০২ মার্চ
বইমেলা নয়, ওদের সমস্ত ক্লান্তিকর ইঁদুর দৌড়কে অগ্রাহ্য করতে বরং ধানমন্ডি লেক। বন্ধুদের সিগারেট থেকে ধোঁয়া ওড়ে, পেছনের হ্রদ থেকে হঠাৎ বাতাস বইলে সোনালি তুষার হয়ে মাথার ওপর ঝরে যায় হলুদ পাতা। ঝরতে ঝরতে প্রশ্ন ছোঁড়ে, ‘কী তুমি ভালোবাসো হেঁয়ালি মানুষ, আমায় বলো?’

উত্তর জানা নেই বলে হাত পেতে দেই মারিসা কন্ডের কাছে। কিন্তু ক্যারিবিয়ানের সমুদ্র নীরব থাকে। বরং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বাড়ির দরজায় এসে কপাল মুছতে মুছতে মহাশ্বেতা দেবী বলেন, ‘ভায়োলেন্স আমার কাছে পবিত্র, ভায়োলেন্স সূর্যের মতো, ভায়োলেন্স জ্বলে’। জবাবে  ‘লাস্ট নাইট ইন সোহো’র পর্দা থেকে উঠে এসে সুরেলা প্রতিবাদ করে পিটার এন্ড গর্ডনঃ I dont care what they say, I won’t stay in a world without love ♪ ♫ ♬

কিন্তু ভালোবাসাহীন পৃথিবীতে থাকতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই পুতিন সাহেবের। ফলে একটু একটু আফগানিস্তানের ক্রিকেট, কয়েক ফোঁটা সড়কে পাঁচ ভাই, অল্পস্বল্প নির্বাচন কমিশনারও মুছে গেলো। মুছে গেলো শ্রেণীবিদ্যা নিয়ে আঁতলামি করা উমবার্তো একো, উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন চীনের প্রাচীরের ওইপারে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা লিউ-সিশিন। তবু নজর কাড়লো টিসিবির নায্যমূল্যের লাইনে সপরিবারে দাঁড়িয়ে থাকা উৎপলকুমারের ওই হাভাতে ক্লাউন, দুঃখের দিনেও সবাইকে না হাসিয়ে সে ছাড়বে না।

হলদে পাতার ফিল্মি দুপুরে আরামপ্রিয় চোখ ধানমন্ডি লেকের ধারে তবু খুঁজে যায় পুরোনো নায়িকা। অরহান পামুক নামের পুরোনো ইনসোমনিয়া ফিরে ফিরে এসে কেবল বলে, ‘কেন তুমি লেখো হেঁয়ালি মানুষ, আমায় বলো?’

১৩ জানুয়ারি
‘না, না, তার কথা আর নয়, সেই

বেরিয়েছে সকাল বেলায় সে তো- শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।’

কিন্তু শহীদ কাদরী তো নয়, খোঁজ করছিলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের।

দুই অগ্রজ ইমতিয়ার শামীম আর প্রশান্ত মৃধার সাথে দুপুরে ফোনালাপ হলো ঠিকই, তবে মোহাম্মদপুরের এইসব আয়তক্ষেত্র গলির মাঝে লোকটাকে বিকালে হারিয়ে ফেললাম। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে পাতলা কুয়াশা, তার মাঝে রিকশা দিয়ে লোকটাকে খুঁজতে খুঁজতে যাই। পোস্টারে শোভিত নেতা আছে, দেয়ালে চিকা মারা মেধাকুঞ্জ কোচিং এর বিজ্ঞাপণ আছে, শারীরিক শিক্ষা কলেজের সামনে নিয়ন আলোতে ‘কারিগরি শিক্ষাই জাতির উন্নয়নের মূল শক্তি’ মার্কা ইউনিভার্সাল ট্রুথ পর্যন্ত দেখা যায়; কিন্তু ইলিয়াস কোথায়?

তখন মনে হয়, ইলিয়াসের খোঁজ করি, অথচ আবার করি না।

২৭ নাম্বারের চৌরাস্তা ফাঁকা, স্লিভলেস আলো সেখানে এমন মোহনীয়, যে রবীন্দ্রনাথ পারলে আজ শান্তিনিকেতনের ক্লাস পর্যন্ত নেবে। তবে যা খুঁজি তা পাই না। আরেকটু এগোলে কমিক ক্যাফে, গ্লোরিয়া জিনসের ঝলমলে আলোতে এমন প্যাঁচ লাগে; যে রিকশা ঢুকে পড়ে শাখাগলিতে। মরিয়া হয়ে বাড়ির নামে খোঁজ করি। ড্রিম ভ্যালি আছে, শাহজাহান ম্যানর আছে, অধ্যাপক মবিন খান (অবঃ) পর্যন্ত আছে; কিন্তু কী খুঁজছি- তা পাই না।

চিরতরুণ ভার্গাস ইয়োসা ৮৫ বছর বয়েসে আবার ঝাঁপিয়ে পড়লেন গুয়াতেমালার অভিযানে, হোয়াকিন ফোনিক্স প্রস্তুত আবারও মুগ্ধ করতে, কোথায় কারা যেন মারা যাচ্ছে। অনুভব করি, এইসব সন্ধ্যায় উৎপলকুমার বসুর মতোই আমারও ভুল আবিষ্কার – ভুল ধূপাগার- ভুল পুস্করিনী- ভুল দেবদারু- ততোধিক ভুল স্মৃতি। তবু কী খুঁজি নিরুদ্দেশ যাত্রায়? কী খুঁজছি?

‘আম্মার ঘরে কী যেন ফেলে এসেছি।’