্রতিভ সমন্বয়যুক্ত মারিয়াকে দেখা যায় তথাগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তে।

উপন্যাসটা পড়তে গিয়ে তাই এক ধরনের বিবমিষা হয়। মনে হয়, তথাগতের হেঁটে যাওয়া বা ইমতিয়ার শামীমের এই সঞ্চারপথ বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথকে বনসাই সংস্করণে হলেও এমন নগ্ন করে উপস্থাপন করে আমাদের সামনে, যেমনটা আগে কখনো পাইনি। সৎ সাহিত্য পাঠকের চোখের মাঝে বাইনোকুলার কি মাইক্রোস্কোপ ঠেসে দিতে পারে। তবে কলমের জোর থাকলে পাঠক নিজেই বুঝে নিতে পারে যে প্লাস না মাইনাস পাওয়ারের চশমা তার দরকার। আমরা হেঁটেছি যারা এই প্রেক্ষিতে তাই, আমার মতো অজস্র কানা পাঠকের ভিড়ে একটা বলবার মতো কাজ। মনে পড়ে, সল বেলো একবার বলেছিলেন, আমরা যে কিছুতেই মন বসাতে পারি না, তার মাঝ থেকেও মনোযোগ কেড়ে নেয়াটাই হচ্ছে শিল্প। ইমতিয়ার শামীমের হাঁটাপথে চলার অভিজ্ঞতা এই উক্তির সাথে একেবারে যুতসই।

পৃথিবী এখন প্রবেশ করেছে বিগ ব্রাদারের যুগে, প্রতিনিয়ত নজরদারি এখন স্মার্টফোনের পর্দায় অপেক্ষা করে আমাদের জন্য। আলোর অভাবে মানুষ দেখতে পায় না, কিন্তু বেশি আলোতে চোখে তার ঝিলমিলও লাগে। তথ্যের অবাধ প্রবাহের ক্যাকোফোনি আর বিবিধ ধ্বনি-প্রতিধ্বনি কি ঘাত-প্রতিঘাতের এই যুগে মনোযোগ ধরে রাখাটা, একাগ্র হওয়াটা হয়ে পড়েছে কঠিনতর। মানুষকে এই ক্ষমতা যোগান দেয়া শিল্প ছাড়া সম্ভব বলে মনে হয় না। ইমতিয়ার শামীমের মতো কিছু শক্ত কলমের মানুষের হাঁটাচলা চালু রাখাটা এখনই তাই সবচেয়ে বেশি দরকার।

[ডিসেম্বর, ২০১৭]

[ইতোপূর্বে kaalkuut.com-এ লেখাটি প্রকাশিত।]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s