কথাসাহিত্যের বন্দনা

পাঁচ বছর বয়েসে, বলিভিয়ার কোচাবাম্বার দে লা স্যালে একাডেমিতে, ব্রাদার হুস্তিনিয়ানোর কাছে আমি পড়তে শিখি। আমার জীবনে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রায় সত্তর বছর পরেও স্পষ্ট মনে করতে পারি বইয়ের পাতার শব্দকে মনের ভেতরে ছবি করে তোলার সেই যাদু কীভাবে আমার জীবনকে ভরিয়ে দিয়েছে; সময়ের আর ভূগোলের দেয়াল ভেঙে কীভাবে সেটা আমাকে ক্যাপ্টেন নিমোর সাথে সাগরতলে বিশ হাজার লিগ ঘুরিয়ে এনেছে; এথোস, পর্থোস, আরামিস আর দাঁরতানিয়ার সাথে কীভাবে সেটা আমাকে যুদ্ধে নামিয়েছে রাণীর বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রিশেল্যুর বিপক্ষে; মারিউসের নিশ্চল দেহ পিঠে নেয়া জাঁ ভালজাঁর সাথে কীভাবে সেটা আমায় হোঁচট খাইয়েছে প্যারিসের নর্দমায়।Read More »

বইমেলা ২০২০/ কিস্তি ০৪

২০২০ এর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত বইগুলোর কয়েকটাকে নিয়ে আমার এলোমেলো পাঠানুভূতি গুছিয়ে রাখার জন্য এই সিরিজ। আজ রইলো চতুর্থ পর্ব (সিরিজের সবগুলো কিস্তি পাওয়া যাবে এইখানে)।

নভেম্বর ১৯৭৫

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের পরেই সবচেয়ে আলোচিত সময়কালটি ১৯৭৫। ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি ইতিহাসের যে বাঁকটায় চলে যায়, সেই রাস্তা ধরেই হেঁটে ৭৫’ এর নভেম্বর মাস জন্ম দিয়েছে অভূতপুর্ব সব নাটকের। ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত নভেম্বর ১৯৭৫ এ, নজরুল সৈয়দের গবেষক চোখ চেষ্টা করেছে সেইসব নাটকের পেছনের কারণ খুঁজে বের করতে।

ব্যক্তিগত আঙিনায় নজরুল সৈয়দের সাথে আমার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ, সেই ঘনিষ্ঠতা অ্যাতোই গাঢ়, যে সেটার ফাঁক গলে অপরের রাজনীতিমনস্কতার প্রকৃতিও অনেকটা আমাদের উভয়েরই জানা। ফলে,  নভেম্বর ১৯৭৫ নিয়ে আগ্রহের আমার কমতি ছিলো না পাঠক হিসেবে।Read More »

মৃদু মানুষের মাস্তুলহীন মন

(১)
আসগর ফারহাদি যখন জীবনে প্রথমবারের মতো সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে ঢোকেন, ততদিনে তিনি পা রেখেছেন কৈশোরে, আর ইসলামি বিপ্লবের হাত ধরে ইরানের সুপ্রিম লিডার হয়ে বসা আয়াতুল্লাহ রুহুলউল্লাহ খোমেনির বিরুদ্ধে তখন যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন ইরাকের সাদ্দাম হোসেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে মিত্রশক্তির দেশগুলো যে সব সিনেমা বানিয়েছিলো, জাতীয়তাবাদ উস্কে দিতে সেই সব সিনেমাই তখন জোরেশোরে দেখানোর ধুম পড়েছে ইরানের হলগুলোতে। ইরাকের সাথে যুদ্ধ বলে পাবলিকও তখন খুব খাচ্ছে সেই জিনিস।

ফারহাদি যেদিন প্রথম সিনেমা দেখতে যান, গুষ্টির আরো কিছু ভাইবোনকে নিয়ে বাসে করে সেদিন শহরে পৌঁছতে খানিক দেরিই হয়ে যায় তার। হলে ঢুকতে ঢুকতে পেরিয়ে যায় সিনেমার প্রায় অর্ধেক। কিন্তু তাই বলে কি ক্ষুদে দর্শকদের আনন্দ কমে? নাহ, বরং সিনেমার পর্দায় তরুণ এক যোদ্ধা, যে নাৎজিদের রুখে দিতে কড়া ফাইট দিচ্ছিলো পূর্ব ইউরোপের কোথাও, সেটা দেখে সকলে একেবারে বিগলিত। বলাই বাহুল্য, শেষ দৃশ্যে নায়ক যথারীতি গলা কেটে নিয়েছিলো নাৎজি শয়তানদের।

Read More »

গড়পারের মানিক

যখনই তার কথা ভাবি, আমার মনে আসে শৈশবের কোনো এক বইমেলায় দেখা মানুষটার একটা চমৎকার পোস্টার। বিশাল, দীর্ঘদেহী মানুষটাকে সিনেমা পরিচালকদের চিরচেনা ভঙ্গীতে দুই হাতের মাঝ দিয়ে কিছু একটা খুঁজতে দেখেছিলাম আমি দেড় বাই এক হাতের সেই ছোট্ট পোস্টারে। সেই পোস্টার কেনা হয়ে ওথঠেনি আমার কখনো। ঘরের দেয়ালে দেশ-বিদেশের অজস্র সিনেমার পোস্টারের পাশে লাগানোও হয়নি কোনদিন। নানা ভঙ্গীমায় সেই মানুষটার আরো সব দারুণ সব পোস্টার আমি খুঁজে পেয়েছি পরে, নানা জায়গায়। কিন্তু কোনটাই মনে ধরেনি শৈশবের সেই এক পলকের জন্য  দেখা পোস্টারটার মতো।

ছেলেবেলা এক অদ্ভুত যাদুঘর। কেউ বলতে পারেনি, পারবে না; ছেলেবালার এক-একটা মুহুর্ত কী করে সারাজীবনের জন্য আমাদের তাড়া করে ফেরে। শৈশবের নায়কেরাও হয় ঠিক তেমনই। Read More »

কী বলি, যখন হারুকি মুরাকামিকে নিয়ে বলতে যাই

(১)

নিখুঁত লেখা বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, যেমন নেই নিরেট কোনো হতাশা।

হারুকি মুরাকামির প্রথম উপন্যাস ‘হিয়ার দ্যা উইন্ড সিং’ শুরু হয়েছে অন্য কোনো লেখকের মুখে শোনা এই বাণী উদ্ধৃত করে।

(২)
ঢাকা শহরের অজস্র রাজপথ, কিংবা তা হতে উদ্ভূত ভেতরের গলি, তস্যগলির মাঝে কিছু রাস্তা আমরা নিজস্ব বলে চিহ্নিত করে রাখি। কারো জন্য সেটা হতে পারে মাসুদের দোকান, কারো জন্য সেটি চাচীর টং, কারো জন্য বরাদ্দ থাকে বারেক স্টোরের বেঞ্চি। জানেন আড্ডাপ্রেমী মানুষ মাত্রই, এ জাতীয় আড্ডাগুলো মুখর হয়ে থাকে বিবিধ প্রশ্ন, বিচারকাজ এবং আক্ষেপে।Read More »

ইনভিকটাস, ১৯৭১

Some people believe football is a matter of life and death, I am very disappointed with that attitude. I can assure you it is much, much more important than that.
Bill Shankly

ক।

বাবার সামনে দাঁড়ালেই বুক কেঁপে উঠতো কেনো জানি, যে কারণে বাবার কাছে মুখ ফুটে মনের কথা বলা কখনোই হয়নি তার, যত আবদার ছিলো মায়ের কাছে। কোনোদিন এর অন্যথা হয়নি।

‘তোর বাবা বলতেছিলো তোকে লন্ডন পাঠায়ে দিবে আগামী মাসে,’ তূর্যকে বলেছিলেন মা। ‘এই নিয়ে ফয়েজ চাচার সাথে কথাও হইছে নাকি দুই-একবার।’

এ কথা শুনে আশঙ্কায় হঠাৎ ভারী হয়ে গিয়েছিলো তূর্যের বুকের ভেতরটা, চেষ্টা করেই গলার স্বরটা কাঠকাঠ করে তুলতে হয়েছিলো তাকে। ‘দ্যাখো আম্মা, ওই লন্ডন-ফন্ডন যাওয়া আমারে দিয়া হবে না। জুয়েলদের সাথে আমার কথা হইছে এর মাঝে, আগরতলায় যাবার রাস্তা খুঁজতেছে ওরা। আমিও ওদের সাথে যাবো ঠিক করছি, যুদ্ধে যাবো। তুমি আব্বারে বইলো।’

মা অবশ্য প্রথমে রাজি হননি বাবাকে এই কথা বলতে। তবে দুইদিন ধরে বাসায় পানি পর্যন্ত মুখে না দেয়ার ফলে মা’র কাছে আর উপায় থাকেনি কোনো। নিচু স্বরে চলা বদ্ধঘরের সেই আলোচনায় কান পেতে তূর্য কেবল শুনেছিলো মা হঠাৎ রেগে গিয়ে বাবাকে বলছেন- ‘আমার ছেলে যুদ্ধে চলে যাইতে চায়- আমার কলেজে পড়া ছেলে- তুমি তারে নিষেধ পর্যন্ত করবা না?’

বহুদূর থেকে তূর্য আব্বার গলা শুনতে পায় যেন, ‘আমি ওদের কোনমুখে মানা করি বলো ! আর তোমার ছেলেকে তো চেনো, সে যুদ্ধে না গেলে আর কার ছেলে যাবে বলতে পারো? ওর বয়েসী সবাই যুদ্ধে না গিয়ে লন্ডন চলে গেলে দেশটা কী করে স্বাধীন হবে?’

… সেই প্রথম তূর্যের মনে হয়েছিলো, বাবাকে সে চেনে না- বোঝে না ঠিকই; তবে বাবা তাকে ঠিকই বোঝেন ও চেনেন।
Read More »

কফিশপের মানুষেরা

বর্ণালী সাহার ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ উপন্যাসটি পড়বো বলে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়নি আমার দুটো কারণে। ফেসবুক মারফত নজরে আসা মাত্র মনে হয় যে, কি নামকরণে কি প্রচ্ছদে, এই উপন্যাসটি বেশ অভিনব। তদুপরি বিক্ষিপ্তভাবে নানা জায়গায় বর্ণালীর টুকরো টুকরো রচনাগুলো যা পড়া হয়েছে, তাতে করেও তার গদ্যে বেশ আস্থা স্থাপিত হয়। বর্ণালীর প্রথম উপন্যাস হিসেবে ‘দ্যা নর্থ এন্ড’কে সংগ্রহ করাকে কর্তব্য নির্ধারণে আমি তাই দ্বিধান্বিত হইনি।

অথচ মার্চের এক সন্ধ্যায়, ঘন্টা তিনেক টানা পড়ে শেষ করে ফেলবার পর, ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে আমার ভেতরে বেশ দ্বিধা চাপে, বিক্ষিপ্ত বলে মনে হয় নিজেকে।

Read More »