কী বলি, যখন হারুকি মুরাকামিকে নিয়ে বলতে যাই

(১)

নিখুঁত লেখা বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, যেমন নেই নিরেট কোনো হতাশা।

হারুকি মুরাকামির প্রথম উপন্যাস ‘হিয়ার দ্যা উইন্ড সিং’ শুরু হয়েছে অন্য কোনো লেখকের মুখে শোনা এই বাণী উদ্ধৃত করে।

(২)
ঢাকা শহরের অজস্র রাজপথ, কিংবা তা হতে উদ্ভূত ভেতরের গলি, তস্যগলির মাঝে কিছু রাস্তা আমরা নিজস্ব বলে চিহ্নিত করে রাখি। কারো জন্য সেটা হতে পারে মাসুদের দোকান, কারো জন্য সেটি চাচীর টং, কারো জন্য বরাদ্দ থাকে বারেক স্টোরের বেঞ্চি। জানেন আড্ডাপ্রেমী মানুষ মাত্রই, এ জাতীয় আড্ডাগুলো মুখর হয়ে থাকে বিবিধ প্রশ্ন, বিচারকাজ এবং আক্ষেপে।Read More »

ইনভিকটাস, ১৯৭১

Some people believe football is a matter of life and death, I am very disappointed with that attitude. I can assure you it is much, much more important than that.
Bill Shankly

ক।

বাবার সামনে দাঁড়ালেই বুক কেঁপে উঠতো কেনো জানি, যে কারণে বাবার কাছে মুখ ফুটে মনের কথা বলা কখনোই হয়নি তার, যত আবদার ছিলো মায়ের কাছে। কোনোদিন এর অন্যথা হয়নি।

‘তোর বাবা বলতেছিলো তোকে লন্ডন পাঠায়ে দিবে আগামী মাসে,’ তূর্যকে বলেছিলেন মা। ‘এই নিয়ে ফয়েজ চাচার সাথে কথাও হইছে নাকি দুই-একবার।’

এ কথা শুনে আশঙ্কায় হঠাৎ ভারী হয়ে গিয়েছিলো তূর্যের বুকের ভেতরটা, চেষ্টা করেই গলার স্বরটা কাঠকাঠ করে তুলতে হয়েছিলো তাকে। ‘দ্যাখো আম্মা, ওই লন্ডন-ফন্ডন যাওয়া আমারে দিয়া হবে না। জুয়েলদের সাথে আমার কথা হইছে এর মাঝে, আগরতলায় যাবার রাস্তা খুঁজতেছে ওরা। আমিও ওদের সাথে যাবো ঠিক করছি, যুদ্ধে যাবো। তুমি আব্বারে বইলো।’

মা অবশ্য প্রথমে রাজি হননি বাবাকে এই কথা বলতে। তবে দুইদিন ধরে বাসায় পানি পর্যন্ত মুখে না দেয়ার ফলে মা’র কাছে আর উপায় থাকেনি কোনো। নিচু স্বরে চলা বদ্ধঘরের সেই আলোচনায় কান পেতে তূর্য কেবল শুনেছিলো মা হঠাৎ রেগে গিয়ে বাবাকে বলছেন- ‘আমার ছেলে যুদ্ধে চলে যাইতে চায়- আমার কলেজে পড়া ছেলে- তুমি তারে নিষেধ পর্যন্ত করবা না?’

বহুদূর থেকে তূর্য আব্বার গলা শুনতে পায় যেন, ‘আমি ওদের কোনমুখে মানা করি বলো ! আর তোমার ছেলেকে তো চেনো, সে যুদ্ধে না গেলে আর কার ছেলে যাবে বলতে পারো? ওর বয়েসী সবাই যুদ্ধে না গিয়ে লন্ডন চলে গেলে দেশটা কী করে স্বাধীন হবে?’

… সেই প্রথম তূর্যের মনে হয়েছিলো, বাবাকে সে চেনে না- বোঝে না ঠিকই; তবে বাবা তাকে ঠিকই বোঝেন ও চেনেন।
Read More »

কফিশপের মানুষেরা

বর্ণালী সাহার ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ উপন্যাসটি পড়বো বলে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়নি আমার দুটো কারণে। ফেসবুক মারফত নজরে আসা মাত্র মনে হয় যে, কি নামকরণে কি প্রচ্ছদে, এই উপন্যাসটি বেশ অভিনব। তদুপরি বিক্ষিপ্তভাবে নানা জায়গায় বর্ণালীর টুকরো টুকরো রচনাগুলো যা পড়া হয়েছে, তাতে করেও তার গদ্যে বেশ আস্থা স্থাপিত হয়। বর্ণালীর প্রথম উপন্যাস হিসেবে ‘দ্যা নর্থ এন্ড’কে সংগ্রহ করাকে কর্তব্য নির্ধারণে আমি তাই দ্বিধান্বিত হইনি।

অথচ মার্চের এক সন্ধ্যায়, ঘন্টা তিনেক টানা পড়ে শেষ করে ফেলবার পর, ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে আমার ভেতরে বেশ দ্বিধা চাপে, বিক্ষিপ্ত বলে মনে হয় নিজেকে।

Read More »

বইমেলা ২০২০/ কিস্তি ০২

২০২০ এর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত বইগুলো পড়া শেষে আমার এলোমেলো অনুভূতি গুছিয়ে রাখার জন্য এই সিরিজ। সম্যক আলোচনা কিছুতেই বলা যায় না এসব শব্দ সমষ্টিকে, আমার বরং মনে হয় আলোচ্য বইগুলো নিয়ে এসব কথাবার্তা পাঠের চটজলদি প্রতিক্রিয়া ছাড়া আর কিছু হতে পারেনি। তবু, আকারে ছোট বলে হোক আর পরিচিতদের সাথে তাদের লেখা নিয়ে তর্ক করার লোভে হোক; দ্রুতই পড়ে নিয়ে নিজস্ব অনুভূতি জানিয়ে রাখলাম আগ্রহীদের।

তিনটি ছোটগল্প সংকলন নিয়ে আজ রইলো সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব (প্রথম কিস্তি এইখানে)।Read More »

বইমেলা ২০২০/ কিস্তি ০১

সুদূর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ফেব্রুয়ারিতে একেবারে নিজের আঙ্গিনা বানিয়ে ফেলা একুশে বইমেলা চত্বরে ব্যস্ততা আর অসুস্থতার প্রকোপে এবার যাওয়া হয়েছে বেশ কম। দিন তিনেক হবে। বই কেনার মাঝে তাই প্রথম দফায় ছিলো পরিচিতদের লেখা বইগুলোই। মেলায় কেনা বই মেলার মাঝেই পড়ে ফেলাটা গরম জিলিপি খাবার মতোই, সারতে পারলে বেশ আরাম লাগে। সেজন্যেই আকারে ছোট বলে হোক আর পরিচিতদের সাথে তাদের লেখা নিয়ে তর্ক করার লোভে হোক; কয়েকটা বই দ্রুতই পড়ে ফেললাম।

পরিচতদের বই নিয়ে আলোচনার করার ঝুঁকি থাকে। থাপ্পড়টাও মারতে হয় ললিত স্বরে, আবার প্রশংসা বিলাতে হলে বজায় রাখতে হয় আঁটোসাঁটো লাইন লেংথ। ফলে আলোচনার ওই ছকে বাঁধা এবং ভুরু কুঁচকানো পথে না হেঁটে আমি তাই এলোমেলো কথাই বলে গেলাম এখানে। আশা রাখি পডকাস্ট আর ইউটিউবারের যুগে বইমেলা ২০২০ থেকে কেনা বাকি বইগুলো নিয়েও এমন খাপছাড়া কথার ঝুলি চালু রাখতে পারবো পরের কোনো অবসরে।Read More »

জানালা মানুষ

অঞ্জন দত্তের গান প্রথম শোনার দিন না হলেও ক্ষণটা আমার মনে আছে, মনে আছে যে তখনো আমি প্রাইমারি স্কুলেই পড়ি। প্রাইমারি স্কুলে পড়বার সময় আমার ধারণা ছিলো প্রতিবছর ঈদ হয় ঠিক শীতকালে, আর সেই ঈদের জন্যে শীতের সকালে গ্রামের বাড়িতে পেছনের লাগোয়া গোসলঘরে কাঁপতে কাঁপতে গোসল করতে হয় মাথায় পানি দিয়ে। তো, সেরকমই কোনো একটা ঈদ করবার পর মামার গাড়িতে চেপে গ্রাম থেকে রওয়ানা দিয়েছি চট্টলা শহরের দিকে। মেজোমামার ভোক্সওয়াগনের জানালা দিয়ে গালে হালকা থাপ্পড় মারছে ঠান্ডা বাতাস, আমি আম্মার সামনে আধ-বসা-আর-আধেক-দাঁড়ানো অবস্থায় সামনের সিটের কাঁধ আকঁড়ে ধরে আছি, ছোট্টো কিন্তু যাত্রী পূর্ণ গাড়ির নানা আসন থেকে নানা বিষয়ে কথা বলে চলেছে বড়রা, আর এসবের মাঝে কেমন একটা গলায় কে যেন সমানে চ্যাঁচিয়ে যাচ্ছে- ‘বড় বড় বড় বড় গোল গোল চোখ, হরিপদ একজন সাদামাটা ছোটোখাটো লোক…..’Read More »

দস্তয়েভস্কির দানবেরা

(১)
ফিওদর দস্তয়েভস্কির সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসটি, সম্ভবতঃ ‘অপরাধ ও শাস্তি’। আগ্রহী পাঠকের স্মরণ হয়, গোয়েন্দা কাহিনির গতিতে এগিয়ে চলা সেই উপন্যাসে তারা প্রত্যক্ষ করেছে রাস্কলনিকোভের প্রবল যুক্তিবাদী চরিত্রের টানাপোড়েন, দহনে পুড়তে পুড়তে যুক্তির সিঁড়ি ভাঙা শেষে যে মানুষটা আবিষ্কার করেছে জীবন কোনো অংক নয়, তত্ত্ব দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করা যায় না কিছুতেই। তো, সেই দস্তয়েভস্কিরই আরেক উপন্যাস দা ডেমনস পড়তে গিয়ে রাস্কলনিকোভকে কখনো কখনো স্মরণ হবার কারণ হচ্ছে, এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র পিওতর স্তেপানোভিচের সাথেও কিছু কিছু জায়গায় সাদৃশ্য রয়েছে রয়েছে।

স্বীকার করি, সেই সাদৃশ্য আবিষ্কার করার আগেই দা ডেমনস উপন্যাসের সাথে আমার পরিচয় ঘটে যায় দুটি ভিন্ন রাস্তায়। প্রথম রাস্তাটির অবস্থান জে এম কোয়েটজি’র ‘দা মাস্টার অফ পিটার্সবার্গ’ উপন্যাসে। আঠারোশো উনসত্তরের এক শীতে সৎ পুত্র পাভেলের রহস্যময় মৃত্যুতে দস্তয়েভস্কি সেন্ট পিটার্সবার্গে ফিরে এসেছেন ইউরোপ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষ করে, এমন এক কাল্পনিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে কোয়েটজির উপন্যাসটির কাহিনি। সেই আখ্যানে দস্তয়েভস্কি মুখোমুখি হন ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে থাকা সের্গেই নাচায়েভ নামের এক নিহিলিস্টের সাথে, আর উপন্যাসটির শেষ পাতায় দস্তয়েভস্কি শুরু করেন ‘দা ডেমনস’ উপন্যাস লেখার কাজ। দা ডেমনস উপন্যাসের সাথে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাৎ ঘটে প্রিয় ঔপন্যাসিক অরহান পামুকের এক আলোচনায়। দেখতে পাই, পামুক সেখানে দস্তয়েভস্কির এই উপন্যাসকে আখ্যা দিচ্ছেন সর্বকালের সেরা রাজনৈতিক উপন্যাস বলে।Read More »