৩০ জুন, ২০২১
বন্ধুর জন্মদিনের সন্ধ্যার গতিপ্রকৃতি তখনও বোঝা যায়নি।

তখনও বলতে, আরোপ করা শাটডাউনের ভয়ে জরুরী একটা বই বাগাতে ধানমন্ডি চলে যাবার পরেও নয়। হঠাৎ হাজির সোহাগ গিটার নিয়ে ট্যাং ট্যাং করে দুয়েকটা গান শোনালে মুগ্ধ হবার অভিনয় করতে হয় ঠিকই, কিন্তু বাড়ি ফেরার তাড়া ভেতরে ক্রমাগত চুলকায়। বের হতে গিয়ে আবার আন্টির আহবান। রিশাদের-যাকে তিনি নিজেও ডন বলে ডাকেন- জন্মদিন উপলক্ষে প্রচুর ভালোমন্দ রান্না হয়েছে, সেগুলোর সদগতি আমরা ছাড়া আর কে করবে? প্রচুর পরিশ্রমের পর আমি ডন শালাকে কিছু না দেয়ার অপরাধবোধটা উড়িয়ে দেই দুই টাকার সেন্টারফ্রেশ উপহার দিয়ে।

এবং তারপর বেরোনো মাত্রই বৃষ্টি। রিকশাওয়ালাদের নবাবজাদা বলে যে খানিক গালি দেবো, সেটাও হয় না আজ, প্রথম রিকশাটাই রাজি। আশ্চর্য!

এই রাত কি আজকের? এই রাত তো সেই কবে ইংরেজ সাহেব ওয়াল্টারের তত্ত্বাবধানে তৈরি হওয়া ধোলাইখালের লোহার পুলে নেমে এসেছিলো মেঘের ঘনঘটা আর বজ্রপাত নিয়ে, যখন প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখে ফেলেছিলেন ‘হয়তো’ নামের এক অনন্য গল্প। আজ আর লোহারপুল নেই, প্রেমেন মিত্তিরও নয়, কিন্তু থেকে গেছে ঢাকার রাস্তার অজস্র গল্প।

সমস্ত দোকানের ঝাঁপ ফেলা সারা, তার মাঝে অন্ধকার গলিপথে ঢুকে পড়লে কালো ছাতা সমেত কালো বোরখায় আবৃত মহিলাটিকে রীতিমতো অশরীরী দেখায়। ভয়টা অবশ্য দ্রুত কাটে, যখন কয়েক মিটার পরপর যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা দালানের সিঁড়ি ঘরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মাঝে প্রতিবারই খুঁজে পাই ফুডপান্ডার ডেলিভারিম্যান। তারা, এবং বৃষ্টি থেকে বাঁচতে তৎপর অন্যেরা; মোবাইল টেপে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং রিকশা-চড়া-ভাগ্যবান আমাকে ঈর্ষা করে মনে মনে।

ডাচ টিভিতে ব্যালে নর্তকীর পায়ের ছন্দের সাথে মিলিয়ে ফন বাস্তেনের ড্রিবলিং দেখানো হয়েছিলো একবার, ছপছপ জলের মাঝে তেমনই ফুটবল কারিকুরি দেখিয়ে ছুটে যায় কোনো কিশোর। নটরডেমের ডায়াস থেকে প্রক্সি ক্লাস নিতে আসা সেই শিক্ষক উঠে আসে ইস্টার্ন প্লাজার চাতালে আশ্রিতদের মাঝে, বিষণ্ণ ডগি শুয়ে থাকে বন্ধ লরির নিচে। বিপরীত থেকে ছুটে আসা গাড়ির হেডলাইটের টুকরো আলো হয়ে ওঠে নামী রেস্তোরাঁয় সাজানো পেস্ট্রির মতো ঝলমলে, বৃষ্টির ছাঁটে চোখে কীসের যেন পানি।

এইসব রাতে শব্দমালা বৃষ্টিভেজা বিব্রত কাক। এইসব রাতে চেনা কোনো অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশে ফিরতে থাকা সুহানের কাছে ঢাকা হয়ে ওঠে সাবটাইটেল-হীন বিদেশি ছবির মতো অচেনা। এইসব রাতে এমনকি চেনা পথেও ঢাকা ফিসফিস করে অচেনা স্বরে সুহানকে বলে যায় জলের ভেতর সেই অগ্নির মানে।

২৮ এপ্রিল, ২০২১
চলতি উপন্যাসের প্রথম খসড়া শেষ হলো আজ, সকাল তখন দশটা বারো।

পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালে বাইরে উজ্জ্বল রোদ। তার মাঝে পান্ডুলিপির জন্য খরচ হয়ে যাওয়া প্রায় দুই বছরের দিকে ফিরে চাইলে মেরিন ড্রাইভের গুলির আওয়াজ, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় আর জর্জ ফ্লয়েডের গোঙানি; একে অন্যকে ছাড়িয়ে যেতে তারা তর্ক করে অ্যাডাম ড্রাইভার আর স্কার্লেট জোহানসনের মতোই।

আর থাকে মহামারী, কোহেনের মতো আমরাও জানি নৌকা ডুবে গেছে, সকলেই জানে ক্যাপ্টেন মিথ্যা বলেছিলো।

ভাবি, কেন লিখি? অম্লজানের অভাবে ধুঁকতে থাকা দুনিয়ায় যখন আগামী সাতদিন বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা নাই; সেখানে উপন্যাস লিখে কী হয়?

মনোযোগের দৈর্ঘ্য যখন একশো চল্লিশ ক্যারেক্টার, হ্যাশট্যাগময় প্রচারণার ইতরপনা যখন অবিরাম জন্ম দিচ্ছে প্যারাডক্সের; উপন্যাসের লেখক তো তখন ডেভিড মালুফের গল্পের সেই নিজভাষার শেষ বক্তা মানুষটার মতোই সংযোগহীন। আবার হাত বাড়ালেই যেখানে ডন ডি লিলো, জুলিয়ান বার্নেস আর কোয়েটজি; ল্যাংড়া এবং ক্যারিকেচারের মতো উপন্যাস নিয়ে সেখানে দাঁড়ানোর ঔদ্ধত্য কেউ আজও কেন দেখাবে কেউ?

উত্তর দেওয়া দুরুহ। এবং উপন্যাস যে লেখে, সে সম্ভবত প্রশ্নটাই জানে, উত্তর জানে না কখনোই। লেখা তাই নিজের কাছেই নিজের পরীক্ষা; মহারাজ বিক্রমাদিত্যর মতোই, বেতালের লাশের বদলে বেঁচে থাকার ভারকে কাঁধে ফেলে হেঁটে যাওয়া, যাত্রার শেষে থাকে কেবলই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়ে ধূর্ত বেতালের পুনরায় আদিবিন্দুতে ফিরে যাওয়া।

‘To write is human, to edit is divine!’ বলেছিলেন ওস্তাদ স্টিফেন কিং।

মানুষী কাজের শেষে সকালের তিক্ত রোদেও তাই স্বর্গীয় এক ফুরফুরে ভাব মনে বলি, বেশ, ধরা যাক দুয়েকটা ইঁদুর এবার!

২৩ মার্চ, ২০২১
শিকাগোর সাত নয়, সরকিনের ট্রায়ালে এবার অগুনতি বাংলাদেশি। শেষ দৃশ্যে এডি রেডম্যান কিংবা টম হেইডেন উঠে দাঁড়িয়ে শল্লার পর রামু, নাসিরনগর প্রভৃতি নাম একের পর এক বলা শুরু করলে আবেগে উদ্বেলিত জনতা আরেকটু হলে তালি মেরে বসে।

তালিটা মারতে গিয়েই তবে মুশফিক ক্যাচ ফেললো? নাকি লোকের নজর সরাতে? উত্তর দেয়া মুশকিল, কোথাও সাকিব কোথায় পাপন কে বলে তা বহুদূর; বিসিবির মাঝেই স্র্বর্গ নরক, বিসিবি’ই সুরাসুর।

আরেকটু পেহনে ফিরলে কালোকে ভালো বলে আলো হলো চক্ষুশূল, তারপর এক গামলা ওটিটির মাঝে একমুঠো অলাতচক্রের ভ্যাক্সিন।

এমনিতে অগ্নিঝরা মার্চে বীর বাঙালি ভ্যাক্সিন ছাড়াই শাহেদদের ধন্যবাদ জানিয়ে গেছে, আপাতত এরা হন্য হয়ে কোভিড রুখতে মানববন্ধন করে।

রাস্তাঘাটে সমাবেশের ঘনত্ব কমানোর গুরুদায়িত্ব কমাতে তাই এগিয়ে আসে চাকুরিপ্রার্থীরা, এইচ জি ওয়েলসের টাইম মেশিনের নতুন প্লটে ভবিষ্যতে নাকি মাটির ওপরে তারাই থাকবে।

তাই বলে অবজেক্টিভের টিক দাগাতে হবে যাদের নামে, সেই লেখকদের কি দমলে চলে? চৈত্রের বিকেলে মহীনের ঘোড়াগুলি ছাড়াই এক-একজন প্রচলন করে ভিউকার্ডের ইতরামি কি টুপির শিল্প।

১৯৭১ এর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হবে না বলে পাকিস্তানে বাতিল সমাবেশ, মায়ানমারে বৌদ্ধভিক্ষুদের ওপর গুলি, কোথায় যেন অসুস্থ হয়ে কে জেলে মারা গেছে।

What’s on your mind? ; জানতে চাইছে ফেসবুক।

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাশা কোহেন কিংবা অ্যাবি হফম্যান, কিংবা সুহান উত্তর ছাড়েঃ Give Me A Moment, Would You, Friend? I’ve Never Been On Trial For My Thoughts Before.

০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
করোনাকে ভয় না পেলে কী হবে, ভ্যাক্সিনকে ভয় পেতে বীর বাঙালি মোটেই পিছপা নয়। তুখোড় এই রহস্যকে ভেদ করতে গল্প নিয়ে ফেলুদা ফিরলো আবার। তবে সিজিআই’এর সুলতানকে দেখে বাঘ নয়, মনে পড়ে বাঘের মাসী।

প্রকৃত বিড়াল দেখতে হলে চট্টগ্রামে যাও, সেখানে ইন্দুর বিলাই খেলা ডিক্লার করা, নচিকেতার গানের ভোট নষ্ট হবার ভয়ে অফিস কাচারি হাট হয়ে খোলা। আইডিয়া মেরে দেবার রোগটি অবশ্য আরো পুরোনো, প্লাগারিজমের চক্কর যতই থাক, মেট্রোরেলের ঠাপ খাওয়া ক্যাম্পাসে হাঁটলেও নাকি বাতির তলায় পড়া বিদ্যাসাগরকে পেছনে ফেলা যায়।

তারও আগে মহাভারতের অ্যাডিলেড বিপর্যয়ে সকলেই খুশি, কিন্তু টিম পেইনের দুঃখী মুখ দেখে লোকে এমন ভেঙে পড়ে যে রাগ করে তামিমকে এবার তারা গালি পর্যন্ত মারে না। এরপর তাকদীরের সাথে দুই ছটাক তাণ্ডব আর জানোয়ার মেশালেই বিকাশের মতো মূহুর্তেই সমাধান।

বইমেলা হবে নাকি, সে দ্বন্দ্বে বার্নি দাদু দুই টাকার মাস্ক পরে ঘুরে বেড়ান সর্বত্র। তখন বিরক্ত হয়ে মায়ানমারের গেইম অফ থ্রোনস আর ভারতের কৃষককে মুড়ি খেতে বলে বিভূতিভূষণ পড়তে যাই তো শীতের চোটে হাত পা জমে যাবার দশা, কিন্তু এদিকে সুপর্ণার নাম্বার হারিয়ে ফেলেছি।

সোভিয়েত ইউনিয়নে যাত্রীবাহী একটি বাস নীরবে গড়িয়ে চলে। হঠাৎ সের্গেই পাভলোভিচ ফেলে দীর্ঘনিঃশ্বাস। মিসেস পাভলোভিচ সাথে সাথে হয়ে ওঠেন ক্ষিপ্ত, ‘তোমাকে বলেছি না লোকের সামনে রাজনীতি নিয়ে কোনো কথা বলবে না!’

১২ জানুয়ারি, ২০২১
টিপ বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা এমা স্টোনের চাইতে সুন্দর আর কী আছে পৃথিবীতে?

রাতের ঢাকা শহর।

সেই ঢাকা, কবে কোন মোগল আমলে হীরালাল তবলচিকে সাথে করে লখনৌ থেকে উড়ে আসা গওহরজান বাইজী যেখানে চুড়িদার পাজামা আর ঘুঙুরের ছন্দে নাচাতো নবাববাড়ি; সেই ঢাকা, সাধকশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মানন্দ গিরির মাথার ওপর দেবীর আদেশে উড়তে থাকা পাথর যেখানে এসে ঠাঁই পায় রমনার কালীবাড়ি প্রাঙ্গণে; সেই ঢাকা, যেখানে বুড়িগঙ্গার নিচে হারিয়ে যাওয়া কোনো চর থেকে আজও বর্ষার রাতে চিৎকার করে ডেকে ওঠে কালে জমজম নামের কামান; আজ  কতকাল পরেও সেই ঢাকা শহর এইসব হালকা শীতের রাতে সোডিয়াম বাতির রিমিক্স আলোয় বহু গাড়ি এবং অগণিত কুত্তার বাচ্চা নিয়েও সুন্দর হয়ে ওঠে এমা স্টোনের চাইতে।

সেখানে এটিএমের পাহারায় নিয়োজিত এবং তোয়ালে বিছিয়ে ঘুমের অপেক্ষায় থাকা বুইড়া মামায় বুট পায়ে অকারণ হাঁটাহাঁটি করে রাত গভীর হবার আগেই নিজের কর্মদক্ষতা প্রমাণে; সেখানে ছক কাটার পরোয়া না করে স্যান্ডেল দিয়ে সীমানা টেনে ব্যাডমিন্টন খেলে সারাটা দিন ট্রাক থেকে মাল খালাস করা মাতারির পোলারা; সেখানে বুকের মাঝে শ্লেষা জড়ানো স্বরে লাইটপোস্টের নিচে বৃদ্ধা ফকিরের কোরআন পাঠ; সেখানে কয়েকদিনের পুরানো তেলেভাজার ঘ্রাণে মৌ মৌ গলির ওপরে বিদ্যুত, ইন্টারনেট আর ফোনের লাইনের মাঝে বসে ওম পোহায় অপুষ্টিতে ভোগা আকাশ।

শুধু ওই আকাশকে দেখেই মনে পড়ে, বেঁচে থাকার জন্য বার্ডম্যানকে যে ট্যাক্স দিতে হয়, তার নাম নিঃসঙ্গতা।

কতদিন কতকালের মানুষের ইতিহাস মুছে গেলো এমা স্টোনের ন্যাপকিন হতে, কিন্তু কালচে ওই আকাশ আজও অমলিন।